পরিপূর্ণ মুসলিম হতে হলে ঈমান, ইলম ও আমলের সাথে আমাদের আরও একটি গুণ থাকা দরকার তা হলো, ‘পারস্পরিক ভালোবাসা’। রাসূল সা. বলেছেন, “তোমরা ততক্ষণ জান্নাতে যেতে পারবে না যতক্ষণ না তোমরা মুমিন হবে তোমরা ততক্ষণ মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ না তোমরা পরস্পরকে ভালবাসতে পারবে। আমি কি তোমাদের এমন বিষয় বলবো যা করলে তোমরা একে অপরকে ভালবাসবে? তোমরা নিজেদের মধ্যে অধিক পরিমাণ সালাম আদান প্রদান করো”। (মুসলিমঃ৫৪)অতএব পারস্পরিক
ভালো বাসা হলো মুমিন হওয়ার শর্ত। আর এই ভালোবাসা বৃদ্ধির উপায় ও রাসূল সা.বলেছেন। সুবহান আল্লাহ!
ইসলামে ভালোবাসা অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, আল্লাহর দ্বীনের জন্য পারস্পারিক ভালবাসার প্রতিদান তো সীমাহীন। তাইতো রাসুল সা. বলেছেন,” যেদিন সূর্যটা অধিক নিকটবর্তী হয়ে যাবে, আল্লাহর আরশের ছায়া ছাড়া আর কোন ছায়া থাকবে না সেদিন সাত শ্রেণীর মানুষ মহান আল্লাহর আরশের ছায়ায় জায়গা পাবে। তার মধ্যে ঐ দু’ব্যক্তি ও থাকবে যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, আল্লাহর দ্বীনের জন্যই পরস্পরকে ভালোবেসে ছিল”।( মুসলিম: ১০৩১)
ইসলামী ভালোবাসার স্বরূপ ও নীতি
‘ভালোবাসা’ ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যার অন্তরে যত বেশি ভালোবাসা, সে আল্লাহর ততবেশি নিকটবর্তী। কারণ যাবতীয় কল্যাণমূলক কাজ ও পারস্পরিক কল্যাণ কামনার উৎপত্তি হয় ভালোবাসা থেকেই। আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সা. বলেছেন, “মুমিন ব্যক্তি ভালোবাসার প্রতীক। ঐ ব্যাক্তির মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই, যে কাউকে ভালোবাসে না এবং পরিণামে ও তাকে কেউ ভালবাসে না”। ( মুসনাদে আহমদ) তাই বাবা-মা, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রীর, সন্তান, প্রতিবেশী আত্মীয় স্বজন প্রত্যেকের প্রতি প্রত্যেকের মজবুত ভালোবাসা থাকবে। ভালোবাসা পাওয়া একের উপর অন্যের হক। কিন্তু সবচেয়ে বেশি ভালোবাসা থাকতে হবে সেই মহান সৃষ্টিকর্তার প্রতি যিনি আমাদেরকে সব চেয়ে বেশি ভালোবাসা দিয়েছেন। তিনিই আমাদের ভালোবাসা পাওয়া সবচেয়ে বেশি হকদার।
আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা:
আল-কুরআনে আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেছেন,” হে নবী (ওদেরকে বলো), তোমাদের বাবা মা, সন্তান, ভাই স্বামী-স্ত্রী, আত্মীয়-স্বজন, তোমাদের ধন-সম্পদ যা তোমরা অর্জন করেছ, তোমাদের ঐ ব্যবসা বাণিজ্য যার মন্দা হয়ে যাবার ভয় করো, তোমাদের সেই ঘর বাড়ি যা তোমরা পছন্দ করো এসব যদি তোমাদের নিকট আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এবং আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা থেকে বেশি প্রিয় হয়ে থাকে, তাহলে আল্লাহর চূড়ান্ত ফয়সালা আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করো “।(সূরা তাওবা : ২৪)
অতএব আল্লাহ কে ভালবাসার নিদর্শন দুটি।
যথা :(ক)রাসূলকে ভালোবাসা
(খ)আল্লাহর পথে জিহাদ।
(ক)রাসুলকে ভালোবাসা: রাসুল সা.এর পূর্ণ আনুগত্যের মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা প্রমাণ হবে। আল্লাহর নির্দেশ,” হে নবী (তাদেরকে বলো) যদি তোমরা সত্যিকারভাবে আল্লাহকে ভালোবাসো তবে আমার (রাসূলের) আনুগত্য করো আল্লাহ তোমাদের তাঁর প্রিয় বান্দা হিসেবে কবুল করে নিবেন”।(সূরা আল-ইমরান:৩১) আল্লাহ তা’আলা নির্দেশ দিয়েছেন,” রাসূল তোমাদের যা কিছু দেন তা গ্রহণ করো এবং যা থেকে বিরত থাকতে বলেন তা থেকে বিরত থাকো”। (সূরা হাশর: ৭) রাসুল সা. কে ভালোবাসা প্রসঙ্গে স্বয়ং রাসুল সা. বলেছেন,” সেই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার জীবন! তোমাদের কেউ মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত আমি তার নিকট তার সন্তান, তার বাবা-মা সহ অন্যান্য মানুষের চেয়ে বেশি প্রিয় না হবো”।(বুখারী) তাই আমাদের উপর রাসূলের স. আনুগত্য ফরজ। আর আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়ার জন্য রাসূল সা. ই একমাত্র মাধ্যম। এর কোনো বিকল্প নেই। আমাদের সার্বিক কল্যাণ ও সফলতার জন্য ই রাসূল স. কে ভালোবাসতে হবে।রাসূল স. বলেছেন, “ আমি তোমাদের কাছে দুটো জিনিস রেখে যাচ্ছি, যতদিন তোমরা তা শক্ত করে ধরে রাখবে, ততদিন পথভ্রষ্ট হবে না। আর তা হলো আল্লাহর কিতাব ও আমার সুন্নাহ”।
(বুখারী ও মুসলিম)
(খ) আল্লাহর পথে জিহাদ: আল্লাহকে ভালোবাসার দ্বিতীয় নিদর্শন হলো আল্লাহর পথে জিহাদ। অর্থাৎ আল্লাহর দ্বীন কায়েমের চেষ্টা করা, সমস্ত অনৈতিকতা দূর করে ইসলামী নৈতিকতা প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা-সাধনা ও লড়াই করা। আল্লাহই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসা পাওয়ার হকদার। আল্লাহকে ভালোবাসার কথা শুধু মুখে বললে হবে না, কাজে ও প্রমাণ করতে হবে। তাই আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে চলা জরুরি। আল্লাহ তা’য়ালা বলেছেন, “ লোকেরা কি মনে করেছে, আমরা ঈমান এনেছি এতটুকু বললেই তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হবে? আর তাদের পরীক্ষা করা হবে না? অথচ আমি তো তাদের পূর্বে অতিক্রান্ত সকল লোককেই পরীক্ষা করেছি। আল্লাহ তো অবশ্যই দেখে নিবেন (ঈমানের দাবিতে) কে সত্যবাদী আর কে মিথ্যাবাদী”। (সূরা আল আনকাবুত: ১,-৩)
অতএব আমাদের ভালোবাসা সবই যেন হয় শুধু মহান রবের জন্য। রাসূল সা. ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য কাউকে ভালোবাসল, আল্লাহর জন্য কাউকে ঘৃণা করল, আল্লাহর জন্য কাউকে দান করল এবং আল্লাহর জন্য কাউকে দান করা থেকে বিরত থাকল, সে ব্যক্তি নিজ ঈমানকে পূর্ণতা দান করল।(আবু দাউদ : ৪৬৮৩)
ভালোবাসার মহিমার বিবরণে একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ইসলামে গাইরে মাহরামদের প্রেম-ভালোবাসা হারাম। ভালোবাসার অর্থ যেমন ব্যাপক এর পরিধি উপমাও তেমনি বর্ণনাতীত। নিঃস্বার্থ ভালোবাসার ফোয়ারায় উজ্জীবিত হোক সকল প্রাণ এটাই সবার প্রত্যাশা।