শরীফ ওসমান হাদীর আধিপত্যবাদবিরোধী একটি গুরুত্বপূর্ণ কবিতা
হাসান নাজমুল
প্রেম, দ্রোহ, মৃত্যু কিংবা প্রকৃতি যে কোনো বিষয় নিয়েই একজন কবি কবিতা লিখতে পারেন। বিষয় নির্ধারণ মূলত একজন কবির নিতান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার। হৃদয়ের তলদেশে প্রেম না থাকলে যেমন প্রেমের কবিতা লেখা যায় না, তেমনি দ্রোহের আগুনে সত্তা না পুড়লে সে-সত্তায় কখনো দ্রোহের কবিতা আসে না। প্রকৃতির গভীরতা টের না পেলে প্রকৃতির কবিতা লেখা সম্ভব হয় না। অনুরূপভাবে মৃত্যুচিন্তা মস্তিষ্কে না এলে মৃত্যুর কবিতা প্রসব করা দুরূহই বটে। আবার স্বদেশ এবং স্বদেশের মানুষ আরেকটি দেশের আধিপত্যের শিকার হচ্ছে—এমন উপলব্ধি না করতে পারলে আধিপত্যবাদবিরোধী কবিতার জন্ম দেওয়া অসম্ভব। আজকালকার তরুণ কবিদের কবিতায় প্রেম, কাম, দ্রোহ, মৃত্যু, আশা কিংবা হতাশা থাকলেও আধিপত্যবাদবিরোধী মনোভাব খুব একটা পরিলক্ষিত হয় না। এদিক থেকে কবি শরীফ ওসমান হাদী ব্যতিক্রম। তাঁর ‘আমায় ছিঁড়ে খাও হে শকুন’ কবিতার প্রায় প্রতিটি পঙক্তিতেই আধিপত্যবাদবিরোধী আর সাম্রাজ্যবাদবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ্য করা যায়। শরীফ ওসমান হাদীর কর্তৃত্ববিরোধী মনোভাব উপলব্ধি করার জন্য তাঁর পুরো কবিতাটি পড়ে নেওয়া যাক-
হে সীমান্তের শকুন
এক্ষুনি ছিঁড়ে খাও আমাকে
হে আটলান্টিকের ঈগল
শিগগির খুবলে খাও আমাকে
হে বৈকাল হ্রদের বাজ
আঁচড়ে কামড়ে ছিন্নভিন্ন করো আমাকে।
আমার রক্তরসে শুধু অসহায়ত্ব আর অভাব;
কাগজের কামলারা তারে আদর করে মুদ্রাস্ফীতি ডাকে।
ঋণের চাপে নীল হয়ে যাচ্ছে আমার অণুচক্রিকা
সংসার চালাতে অন্তরে হয় ইন্টারনাল ব্লিডিং
কী আশ্চর্য, তবুও আমি মরছি না!
ওদিকে দোজখের ভয়ে
আত্মহত্যা করবারও সাহস পাই না আমি!
খোদাকে বললাম, আমি মরতে চাই
তিনি বললেন, বেঁচে আছ কে বলল?
সহস্রাব্দ উন্নয়নের সাক্ষী হিসেবে
রাজা তোমাকে মমি করে রেখেছেন!
বাজারে দীর্ঘশ্বাস ফেললে নাকি
রাজ্যের ভীষণ বদনাম হয়
রাজারও মন খারাপ হয় খুব।
কোতোয়ালরা ফরমান জারি করেছে
আমাকে সারাক্ষণই হাসতে হবে!
নইলে দেশি কুকুর ও বিদেশি মাগুরকে
একবেলা ভালোমন্দ খাওয়ানো হবে আমার মাংস দিয়ে
নিত্যদিন ব্রয়লারের ভুঁড়ি নাকি ওদের ভাল্লাগে না!
অথবা আমাকে ভাগ দিয়ে বেচা হবে
মানুষেরও তো মানুষ খাওয়ার সাধ হতে পারে, তাই না?
