ঘন কালো রাতের আঁধার কাটিয়ে যখন সূর্যের আলোয় আলোকিত হয় সমগ্র পৃথিবী, তখন নতুন করে নবজীবনের সূচনা হয়। নতুন একটি দিন, নতুন প্রত্যাশা, নতুন কিছু পরিকল্পনা এবং পূর্বের থেকে ভিন্ন ফলাফল। গত ১৭ বছরের অত্যাচারী ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর আমরা নতুন করে স্বাধীনতা পাই। স্বাধীনতার সাথে আসে নতুন প্রত্যাশা ও দায়িত্ব। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসে ভঙ্গুর বাংলাদেশের দায়িত্ব কাঁধে নেয় এবং বিগত দেড় বছরে সাধ্য অনুযায়ী সংস্কার করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত দলকে ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যমে বিদায় নেয়। নবনির্বাচিত সরকারের কাছে অর্পিত হয় আগামী ৫ বছরের শাসনভার। নতুন সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা কি হতে পারে এখন তাই দেখার বিষয়।

শাসন ভার গ্রহণ এবং তা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করার মাঝে বিরাট পার্থক্য রয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস লক্ষ্য করলে দেখা যায়, ক্ষমতা পাওয়ার পর অধিকাংশ দল ফ্যাসিবাদী শাসন চর্চা করে। তবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের মানুষ রাজনীতি নিয়ে সচেতন হয়েছে। বিশেষ করে বাকস্বাধীনতা হারানো তরুণ প্রজন্ম এখন তাদের রাজনৈতিক এবং মানবাধিকার নিয়ে সচেতন। তারা প্রতিটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান গড়ে তোলে এবং প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। তাই পূর্বের তুলনায় বর্তমানে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা করা অনেকটাই কঠিন। নবনির্বাচিত সরকারের কাছে বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা রয়েছে অনেক। যা পরবর্তী ৫ বছরের বাংলাদেশ গড়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

নবনির্বাচিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের কাছে জনগণের রয়েছে অনেক প্রত্যাশা। যা আগামীর বাংলাদেশ গড়ায় সহযোগী। নবনির্বাচিত সরকারের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা কেবল উন্নয়নমূলক অবকাঠামো নির্মাণে সীমাবদ্ধ নয়, বরং একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মধ্যেই নিহিত। জনগণ চায় আইনের শাসন নিশ্চিত হোক, বিচারব্যবস্থা হোক নিরপেক্ষ এবং প্রশাসন হোক স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক। রাষ্ট্র যেন দলীয়করণের ঊর্ধ্বে উঠে সকল নাগরিকের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করে এটাই আজকের প্রধান প্রত্যাশা।

বিশেষ করে তরুণ সমাজ চায় তাদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত থাকুক। ডিজিটাল নিরাপত্তার নামে বাকস্বাধীনতা দমনের সংস্কৃতি আর ফিরে না আসুক এ প্রত্যাশা এখন প্রবল। তারা চায় এমন একটি পরিবেশ, যেখানে সমালোচনা রাষ্ট্রদ্রোহ নয়, বরং গণতন্ত্রের স্বাভাবিক চর্চা হিসেবে বিবেচিত হবে। অর্থনৈতিক দিক থেকেও জনগণের প্রত্যাশা সুস্পষ্ট। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, শিক্ষিত বেকারদের জন্য বাস্তবমুখী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ এসব এখন সময়ের দাবি। শুধু বড় বড় মেগা প্রকল্প নয়, বরং গ্রামভিত্তিক শিল্প, কৃষি খাতের আধুনিকায়ন এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ ঋণব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। এতে অর্থনীতির ভিত শক্ত হবে এবং বৈষম্য কমবে।

প্রত্যাশা পূরণে সরকারকে প্রথমেই গ্রহণ করতে হবে কিছু কার্যকর উদ্যোগ।

প্রথমত, প্রশাসনিক সংস্কার। যেখানে নিয়োগ ও পদোন্নতিতে যোগ্যতাকে প্রাধান্য দেওয়া হবে। দ্বিতীয়ত, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন কাগজে নয়, কার্যত।তৃতীয়ত, শিক্ষাব্যবস্থায় যুগোপযোগী সংস্কার যাতে শিক্ষা কেবল সার্টিফিকেট অর্জনের মাধ্যম না হয়ে দক্ষতা উন্নয়নের হাতিয়ার হয়। চতুর্থত, স্বাস্থ্যখাতে স্বচ্ছতা ও প্রান্তিক মানুষের জন্য সহজ চিকিৎসা নিশ্চিত করা। পঞ্চমত, মানবাধিকার রক্ষায় স্বাধীন কমিশনগুলোকে শক্তিশালী করা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।

এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের উন্নয়ন হবে বহুমাত্রিক। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি টেকসই হবে, সামাজিক বৈষম্য কমবে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে। সবচেয়ে বড় কথা রাষ্ট্র ও নাগরিকের মাঝে আস্থার সম্পর্ক পুনর্গঠিত হবে।

একটি দেশ তখনই এগিয়ে যায়, যখন তার মানুষ রাষ্ট্রকে ভয় নয়, বরং বিশ্বাস করে। এই সরকার যদি সত্যিকার অর্থে ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় এবং জনগণের কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব দেয়, তবে আগামী পাঁচ বছর হতে পারে পরিবর্তনের সোনালি অধ্যায়। তবে ক্ষমতা কখনোই চিরস্থায়ী নয় চিরস্থায়ী কেবল জনগণের বিচার। তাই জনগণের প্রত্যাশাকে সম্মান জানিয়ে, সমালোচনাকে গ্রহণ করে এবং স্বচ্ছ শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলেই একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নির্মাণ সম্ভব। রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল শাসন করা নয়, রাষ্ট্রের দায়িত্ব বিশ্বাস অর্জন করা। আর সেই বিশ্বাসই হবে আগামীর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি।