মোহাম্মদ আবদুল মান্নান
১৭৫৭ সালের ২৩শে জুনের পলাশী যুদ্ধ ও ১৭৬৪ সালের বখশার যুদ্ধের মধ্য দিয়ে সুবাহ বাঙলা বা বাঙলা, বিহার, উড়িষ্যা ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দখলভুক্ত হয়। এরপর ক্রমশ তাদের ঔপনিবেশিক শাসন বিস্তৃত হয়। এই আগ্রাসনের মোকাবিলায় ১৭৬০ সালে মীর কাসেম ও ১৭৯৯ সালে টিপু সুলতানের মতো অল্প ক’জন আঞ্চলিক শাসক বিচ্ছিন্নভাবে প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেন। এসব আঞ্চলিক প্রতিরোধকে সমর্থন দেয়ার মতো সচেতন ও শক্তিশালী নেতৃত্ব তখন দিল্লীতে বা প্রদেশগুলোতে ছিল না।
পনেরো শতকে ইলিয়াসশাহী সুলতানদের সময়ে দিনাজপুরের ভাতুরিয়ার জমিদার গণেশের মুসলিম শাসন উৎখাতের চেষ্টা নূর কুতুব-উল-আলমের নেতৃত্বে ইসলাম প্রচারকগণের নেতৃত্বে জনগণকে সক্রিয় অংশগ্রহণের ফলে ব্যর্থ হয়। ষোল শতকে আলাউদ্দীন হোসেন শাহ’র সময় মুসলিম শাসন উৎখাতের জন্য চৈতন্যের সাংস্কৃতিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা করলে আলেম সমাজ ও জনগণের মিলিত প্রতিরোধের ফলে তা নস্যাৎ হয়। কিন্তু আঠারো শতকের শুরুতে সম্রাট আওরঙ্গজেব আলমগীরের ইন্তিকালের পর দিল্লীর কেন্দ্রীয় ও প্রদেশগুলোর আঞ্চলিক নেতৃত্ব রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে দিকনির্দেশনা হারিয়ে ফেলে। আলেমদের সাথে এই শাসকদের যোগসূত্র ছিন্ন হয়। শাসকগণ পুরাই জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। জনগণের রাজনৈতিক চেতনতা দুর্বল হয়ে পড়ার কারণে ১৭৫৭ সালের পলাশী ময়দানে কিংবা ১৭৬৪ সালে বখশারে শাসকগণ ভাড়াটে সৈন্যের ওপর নির্ভর করে যুদ্ধ জয়ে ব্যর্থ হন। পাশের জমি চাষকারী কৃষকও বুঝতে পারেননি তার ভাগ্যে এই যুদ্ধ কতবড় পরিবর্তন ঘটাচ্ছে। পলাশীর মাঠ থেকে ক্লাইভ বিজয়ীর বেশে মুরশিদাবাদে প্রবেশ করার সময় পথের দুই ধারে যে অসংখ্য তামাসগীর জড়ো হয়েছিলেন তারা সচেতনভাবে প্রত্যেকের হাতে একটা মাটির ঢেলা কিংবা একটি বাঁশের লাঠি তুলে নিলে সেখানেই ইংরেজদের কবর রচনা করতে পারতেন।
এমনি এক সামাজিক পটভূমিতে আঠারো শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ১৭৬৩ সালে ফকীর মজনু শাহ হাজারখানেক কৃষক-কারিগরকে নিয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে গ্রামীণ সমাজ থেকে প্রতিরোধ সংগ্রামের সূচনা করেন। সে লড়াইতে সারা বাঙলায় প্রায় পঞ্চাশ হাজার সশস্ত্র মুক্তি সংগ্রামী অংশ নেন। প্রায় চল্লিশ বছর স্থায়ী এই জনযুদ্ধ ইংরেজদের ঔপনিবেশিক শাসনের ভিত্তি কাঁপিয়ে দেয়। এই আন্দোলনের কর্মীগণ সীমাহীন ত্যাগ, সাহস ও সাংগঠনিক দক্ষতা দিয়ে হতাশ জাতির বুকে নতুন আশার আলো জ্বালেন। তাদের পথ ধরে পুরা উনিশ শতক জুড়ে বাঙলার মুসলমানগণ একের পর এক গণসংগ্রাম পরিচালনা করেন।
ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সুবাহ বাঙলার প্রাচীন স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামসমাজের ভিত্তি গুড়িয়ে দিয়ে বাঙলাকে ইংল্যান্ডের শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহের জন্য ব্যবহার শুরু করে। ১৭৫৮ থেকে ১৭৬৩ সালের মধ্যেই কৃষক ও কারিগরদের একটা অংশ স্থায়ী বেকারে পরিণত হন। ঢাকার বিশ্বখ্যাত মসলিনের কারিগর এবং আরো অন্যান্য শিল্প-কারিগরদের মধ্যে অনেকে নিজেদের বুড়ো আঙ্গুল কেটে কিংবা বনে জঙ্গলে পালিয়ে ইংরেজ বণিকদের শোষণ-উৎপীড়ন থেকে বাঁচার চেষ্টা করেন।
এদিকে ১৭৬০ সালে মীর যাফরের জামাতা মীর মুহম্মদ কাসিম আলী খান (১৭৬০-১৭৬৩) নতুন নবাব হয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। ১৭৬৩ সালে মীর কাসিম কয়েকটি রণাঙ্গনে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। সে সময় জনগণের কাতার থেকে ফকীর মজনু শাহ গ্রাম বাঙলায় জনবিদ্রোহের সূচনা করেন। মাত্র হাজারখানেক লোক নিয়ে তিনি ইংরেজদের বিরুদ্ধে দাঁড়ান। সুবাহ বাঙলায় ব্রিটিশ বিরোধী এই প্রথম গণসংগ্রামে জমিহারা-গৃহহারা নিরন্ন চাষী, দিন মজুর, শিল্প ধ্বংসের ফলে বেকার হওয়া তাঁতী ও অন্যান্য কারিগর, চাকুরীচ্যুত বুভুক্ষু সৈনিকসহ প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষ শরীক হন।
সে সময় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঢাকা কুঠি গণ-নিপীড়নের কুখ্যাত ছিল। এই কুঠির ইংরেজ বণিকরা ঢাকা ও আশেপাশের এলাকার কারিগরদের কাছ থেকে মসলিন ও কেলিকো বস্ত্র নামমাত্র মূল্যে কেড়ে নিত। ফকীর মজনু শাহ ১৭৬৩ সালের শুরুর দিকে এই কুঠিতে হামলা চালান। ইংরেজ কুঠিয়ালরা সব কিছু ফেলে কুঠির পেছন দিয়ে বুড়িগঙ্গা নদী বেয়ে পালিয়ে যান। ডিসেম্বরের শেষের দিকে ইংরেজ ক্যাপ্টেন গ্রান্ট এ কুঠি পুনর্দখলের আগের নয় মাসের বেশি সময় এই এলাকার কারিগড়গণ ইংরেজদের জুলুম-নিপীড়ন থেকে রেহাই পান। এই অভিযানের মধ্য দিয়েই সফলভাবে মজনু শাহ’র মুক্তির লড়াইয়ের বিসমিল্লাহ হয়।
ঢাকা কুঠি আক্রান্ত হবার পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী সচকিত হয়। তারা জনবিদ্রোহ মোকাবেলায় বিভিন্ন স্থানে সেনা মোতায়েন করে। কিন্তু জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের ফলে সারা বাঙলা ও বিহারে বিদ্রোহ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে থাকে। ফকীরগণ ১৭৬৩ সালের মার্চ মাসে ইংরেজদের রাজশাহী কুঠিতে হামলা চালান। তারা কুঠির ইংরেজ এজেন্ট বেনেটকে হত্যা করেন এবং কুঠির সম্পদ দখল করেন। ১৭৬৩ সালেই তারা বরিশাল কুঠিতে অভিযান চালান। সে অভিযান লক্ষ্য অর্জনে পুরা সফল না হলেও তা ইংরেজ শিবিরে আতঙ্ক বাড়াতে সক্ষম হয়। এরপর মুক্তিসংগ্রামীগণ আরো সংগঠিত হয়ে ১৭৬৪ সালে আবার রাজশাহী কুঠিতে হাজির হন। এবারে তাদের হামলায় কুঠিটি তছনছ হয়।
