ফাহমিদ-উর-রহমান

ইসলামের প্রধান দুটি উৎসব হলোÑ ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা। এর সাথে স্বয়ং রাসুল সা. যুক্ত ছিলেন। ফলে মুসলিম জগতে এই দুটি উৎসব স্বতন্ত্র ও বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। এটা সার্বজনীনভাবে পালিত হয় ইসলাম প্রসারের সাথে সাথে ঈদ উৎসবও বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে এই উৎসব পালনের ভেতরে কিছু কিছু স্থানীয় সংস্কৃতিরও প্রভাব দেখা যায়। তবে এই উৎসবের মূলনীতি ও আচারের ভেতরে কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। সেটা হয়েছে ইসলামের শক্ত ধর্মীয় কাঠামোর জন্য। যদি কোন স্থানীয় আচার বা প্রকার-ইসলামী যুগের নিদর্শন এই উৎসবের ভেতরে ঢুকেও পড়ে তবে ইসলামের স্পর্শে তার চেহারা অনেকখানি বদল হয়ে গেছে।

ঈদের আনুষ্ঠানিক শুরুটা হয় দ্বিতীয় হিজরি, খ্রিষ্টীয় সন মোতাবেক ৬২৩ এ, মদিনাতে। এই শুরুটার পিছনে একটা ঘটনা আছে। রাসুল সা. এখানে এসে দেখেন প্রাক-ইসলামী যুগ থেকেই মদিনাবাসীরা দু’টি উৎসব পালন করতো। দুটো উৎসবের নাম ছিল ইয়াওমুন নিরুয (নওরোজ) ও ইয়াওমুল মেহেরজান (মেহেরজান)। এ দুটো শব্দ আরবি নয়, ফারসি শব্দের অপভ্রংশ। পারস্যের প্রভাবে এ দুটো উৎসব আরবে প্রবেশ করেছিল। হাদিসের বর্ণনা থেকে জানা যায় রাসূল সা. সব কিছু দেখা, জানা ও বুঝার পর প্রচার করলেন মুসলমানদেরও দুটো উৎসব আছে। এর নাম ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা। সুতরাং পূর্বের উৎসব বাদ দিয়ে রাসূল সা. এ দুটো উৎসব পালনের জন্য মুসলমানদের তাগিদ দেন।

প্রত্যেক ধর্ম বা জাতির কিছু স্বাতন্ত্র্য থাকে। এটি তাকে ভিন্ন জাতিগোষ্ঠী থেকে স্বকীয়তা দিয়ে থাকে। সংস্কৃতির এই চিহ্নগুলো একটা জনগোষ্ঠীর জাতি হয়ে ওঠার পিছনে বড় শক্তি জোগায়। স্বাভাবিকভাবে রাসূল সা. ঈদ উৎসব চালু করার পিছনে প্রাক-ইসলামী যুগের উৎসব থেকে প্রবীণ মুসলমান সমাজকে সরিয়ে রাখতে চেয়ে ছিলেন। অন্যান্য জাতির যেমন উৎসব আছে, তেমন মুসলমানদের জাতীয় উৎসব হিসেবে তিনি দুই ঈদকে নির্বাচিত করলেন। যেহেতু অন্যান্য জাতির উৎসব আছে। সুতরাং মুসলমানদের নিজস্ব উৎসব থাকা দরকারÑ এ ধারণা থেকেই ঈদ উৎসব তিনি চালু করেন। নতুবা ঈদের সাথে অন্যান্য জাতির উৎসবের কথা উঠতো না। এ ভাবে মুসলমানদের ভেতরে যাতে আত্মপরিচয়গত সঙ্কট তৈরি না হয় সেটা রাসূল সা. খুব ভালোভাবে বুঝে শুনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিছু কিছু হাদিস থেকে এটাও জানা যায়Ñ ঈদের দিন মদিনার মানুষরা খেলাধুলা করতেন। কিছুটা গান-বাজনাও করতেন। রাসূল সা. বলেছিলেনÑ প্রত্যেক জাতির জন্য আনন্দ উৎসব রয়েছে। আর এ হলো আমাদের আনন্দ।

এভাবে মুসলিম সমাজে ঈদ উৎসবের জন্ম হলো। কালক্রমে এই উৎসব উদযাপনের রীতি দেশে দেশে নানাভাবে পরিবর্তিত, পরিবর্ধিত ও পরিপুষ্টি লাভ করেছে। এর উপর বিভিন্ন দেশের পারিপার্শ্বিকতার ছাপ পড়েছে। কিন্তু ঈদের মৌলভাবনা একই রকম ভাবে বয়ে চলেছে।