ভাগ্যিস তা বিদেশি সুপারশপে বিক্রি হবে না
দেশি মানুষেরই তো হক বেশি আমাকে খাওয়ার!
এ দোজখই যখন নিয়তি
তখন আমি উদাম হয়ে ডাকছি
দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ মাংসাশী বিহগদের
হে ঈগল, চিল ও ভয়ংকর বাজেরা
হে সাম্রাজ্যবাদী সাহসী শকুনিরা
তোমরা এফ-থার্টি ফাইভের মতো
মিগ টুয়েন্টি নাইনের মতো-
দল বেঁধে হামলে পড়ো আমার বুকে
আমার রান, থান, চক্ষু, কলিজা
আজ সব তোমাদের গনিমতের মাল
দেশি শুয়োর খুবলে খাওয়ার আগেই
আমায় ইচ্ছেমতো ছিঁড়ে খাও তোমরা!
দোহাই, শুধু মস্তিষ্কটা খেয়ো না আমার
তা হলে শীঘ্রই দাস হয়ে যাবে তোমরাও।
উপরোক্ত কবিতায় ৪৩ টি পঙক্তি রয়েছে। প্রথম ছয় পঙক্তিতে নিজের জীবন কেড়ে নেওয়ার জন্য কবি আন্তর্জাতিক আধিপত্যবাদীদের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন-
‘হে সীমান্তের শকুন
এক্ষুনি ছিঁড়ে খাও আমাকে
হে আটলান্টিকের ঈগল
শিগগির খুবলে খাও আমাকে
হে বৈকাল হ্রদের বাজ
আঁচড়ে কামড়ে ছিন্নভিন্ন করো আমাকে।’
এ যেন এক আশ্চর্য আহ্বান! এমন অদ্ভুত আহ্বান কবিতায় এক নতুন ধারা সৃষ্টি করেছে। কবিতাকে করেছে ব্যতিক্রম। কবি স্বেচ্ছায় আন্তর্জাতিক আধিপত্যের বলি হতে চান। মূলত স্বদেশের স্বৈরশাসকের কাছে কবি বেদম নির্যাতিত হয়েছেন। নিপীড়িত হতে হতে তিনি বড্ড শ্রান্ত-ক্লান্ত। স্বদেশের স্বৈরশাসকের শিকার হওয়ার চেয়ে কবি আন্তর্জাতিক কর্তৃত্বের শিকার হওয়া শ্রেয় মনে করেছেন।
কবি শরীফ ওসমান হাদী তাঁর ‘আমায় ছিঁড়ে খাও হে শকুন’ কবিতায় বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের চিরন্তন অভাবের কথা তুলে ধরেছেন। কবির ভাষায়-’আমার রক্তরসে শুধু অসহায়ত্ব আর অভাব;
কাগজের কামলারা তারে আদর করে মুদ্রাস্ফীতি ডাকে।
ঋণের চাপে নীল হয়ে যাচ্ছে আমার অণুচক্রিকা
সংসার চালাতে অন্তরে হয় ইন্টারনাল ব্লিডিং
কী আশ্চর্য, তবুও আমি মরছি না!
ওদিকে দোজখের ভয়ে
আত্মহত্যা করবারও সাহস পাই না আমি!’