১৭৬৬ সালে সারা উত্তর বাঙলায় মজনু শাহ’র বাহিনী বড় আকারে সংগঠিত হয়। কুচবিহারের দিনহাটায় তারা শক্তি অর্জন করেন। জলপাইগুড়ি জেলায় তারা মাটির প্রাচীর এবং চারদিকে ট্রেঞ্চ কেটে সুরক্ষিত দুর্গ তৈরি করেন। তারা ইংরেজ বণিকদের প্রতিনিধি মার্টেলসহ তার লোকদের বন্দী করেন। বিচার শেষে তাদের প্রাণদন্ড হয়। ইংরেজ সেনাপতি ক্যাপ্টেন ম্যাকেঞ্জির নেতৃত্বে মুক্তি সংগ্রামীদের বিরুদ্ধে সেনা অভিযান ব্যর্থ হয়।
১৭৬৭ সালে পাটনার আশপাশের এলাকায় মজনু শাহ’র অনুসারীগণ সংগঠিত হয়ে পাটনার ইংরেজ কুঠি ও তাদের সহযোগী জমিদারদের ধন-সম্পদ ছিনিয়ে নেন। এলাকার জনগণ খাজনা আদায় বন্ধ করে দেন। বিহারের সারেঙ্গী জেলায় (সারণ) এ সময় মজনু শাহ’র প্রায় পাঁচ হাজার অনিসারী সংগঠিত হন। ইংরেজদের দু’টি সেনাদল এখানে অভিযান চালিয়ে আশিটি লাশ ফেলে পালাতে বাধ্য হয়। এই বড় সাফল্যের পর মুক্তিফৌজ সারেঙ্গী জেলার হুসীরপুর দুর্গ দখল করে। ইংরেজ ক্যাপ্টেন উন্ডিংয়ের নেতৃত্বে কামান সজ্জিত বাহিনী এসে পরে দুর্গটি এই দুর্গ পুনরুদ্ধার করে। (লেটার্স এন্ড রেকর্ডস, লংস সিলেকশন, পৃ: ৫২৬)
১৭৬৯ সালের শীতের শুরুতে মজনু শাহ’র বাহিনী উত্তর বাঙলায় ক্যাপ্টেন ম্যাকেঞ্জির অধীন ইংরেজ সেনাদলের ওপর হামলা চালান। তারা রংপুর পর্যন্ত অগ্রসর হন। লে: কীথের সৈন্য তখন ম্যাকেঞ্জির সাহায্যে এগিয়ে আসে। মুক্তিফৌজ ইংরেজ বাহিনীকে তাদের অনুসরণ করার সুযোগ দিয়ে ১৭৬৯ সালের ডিসেম্বরে নেপাল সীমান্তে মোরাং এলাকায় হঠাৎ তাদের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়ান। এই যুদ্ধে ইংরেজ সেনাপতি লে. কীথ নিহত হন। ইংরেজ বাহিনীটিও ধ্বংস হয়। (রেনেলস জার্নাল, জানুয়ারি ১৭৭০)
ইংরেজদের বিরুদ্ধে মুক্তিসংগ্রামীদের একের পর এক বিজয় তাদের মনোবল বাড়ায়। ইংরেজরা অজেয় নয় এই ধারণা জনগণকেও সাহসি করে। তারা বহু জেলায় ইংরেজদেরকে খাজনা দেয়া বন্ধ করে সে টাকা মুক্তিবাহিনীর হতে তুলে দেন। ইংরেজরা আতঙ্কিত হয়ে মজনু শাহ’র লোকদের গতিবিধির খবর জানতে এবং কৃষকদের ওপর নযরদারীর চালাতে গ্রামে গ্রামে জমিদার-মহাজনদের মাধ্যমে গোয়েন্দা নিয়োগ করে। কৃষকদের ওপর তারা নির্যাতন বাড়িয়ে দেয়। এ সব করে তারা মুক্তিসংগ্রামীদের দমাতে ব্যর্থ হন।
ইংরেজ ও তাদের দেশীয় সহযোগীরা ভয়াবহ দ্বিমুখি ফাঁদ পেতে ফসল কাটার মওসুমে জনগণের কাছ থেকে ধান-চাল কিনে মওজুদ করে বাঙলা ও বিহারে কৃত্রিম খাদ্য ঘাটতি তৈরি করে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করে। ছিয়াত্তরের মন্বন্তর নামে পরিচিত এই দুর্ভিক্ষে তিন কোটি মানুষের মধ্যে দেড় কোটি লোক খাদ্যের অভাবে মারা যান। ১৯৬৯-৭০ সালে এই দুর্ভিক্ষের সময় চাষী, কারিগর ও চাকুরী-বঞ্চিত বুভুক্ষ সৈন্যরা দলে দলে ফকীর বাহিনীতে যোগ দিয়ে এই জালেমদের হাত থেকে দেশ মুক্ত করার লড়াই শুরু করেন। মুক্তিসংগ্রামীর সংখ্যা তখন দ্রুত বাড়তে থাকে।
উত্তর বাঙলায় মজনু শাহ’র মুক্তি বাহিনীর তৎপরতা ক্রমশ শক্তিশালী হয়। দুর্ভিক্ষের সময় ১৭৭০ সালের শেষ দিকে মজনু শাহ’র বাহিনীর প্রায় পাঁচ হাজার সদস্য দিনাজপুরে জড়ো হন। দিনাজপুর কুঠির ইংরেজ সুপারভাইজার তাদের বিরুদ্ধে দশজন সিপাই ও একশ বরকন্দাজ পাঠালেও তারা দিনাজপুরের রাজার কাছ থেকে ফকীরদের বিরাট সংখ্যার কথা জেনে জান নিয়ে ফরে যান। কুঠির ইংরেজ সুপারভাইজার ১৭৭৯ সালের নবেম্বরে তার কর্তৃপক্ষকে জানান যে এত কম লোক নিয়ে ফকীর বাহিনীর মোকাবিলা সম্ভব নয়। (উদ্ধৃতঃ চৌধুরী শামসুর রহমান: বাংলার ফকীর বিদ্রোহ, পৃ: ৯)
দিনাজপুরের রাজা ভয় পেয়ে শক্তিশালী বাহিনী পাঠানোর আবেদন জানান। ইংরেজদের কামান-বন্দুক সজ্জিত একটি বড় দল তখন দিনাজপুরে যায়। কিন্তু মুক্তি বাহিনীর লোকেরা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে জেলার চারদিকে ছড়িয়ে পড়েন। তারা অত্যাচারী জমিদার ও লুটেরা ধনীদের ধন-সম্পদ ছিনিয়ে নিয়ে উধাও হয়ে যান। তাদের একটি দল মোমেনশাহী জেলায় সহযোদ্ধাদের সাথে মিলিত হন। রংপুর, দিনাজপুর ও মোমেনশাহীর মুক্তিফৌজ তখনো পরস্পর সংযোগ-সমন্বয় রেখে তাদের অভিযান অব্যাহত রাখেন। (মুরর্শিদাবাদে রাজস্ব বোর্ডকে পাঠানো ক্যাপ্টেন রেনেলের রিপোর্ট: লংস সিলেকশন)
১৭৭১ সালে ঢাকাতে মজনু শাহ’র বাহিনীর ব্যাপক তৎপরতার কথা জানা যায়। ঢাকা জেলার নানা জায়গায় তারা ইংরেজদের কুঠি ও জমিদারদের কাচারী লুট করেন। তারা জালেম জমিদারদের কাছ থেকে ‘কর’ আদায় করেন। ইংরেজ কর্তৃত্ব সম্পূর্ণ উপেক্ষা ও অগ্রাহ্য করে মজনু শাহ’র লোকদের এই তৎপরতার ফলে এখানকার পরিস্থি ইংরেজ প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ১৭৭১ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার ইংরেজ সুপারভাইজার রাজস্ব কাউন্সিলকে এই এলাকার অবস্থার অবনতি সম্পর্কে লিখিতভাবে জানান।
১৭৭১ সালে মজনু শাহ’র মুক্তিবাহিনীর লোকেরা উত্তর বাঙলার দিনাজপুর, বগুড়া ও জলপাইগুড়ি জেলায় বিভিন্ন স্থানে প্রাচীরঘেরা দুর্গ নির্মাণ করেন। বগুড়ার মস্তানগড় দুর্গটি ছিল বৃহত্তম। চারদিকে খাড়া পাহাড়ঘেরা প্রাকৃতিক দুর্গ সদৃশ ‘সেলবর্স’ নামে পরিচিত মস্তানগড়কে মজনু শাহ’র লোকেরা সুরক্ষিত ও সুদৃঢ় করেন। এই দুর্গ বহু বছর ফকীরদের অভিযানের কেন্দ্র ছিল। এ দুর্গ থেকেই জায়গাটি ‘মস্তান গড়’ বা মস্তান দুর্গ নামে পরিচিত হয়। ১৭৭১ সালের মার্চ মাসে বগুড়ার কালেক্টর ফ্রান্সিস গ্লাডউইনসহ একাধিক সূত্র থেকে এই দুর্গ সম্পর্কে রিপোর্ট করা হয়। মজনু শাহ বগুড়ার মাদারগঞ্জেও একটি কেন্দ্র কায়েম করেন। (চৌধুরী শামসুর রহমান: বাঙলার ফকীর বিদ্রোহ)।
