রফিক মুহাম্মদ
ঝলমলে চাঁদনী রাতে সাইফুল বারী তার দোতলা বাড়ির ছাদে একা বসে আছে। কি ফকফকা জোছনা রাত। চারদিকের প্রকৃতি যেন নববধূর মতো লাজুক হাসি হাসছে। এমন ভরা পূর্ণিমার রাত বিনার খুব প্রিয় ছিল। জোছনা রাতে এই ছাদে এসে দু’জনে দোলনায় বসে কত গল্প করেছে। বিনা মানে সাবিনা যাকে বিয়ের পর বারী আদর করে বিনা বলে ডাকতো। সেই সাবিনা শেষ পর্যন্ত বারীর আদরের ডাক বিনা নামেই সবখানে পরিচিত পড়ে। বিনার গায়ের রঙ ছিল ধবধবে ফর্সা। তাই জোছনা রাতে ছাদে বসে বারী দুষ্টুমি করে বিনাকে বলতো, আমি তো বুঝতে পারছি না যে চাঁদের আলোতে চারদিক হাসছে নাকি তোমার আলোতে। বিনা এতে খুব খুশি হলেও তা প্রকাশ করতো না। শুধু একটু মুচকি হেসে বলতো, যাও এভাবে বলোনা নজর লেগে যাবে। বিনার হাসিটাও ছিল খুব সুন্দর। শেষ বয়সে বিনা পান খাওয়ার অভ্যাস করেছিল। সেই পান খাওয়া লালচে ঠোঁটের হাসি চাঁদনী রাতে কি যে অপরূপ তা যে দেখেনি সে কখনো কল্পনাও করতে পারবে না।
সাইফুল বারী এলাকায় সে বারী হিসাবেই পরিচিত। পনের বছর আগে সে জনতা ব্যাংকের ক্যাশিয়ার পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেছে। এরপর নেত্রকোণা জেলা শহরের এক প্রান্তে এই দোতলা বাড়িটি করেছে। বারী যখন বাড়ি করে তখন এ এলাকাটা গ্রামের মতো ছিল। সেই প্রথম এখানে ছয় শতক জমি কিনে দোতলা বাড়ি করেছে। এ অঞ্চলে বারী সাহেবের বাড়ি ‘বারীস হ্যাভেন’ বললে এক নামে সবাই চিনে। সাইফুল বারীর কাছে এ বাড়িটি তার স্বপ্নের বাড়ি। এটি তার কাছে এ পৃথিবীর এক টুকরো বেহেশত। চাকরি থেকে অবসর নিয়ে যে টাকা পেয়েছে তার প্রায় পুরোটাই এ বাড়ি করতে ব্যয় করেছে। কিছু টাকা দিয়ে মেয়ে সায়রাকে বিয়ে দিয়েছে। আর ছেলে সাইদুল বারীকে উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশ পাঠানোর সময় কিছু টাকা ব্যয় করেছে। সেটা অবশ্য খুবই সামান্য, হাজার পনের টাকা হবে। যা দিয়ে ছেলেকে কিছু প্রয়োজনীয় কাপড়-চোপড় কিনে দিয়ে ছিল। ছেলে স্কলারশিপ নিয়ে কানাডায় পড়তে গিয়েছিল। এখন বিয়ে করে সেখানে এক বিশ্ববিদ্যালয়ের টিচার হিসাবে কর্মরত আছে।