দেশে যখন স্বৈরতন্ত্র বিদ্যমান থাকে, স্বৈরতন্ত্রে জড়িত সকলেই তখন ক্রমেই বিত্তশালী হয়ে ওঠে। পণ্যের তুলনায় অর্থের সরবরাহ বেড়ে যায়। পক্ষান্তরে সাধারণ জনগণ চরম দারিদ্র্যে পিষ্ট হতে থাকে। উক্ত পঙক্তিগুলোর মাধ্যমে কবি বাংলাদেশের দরিদ্র মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। নিজের অসহায়ত্বের মাধ্যমে জনসাধারণের অসহায়ত্বের কথা বলেছেন। অনটনে সংসার চালাতে হিমশিম খাওয়া, হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হওয়া কোটি মানুষের কথা নিজের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন।
ওসমান হাদী তাঁর কবিতার কয়েক পঙক্তিতে রাষ্ট্রব্যবস্থাকে Satire করেছেন। রাষ্ট্রচালক উন্নয়নের নামে নিজের পকেট ভারী করেছে। চারদিকে ছড়িয়েছে দেশ ও দশের উন্নয়নের বিজ্ঞাপন। রাষ্ট্র কবিকে মেরে ফেলে উন্নয়নের সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য মমি করে রেখেছে। অথচ কবি, রাষ্ট্র কিংবা জনগণের কোনো উন্নয়ন হয়নি। কবির ভাষায়-
‘খোদাকে বললাম, আমি মরতে চাই
তিনি বললেন, বেঁচে আছ কে বলল?
সহস্রাব্দ উন্নয়নের সাক্ষী হিসেবে
রাজা তোমাকে মমি করে রেখেছেন!
বাজারে দীর্ঘশ্বাস ফেললে নাকি
রাজ্যের ভীষণ বদনাম হয়
রাজারও মন খারাপ হয় খুব।’
শরিফ ওসমান হাদী একজন প্রকৃত কবি। একজন প্রকৃত কবি মূলত একজন প্রকৃত জ্যোতিষী (Astrologer) । একজন প্রকৃত জ্যোতিষীরPredictionযেমন মিলে যায় ঠিক তেমনি একজন প্রকৃত কবির Prediction সহজেই মিলে যায়। শরীফ ওসমান হাদী তাঁর কবিতায় নিজেকে আধিপত্য এবং আগ্রাসনের খাবারে পরিণত হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাঁর Prediction বাস্তবে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেছেন-
’কোতোয়ালরা ফরমান জারি করেছে
আমাকে সারাক্ষণই হাসতে হবে!
নইলে দেশি কুকুর ও বিদেশি মাগুরকে
একবেলা ভালোমন্দ খাওয়ানো হবে আমার মাংস দিয়ে
নিত্যদিন ব্রয়লারের ভুঁড়ি নাকি ওদের ভাল্লাগে না!
অথবা আমাকে ভাগ দিয়ে বেচা হবে
মানুষেরও তো মানুষ খাওয়ার সাধ হতে পারে, তাই না?
ভাগ্যিস তা বিদেশি সুপারশপে বিক্রি হবে না
দেশি মানুষেরই তো হক বেশি আমাকে খাওয়ার!’
বাংলাদেশর স্বৈরাচারী সরকার ব্যবস্থাকে কবি দোজখের সাথে তুলনা করেছেন। কবি স্বদেশের স্বৈরতন্ত্রের দোজখে জ্বলার চেয়ে আন্তর্জাতিক দোজখে জ্বলার ইচ্ছা পোষণ করেছেন। মাতৃভূমির মাংসাশী বিহগদের খাবারে পরিণত হওয়ার চেয়ে আন্তর্জাতিক মাংসাশী বিহগদের খাবারে পরিণত হতে চেয়েছেন। কবিতার শেষ কয়েক পঙক্তিতে তাইতো তিনি আন্তর্জাতিক আধিপত্যবাদীদের এভাবে আহ্বান করেছেন-
‘এ দোজখই যখন নিয়তি
তখন আমি উদাম হয়ে ডাকছি
দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ মাংসাশী বিহগদের
হে ঈগল, চিল ও ভয়ংকর বাজেরা
হে সাম্রাজ্যবাদী সাহসী শকুনিরা
তোমরা এফ-থার্টি ফাইভের মতো
মিগ টুয়েন্টি নাইনের মতো-
দল বেঁধে হামলে পড়ো আমার বুকে
আমার রান, থান, চক্ষু, কলিজা
আজ সব তোমাদের গনিমতের মাল
দেশি শুয়োর খুবলে খাওয়ার আগেই
আমায় ইচ্ছেমতো ছিঁড়ে খাও তোমরা!