১৭৭১ সালে পাবনার বেলকুচি ও লক্ষীনামপুর এলাকায় মজনু শাহ’র বাহিনীর তৎপরতা বৃদ্ধি পায়। ইংরেজদের নথীতে তখন এই এলাকায় প্রায় এক হাজার ‘ভালোভাবে অস্ত্রসজ্জিত’ মুক্তিসংগ্রামী সক্রিয় ছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তারা গঞ্জের দারোগার কাছ থেকেও টাকা আদায় করতেন বলে ইংরেজ কর্মকর্তাদের রিপোর্টে বলা হয়। মোমেনশাহীর পুখারিয়া পরগনায়ও তখন মুক্তি সংগ্রামীগণ তৎপর ছিলেন বলে রিপোর্ট করা হয়।
১৭৭১ সালের ফেব্রুয়ারিতে মজনু শাহ-এর নেতৃত্বে আড়াই হাজার মুজাহিদ রংপুরে জড়ো হন। তাদের দমনের জন্য ক্যাপ্টেন রেনেলের অনুরোধে লে. টেইলর ও লে. ফেল্টহামের নেতৃত্বে দু’দল সৈন্য রংপুরে পাঠানো হয়। ফেল্টহামের বাহিনী রংপুরের ঘোড়াঘাটে মুক্তিফৌজকে বাধা দেন। মজনু শাহ এ সময় বগুড়ার মস্তানগড় হয়ে বিহারে যান। মজনু শাহ’র বিহার সফরের কিছুদিন পর ১৭৭১ সালের শরৎকালে পাটনা থেকে মুক্তিসংগ্রামীদের একটি বড় দল উত্তর বাঙলায় আসেন। তারা বিপুল সংখ্যায় রংপুরে জড়ো হন। ১৭৭১ সালের ১৫ এপ্রিল রাজস্ব কাউন্সিলকে কোম্পানির সুপারভাইজার দারুণ উদ্বেগের খবর দিয়ে জানান: মজনু শাহ’র লড়াইয়ে দেশের সব ধরনের মানুষ একতাবদ্ধ হচ্ছেন। সরকারের বহু দেশীয় কর্মচারী এই আন্দোলনকে সহযোগিতা করছেন। অনেকে চাকুরী ছেড়ে মজনু শাহ’র আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন।
মজনু শাহ এই সময় ইংরেজদের বিরুদ্ধে সমাজের প্রভাবশালী লোকদেরকেও শরীক হওয়ার আবেদন জানান। তিনি নাটোরের রাণী ভবানীকেও বিশেষ ইশারাবাহী একটি চিঠি লিখে সহযোগিতা কামনা করেন। মজনু শাহ ফারসী ভাষায় লেখা এই চিঠিতে রাণীকে বলেন: ‘আমরা বহুদিন বাঙলার সবখানে ভিখ চাইছি। দেশের মানুষ সমর্থন ও সাহায্য করছেন। আমরা দরগাহ বা তীর্থস্থান সফর করি। কাউকে গালি দেই না। কারো গায়ে হাত তুলি না। তবুও আমাদের ১৫০ জন নির্দোষ ফকীরকে হত্যা করা হয়েছে। আগে আমরা একা ছিলাম। এখন বেশ সংগঠিত। ইংরেজদের কাছে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া অপরাধ। তারা ফকীরদেরকে ইবাদতে বাধা দিচ্ছে। এটা অন্যায়। আপনি প্রকৃত শাসক। আমরা ফকীর মানুষ। আমরা আপনার কল্যাণ চাই। আপনার কাছ থেকে আমরা সাহায্য আশা করি। (ক্যালেন্ডার অব পারসিয়ান করেসপন্ডেন্স,ভল্যুম থ্রী, পৃঃ ৪৭)।
মজনু শাহ-র চিঠির বহু শব্দ এবং প্রতিটি বাক্য বিশেষ ইঙ্গিতবহ ও কৌঢ়লী। মজনু শাহ’র এই আবেদনে রাণী ভবানীর সাড়া মেলেনি। তখন ১৭৭২ সালের জানুয়ারি থেকে মজনু শাহ-র মুক্তিযোদ্ধাগণ নাটোরে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। তারা রাণী ভবানীর এলাকায় জালেম জমিদার ও ইংরেজদের অনুচরদের বিরুদ্ধে অপারেশন শুরু করেন। জনগণের কাছ থেকে লুট করা তাদের ধন-সম্পদ তিনি কেড়ে নেন। জালেমদের গ্রেফতার করে কৃষক নির্যাতনের প্রতিশোধও নেন। বগুড়ার ডেপুটি সুপারভাইজার ১৭৭২ সালের ১৪ জানুয়ারি রাজস্ব কাউন্সিলকে মজনু শাহ’র দলের এই সব কাজের ব্যাপারে রিপোর্ট করেন। বিদ্রোহীগণ স্থানীয় কর্মশালায় তৈরি আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেন বলে এই রিপোর্টে বলা হয়। (১৭৭২ সালের বগুড়া ডিস্ট্রিক্ট রেকর্ডস এবং নাটোর রাজ রেকর্ডস)।
১৭৭২ সালের শুরু থেকেই উত্তর বাঙলায় ফকীর মজনু শাহ ব্যাপক তৎপরতা চালান। রাজশাহীর ইংরেজ সুপারভাইজারের ২২ জানুয়ারির চিঠিতে রাজস্ব কাউন্সিলকে জানান যে মজনু শাহ দু’হাজার অনুসারী নিয়ে রাজশাহীতে হাজির হয়েছেন। তিনি এ পরগণার এক ‘বিশিষ্ট ব্যক্তি’কে বন্দী করেছেন। এই রিপোর্টে মুক্তিফৌজের বিপুল সংখ্যার ব্যাপারে ইংরেজ কর্মকর্তার আতঙ্ক স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়। তিনি বলেন, আমার কাছে থাকা অর্থ-সম্পদের পরিণতি কী হবে বুঝতে পারছি না।
নাটোর-রাজের এক সময়ের প্রধান নায়েব দয়ারাম রায় ইংরেজ আমলের লুটপাটের ভাগীদার হয়ে দুর্ভিক্ষের সময় প্রচুর বিত্ত গড়ে তোলেন। তিনি সেই অর্থে অভিজাত শ্রেণীভুক্ত হয়ে দিঘাপাতিয়া রাজবংশ প্রতিষ্ঠাতা করেন। সামান্য ‘নায়েব’ থেকে দিঘাপতিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ জমিদারী কায়েম করে ‘রাজা’ হয়ে কৃতজ্ঞ দয়ারাম ইংরেজদের রাজত্ব চিরস্থায়ী করার চেষ্টায় লিপ্ত ছিলেন। মজনু শাহ’র তৎপরতা তাকেও আতঙ্কে রেখেছিল। তিনি বিভিন্ন সূত্র থেকে মজনু শাহ’র বাহিনীর তৎপরতা সম্পর্কে খোঁজ-খবর জেনে কোম্পানিকে জানাতেন। দয়ারাম তার এক সাবেক গ্রাম্য সহকর্মীর কাছ থেকেও তথ্য সংগ্রহ করতেন। তার দেয়া তথ্য অনুযায়ী রাজশাহীর সুপারভাইজার কাউন্সিল বরাবরে লেখেন: মজনু শাহ’র দলের লোকেরা জমিদার কাচারীতে হামলা করে কৃষকদের কাছ থেকে আদায় করা খাজনার এক হাজার টাকা কাচারী থেকে নিয়ে গেছেন। তারা তলোয়ার, বর্শা, গাদা বন্দুক, হাউই বাজি ও ঘূর্ণায়মান কামানে সজ্জিত। ভয় হচ্ছে, মজনু শাহ’র ফৌজ পুরা কাচারীটাই কখন না জানি দখল করে নেবে।
১৭৭২ সালের ২৫ জানুয়ারির চিঠিতে নাটোরের সুপারভাইজার রাজস্ব কাউন্সিলকে লেখেন: দু‘টি উট, প্রায় চল্লিশটি হাউই, কয়েকটি ঘূর্ণায়মান কামান আর চারশ গাদা বন্দুকধারী ফৌজসহ প্রায় এক হাজার সশস্ত্র লোকের একটি বাহিনী দয়ারাম রায়ের এলাকায় হাজির হন। মজনু শাহ ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে আসেন। কিছু সহচর আসেন টাট্টু ঘোড়ায় চরে। তারা নূরনগর গ্রাম থেকে পাঁচশ টাকা এবং জয়সিনা কাচারী থেকে ষোলশ নব্বই টাকা আদায় করেন। কাচারীর লোকেরা ফকীরদের দেখেই পালিয়ে যায়। ১৭৭২ সালের ২৯ জানুয়ারি নাটোরের সুপারভাইজার আরেকটি চিঠিতে লেখেন, গ্রামের লোকেরা স্বউদ্যোগে মুক্তিবাহিনীর লোকদের মেহমানদারী করেন। গ্রামবাসীর সাথে মজনু শাহ’র লোকদের সম্পর্ক চমৎকার।