আজ প্রায় দুই বছর হতে যাচ্ছে বারী তার বারীস হ্যাভেনে একাকি বসবাস করছে। বাইশ মাস আগে বিনা তাকে ছেড়ে, এই দুনিয়ার মায়া ছেড়ে চলে গেছে। এরপর বারী একা একা বাড়ির ছাদে খুব একটা আসে না। ছাদে আসলেই অতীতের স্মৃতি তাকে ঘিরে ধরে। অতীতের কত কথা তখন একের পর এক মনের পর্দায় ভেসে ওঠে। তাদের উনপঞ্চাশ বছরের সংসার জীবনের কত-সুখ দুঃখের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। সংসার জীবনে বিনার খুব বেশি চাওয়া ছিল না। ব্যাংকের ছোট খাট এক কর্মকর্তার স্ত্রী হিসাবে ডাল-ভাত খেয়ে কোন রকমে মাস চললেই সে খুশি। বাড়তি কোন শখ আল্লাদ তার ছিল না। ছেলে-মেয়ের পড়া-লেখার প্রতি ছিল তার প্রচন্ড আগ্রহ। তাদের পিছনেই বিনার সব সময় কাটত। বারীর নয়টা পাঁচটা অফিস। তাই সকালে আটটার আগেই সে বাসা থেকে বেরিয়ে যেত। ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা। কোন দিন অফিসে কাজের চাপ থাকলে বাসায় ফিরতে রাতও হয়ে যেত। সে সব নিয়ে বিনার কোন দিন কোন অজুহাত বা সামান্যতমও আপত্তি ছিল না। বিনা ঘুম থেকে উঠে ফজরের নামাজ আদায় করেই রান্না ঘরে ঢুকে যেত। সবার জন্য নাস্তা রেডি করতো। স্বামীকে অফিসে দুপুরের খাবার দিয়ে দিতে হবে সেটা তৈরী করতো। ছেলে-মেয়েকে ঘুম থেকে তুলে স্কুলের জন্য তৈরি করতো। এভাবেই বিনার জীবন কেটেছে। ছেলে-মেয়ে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছে তখনও তাদের প্রতি বিনার নজরদারি ছিল। বলতে গেলে ছেলে-মেয়ে যে টুকু মানুষ হয়েছে, পড়া লেখা শিখেছে তার পুরো কৃতিত্ব বিনার। বারী শুধু মাসের প্রথম তার বেতনের টাকাটা বিনার হাতে গুজে দিয়ে নিশ্চিন্তে মাস পার করেছে। বিনার মতো এমন নির্মোহ সংসারি আর কাউকে দেখেনি বারী। অবসরের পর বারী যখন এই শহরতলীতে তার স্বপ্নের বাড়ি কাজ শুরু করেছিল তখন তাদের জীবনের পড়ন্ত বেলা। বিনার জীবনে একটাই চাওয়া ছিল যে একদিন তাদের নিজেদের একটা বাড়ি হবে। তবে সেটাও সে মুখ ফোটে খুব একটা বলতো না। মেয়ের বিয়ের আগে শুধু একদিন রাতে পাশে শুয়ে অন্ধকারেই হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতে করতে বিনা বলেছিল, এই যে সায়রার বাপ হুনছুইননি, নাকি ঘুমাইয়া গেছুইন?
বারী একটু পাশ ফিরে বলতো, আর ঘুম কি আইয়ে। কি যে একটা অসহ্য গরম পড়ছে। মরার বিদ্যুৎও থাহে না।
: বিনা হাতপাখাটা আর একটু জোরে ঘোরাতে ঘোরাতে বলে, হাঁছাই কইছুন। এক্কেবারে বিষম গরম পড়ছে। শইল খালি ছনবন করে। আইচ্ছা হুনছুইন নি...
: কি কইতে চাও কও... হুনতাছি..