আধিপত্যবাদের অদৃশ্য চাকায় পিষ্ট কবি শুধু মস্তিষ্কটা খেতে নিষেধ করেছেন যাতে কোনোমতে বেঁচে থাকতে পারেন। লড়তে পারেন এ দেশের দরিদ্র, অবহেলিত মানুষের জন্য। শরীরের অন্য যে কোনো অঙ্গের বিচ্যুতি হলে কোনোমতে বেঁচে থাকা সম্ভব হয়। মস্তিষ্কের মৃত্যু হলে জীবনের মৃত্যু হয়। জ্ঞানের মৃত্যু হয়। ধ্বংস হয়ে যায় জ্ঞানভাণ্ডার। তাইতো কবি অনুনয় করে বলেছেন-
‘দোহাই, শুধু মস্তিষ্কটা খেয়ো না আমার
তা হলে শীঘ্রই দাস হয়ে যাবে তোমরাও।’
হন্তারক শেষমেশ কবির মস্তিষ্কটাই খেয়ে ফেললো। কবির অনুনয় রক্ষা পেল না। কর্তৃত্ব বাস্তবায়ন করে আধিপত্যবাদের দাস হয়ে গেল। কবির Prediction কী দ্রুত মিলে গেল!
কবি শরীফ ওসমান হাদী তাঁর ‘আমায় ছিঁড়ে খাও হে শকুন’ কবিতায় বিভিন্ন Literary terms এবং speech ব্যবহার করেছেন। যার দরুণ কবিতাটি শিল্পে পরিণত হয়েছে। আধিপত্যবাদীদের এবং সাম্রাজ্যবাদীদের চরিত্র প্রকাশ করতে তিনি Symbol ব্যবহার করেছেন। ‘সীমান্তের শকুন’, ‘আটলান্টিকের ঈগল’, ‘বৈকাল হ্রদের বাজ’, ‘বিদেশি মাগুর’ এবং ‘দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ মাংসাশী বিহগ’ Symbol for imperialist হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। অন্যদিকে দেশি কুকুরকে কবি Symbol for supremacist হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
ঝুসনা ছাড়াও কবি উপমা প্রয়োগ করেছেন। সাধারণ ধর্ম এবং সাদৃশ্যবাচক শব্দ লুপ্ত করে কবি লুপ্তোপমার নিপুণ ব্যবহার দেখিয়েছেন। কবির ভাষায়Ñ
‘আমার রান, থান, চক্ষু, কলিজা
আজ সব তোমাদের গনিমতের মাল’
এখানে ‘রান’, ‘থান’, ‘চক্ষু’, ‘কলিজা’ উপমেয়, ‘গনিমতের মাল’- উপমান।
সাধারণত কবিদের জুড়ে দেওয়া প্রশ্ন ব্যবহার করতে দ্যাখা যায় না। পাঠকের সম্মতি পাওয়ার জন্য ওসমান হাদী একটি পঙক্তিতে জুড়ে দেওয়া প্রশ্ন (Tag question) ব্যবহার করেছেন। ব্যবহৃত Tag question কবিতাটিকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। জুড়ে দেওয়া প্রশ্নের পঙক্তিটি হলোÑ
‘মানুষেরও তো মানুষ খাওয়ার সাধ হতে পারে, তাই না?’
কবিতায় বিভিন্ন অনুষঙ্গ ব্যবহারের মাধ্যমে কবি আধিপত্যবাদ এবং সাম্রাজ্যবাদের সরূপ উন্মোচন করেছেন। তাঁর ‘আমায় ছিঁড়ে খাও হে শকুন’ কবিতাটি তরুণ প্রজন্ম এবং তরুণ কবিদের আধিপত্যবাদবিরোধী মনোভাব সৃষ্টিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। কবিতাটি স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের আধিপত্যবাদবিরোধী একটি গুরুত্বপূর্ণ কবিতা বলে আমি মনে করি।
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক