চট্টগ্রামের পাহাড়ি ঢল নেমে এসে যে নদীটি সমতলে প্রাণের সঞ্চার করে, তার নাম হালদা নদী। এই নদী শুধু একটি জলধারা নয়; এটি প্রকৃতি, মানুষ ও অর্থনীতির গভীর সম্পর্কের এক জীবন্ত উদাহরণ। দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মিঠাপানির কার্পজাতীয় মাছের ডিম সংগ্রহের ক্ষেত্র হিসেবে হালদা বহু বছর ধরে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে আসছে। রুই, কাতলা, মৃগেলসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ এই নদীতে ডিম ছাড়ে। সেই ডিম সংগ্রহ করে পোনা উৎপাদন করা হয়, যা পরে দেশের নানা প্রান্তের খামারে সরবরাহ করা হয়। ফলে হালদা জাতীয় মৎস্য উৎপাদনের এক গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে পরিচিত।

প্রতি বছর ডিম ছাড়ার মৌসুমে হালদার তীরজুড়ে এক বিশেষ দৃশ্য দেখা যায়। জেলেরা নৌকা নিয়ে নদীতে নামেন, ডিম সংগ্রহ করেন, পরিবার-পরিজন নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করেন। এই মৌসুমকে ঘিরে স্থানীয় অর্থনীতি চাঙা হয়ে ওঠে। ডিম সংগ্রহ, পরিবহন, পোনা উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ-সব মিলিয়ে হাজারো মানুষের আয়-রোজগারের সুযোগ সৃষ্টি হয়। হালদা তাই শুধু একটি নদী নয়; এটি একটি চলমান অর্থনৈতিক চক্রের কেন্দ্রবিন্দু।

কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই নদী নানা চাপে পড়েছে। শিল্পকারখানার বর্জ্য, বসতবাড়ির ময়লা, প্লাস্টিক ও বিভিন্ন ধরনের আবর্জনা নদীর পানিতে মিশে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বর্জ্য শোধনের যথাযথ ব্যবস্থা না থাকায় দূষণের মাত্রা বাড়ছে। নদীর পানি আগের মতো স্বচ্ছ নেই। পানির গুণগত মান নষ্ট হলে মাছের স্বাভাবিক জীবনচক্র ব্যাহত হয়। ডিম ছাড়ার অনুকূল পরিবেশ নষ্ট হলে উৎপাদন কমে যায়, যা সরাসরি জাতীয় মৎস্যসম্পদে প্রভাব ফেলে।

কৃষিক্ষেত্রেও অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের প্রভাব হালদায় পড়ছে। বৃষ্টির পানির সঙ্গে এসব রাসায়নিক নদীতে এসে মিশে যায়। কোথাও কোথাও নদীর তীরবর্তী এলাকায় তামাক চাষ পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে। এতে নদীর জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মাছের ডিম ও পোনার বেঁচে থাকার হার কমে গেলে ভবিষ্যতে মাছের উৎপাদনও কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়।

অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনও একটি বড় সমস্যা। নদীর তলদেশ থেকে নির্বিচারে বালু তুললে স্বাভাবিক গঠন বদলে যায়। মাছ ডিম ছাড়ার জন্য নির্দিষ্ট গভীরতা ও পরিবেশ প্রয়োজন। তলদেশ পরিবর্তিত হলে সেই প্রাকৃতিক পরিবেশ নষ্ট হয়। একইভাবে অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে। উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু তা হতে হবে পরিবেশসম্মত ও টেকসই।

এছাড়া নদীতে বিষ প্রয়োগ, ঘেরাজাল ও বড়শি দিয়ে নির্বিচারে মাছ শিকারও হালদার জন্য মারাত্মক হুমকি। বিশেষ করে প্রজনন মৌসুমে এসব অবৈধ পদ্ধতিতে মাছ ধরার ফলে মা মাছ ও ডিম উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে প্রাকৃতিক প্রজনন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয় এবং ভবিষ্যৎ মৎস্যসম্পদ ঝুঁকির মুখে পড়ে। তাই বিষ প্রয়োগ, ঘেরাজাল ও বড়শি দিয়ে মাছ শিকার সম্পূর্ণ বন্ধে কঠোর নজরদারি ও আইন প্রয়োগ জরুরি।

হালদার পরিবেশগত সংকটের সঙ্গে অর্থনৈতিক সংকট গভীরভাবে জড়িত। ডিম কমে গেলে পোনা উৎপাদন কমে যায়। পোনা না পেলে মাছের খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। মাছের উৎপাদন কমে গেলে বাজারে দাম বাড়ে, সাধারণ মানুষও প্রভাবিত হন। অর্থাৎ নদীর ক্ষতি একসময় বৃহত্তর অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে। স্থানীয় জেলে, শ্রমিক, নৌকাচালক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আয় কমে গেলে তাদের জীবনযাত্রায়ও সংকট দেখা দেয়।

এই বাস্তবতায় হালদাকে রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি। প্রথমত, শিল্পবর্জ্য শোধনের ব্যবস্থা কঠোরভাবে নিশ্চিত করতে হবে এবং নিয়মিত মনিটরিং জোরদার করতে হবে। দ্বিতীয়ত, নদীতে ময়লা ও প্লাস্টিক ফেলা বন্ধে সচেতনতা ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

তৃতীয়ত, কৃষিক্ষেত্রে পরিবেশবান্ধব পদ্ধতির ব্যবহার বাড়াতে হবে। চতুর্থত, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি বিষ প্রয়োগ, ঘেরাজাল ও বড়শি দিয়ে মাছ শিকার বন্ধে প্রশাসনের নিয়মিত অভিযান চালাতে হবে।

নদী রক্ষায় স্থানীয় মানুষের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম হালদার ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করছেন, তারাই এই নদীর প্রকৃত অভিভাবক। তাদের সচেতনতা ও সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো উদ্যোগই দীর্ঘস্থায়ী হবে না। স্কুল-কলেজে নদী রক্ষা বিষয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের মাধ্যমে প্রচার-প্রচারণা বাড়ানো যেতে পারে।

হালদা আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ ও জাতীয় গর্ব। পরিবেশ রক্ষা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন-দুটিকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। পরিবেশ ধ্বংস করে কোনো উন্নয়ন স্থায়ী হয় না। টেকসই উন্নয়নের পথেই রয়েছে ভবিষ্যতের নিরাপত্তা। আজ যদি আমরা সচেতন হই, সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করি এবং কঠোরভাবে তা বাস্তবায়ন করি, তবে হালদা আবার তার প্রাণ ফিরে পাবে।

নদীর স্বচ্ছ পানি, প্রাচুর্যময় মাছ এবং কর্মব্যস্ত জেলেদের হাসিমুখ-এই দৃশ্যই হোক আমাদের লক্ষ্য। হালদা বাঁচলে প্রকৃতি বাঁচবে, জীবিকা বাঁচবে, অর্থনীতিও শক্ত থাকবে। তাই আসুন, আমরা সবাই মিলে এই নদী রক্ষায় দৃঢ় অঙ্গীকার করি।