উত্তর বাঙলার কৃষকরা সরকারের বদলে মজনু শাহকে কর দেন। রাজশাহীর জমিদাররা ইংরেজদের কাছে কর মওকুফের আবেদন জানালে মুরশিদাবাদের রাজস্ব কাউন্সিল তা নাকচ করে বলে: ফকীরদের কারণে রাজশাহীতে রাজস্ব আয় আট হাজার নয়শ’ উনসত্তর টাকা কমেছে। জমিদাররা চুক্তি অনুযায়ী এর ক্ষতিপূরণ করতে বাধ্য। (কোম্পানীর রাজস্ব কাউন্সিল কৃর্তক রাজশাহীস্থ সুপারভাইজারকে লেখা ১৭৭২ সালের ১৬ মার্চের চিঠি)।
১৭৭২ সালের শুরুতে মজনু শাহ’র মুক্তিফৌজ রংপুরের ঘোড়াঘাটে সমবেত হয়। রংপুরের সুপারভাইজার পালিং-এর নির্দেশে ক্যাপ্টেন টমাস সেনাবাহিনী নিয়ে গোবিন্দপুরমুখি হন। তিনি ৩০ ডিসেম্বর শ্যামগঞ্জ ময়দানে ফকীরদের উপর হামলা চালান। মুক্তিফৌজ পলায়নের ভান করে পিছু হটলে টমাসের বাহিনী তাদের পিছু নিয়ে জঙ্গলে ঢুকে জয়ের উল্লাসে গোলাগুলী শেষ করে ফেলে। তখন মুক্তিফৌজ ঝটিকাবেগে হামলা চালিয়ে তাদেরকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেন। এলাকার জনগণও তীর-ধনুক, বল্লম ও লাঠিসোটা নিয়ে ফকীরদের পক্ষ নেন। ক্যাপ্টেন টমাস পাল্টা হামলার নির্দেশ দিলে তার বাহিনীর দেশীয় সৈন্যরা জনগণের বিরুদ্ধে গুলী চালাতে অস্বীকার করেন। সেনাপতি টমাস এই অভিযানে নিহত হয়। সেনাপতি টমাস এই অভিযানে নিহত হয়। টমাস নিহত হন এবং তার বাহিনী পরাজিত ও ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। পালিংও স্বীকার করেছেন: কৃষকরা লাঠিসোটা নিয়ে বিদ্রোহীদের পক্ষ নেন। তারা লম্বা ঘাসের ভেতর লুকিয়ে থাকা টমাসের সৈন্যদেরকে খুঁজে খুঁজে হত্যা করেন। কোন ইংরেজ সৈন্য গ্রামে ঢুকলে কৃষকরা তাদেরকে হত্যা করে বন্দুকগুলো নিয়ে নেন।’ (পালিং-এর ১৭৭২ সালের ২৯ ও ৩১ ডিসেম্বরের দু‘টি চিঠি।)
মজনু শাহ’র বাহিনীর ধারাবাহিক সাফল্য উপনিবেশিক শিবিরে উদ্বেগ বাড়ে। ইংল্যান্ড থেকে গবর্ণর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। হেস্টিংস কোম্পানির সব সৈন্য নিয়ে মজনু শাহ’র বিরুদ্ধে অভিযানের প্রস্তুতি নেন। ইংল্যান্ড থেকে সৈন্য ও অস্ত্রশস্ত্রের নতুন চালান আসে। ১৭৭৩-এর জানুয়ারি থেকে ইংরেজদের ব্যাপক অভিযান শুরু হয়। ইংরেজ সেনাপতি স্টুয়ার্ট ৩ ফেব্রুয়ারি একটি বড় বাহিনী নিয়ে দিনাজপুর জেলার সন্তোসপুর দুর্গ দখল করতে অগ্রসর হন। সেখানে ভয়ংকর যুদ্ধের পর মজনু শাহ’র অনুসারীগণ সুশৃংখলভাবে ভুটান সীমান্তের দিকে চলে যান। ইংরেজরা সন্তোষপুর দুর্গ ও জলপাইগুড়ি অধিকার করে। (সার্কিট কমিটির কাছে ক্যাপ্টেন ষ্টুয়ার্ট-এর লেখা ৩ ফেব্রুয়ারির চিঠি।)
দিনাজপুর ও জলপাইগুড়ি থেকে মজনু শাহ’র বাহিনী পিছু হটলে বগুড়ার মুক্তিফৌজ ইংরেজদের সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় প্রস্তুতি নেন। ইংরেজরা বগুড়ায় হামলার সাহস করেনি। বগুড়ার কালেক্টর সার্কিট কমিটিকে জানান: স্থানীয় প্রশাসন ও জমিদাররা মজনুশাহকে বছরে বারোশ টাকা ‘কর’ দেয়ার শর্ত মেনে চুক্তি করেছেন। কিন্তু ক্যাপ্টেন ষ্টুয়ার্ট মজনু শাহকে শায়েস্তা করতে বগুড়ামুখি হলে বগুড়ার মুক্তিফৌজ তেরোশ’ টাকাসহ স্থানীয় জমিদার ও তার দু‘জন কর্মচারীকে বন্দী করে মোমেনশাহীর পথে জামালপুর পৌছেন। জাফরশাহী পরগণার জমিদারের প্রধান নায়েবকে আটক করে তারা ষোলশ’ টাকা আদায় করে মোমেনশাহী গিয়ে সেখানকার ফৌজের সাথে মিলিত হন। তারা সেখান থেকে সারা পূর্ব বাঙলায় জমিদারদের কাচারী ও ইংরেজ কুঠিগুলোতে হামলা চালিয়ে জালেনদের সব কিছু অচল করে দেন।
এ সময় ঢাকাতেও মজনু শাহ’র বাহিনীর মজনু শাহ’র বাহিনীর তৎপরতা বৃদ্ধি পায়। ঢাকার কালেক্টর ১৭৭৩ সালের ২৯ জানুয়ারি গর্ভনর জেনারেলকে ঢাকায় মজনু শাহ’র ব্যাপক তৎপরতা কথা জানান। তিনি লেখেন : মজনু শাহ’র সাড়ে তিন হাজার লোকের একটি বাহিনী এখানকার জমিদারের গোমস্তা কিঙ্করের বাড়ি ও ধনাঢ্য রামপ্রসাদের বাড়ী লুঠ করেছেন। অন্য ধনীরাও নিস্তার পাননি। দু’জন স্থানীয় জমিদার উকিল মারফত তাদের সাথে সাড়ে তিন হাজার টাকায় একটি রফা করেছেন।
এ সময় মোমেনশাহী থেকেও মজনু শাহ’র একটি বড় দল ঢাকা জেলায় ঢোকে। এই খবরে আতঙ্কিত যালেম জমিদাররা গ্রাম থেকে ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় দ্রুত ঢাকা শহরে আশ্রয় নেন। ইংরেজরাও তাদের ঢাকার কেন্দ্রগুলো রক্ষার প্রস্তুতি নেন। ক্যাপ্টেন এডওয়ার্ডসহ ক’জন ইংরেজ সেনাপতি মজনু শাহ’র বাহিনীকে দমনের জন্য অগ্রসর হয়। মুক্তিসংগ্রামীগণ ভাওয়াল পরগনায় তাদের কিছু লোক পাহারায় রেখে মোমেনশাহী জেলার মধুপুরের গভীর জঙ্গলপথে উওর বাঙলার দিকে রওনা হন। ক্যাপ্টেন এডওয়ার্ডের বাহিনী মজনু শাহ’র দলের তিন হাজার সদস্যের এই বাহিনীটিকে অনুসরণ করে কাছাকাছি পৌছায়। তখন হঠাৎ মুক্তিফৌজ এডওয়ার্ডের বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই আকস্মিক হামলায় ইংরেজ বাহিনী প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়। তাদের মাত্র বারোজন সৈন্য ১৭৭৩ সালের ১ মার্চ কোনোক্রমে প্রাণ নিয়ে পালান। (বগুড়ার কালেক্টর কর্তৃক গভর্নর জেনারেলকে লেখা ২ মার্চের চিঠি।)
ক্যাপ্টেন এডওয়ার্ডকে পরাস্ত করে মজনু শাহ’র বাহিনী কয়েক দলে ভাগ হয়। দেড় হাজার মুক্তিফৌজের একটি দল যশোর হয়ে কলকাতার দিকে যায়। ক’টি দল পশ্চিম বাঙলার কিছু জেলায় প্রবেশ করে। ইংরেজদের বিভিন্ন সেনাদল মুক্তিসংগ্রামীদের অভিযানে বাধা দিতে কয়েকটি পথে অগ্রসর হয়। পশ্চিমমুখী দলগুলো সংঘর্ষ এড়াতে রোখ পরিবর্তন করে উত্তর বাঙলার দিকে চলে যায়।
১৭৭৩ সালের নবেম্বরে মজনু শাহ’র মুক্তিফৌজের একটি অংশ দেশীয় কামারশালায় তৈরি কয়েকটি কামান ও অন্যান্য অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মুরশিদাবাদ ও বীরভূমের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হন। এ সময় রাজশাহী এলাকায় মজনু শাহ’র অনুসারীগণ অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন। মুরশিদাবাদের কালেক্টর তার ৩০ নভেম্বরের প্রতিবেদনে এ ব্যাপারে গবর্ণর জেনারেলকে অবহিত করেন। তিনি ১৮ ডিসেম্বর রাজশাহী জেলায় তিন হাজার মুক্তিসংগ্রামীর উপস্থিতির কথা জানান। এই বাহিনীর সদস্যগণ প্রত্যেকে একটি করে দেশীয় বন্দুক, একটি বল্লম, দুটি তলোয়ার ও একটি করে ‘রকেট’ বহন করেন। রাজশাহী জেলার বিস্তীর্ণ এলাকার তারা জমিদারদের কাছ থেকে ‘কর’ আদায় করেন। কালেক্টর লিখেন, সাতশ সাথী নিয়ে মজনু শাহ দিনাজপুরের মেসিদা পরগনায় হাজির হয়েছেন। তিনি জমিদারের কাছে দেড় হাজার টাকা দাবী করেন। কোন জবাব না পেয়ে তাকে ধরে নিতে দু’শ লোক পাঠান। জমিদার আগের রাতেই সে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান। ফকীর দল প্রায় ত্রিশ মাইল দূরে লেম্বুবাড়িয়া পর্যন্ত জমিদারকে অনুসরণ করেন। মজনু শাহ’র ভয়ে কর্মচারীরা আগেই পালিয়েছিলেন। কাচারীতে সঞ্চিত জনগণের কাছ থেকে আদায় করা খাজনার এক হাজার সাতান্ন টাকা মজনু শাহ’র লোকেরা নিয়ে যান। তারা জমিদারের বাড়ী ও কাচারীতে হামলা করেন। বিভিন্ন গ্রাম থেকে তারা আরো প্রায় দেড় হাজার টাকা আদায় করেন। এই রিপোর্টের পর ২৩ ডিসেম্বর লে. উইলিয়ামসের নেতৃত্বে চার কোম্পানী সৈন্য রাজশাহীর দিকে যায়। মজনু শাহ’র বাহিনী এর আগেই উত্তর বাঙলা ছেড়ে বিহারের পূর্ণিয়ামুখি হন। তখন সেখানে মজনু শাহ’র বাহিনীর তৎপর ছিল।
ফকীর মজনু শাহ’র প্রতিরোধ ও মুক্তি সংগ্রাম মোকাবেলায় ইংরেজরা চার ব্যাটালিয়ন ব্রিটিশ সৈন্য নিয়োজিত করতে বাধ্য হয়। এ কথা ওয়ারেন হেস্টিংস নিজেই স্বীকার করেছেন। স্থানীয় জমিদারদের লোকেরাও তাদেরকে নানাভাবে সাহায্য করেন। কিন্তু মজনু শাহ’র দেশপ্রেমিক জানবাজ মুক্তিফৌজের মোকাবেলায় লোভী ও দেশদ্রোহী জননিপীড়ক লুটেরা দালালদের কৌশল চরমভাবে ব্যর্থ করে মজনু শাহ ইংরেজ শাসনকে প্রায় অকার্যকর করে ফেলতে সক্ষম হন। জনগণ বহু জায়গায় খাজনা দেয়া বন্ধ করার ফলে ইংরেজদের রাজকোষ প্রায় শূন্য হয়ে যায়। প্রশাসন ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়। হান্টার লিখেছেন: মজনু শাহ-র বাহিনীর প্রতি স্থানীয় জনগণের সমর্থন ও সহানুভূতির কারণে জমিদারদের পক্ষে খাজনা আদায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। গ্রাম বাঙলায় শাসন ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে উপনিবেশিক শাসকেরা অচল অবস্থার সম্মুখীন হন। (ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টার : গ্রাম বাংলার ইতিকথা (এ্যানালস অব রুরাল বেঙ্গল গ্রন্থের অসীম চট্টোপাধ্যায়কৃত তরজমা), পৃঃ ৬৩]। মজনু শাহ’র বাহিনী ইংরেজদেরকে নানা রণাঙ্গনে পরাজিত করার ফলে তাদের অপরাজেয় সামরিক সামর্থের বড়াই ধুলায় মিশে যায়।
ইংরেজরা অস্তিত্বের সংকটে ওড়ে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি ও পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয়। মজনু শাহ’র তৎপরতার খবর কোম্পানিকে জানানোর ব্যাপারে আইনি বাধ্যবাধকতা আরোপ করা সত্বেও জনগণ মজনু শাহ’র লোকদের সম্পর্কে খোঁজ-খবর জানাতে অস্বীকার করেন। ভীত-সন্ত্রস্ত ও পরাজয়ের মনোভাবে আচ্ছন্ন ইংরেজ প্রশাসন বিনা কারণে হাজার হাজার কৃষককে আটক করে অনেককে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করে। জনগণকে আতঙ্কিত করতে লাশ বহুদিন গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়। সন্দেহের কারণেও অনেককে ফাঁসিতে ঝুলানো হয় এবং তাদের পরিবারের লোকদেরকে ক্রীতদাস বানানো হয়। (সুপ্রকাশ রায়: ভারতের কৃষক বিদ্রোহ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম, পৃঃ ৪০-৪১)
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আইন করে ধর্মীয় সফর নিষিদ্ধ করে। মজনু শাহ’র লোকদের আশ্রয় না দেয়ার জন্য ভুটানকে চুক্তিবদ্ধ করা হয়। পলাশী যুদ্ধের পর পর প্রায় আশি হাজার দেশীয় সৈন্য ছাঁটাই করার পর বাকী যে সব সৈন্য ইংরেজদের সেনা বাহিনীতে ছেলেন তাদেরকেও বেসামরিক পাহারাদার বা কাচারীরক্ষী বরকন্দাজের দায়িত্ব দিয়ে শুধু গোরা সৈন্যদেরকে দিয়ে সেনাবাহিনী পুনর্গঠন করা হয়। এই সব পদক্ষেপ থেকে ইংরেজদের তখনকার আতঙ্কের মাত্রা কিছুটা ধারণা করা যায়। ইংরেজদের এই ভয় মিশ্রিত প্রস্তুতির মুখে মজনু শাহ তার কৌশলও পরিবর্তন করেন। এই সময় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দিল্লীর সম্রাটের সাথে ১৭৬৫ সালের এলাহাবাদ সন্ধীর শর্ত একতরফা লংঘন করে ১৭৭৪ সালে ‘দ্বৈত শাসন’ বাতিল করে বাঙলার সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী হিসাবে মুরশিদাবাদের পরিবর্তে কলকাতাকে রাজধানী ঘোষণা করে।
১৭৭৬ সাল থেকে মজনু শাহ তার বাহিনীতে নতুনভাবে বহু লোক রিক্রুট করে বাহিনীর পুনর্বিন্যাস করেন। এ সময় উত্তর বাঙলায় মজনু শাহ’র উপস্থিতি দৃশ্যমান হলে ইংরেজরা ভীত হয়ে বিভিন্ন এলাকার সঞ্চিত রাজস্ব দিনাজপুরে সরিয়ে নেয় ও পাহারা জোরদার করে। ১৭৭৬ সালের ১৯ মার্চ কালেক্টর ফ্রান্সিস গ্লাডউইন রিপোর্ট করেন যে, মজনু শাহ’র অনুসারী একটি বড় সশস্ত্র দল বগুড়াতে জড়ো হয়ে মস্তানগড়ের মেলায় শরীক হচ্ছেন। তার দলের আরো বহু লোক শীঘ্রই এখানে মিলিত হবে। তিনি তাদেরকে তাড়াতে শক্তিশালী সেনাদল পাঠানোর অনুরোধ জানান। কোম্পানি জবাব দেয়: আগের বছর শীতে মজনুর লোকেরা কারো ওপর জুলুম করেননি। এবছরও নিরুপদ্রব থাকবেন আশা করা যায়। তবে গ্লাডুইন অনিরাপদ মনে করলে দিনাজপুরে চলে যেতে পারেন। গ্লাডউইন এর পর ২৪ মার্চ মজনু শাহ সম্পর্কে আরেকটি রিপোর্ট দাখিল করেন।
১৭৭৬ সালের ২২ অক্টোবর গবর্ণর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস কোম্পানির প্রাদেশিক কাউন্সিলকে মজনু শাহ’র ক’বছরের তৎপরতা সম্পর্কে রিপোর্ট দেন। তখন মজনু শাহ’র একটি ছোট বাহিনী বগুড়া বা সেলবর্সে হাজির হওয়ার কথা শুনে ইংরেজরা মজনু শাহকে গ্রেফতার করা জন্য একটি শক্তিশালী বাহিনী পাঠায়। মজনু শাহ তখন করতোয়া নদী ও মোমেনশাহী সীমান্ত পার হয়ে ব্রহ্মপুত্রের তীরে ঘাঁটি গেড়েছেন। এর পর গ্লাডউইন ৩০ অক্টোবর গবর্ণর জেনারেলকে জানান, মজনু শাহ’র লোকেরা ঘোড়াঘাটের দিকে গেছেন। তার বাহিনীতে পঁচিশ জন প্রাক্তন সেনা সদস্যও রয়েছেন বলে এ রিপোর্টে বলা হয়।
১৭৭৬ সালের ১৪ নবেম্বর লে. রবার্টসন বরহমপুর থেকে সেনাদল নিয়ে বগুড়া থেকে চার মাইল দূরে মজনু শাহ’র শিবিরের কাছে গিয়ে গুলীবর্ষণ শুরু করেন। মজনু শাহ পিছু হটে জঙ্গলের ভেতরে ঢুকে পড়েন। রবার্টসনও তাকে অনুসরণ করলে মজনু শাহ’র বাহিনী হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে পাল্টা হামলা চালায়। ফলে গোরা বাহিনীর ক’জন নিহত হন এবং রবার্টসন নিজেও আহত হন। রবার্টসন তার এই অভিযান সম্পর্কে গ্লাডউইনকে লেখেন : ‘রাত নয়টায় ক্যাম্প থেকে রওনা হয়ে প্রায় বিশ মাইল পথ পেরিয়ে সূর্য ওঠার আগে মজনুর শিবিরের কাছে পৌছে যাই। প্রায় তিনশ লোক সেখানে শিথিল পাহারায় আগুনের চারপাশে অসর্তকভাবে বসেছিলেন। আমরা তাদের বিশ গজের মধ্যে পৌছলে তারা আমাদের দেখেই হাতিয়ার নিয়ে দাঁড়ান। আমরা গুলী চালাই। তারা পনের গজ পিছনে জঙ্গলে আশ্রয় নিয়ে পাল্টা গুলী চালান। ফলে আমাদের ক’জন সিপাহী যখম হন। আমার পায়েও গুলী লেগেছে। আমাদের এ ধরনের গোপন ও আকস্মিক হামলা তারা বিস্ময়করভাবে রুখে দিয়েছেন। আধঘণ্টা পর তারা স্থান ত্যাগ করেন। মজনু শাহ’র একটি ঘোড়ায় চড়ে চলে যান।
মজনু শাহ ১৭৮১ সালে মধুপুর জঙ্গলের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেন। তিনি চারদিকের অত্যাচারী জমিদারদের বিরুদ্ধে অভিযান চালান। জামালপুরেও তিনি নিয়ন্ত্রণ কায়েম করেন। মোমেনশাহীর জমিদাররা কোম্পানির কাছে সাহায্য চান। হেনরী লজের নেতৃত্বে একদল সৈন্য ১৭৮২ সালে চরকায়থে মুক্তি বাহিনীর ওপর হামলা চালায়। এ যুদ্ধে মুক্তিফৌজের পঁচিশজন শহীদ এবং অনেকে আহত হন। মজনু শাহ তার বাহিনীর বাকি লোকদের নিয়ে মধুপুর জঙ্গলের আরো গভীরে চলে যান। (মোমেনশাহী ডিষ্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার)।
১৭৮৩ সালের জানুয়ারিতে মজনু শাহ এক হাজার সাথি নিয়ে মোমেনশাহীতে পৌছে অনুসারীদেরকে বিশেষভাবে সংগঠিত করেন। এই খবর পেয়ে গভর্নর জেনারেল হেস্টিংস উত্তেজিত হয়ে ১৭৮৩ সালের ১১ এপ্রিল রাজস্ব কমিটিকে তার ক্ষোভ ও অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন। তিনি সেনাপতি ও কালেক্টরদেরকে বলেন: জাফরশাহী পরগণায় আবারও মজনুর উপস্থিতির খবর পাচ্ছি। এই লোকটি প্রতি বছর আমাদের ওপর হামলা করছেন। আমরা এই উৎপাত আর নিতে পারছি না। শুনেছি তিনি ব্রহ্মপুত্র নদের ওপারে বহাল তবিয়তে বাস করেন। প্রতিবছর কোম্পানির অধীন জেলাগুলো তিনি ছারখার করে এসব এলাকা থেকে নিয়মিত টাকা-পয়সা আদায় করেন। তাকে কেউ বাধা দিতেও সাহস পায় না!
মজনু শাহকে গ্রেফতার করতে চারদিকে সাজ সাজ রব পড়ে যায়। কয়েক দল ইংরেজ সৈন্য মোমেনশাহী অভিমুখি হন। কিন্তু তারা পৌছার আগেই মজনু শাহ মধুপুরের জঙ্গলের পথ ধরে উত্তর বাঙলায় ফিরে যান। এর পর মালদহ জেলার কুঠি ও জমিদারী কাচারীতে সঞ্চিত সম্পদ হস্তগত করেন। মালদহের এই অভিযানের সময় ইংরেজদের অধীন ক’জন দেশীয় বরকন্দাজ মজনু শাহ’র বাহিনীতে যোগ দেনবলে রেসিডেন্ট-এর ১৭৮৩ সালের ১২ মার্চের চিঠি থেকে জানা যায়।
ইংরেজদের ক’টি সেনাদল মজনু শাহকে ধরতে এ সময় মালদহে ছুটে আসেন। কিন্তু তাদের পৌছার আগেই মজনু শাহ মালদহ ছেড়েও অনেক দূরে চলে যান। তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা না নিতে পারায় ইংরেজদের দুশ্চিন্তা ও হতাশা ক্রমশ বাড়ে। সেনাপতি ও কালেক্টরদের নানা ব্যর্থতার বিভিন্ন কৈফিয়ত নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়। শেষে ১৭৮৪ সালের ২৮ অক্টোবর সপারিষদ গভর্ণর জেনারেলের রাজস্ব বিভাগের বিবরণে বলা হয় : অতীতে ক’বার মজনু শাহকে সফলভাবে বাধা দেয়া হয়। তার ওপর হামলাও করা হয়। কিন্তু তাকে শাস্তি দেয়া যায়নি। জমিদাররাও তার গতিনিধির খবর জানাতে ভয় পান। মজনু শাহ’র বাহিনী একেকটি ঘটনার পর দ্রুত অদৃশ্য হয়ে যান। এর পর অভাবিত কোন নতুন কোন আবার তাদেরকে দেখা যায়। এমন দুশমনের মোকাবেলা করা বেজায় কঠিন।
ইংরেজরা মরিয়া হয়ে সামরিক শক্তি বাড়ায়। বড় সেনাবাহিনী নিয়ে চলাচলের উপযুক্ত পথঘাট নেই। তাই বড় বাহিনী ভেঙে ছোট ছোট দল গঠন করা হয়। তাদেরকে উন্নত অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত করা হয়। সারা উত্তর বাঙলায় এবং মোমেনশাহী ও ঢাকা জেলায় তারা মজনু শাহ’র মুক্তিফৌজের সন্ধানে চিরুনী অভিযান শুরু করেন। (সুপ্রকাশ রায় : বাঙালী ফকীর বিদ্রোহ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম পৃ-৪৪-৪৫) ফকীর মজনু শাহ এ সব কিছুকে আদৌ তোয়াক্কা না করে সারা উত্তর বাঙলায় এবং মোমেনশাহী ও ঢাকায় ইংরেজদের কুঠি ও জমিদারদের কাচারীতে হামলা চালান। ফলে সব শ্রেণীর জালেমদের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
১৭৮৫ সালের মার্চ মাসে মজনু শাহ মস্তানগড়ে ছিলেন। তখন লে. ক্রোর নেতৃত্বে ইংরেজদের একটি সেনাদল সেখানে তার বিরুদ্ধে হামলা চালানোর চেষ্টা করে নিজেদের একটি লাশ পেছনে ফেলে দু’জন আহত সৈনিকসহ পিছু হটে। ১৭৮৬ সালে মজনু শাহ তার বাহিনীকে কৌশলগতভাবে দু’টি দলে ভাগ করে নতুনভাবে অভিযান শুরু করেন। মজনু শাহ একটি দল নিয়ে মোমেনশাহী জেলায় অভিযান চালান। আরেকটি দল মুসা শাহ’র নেতৃত্বে উত্তর বাঙলায় অভিযান চালান। মার্চ, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে মজনু শাহ বগুড়ায় ছিলেন।