মুসলমানের উৎসব-অনুষ্ঠান-আচারের মূল বুনিয়াদ হচ্ছে কুরআন-হাদিসের বিধান। এসব পালিত হয় ধর্মীয় বিশ্বাস বা ঈমান-একিনের জায়গা থেকে। এই ঈমান ছাড়া এসব অনুষ্ঠানের মূল্য নেই। এই ঈমানের স্বীকৃতিতে উৎসব-অনুষ্ঠানগুলোন একজন মুসলমানের আত্মপরিচয়-আইডেনটিটি-জীবন শৈলীর আকারে মূর্তিমান হয় ওঠে। এসব অনুষ্ঠানের ভতর দিয়ে যে কোনো ভূখণ্ডে তাকে চেনা যায় ইসলাম ধর্মের মানুষ হিসেবে।

রাসূল সা. পূর্বতন নবীদের উৎসবের লিগ্যালি অনেক কিছুই গ্রহণ করেছেন। যেমন হজ। আবার নিজেও কিছু উৎসব-অনুষ্ঠানের প্রচলন করেছেন। এভাবে ইসলামের প্রচার-প্রসারের পাশাপাশি বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান-উৎসব পালনের ভেতর দিয়ে ইসলামকে তিনি করে তুলেছেন রঙিন ও বর্ণময়। তাই একজন মুসলমান ওয়ারিশি সূত্রেই তা পালন করেন।

এক মাস ধরে রমযানের রোজা রেখে, আত্মসংযম-আত্মশুদ্ধির পরীক্ষা দিয়ে রোজাদাররা ঈদুল ফিতরের উৎসব পালন করেন। অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার পর রমযানের শেষে এই উৎসব আসে বলে এর একটা অন্যরকম ঘ্রাণ ও আমেজ আছে।

রমযান ছাড়া যেমন ঈদুল ফিতর সম্ভব নয়, তেমনি শাবান মাস আসে রমযানের আগমনী খবর নিয়ে। শবেবরাত-রমযান-ঈদুল ফিতর এটা একটা সিকুয়েন্স। এই তিনে মিলে একটা বর্ণালিও বটে। এই সিকুয়েন্সটা প্রতি বছর ঘুরে ঘুরে আসে। মুসলমানের উৎসবগুলো পালিত হয় চন্দ্র মাসের রীতিতে। একজন পূর্ণবয়স্ক মুসলমানের জীবনে এসব অনুষ্ঠান সব ঋতুতেই ফিরে ফিরে আসে। এ যেন সব ঋতুতেই উৎসবকে বরণ করোর উদ্যোগ। ঈদ শব্দটার একটা অর্থ খুশি। কিন্তু এই শব্দটা এসেছে আওদ শব্দ থেকে। এটির অর্থ বারবার ফিরে আসা। মুসলমানের উৎসবগুলো যে বারবার ফিরে আসে এটা তার ইঙ্গিত দেয়।

একমাস ধরে রমযানের রোজা শেষে একফালি বাঁকা শাওয়ালের চাঁদ উঠলে ঈদের বার্তা শোনা যায়। বহু প্রতীক্ষার পরে আসে এ ঈদ। অনেক সময় বিনিদ্র কেটে যায় চাঁদরাত। সকালের ঈদকে খোশ আমদেদ জানানোর জন্য চলে তোড়জোড়-হৈ হল্লোড়। সেই প্রতীক্ষার ঈদ নিয়ে কাজী কবি লিখেছেন:

শত যোজনের কত মরুভূমি পারায়ে গো,

কত বালুচরে কত আঁখি ধারা ঝরায়ে গো,

বরষের পরে আসিলে ঈদ!

ভুখারির দ্বারে সওগাত বয়ে রিজওয়ানের,

কণ্টক বনে আশ্বাস এনে গুল বাগের,

সাকিরে ‘জামের’ দিলে তাদিদ!

বাংলাদেশে ইসলামের প্রথম যুগে উৎসব হিসেবে কিভাবে ঈদ পালন হতো তার কিছু বর্ণনা দেখতে পাওয়া যায়। মুকুন্দ রামের কবিতায় আমরা দেখেছি সেই কালেও মুসলমানরা ইসলামের হুকুম-আহকাম যথেষ্টই মেনে চলতেন। এতে ধারণা করা অসঙ্গত নয় মুসলমানরা ঈদ উৎসবও পালন করতেন যথাযথ ভাবে মোগল আমলে রোজা ও দুই ঈদ পালনের খুব শক্তিশালী একটা বর্ণনা আমরা দেখতে পাই ঢাকা নগরীর প্রতিষ্ঠাতা মোগল সুবেদার ইসলাম খাঁ চিশতীর নৌবাহিনী প্রধান মীর্জা নাথানÑএর লেখা বাহারিস্তান-ই-গায়বী কিতাবে। মীর্জা নাথান ইসলাম খাঁর সাথে ঢাকা এসেছিলেন।

উপমহাদেশে মোগল বাদশাহরাই প্রথম মুসলমানদের উৎসবগুলোকে একটা সাংস্কৃতিক রূপ দেন। বাদশাহরা এ দিনে গরিব-এতিমদের দান ধ্যান করতেন। হাজতিদের মুক্ত করে দিতেন। উপঢৌকন-নজরানা প্রদান করতেন। রাজধানী দিল্লি আলোকমালায় সজ্জিত হতো। মোগলদের সময়ে ঈদের দিন ঘটা করে পোলাও, বিরিয়ানি, সেমাই, পাকানোর সূত্রপাত হয়। মোগল হেরেমের মহিলারা রীতিমত জৌলুশের সাথে ঈদ উৎসব পালন করতেন। এ দিনে তারা মিনা বাজারের আয়োজন করতেন। সাম্রাজ্ঞীরা শিল্পীদের পুরস্কার দিতেন।

মোগলদের উৎসবের এই শান শওকতকে তাদের সুবেদাররা বাংলায় কিছুটা নিয়ে আসবেন এটাই স্বাভাবিক। মীর্জা নাথানের বর্ণনাকে তাই নির্ভরযোগ্য বলতেই হবে। মোগলরা শুধু উৎসব সংস্কৃতিকে বিস্তৃত করেননি, বাংলায় তারা অনেক ঈদগাহ নির্মাণ করেছিলেন। ঢাকার ধানমন্ডি ঈদগাহ, সিলেটের শাহি ঈদগাহ এসবের দু’একটা নমুনা।

ইতিহাসবিদ অধ্যাপক আবদুর রহিম তার ‘বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস’ বইয়ে মুসলমান ঐতিহাসিকদের লেখা থেকে ঈদের এক বিবরণ তৈরি করেছেন। এখানে তিনি মীর্জা নাথানের বাহারিস্তান-ই-গায়বী, মিনহাজ-উস-সিরাজের তাবাকাৎ-ই-নাসিরী, সৈয়দ গোলাম হোসেন তাবতাবায়ীর সিয়ারে মুতাখখিরিন, আজাদ হোসেন বিলগ্রামীর নও বাহার-ই-মুর্শীদ কুলী খান প্রভৃতি গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে দেখিয়েছেন সুলতান সুবাদাররা রমজান মাসে ধর্মীয় আলোচনার ব্যবস্থা করতেন। প্রচারক নিযুক্ত করতেন। ঈদের নামাজ পড়ানোর জন্য ইমাম নিয়োগ করতেন এবং ঈদগায় নামাজ পড়া হতো। সাধারণত ঈদুল ফিতরের দিন মিষ্টিমুখ করে সবাই নামাজ পড়তে যায়। ঈদুল ফিতরে থাকে জাকাত-ফিতরা আদায়ের ব্যাপার।

ঈদের চাঁদ দেখা গেলে বেজে উঠতো শাহি তূর্য। গোলন্দাজ বাহিনী ছুড়তো গুলি। এ সময় সবাই নতুন পোশাক পরতো ও আমোদ-প্রমোদে মেতে উঠতো। শুধু তাই নয় সচ্ছল ব্যক্তিরা অনেক দান-ধ্যানও করতেন।

অধ্যাপক রহিম তার বইতে দেখিয়েছেন মুসলিম শাসনামলে বাংলার মুসলমানরা খুব জাঁকজমকের সাথে তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবগুলো পালন করতো। কারণ তখন তাদের আর্থিক প্রাচুর্য ছিল। এসব উৎসবগুলো যুগ যুগ ধরে একইভাবে পালিত হতো।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও চিন্তক