জুলাই বিপ্লব পরবর্তী বাংলাদেশে গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে যখন ভাবি, তখন মনে হয় আমরা এক ঐতিহাসিক মোড়ে দাঁড়িয়ে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, সেই বাস্তবতায় গণমাধ্যমের অবস্থান, দায়িত্ব ও কর্তব্য অনেকখানি বদলে গেছে।

গণঅভ্যুত্থানের সময় আমরা দেখেছি সোশ্যাল মিডিয়া ও বিকল্প গণমাধ্যম কিভাবে তথ্য প্রবাহের মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছিল। ঐ সময়ে দ্রুত তথ্য পরিবেশনায় টেলিভিশন ও পত্রিকাগুলো যতটা সক্রিয় ছিল, তার চেয়ে বেশি সক্রিয় ছিল ফেসবুক, ইউটিউব। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- বিপ্লব পরবর্তী স্থিতিশীল সমাজ বিনির্মাণে গণমাধ্যমের ভূমিকা কী হবে? আমার মতে, জুলাই পরবর্তী গণমাধ্যমের প্রধান কাজ হবে সত্য প্রতিষ্ঠা ও বিভ্রান্তি নিরসন। গত কয়েক বছরে আমরা দেখেছি কীভাবে বিভ্রান্তিকর তথ্য ও গুজব সমাজে অস্থিরতা তৈরি করে। এখন সময় এসেছে তথ্যের সত্যতা যাচাই ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার মাধ্যমে গণমাধ্যম আস্থার জায়গাটি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবে। এছাড়া, বিপ্লব পরবর্তী বাংলাদেশে গণমাধ্যমকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে হবে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, নারী, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, প্রতিবন্ধীসহ সমাজের সব শ্রেণীর কণ্ঠস্বর তুলে ধরার দায়িত্ব গণমাধ্যমকে নিতে হবে। বোদার মতো উপজেলা পর্যায়ে বসে আমরা লক্ষ করছি, মূলধারার গণমাধ্যমে স্থানীয় সংবাদ ও সমস্যাগুলো পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায় না। জুলাই চেতনা অনুযায়ী, বিকেন্দ্রীভূত সাংবাদিকতার মাধ্যমে সবার কথা বলার সুযোগ সৃষ্টি করা জরুরি। তরুণ প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতে গেলে, জুলাই বিপ্লবের মূল চালিকাশক্তি ছিল তরুণরা। আর এই তরুণ সমাজ আজ তথ্যপ্রযুক্তিতে সবচেয়ে দক্ষ। তারা ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত। তাই জুলাই পরবর্তী গণমাধ্যমকে তরুণদের চিন্তা-চেতনা ও তাদের ভাষাকে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রচলিত সাংবাদিকতার বাইরে গিয়ে ডিজিটাল মাধ্যমকে আরও শক্তিশালী করতে হবে, যেখানে তরুণরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিতে পারে এবং তাদের মতামত প্রকাশ করতে পারে। তরুণ সাংবাদিক ও কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা জরুরি, যাতে তারা তাদের দক্ষতা ও সৃজনশীলতা বিকশিত করতে পারে।

উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিকদের জন্য জুলাই পরবর্তী সময় নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে। স্থানীয় সমস্যাগুলোকে জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরার দায়িত্ব বেড়েছে। বোদা অঞ্চলের কৃষক, দিনমজুর, নিম্নআয়ের মানুষের কথা গণমাধ্যমে তুলে ধরতে আমরা কাজ করছি। কিন্তু এখনো পর্যাপ্ত সুযোগ নেই। স্থানীয় সাংবাদিকদের জন্য আরও প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সুবিধা নিশ্চিত করা দরকার, যাতে তারা সঠিক ও নির্ভরযোগ্য সংবাদ পরিবেশন করতে পারেন। এছাড়া স্থানীয় পত্রিকা ও অনলাইন পোর্টালগুলোর টেকসই উন্নয়নে সহায়তা প্রয়োজন, যাতে তারা পেশাদার সাংবাদিকতা চালিয়ে যেতে পারে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি দায়িত্বশীলতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বিপ্লবের উত্তাল সময়ে অনেক অনলাইন পোর্টাল ও ব্যক্তিগত পেইজ অনিয়ন্ত্রিতভাবে খবর পরিবেশন করেছে, যার অনেকটাই ছিল অপরীক্ষিত ও বিভ্রান্তিকর। এখন স্থিতিশীল সমাজ গঠনের সময়ে গণমাধ্যমকর্মীদের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও পেশাদার নীতিমালা মেনে চলার বিকল্প নেই। একটি গুজব সমাজে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে, যা বিপ্লবের অর্জনকেই ধ্বংস করে দিতে পারে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। জুলাই বিপ্লব প্রমাণ করেছে যে জনগণ তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন। একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন গণমাধ্যম কেবল তথ্য পরিবেশন করে না, বরং দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হিসেবেও কাজ করে। তাই সরকার ও প্রশাসনের উচিত গণমাধ্যমের ওপর থেকে সব ধরনের নিয়ন্ত্রণ তুলে নিয়ে পেশাদারিত্বের জায়গাটি তৈরি করে দেওয়া। তবে এখানে গণমাধ্যমকেও আত্মসমালোচনা করতে হবে। বাণিজ্যিক স্বার্থে সংবাদের মানদণ্ড বিসর্জন, হলুদ সাংবাদিকতা ও ভিত্তিহীন সংবাদ পরিবেশন প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। জুলাই চেতনার সাথে সামঞ্জস্য রেখে মানবিক মূল্যবোধ, দেশপ্রেম ও পেশাদারিত্বকে প্রাধান্য দিতে হবে। নারী ও শিশু ইস্যুতেও গণমাধ্যমের ভূমিকা নতুন করে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। জুলাই আন্দোলনে নারীরা সাহসিকতার সাথে অংশ নিয়েছিলেন।

কিন্তু এখনো গণমাধ্যমে নারীর উপস্থাপনায় পুরনো ধারা অব্যাহত রয়েছে। নারীকে শুধু ভুক্তভোগী বা অলংকার হিসেবে না দেখে শক্তির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরতে গণমাধ্যমকে এগিয়ে আসতে হবে। নারী সাংবাদিকদের জন্য কর্মপরিবেশ আরও বন্ধুত্বপূর্ণ করতে হবে। এছাড়া শিশুদের অধিকার, তাদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিয়েও নিয়মিত সংবাদ ও প্রতিবেদন প্রকাশ করা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টিও জুলাই পরবর্তী গণমাধ্যমের ফোকাসে থাকা উচিত। আমাদের দেশের দক্ষিণাঞ্চলের মতো উত্তরাঞ্চলেও জলবায়ুর প্রভাব পড়ছে। পঞ্চগড়ের নদ-নদী ভরাট হয়ে যাচ্ছে, তাপমাত্রার তারতম্য ঘটছে।

এসব বিষয়ে নিয়মিত সংবাদ ও প্রতিবেদন প্রকাশ করে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। পরিবেশ বিপর্যয় রোধ ও টেকসই উন্নয়নের বার্তা গণমাধ্যমকে ছড়িয়ে দিতে হবে। অর্থনৈতিক সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা দরকার। বৃহৎ শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, কৃষক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে গুরুত্ব দিতে হবে। তাদের সফলতার গল্প ও সমস্যাগুলো তুলে ধরা হলে তারা আরও অনুপ্রাণিত হবে এবং দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারবে। বিশেষ করে তরুণ উদ্যোক্তা ও স্টার্টআপগুলোর খবর প্রচার করে তাদের উৎসাহিত করতে হবে।

পরিশেষে বলতে চাই, জুলাই পরবর্তী বাংলাদেশ বিনির্মাণে গণমাধ্যম হবে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। এই হাতিয়ারকে সঠিক দিকনির্দেশনা ও স্বাধীনতা দিতে পারলে আগামীর বাংলাদেশ হবে শোষণমুক্ত, সম্প্রীতির গণতান্ত্রিক একটি রাষ্ট্র।