১৭৮৬ সালের ১৭ আগস্ট তিনি বগুড়ার সেলবর্স থেকে বিশ মাইল দূরে লে. অ্যাঁশলীর সেনাদলের মোকাবেলা করেন। এর ক’মাস পর ২৯ ডিসেম্বর মজনু শাহ পাঁচশ লোক নিয়ে বগুড়া থেকে বের হন। লে. ব্রেনানের নেতৃত্বে একটি সেনাদল তাকে অনুসরণ করে। মজনু শাহ কালেস্বরে পৌছলে ব্রেনানের বাহিনী মজনু শাহ’র দলটিকে ঘিরে ফেলেন। মজনু শাহ ও তার সাথীগণ পরিস্থিতির নাজুকতা বুঝতে পেরে সাথে সাথে খোলা তলওয়ার হাতে ব্রেনানের সৈন্যদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। এভাবে তারা ব্রেনানের বাহিনীর ঘেরাও থেকে বের হয়ে আসেন।
এই স্বল্পস্থায়ী সংঘর্ষে মজনু শাহ’র বেশ ক’জন সাথী হতাহত হন। মজনু শাহ নিজেও যখম হন। লে. ব্রেনানের রিপোর্ট ও যামিনী মোহন ঘোষের বিবরণ থেকে এই ঘটনা সম্পর্কে যেটুকু জানা যায়, আহত মজনু শাহকে নিয়ে তার সাথীগণ রাজশাহী ও মালদহ পারি দিয়ে গঙ্গা নদী পার হয়ে বিহারের উত্তর সীমান্তে পৌছেন। মজনু শাহ অসুস্থ অবস্থায় আত্মগোপনে থাকেন।
মজনু শাহ যুদ্ধের যখম নিয়ে আত্মগোপনে থাকার সময় মুসা শাহ ১৭৮৭ সালের মার্চ মাসে রাজশাহীতে অভিযান চালান। নাটোরের রাণী ভবানীর বরকন্দাজ বাহিনী বাধা দিলে তাদের সাথে সংঘর্ষ হয়। মুসা শাহ’র লোকেরা রাণীর ক’জন বরকন্দাজকে বন্দী করেন। মুসা শাহ জালেম জমিদার ও নায়েব-গোমস্তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালান। ইংরেজদের সিপাহী ও জমিদারের লোক-লশকর মুসা শাহ’র ওপর হামলা চালায়। তখন গ্রামের লোকজন শাস্তির ভয় উপেক্ষা করে মুক্তিসংগ্রামীদের পক্ষ নেন। রাজশাহীর কালেক্টরের রিপোর্টসহ বিভিন্ন রিপোর্টে তা উঠে এসেছে।
মুসা শাহ এর পর ১৭৮৭ সালের মে মাসে দিনাজপুরে অভিযান চালান। ২৮ মে মুসা শাহ’র বাহিনী হঠাৎ লে. ক্রিস্টির নেতৃত্বাধীন কোম্পানির সেনাদলের হামলা শিকার হন। এখানেও গ্রামের মানুষ মুসা শাহ’র পক্ষ নেন। তারা মুসা শাহ’র বাহিনীর কিছু ফেলে যাওয়া জিনিসপত্র হেফাজত করে পরে মুক্তিফৌজের কাছে নিরাপদ স্থানে পৌছে দেন। দিনাজপুরের কালেক্টর তার রিপোর্টে মুক্তি সংগ্রামীদের প্রতি জনগণের এই স্বতস্ফূর্ত সমর্থনের কথা উদ্বেগের সাথে উল্লেখ করেন।
রাজশাহী ও দিনাজপুর মুসা শাহ’র এই দুই অভিযানের মাঝে ফকীর মজনু শাহ যুদ্ধের যখম নিয়ে আত্মগোপনরত অবস্থায় ১৭৮৭ সালের মার্চ অথবা মে মাসের মাঝে ইনতেকাল করেন। মজনু শাহ’র ইন্তেকালের (১৭৮৭) মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ শাসিত পূর্ব ভারতের বাঙলা ও বিহারে পলাশী উত্তর প্রথম আযাদী সংগ্রামের প্রায় সিকি শতকের (১৭৬৩-৮৭) একটি অত্যন্ত ঘটনাবহুল রক্তপিচ্ছিল অধ্যায় শেষ হয়।
যামিনীমোহন ঘোষের বিবরণ মতে মজনু শাহ মকানপুরে জিন্দাশাহ মাদারের দরগায় ইন্তেকাল করেন এবং তাকে মেওয়াটের এক বিখ্যাত গোরস্থানে দাফন করা হয়। তবে হায়দার আলী চৌধুরী দাবি করেন, রংপুরের ফুলচৌকৗতে মোগল শাহী খান্দানের একটি মসজিদের সামনে তাদের নিজস্ব কবরস্থানে মজনু শাহকে দাফন করা হয়। (হায়দার আলী চৌধুরী : পলাশী যুদ্ধোত্তর আযাদী সংগ্রামের পাদপীঠ, পৃ ৮১।)
মুসা শাহ চেরাগ শাহ সুবহানী শাহ’র সংগ্রাম
মজনু শাহ আহত হওয়ার কিছুদিন আগে কৌশলগত দিক থেকে তার মুক্তি বাহিনীর সদস্যদেরকে তিনি নিজেই দু’টি প্রধান অপারেশনাল কমান্ডের অধীনে ন্যস্ত করেন। মজনু শাহ নিজে একটি অঞ্চলের কমান্ডে থেকে আরেকটি অংশের দায়িত্ব দেন ঘনিষ্ঠ সহকর্মী মুসা শাহকে। ফলে মজনু শাহের ইনতেকালের পর মুসা শাহ কোন জটিলতা ছাড়া সহজেই এই আন্দোলনের নতুন নেতা হন। ১৭৮৭ সালে মজনু শাহ’র ইনতেকালের পর ১৮০০ সাল পর্যন্ত প্রায় দেড় দশক মুক্তিসংগ্রামে মিশন বাস্তবায়নে মজনু শাহ’র প্রধান সহকারী মুসা শাহ, চেরাগ আলী শাহ, ফেরাগুল শাহ, সুবহানী শাহ, করম শাহ, মাদার বখশ, জরিফ শাহ, রমযান শাহ ও রওশন শাহ প্রমূখ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তারা যেভাবে নেতৃত্বের শূণ্যতা পূর্ণ করেন তাতেও মজনু শাহ’র অসামান্য সংগঠন প্রতিভা এবং দূরদর্শী আদর্শিক নেতৃত্বের বিশেষত্ব প্রকাশ পায়। মজনু শাহ সেই সামাজিক-সাংস্কৃতিক-নৈতিক পটভূমিতে তার আন্দোলনকে শক্তিশালী আদর্শিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছিলেন বলেই তার অনুপস্থিতি নেতৃত্বের বড় কোন সংকট তৈরি করেনি।
১৭৮৭ সালের জুনে ফেরাগুল শাহ ও চেরাগ আলী শাহ তিনশ’ মুক্তিসংগ্রামী নিয়ে দিনাজপুরে অভিযান চালান। ইংরেজ ও তাদের সহযোগী জমিদারদের মাঝে অস্থিরতা তৈরি হয়। ইংরেজদের সামটিক হামলায় ফেরাগুল শাহ আহত হলে স্থানীয় গ্রামবাসীগণ তাকে গোপন আশ্রয়ে রেখে সেবা-শুশ্রুষা করেন এবং নিরাপদ জায়গায় পৌঁছে দেন বলে জেলা কালেক্টরের ২০ অক্টোবরের রিপোর্টে বলা হয়। ১৭৯০ সালের জানুয়ারিতে মুক্তিফৌজ মোমেনশাহীতে অভিযান চালান। তাদের হামলার মুখে ইংরেজ বণিকরা ঘরবাড়ী ও কুঠি ছেড়ে পালিয়ে যায়। রাজস্ব কাউন্সিলের ২০ জানুয়ারির এক বিবরণী থেকে এই তথ্য পাওয়া যায়।
১৭৯৩ সালের মার্চে মুক্তিফৌজ রাজশাহী জেলায় ইংরেজদের রাজস্ব ভান্ডার, বণিকদের কুঠি ও জমিদারদের কাচারিতে এবং মুসিদা পরগণায় জমিদার-মহাজনদের ওপর হামলার তথ্য থেকে তাদের সে সময়ের তৎপরতার খবর জানা যায়। এই বছরের শেষ দিকে সোবহান আলী শাহ’র বাহিনীর সহকারী অধিনায়ক রমজান শাহ ও জহুর শাহ তাদের বাহিনী নিয়ে পুর্ণিয়া, দিনাজপর ও মালদহ জেলায় সক্রিয় ছিলেন। তারা দিনাজপুর ও মালদহ জেলার জমিদার ও মহাজনদের উনিশ হাজার টাকা লুঠ করেন বলে কোম্পানির এক প্রতিবেদনে বলা হয়। সে সময় রাজশাহী ও রংপুর থেকে তেরো হাজার মুক্তিসংগ্রামী পুবদিকে অগ্রসর হন। পরে তারা তাদের গতি পরিবর্তন করেন।
১৭৯৪ সালের ৯ জানুয়ারি কোম্পানির গভর্ণর জেনারেলকে লেখা কুচবিহারের কমিশনারের চিঠি থেকে আসামে বিদ্রোহ দেখা দেয়ার খবর জানানো হয়। এ সময় ইংরেজদেরকে আসাম থেকে তাড়াতে ফকীর বাহিনীর সাথে ও সন্ন্যাসী দলের সদস্যরা মিলিত হয়ে চেরাগ আলী শাহ’র নেতৃত্বে কুচবিহার ও আসামে জড়ো হন। তাদের অপ্রত্যাশিত অভিযানে ইংরেজরা দিশেহারা হয়ে পড়ে। তারা সেনা দল পুনর্গঠন এবং উত্তর বাঙলা ও পুর্ণিয়ার মধ্যবর্তী নানা জায়গায় পাহারা চৌকি বসায়। এ সময়ে সন্যাসী দলের সদস্য মতিগীর চেরাগ আলী শাহকে নিহত করেন। মুক্তিসংগ্রামের এই নাজুক পরিস্থিতিতে মজনু শাহ’র তৈরি মুক্তিফৌজের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন ফকীর সোবহান আলী শাহ। তার নেতৃত্বে মুক্তিফৌজের সদস্যগণ অত্যন্ত দৃঢ়তা ও সংযমের সাথে পরিস্থিত মোকাবেলার চেষ্টা করেন।
এ সময় ইংরেজদের প্রশাসনিক কেন্দ্র কলকাতায় ওয়ারেন হেস্টিংসের জায়গায় নতুন গবর্ণর জেনারেল হয়ে এলেন কর্ণওয়ালিস। তিনি কোম্পানির রাজস্ব আয় বাড়ানোর জন্য এবং গ্রামবাঙলার জনবিদ্রোহের বিরুদ্ধে দেশীয় একটি শ্রেণীকে স্থায়ী ঢাল হিসাবে ব্যবহারের জন্য ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু করেন। এটি ছিল কর্ণওয়ালিসের সময়ের সবচে কুখ্যাত কীর্তি। এই ব্যবস্থার অধীনে ইংরেজদের প্রতি একান্ত আনুগত্যশীল, অতিশয় লোভী ও নিষ্ঠুর কিছু লোককে নতুন জমিদার হিসাবে বসানো হয়। এই লোকেরা অতীতে বাঙলা ও বিহারে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টির প্রধান কারিগড় হিসাবে ইংরেজদের জন্য এবং সেই সাথেও ‘মৃত্যুব্যবসায়ে’র মাধ্যমে দ্রুত কাড়িকাড়ি টাকা-কড়ি কামাইয়ের সুযোগ তৈরি করেছিলেন। তারা বাঙলা ও বিহারের প্রায় অর্ধেক মানুষ হত্যার মাধ্যমে কলকাতায় নতুন বিত্তশালী অভিজাত হিসাবে নাম লিখিয়েছিলেন। তাদের মধ্য থেকে কিছু লোককে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের অধীনে গ্রামবাঙলায় ইংরেজদের উৎপীড়নযন্ত্রের স্থায়ী অংশে পরিনত করার জন্য কৃষক-প্রজাদের জমির মালিকানা হরণ করে তাদেরকে সেসব জমির মালিক এবং কৃষক-প্রজাগণকে এই জমিদারদের ভূমিদাসে পরিণত করা হয়।
সে সময় থেকে গ্রামবাঙলায় আইন শৃংখলা রক্ষায় জমিদারদের পাইক-বরকন্দাজ ছাড়াও ‘দারোগা’ নামে প্রাতিষ্ঠানিক পদ সৃষ্টি করা হয়। ইংরেজ কোম্পানি এবং তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দমনের দায়িত্বও সেনাবাহিনী এবং দারোগার অধীন পুলিশ বাহিনীর ওপর ন্যাস্ত করা হয়। সারা দেশে ইংরেজ ও তার সহযোগীদের প্রতি জনগণের বিদ্রোহী মনোভাবের কারণে উপনিবেশিক সরকারের আতঙ্কের প্রকাশ ঘটে তাদের এই বেপরোয়া সিদ্ধান্তে। জনগণকে দমনের এই ব্যবস্থা বাঙলার গ্রাম সমাজের মূল ভিত্তিটাকেই পুরোপুরি গুড়িয়ে দেয়।
এই কঠোর দমন-নিপীড়নের এই নতুন চ্যালেঞ্জের মধ্যেও সোবহান আলী শাহ’র নেতৃত্বে মুক্তি সংগ্রামীগণ তাদের লড়াই অব্যাহত রাখেন। ফকীর সোবহান আলী শাহ বিহার ছাড়া বাঙলা ও নেপাল সীমান্তজুড়ে ইংরেজ সরকার ও তাদের দুঃশাসনের অংশীদার জমিদারদের বিরুদ্ধে অভিযান চালান। ১৭৯৬ সালের গোড়ার দিকে দিনাজপুর, মালদহ ও পূর্ণিয়া জেলায় অভিযানের সময় সোবহান আলী শাহ’র দুই সহ-অধিনায়ক জহুর শাহ ও মতিউল্লাহ গ্রেফতার হন। ইংরেজরা জহুর শাহকে আঠারো বছর এবং মতিউল্লাহকে দশ বছর কারাদন্ড দেয়। এই বিচার ও তল্লাশীর সময় মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপরতার অনেক গোপন তথ্য ইংরেজদের হাতে চলে যায়। সেই সুবাদে মালদহের কাছে পুচালীর জঙ্গলে একটি বড় অস্ত্রাগার ইংরেজরা দখল করে।
এর পর ১৭৯৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সোবহানী শাহ’র মুক্তিফৌজের নানা তৎপরতার পাশাপাশি আহমদ শাহ’র নেতৃত্বে দেশের আযাদী পুনরুদ্ধারের জন্য আরেকটি বাহিনী তৎপর ছিল বলে ইংরেজদের বিভিন্ন নথী থেকে জানা যায়। ১৭৯৮ সালে সোবহানী শাহ ও আহমদ শাহ’র দুই অভিন্ন লক্ষ্যে পরিচালিত বাহিনী এক হয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেয়। ইংরেজ বাহিনী তখনকার তাদের শক্তিশালী গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এই ঐক্যবদ্ধ বাহিনী সম্পর্কে খোঁজ পেয়ে হঠাৎ অভিযান চালায়। এই হামলায় আহমদ শাহ তার বেশ ক’জন সাথীসহ গ্রেফতার হন। সোবহান আলী শাহ এ সময় গ্রেফতারি এড়িয়ে আযাদী ও অধিকার পুনরুদ্ধারের লড়াই অব্যাহত রাখেন।
১৭৯৯ সালের ৪ মে ‘মহীশুরের বাঘ’ টীপু সুলতান বাঙলার গবর্ণর জেনারেল ওয়েলেসলীর বাহিনীর হামলা মোকাবেলায় জীবনপণ লড়াই চালিয়ে শহীদ হন। আর তখন উত্তর বাঙলার বিভিন্ন জেলায় সোবহানী শাহ মাত্র তিনশ’ সাথী নিয়ে ছোট ছোট অভিযান চালিয়ে ইংরেজদের অতিষ্ট করে তুলেছিলেন। তার অভিযান ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ওপর প্রচন্ড মানসিক চাপ ও অস্বস্তি তৈরি করেছিল। গবর্ণর জেনারেল ওয়েলেসলী সোবহান আলী শাহকে ‘ইংরেজ বিরোধী সংগ্রামের বহু দলের নায়ক’ হিসাবে চিহ্নিত করে তাকে জীবিত বা মৃত ধরে দেয়ার জন্য, কিংবা অন্তত তার খোঁজ দেয়ার জন্য চার হাজার মুদ্রা পুরস্কার ঘোষণা করেন।
১৭৯৯ সালের ৩১ অক্টোবরের আইন বিষয়ক বিবরণীতেও এই সময়ে সোবহান আলী শাহ’র নেতৃত্বে পরিচালিত বাঙলার মুক্তি সংগ্রামের সেই রক্তপিচ্ছিল অধ্যায় সম্পর্কে পূর্ণ তথ্য না হলেও অন্তত ইশারাটুকু পাওয়া যায়। এর পর ইংরেজদের নথিপত্রে সোবহান আলী শাহ’র কোনো উল্লেখ দেখা যায় না। তবে ১৮০০ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ও ৫ সেপ্টেম্বর দিনাজপুরের ম্যাজিস্ট্রেট গবর্ণর জেনারেলকে লেখা দু‘টি চিঠি থেকে সোবহান আলী শাহ’র ক’জন সহকর্মীর সক্রিয় থাকার কথা জানা যায়