: কইতাছিলাম যে..এই রহম ঠিকানহীন উডুল্লা আর কত দিন থাকবাম। আমরার জীবনতো গেছেই গা। অহন ছেলে মেয়ে বড় অইতাছে। মেয়ের বিয়া দিতে অইব। আমাদের তো কোন বাড়ি-ঘর নাই। নিজেদের একটা বাড়ি থাকলে মেয়েডারে একটা ভালো ঘরে বিয়া দেওন যাইত।
বিনার কথার কোন উত্তর দিতে পারে না বারী। শুধু বুক ছিঁড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে যায়। সত্যি তার তো অহন কোন ঠিকানা নাই। ব্যাংকের ক্যাশিয়ারের চাকরি করে যে বেতন পায় তাতে তো সংসার চালানোই কষ্টকর। প্রতি মাসেই টানাটানি করে সংসার চালাতে হয়। এ অবস্থায় জায়গা-জমি কিনবে কেমন করে। তবে চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার পর এক সাথে হয়তো ত্রিশ-চল্লিশ লাখ টাকা পাবে তা দিয়ে নেত্রকোণা একটু জমি কিনে বাড়ি করার ইচ্ছা বারী মনে মনে পোষণ করতো।
বিনা মারা যাওয়ার পর এখন সে একেবারেই একা। রাতে ঘরে একা একা শুয়ে চোখ বন্ধ করলেই কত কিছু মনে পড়ে। আজ থেকে বিশ বছর আগেও বারীর বাপ-দাদার রেখে যাওয়া বিশাল বাড়ি ছিল। হালের গরু, চাষের জমি সবই ছিল। বৃটিশ আমলে বারীর দাদা বাড়িতে টিউবওয়েল বসিয়েছিলেন। তখন আশপাশের কয়েক গ্রামের মানুষ তাদের বাড়ির টিউবওয়েল থেকে পানি নিতে আসত। তথন থেকে পুরো এলাকার মানুষ বারীদের বাড়িকে কলের বাড়ি বলে ডাকতো। বারীর কত স্মৃতি সেই বাড়িকে ঘিরে। এখনো চোখ বন্ধ করে ভাবলেই মনের পর্দায় সে সব স্মৃতি ভেসে ওঠে। নেত্রকোণা জেলার আটপাড়া উপজেলার শুনই গ্রাম ছিল তার আদি ঠিকানা। কিন্তু বারীর দাদা পাশের গ্রামের একজনের সাথে জমি নিয়ে ঝগড়া করে তাকে মেরে ফেলে। এরপর সেই মার্ডার মামলার আসামী হয়ে দীর্ঘদিন ফেরারি জীবন যাপন করে। তখন জমি বিক্রি মামলার খরচ চালিয়েছে এবং সংসার চালিয়েছে। এভাবে মামলা চালাতে গিয়ে জমি-জমা সব বিক্রি করেছে। বারীর বাবা গ্রামের স্কুলে দপ্তরির চাকরি করে তার চার ভাই বোনকে লেখা-পড়া করিয়েছে।
জোছনা ধোয়া ছাদে একাকি বসে ঘরে আজ বারীর অনেক কিছু মনে পড়ছে। বিএ পাশ করে অনেক দিন সে বেকার জীবন কাটিয়েছে। তখন যে কি দুর্বিষহ জীবন গেছে তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। এরপর প্রথম যে দিন জনতা ব্যাংকে চাকরি পায় সে দিন তার বাবা-মা কি যে খুশি হয়েছিল সেটাও বারী বলে কাউকে বলে বোঝাতে পারবে না। তবে বারীর ভাগ্য বলা যায় খুব একটা ভালো না। চাকরি করে খুব বেশি দিন সে তার বাবা মার সেবা করতে পারেনি। চাকরি পাওয়ার মাত্র তিন বছর পরই প্রথমে বাবা তাদের ছেড়ে পরলোকে পাড়ি জমান। এর তিন মাস পরেই বারীর মাও তাদের রেখে ইহলোকের মায়া ত্যাগ করেন। এরপর থেকে গ্রামের সাথে বারীর সম্পর্ক ধীরে ধীরে ছিহ্ন হয়ে যায়।
চাকরি জীবনের প্রথম পোস্টিং ছিল মোহনগঞ্জ উপজেলায়। সেখানে চাকরিরত অবস্থায় সাবিনা মানে বিনার সাথে তার বিয়ে হয়। বিনার বাবা একজন স্কুল শিক্ষক ছিলেন। বিয়ের পর দু’বছর একই ব্রঞ্চে চাকরি করার পর পাশের উপজেলা বারহাট্টায় তার বদলি হয়। এর পর নেত্রকোণা জেলারই বিভিন্ন থানায় ঘুরে ঘুরে সে চাকরি করেছে। সর্বশেষ কেন্দুয়া উপজেলার শাখা থেকে সে অবসরে যায়।
ঝলমলে জোছনায় একা একা ছাদে বসে আজ কেবলই বিনার কথা তার মনে পড়ছে। বিয়ের পর বিনা তার কাছে কোন দিন কোন কিছু চায়নি। তার চাওয়া ছিল শুধু ছেলে মেয়েদের নিয়ে একটু মাথাগুঁজার ঠাঁই, ছিমছাম ছোট্ট একটা বাড়ি। নেত্রকোণা শহরের আশপাশে একটু জায়গা কিনে বাড়ি করার শখ ছিল বিনার। কিন্তু নেত্রকোনায় বাড়ি করার পর সে বাড়িতে একা একা থাকতে তার ভালো লাগতো না। মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। ছেলে থাকে বিদেশে। এখন এই বাড়িতে শুধু ওরা দু’জন। সারাক্ষণ চুপচাপ থাকতে বিনার কিছুতেই ভাল লাগে না। এর মধ্যে ডায়াবেটিস বেড়ে বিনার দুটো কিডনি নষ্ট করে ফেলে। বারীর চোখের সামনেই অনেকটা ধুকে ধুকে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হয় বিনা। কোন ওষুধেই তখন আর কাজ হয় না। মৃত্যুর আগে অসুস্থ বিনা বারীর হাত দুটি ধরে বলেছিল, আইজ আপনেরে আমি একটা কথা কইয়াম। আফনে আমার এই কথাডা রাখবাইন কওহাইন।
অসুস্থ বিনার এমন আকুতিতে কারীর দু’চোখ ভিজে যায়। নিজেকে অনেক কষ্টে সামলে নিয়ে বলে, তুমি একটু ঘুমানির চেষ্টা কর। আমি তো তোমার পাশেই আছি।
: না আগে আফনে কওহাইন আমার এই কথাডা রাখবাইন।
বিনার কণ্ঠে শিশুদের মতো আবদার মেশানো জেদ। এমনটা তাকে আগে কোনদিন দেখেনি বারী। বিনার হাতের তালুতে আলতো করে হাত বুলাতে বুলাতে বারী বলে, আইচ্ছা ঠিক আছে কও, কি কইবার চাও।
: সায়রার বাপ আমি মনে অয় আর বাঁচতাম না। জীবনে অনেক শখ ছিল নিজের একটা বাড়ি অইব। সেই বাড়িতো অইছে। তবে এই বাড়ি তো স্থায়ী বাড়ি না। আমি তো জীবনে অনেক বড় ভুল করছি। আল্লার কাছে এই দুনিয়াতে একটা বাড়ি চাইছি, আল্লা আমারে সেইটা দিছুইন। আমি যদি আল্লার কাছে মরার পরে বেহেশেতে একটা বাড়ি চাইতাম তাইলে তো আল্লাহ আমারে দিতাইন। আপনে অহন থাইক্ক্যা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পইড়া আল্লার কাছে বেহেশতে একটা বাড়ি...। বিনা তার কথা আর শেষ করতে পারে না। জোরে জোরে নি:শ্বাস নিতে শুরু করে। এই নিঃশ্বাস নিতে যেন খুব কষ্ট হচ্ছে। ওর বুক ওঠা নামা করছে। চোখ দুটি কেমন যে উল্টে যেতে চাচ্ছে। বারী কি করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারে না। ব্যাকুল হয়ে বলে, তোমার কি খুব কষ্ট অইতাছে। একটু পানি খাইবা? বিনার নিঃশ্বাসের গতি আরও বেড়ে যায়। তারপর এক সময় মাথাটা একটু কাত করে নিস্তব্ধ হয়ে যায়। এই জোছনা রাতে ছাদে বসে বারীর আজ বিনার কথাই খুব মনে পড়ছে। ওই মাটির ঘরে বিনা কেমন আছে?