আ. শ. ম. বাবর আলী

সাহিত্য তখনই সাধনার উপকরণ হয়, যখন তা সৃষ্টি হয় জাতি ও জনগণের কল্যাণে। আর তেমন সাহিত্য চর্চাকারী বিশেষায়িত হন সাহিত্য-সাধক বলে। উক্ত সংজ্ঞার প্রেক্ষিতে মনিরউদ্দীন ইউসুফ ছিলেন একজন সত্যিকারের সাহিত্য-সাধক। সাহিত্যিক হিসেবে আত্মপ্রকাশের মোহ নয়, সাহিত্যের মাধ্যমে জাতিকে সমৃদ্ধি দান ও জাতীয় কল্যাণ ছিল তাঁর সাহিত্যচর্চার মূল উদ্দেশ্য। আসল বা একমাত্র উদ্দেশ্যও বলা যেতে পারে। তাই তাঁর সাহিত্য-সাধনাকে তিনি সীমাবদ্ধতার গণ্ডিতে আবদ্ধ করে রাখেননি, সীমাকে অতিক্রম করে গেছেন দূর-দূরান্তরের ফসলিভূমিতে।

সে কথায় পরে আসা যাবে। তার আগে দেখা যাক, তাঁর রচিত সাহিত্যের শ্রেণিবিভাগ। যাকে তাঁর সাহিত্যের অঙ্গন অথবা বাতাবরণও বলা যেতে পারে। তাঁর সৃষ্ট সাহিত্যের বিভাজন বললে সংজ্ঞাটা সংকুচিত হয়ে যাবে। তাই তা না বলে বলা যেতে পারে, সাহিত্যের এমন কোনো উল্লেখযোগ্য শাখা নেই, যেখানে তাঁর সৃজনশীল হস্ত সাফল্য লাভ করেনি। তার বর্ণনা যাওয়ার পূর্বে তাঁর রচনার প্রধানতম দুটি বিভাজন উল্লেখ করা যেতে পারে।

এক. মৌলিক রচনা

দুই. বিদেশী সাহিত্যের অনুবাদ।

অবশ্য মৌলিক হোক আর অনুবাদই হোক, তাঁর সার্বিক রচনার উদ্দেশ্য ওই একই। জাতি ও জন-মানুষের কল্যাণ ও উন্নয়ন।

কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক, জীবনী, আত্মচরিতÑ সবই তিনি লিখেছেন। সবগুলোই তাঁর শক্তিশালী হাতে। কোনোটাই কম নয় কোনোটা থেকে।

মনিরউদ্দীন ইউসুফের পারিবারিক পরিবেশ ছিল মুসলিম ধর্মীয় সংস্কৃতি আশ্রিত। তাই ছোটবেলা থেকেই আরবি, ফার্সি আর উর্দুতে তিনি দক্ষতা অর্জন করেন। অপরদিকে নানার বাড়ির আধুনিক পরিবেশে শিক্ষিত হন বাংলা ও ইংরেজি ভাষায়। আর এভাবে উভয় পরিবেশ তাঁর গোটা জীবনকে উৎকর্ষতায় সমৃদ্ধ করে দেয়। তাঁর সাহিত্য উৎকর্ষতায়ও এটি একটি বিরাট সহায়ক হয়। অনেেেকর ক্ষেত্রে যা হয়, মনিরউদ্দীন ইউসুফের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। কবিতার মাধ্যমে তাঁর সাহিত্য-জীবন শুরু। আর তার ফলেই তাঁর প্রকাশিত প্রথম বই একটি কাব্যগ্রন্থ। ‘উপায়ন’ নামের এ কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ১৯৪১ সালে, যখন তঁর বয়স ২২ বছর। একেবারে টগবগে তরুণ। এরপর তাঁর মন চলে আসে গদ্য-সাহিত্যের দিকে। অবশ্য কবিতাকে একেবারেই বাদ দিয়ে নয়। ফাঁকে ফাঁকে বেরিয়েছে তাঁর আরও তিনটি কবিতার বই। ১৯৭৬ সালে ‘রাত্রি নয় কলাপী ময়ূর নয়’, ১৯৮৪ সালে ‘বেতস পাতা জলের ধারা’ এবং ১৯৮৮ সালে ‘এক ঝাঁক পায়রা’। কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা মাত্র তিনটি হলেও তা কাব্যগুণ আর কাব্যালঙ্কারে সম্পূর্ণ সমৃদ্ধ। এমন শক্তিমান কবি হয়েও মাত্র তিনটি কাব্যগ্রন্থ রচনা করেই কেন যে তিনি ক্ষান্ত দিয়েছিলেন, তা বিস্ময়কর বিষয়। হয়তো এমন হতে পারে, বিভিন্ন বাতায়ন মাধ্যমে সাহিত্যের প্রাসাদে তিনি সুবাতাসের অনুপ্রবেশ ঘটাতে চেয়েছিলেন। আর তা পাঠকের আগ্রহ এবং রুচিবোধের কথা চিন্তা করে। সাহিত্যের সর্বশাখার বৈচিত্র্য স্বাদের আগ্রহী পাঠকদেরকে তিনি তাঁর সৃষ্ট সাহিত্য-ভুবনে প্রবেশ করাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কবিতার নেশা তাঁকে ছাড়েনি। মাঝে মাঝে কিছু কিছু কবিতা তিনি লিখেছিলেন। কিন্তু গ্রন্থাকারে পরবর্তীতে তা প্রকাশের আগ্রহ দেখাননি।

তিনটি উপন্যাস লিখেছেন তিনি। ‘ঝড়ের রাতের শেষে’ (১৯৬২), ‘পনসের কাঁটা’ (১৯৮১) এবং ‘ওর বয়স যখন এগারো’ (১৯৮৫)। একটি নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের কাহিনি নিয়ে রচিত ‘ঝড়ের রাতের শেষে’ উপন্যাসটি। গ্রামবাংলার হিন্দু ও মুসলিম পরিবারের সম্প্রীতিবন্ধনে বসবাসের চিত্র ‘পনসের কাঁটা’ উপন্যাসের উপজীব্য বিষয়। বাঙালিদের স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে এ উপন্যাসে। সমাজপ্রেম,মানবপ্রেম ও দেশপ্রেম উপাদানে সমৃদ্ধ এ উপন্যাস। এর কাহিনি বর্ণনা করা হয়েছে সাধু ভাষায় অতি নিখুঁত ও শৈল্পিক সে বর্ণনা। ‘ওর বয়স যখন এগারো’ উপন্যাসটি ‘পনসের কাঁটা’ উপন্যাসের বিস্তৃত রূপ বলে মনে হয়। অর্থাৎ ‘পনসের কাঁটা’র কাহিনি শেষ হয়েছে আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের সর্বশেষ ধাপে যেয়ে। আর ‘ওর বয়স যখন এগারো’র কাহিনি আরম্ভ হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকে। অবশ্য পৃথকভাবে পড়লে দুটি উপন্যাসেরই পৃথক স্বাদ পাওয়া যায়। মনিরউদ্দীন ইউসুফের ‘পনসের কাঁটা’ এবং ‘ওর বয়স যখন এগারো’ উপন্যাস দুটিকে সামগ্রিকভাবে আমাদের স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা, তথা মহান মুক্তিযুদ্ধের দলিল হিসেবেও চিহ্নিত করা যেতে পারে। আলোচ্য কাহিনিকে প্রবন্ধাকারে লিখলে তা-ই হতো। কথাটাকে ঘুরিয়ে এ ভাবে বলা যায়, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের দলিলকে মনিরউদ্দীন ইউসুফ অতি কৃতিত্বের সাথে উপন্যাসের আঙ্গিকে উপস্থাপন করেছেন।

মনিরউদ্দীন ইউসুফের তিনটি উপন্যাসই দেশপ্রেম ও সমাজভাবনায় সমৃদ্ধ। কাহিনির বর্ণনা সাবলীল ও হৃদয়গ্রাহী। উপন্যাসের শৈল্পিক গুণও সর্বত্র বিদ্যমান।

বিবিধ বিষয় নিয়ে তাঁর রচিত প্রবন্ধগ্রন্থের সংখ্যা নয়। গ্রন্থ সমূহের নামকরণেই বিষয়বস্তু পরিজ্ঞাত। যেমনÑ ‘আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি’। এটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৭৮ সালে। এরপর যথাক্রমে ১৯৮৩ ও ১৯৯৩ সালে দুটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়। ‘কারবালা একটি সামাজিক ঘূর্ণাবর্ত’ প্রবন্ধগ্রন্থটির প্রথম প্রকাশকাল ১৯৭৯ সাল। দ্বিতীয় প্রকাশ ১৯৯১সালে। ‘বাংলা সাহিত্যে সুফী প্রভাব’ গ্রন্থটি দু’বার প্রকাশিত হয়। ১৯৬৯ সালে ও ২০০১ সালে। ‘উর্দু সাহিত্যের ইতিহাস’ গ্রন্থটির প্রকাশকাল ১৯৬৮সাল। ১৯৮০ সালে প্রকাশিত হয় ‘সংস্কৃতি চর্চা’ শীর্ষক প্রবন্ধগ্রন্থটি। ‘রুমীর মসনবী’ গ্রন্থটি প্রকাশিত হয় তিন সংস্করণে। প্রথম ১৯৬৬, দ্বিতীয় ২০০১ এবং তৃতীয় ২০০৪ সালে। মনিরউদ্দীন ইউসুফ রচিত একটি রাষ্ট্রীয় ভাবনামূলক গ্রন্থ ‘বাংলাদেশের সার্বিক অগ্রগতির লক্ষ্যে একটি প্রস্তাব’। এর প্রকাশকাল ১৯৮৪। সাহিত্যালোচনা মূলক একটি প্রবন্ধগ্রন্থ ‘নবমূল্যায়নে রবীন্দ্রনাথ’। এটি প্রকাশিত হয় ১৯৮৯ সালে। সর্বশেষ প্রকাশিত আমাদের জাতীয় কৃষ্টি ও ঐতিহ্যমূলক প্রবন্ধগ্রন্থ ‘আত্মপরিচয় ঐতিহ্যের আলোকে’। প্রকাশকাল ২০০৩।

লক্ষ্য করলে দেখা যায়, দেশ ও সমাজকে নিয়ে এক অতি উন্নত চিন্তাধারার অধিকারী ছিলেন তিনি। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর সেই চিন্তাধারারই প্রতিফলন ঘটেছে তাঁর লেখা গ্রন্থগুলোতে। গুরুগম্ভীর নয়, অতি সহজ-সরল ভাষাতেই এ সব প্রবন্ধ রচনা করেছেন তিনি। অতি অল্প মেধার পাঠকেরও তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। প্রবন্ধ-সাহিত্যে এ তাঁর এক অনন্য কৃতিত্ব।

‘ঈসা খাঁ’ নামে একখানা ঐতিহাসিক নাটক তিনি লিখেছিলেন। এটি তাঁর লেখা একমাত্র নাটক হলেও নাটকটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। যার ফলে ১৯৬৮ সালে নাটকটি প্রথম প্রকাশিত হলেও আরও তিনবার এটি পুনর্মুদ্রিত হয় যথাক্রমে ১৯৮০, ১৯৯৭ এবং ২০০৩ সালে। সফল নাটকের সকল নাট্যগুণ এ নাটকে আছে। তাই একজন সফল নাট্যকার হিসেবেও এ নাটকে মনিরউদ্দীন ইউসুফ নিজকে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন।

মহামনীষীগণ সর্বমানুষের আদর্শ। কল্যাণকর সাফল্যময় জীবন গঠনের নির্ভুল পথপ্রদর্শক। এই পরম সত্যটাকে নিজের মধ্যে ধারণ করে মনিরউদ্দীন ইউসুফ রচনা করেন বেশ কিছু জীবনীগ্রন্থ। সেগুলো হচ্ছেÑ ‘হযরত ফাতেমা’ (১৯৬৪), ‘হযরত আয়েশা’ (১৯৬৮) ও ইসলাম ও মুহম্মদ (সা.)’ (২০০৮)। শিশু-কিশোরদের জন্যও কয়েকটি জীবনীগ্রন্থ তিনি রচনা করেন। সবগুলোই শিশু-কিশোরদের মধ্যে সমাদৃত ও জনপ্রিয় হয়। যার ফলে এ ধরনের প্রতিটি গ্রন্থ পুনর্মুদ্রিত হয়। ‘মহাকবি ফেরদৌসী’ গ্রন্থটি মুদ্রিত হয় চারবার।১৯৮৮, ১৯৯৭, ২০০১ এবং ২০০৫ সালে। ‘ছোটদের রসূল চরিত’ গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯৩ সালে। ২০০১ সালে এটি পুনর্মুদ্রিত হয়। শিশু-কিশোরদের জন্য এ ছাড়া আরও দু’টি গ্রন্থের নাম ‘‘ছোটদের ইসলাম পরিচয়’ ও ‘‘চলো যাই ছড়ার দেশে’ (২০০৩)। প্রথমটি মুদ্রিত হয় চারবারÑ ১৯৮৬, ১৯৯৭, ২০০১ ও ২০০৫ সালে। শিশু-কিশোরদের জন্য রচিত গ্রন্থগুলোতে তাঁর শিশু-কিশোর মনস্তাত্ত্বিক প্রজ্ঞার পরিচয় মেলে। শিশু-কিশোরদের উপযোগী করে সুন্দর সহজবোধ্য ভাষার গাঁথুনিতে এ সব গ্রন্থ তিনি রচনা করেছেন। নিজকে প্রমাণিত করেছেন একজন সফল শিশুসাহিত্যিক হিসেবে।

কর্মময় জীবনের আত্মকথা অন্যের সাফল্যময় জীবন গঠনে সহায়ক। জীবনে যাঁরা কোনো না কোনো ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিতি লাভ করেছেন, তাঁদের জীবনকাহিনি যে কোনো জীবনপ্রতিষ্ঠাকামী ব্যক্তির কাছে সাগ্রহে গ্রহণীয়। মনিরউদ্দীন ইউসুফের লেখা ‘আমার জীবন আমার অভিজ্ঞতা’ আত্মজীবনী মূলক গ্রন্থটি তাই আমাদের কাছে প্রিয়তর এক পথ প্রদর্শক। বিশেষ করে স্বদেশ, সমাজ ও মানুষকে ভালোবাসার এক সুন্দরতম সহায়ক। গ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ১৯৯২ সালে।

মনিরউদ্দীন ইউসুফের সাহিত্য-জীবনের যে সর্বশ্রেষ্ঠ খ্যাতি, তা তাঁর অনুবাদকর্মে। ইংরেজি ছাড়াও আরবি, ফার্সি ও উর্দু ভাষাতে তাঁর বিশেষ দক্ষতা ছিল। ্ওইসব ভাষার শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকে বাংলায় অনুবাদ করে বাংলা সাহিত্যকে তিনি পরম সমৃদ্ধতা দান করেন।

উর্দু সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবি ইকবাল। মহাকবি ইকবাল নামে যে দার্শনিক কবি বিশ্বপরিচিত। তাঁর শ্রেষ্ঠ কবিতা সমূহ মনিরউদ্দীন ইউসুফ বাংলায় অনুবাদ করেন ‘ইকবালের কাব্য সঞ্চায়ন’ নাম দিয়ে। গ্রন্থটি বাঙালি পাঠকদের মাঝে ব্যাপক সাড়া তুলে দেয়। এত বেশি জনপ্রিয়তা লাভ করে যে, গ্রন্থটির বেশ কয়েকটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়। প্রথম মুদ্রিত ১৯৬০ সালে। এরপর যথাক্রমে ১৯৬৮, ১৯৮২, ১৯৮৮, ১৯৯৫ ও ২০০৯ সালে। গ্রন্থটির এত বেশি পাঠকপ্রিয়তার কারণ ইকবালের রচনা ছাড়াও মনিরউদ্দীন ইউসুফের সার্থক অনুবাদ।

আর একজন উর্দু কবি মীর্জা গালিবের কিছু গজল অনুবাদ করে গ্রন্থের নাম দেন ‘দীওয়ান-ই গালিব’। মূল গজলের অনুবাদে মূল ঢং ঠিক রেখেই বাংলায় তার রূপান্তর করেছেন। অথচ বাংলা গজলের বৈশিষ্ট্য থেকে সামান্যতম বিচ্ছিন্ন হয়নি সেগুলো। এর আগে তিনি বাংলা গজল লিখতেন। তাই এমন সুন্দর রূপান্তর তাঁর পক্ষে অনায়াসসাধ্য হয়েছে। গ্রন্থটির প্রকাশকাল ১৯৬৫। এরপর ১৯৮০, ১৯৮৬, ২০০৫ এবং ২০০৮ সালে এটি মুনর্মুদ্রিত হয়। বাঙালি কবি সৈয়দ নিজামুদ্দীন রাগিব রচিত উর্দু ও ফার্সি গজলের সুন্দর বাংলা অনুবাদ করেছেন মনিরউদ্দীন ইউসুফ ‘কালামে রাগিব’ নামে। এমনিভাবে সৈয়দ নিজামদ্দীন রাগিবকে তিনিই পরিচিতি করিয়েছেন বাঙালি পাঠক সমাজে। এ গ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ১৯৬৬ সালে।

মীর্জা গালিবের অনেকগুলো বিখ্যাত কবিতা বাংলায় অনুবাদ করে তা গ্রন্থাকারে প্রকাশ করে নাম দেন ‘গালিবের কবিতা’। বিষয়বস্তুর সাথে সুন্দর ছন্দবদ্ধ বাংলা অনুবাদ পাঠককে মুগ্ধ করে। ২০০২ সালে কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয়।

ফার্সি কবি হাফিজের কিছু সংখ্যক অতি জনপ্রিয় গজলের বঙ্গানুবাদ করেন তিনি ‘হাফেজের গজল’ গ্রন্থনাম দিয়ে। বলা যেতে পারে, এ গ্রন্থটির মাধ্যমেই ফার্সি কবি হাফিজের গজলকে তিনি বাংলাভাষী কাছে জনপ্রিয়তা দান করেন।

মরিউদ্দীন ইউসুফের সর্বশ্রেষ্ঠ অনুবাদকর্ম ফার্সি কবি ফেরদৌসীর জগদ্বিখ্যাত মহাকাব্য ‘শাহনামা’র বাংলা অনুবাদ। বীররসের এ মহাগ্রন্থটি তিনি গদ্যে অনুবাদ করলেও এর প্রতিটি বাক্যে কাব্যিক ব্যঞ্জনা, কাব্যিক ছন্দ বিদ্যমান। মনিরউদ্দীন ইউসুফ যে একই সাথে একজন দক্ষ গদ্যও কাব্যশিল্পী, তাঁর অনুদিত রচনা ‘ফেরদৌসীর শাহনামা’ গ্রন্থটি তার প্রমাণ। মোট ৬টি খণ্ডে গ্রন্থটি অনুদিত হলেও মাত্র ২টি খণ্ড তিনি তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশ করে যেতে পেরেছিলেন। ১ম খণ্ড ১৯৭৭ সালে এবং ২য় খণ্ড ১৯৭৬ সালে। বাকি ৪টি খণ্ডসহ মোট ৬ খণ্ডের সেট ‘ফেরদৌসীর শাহনামা’ নামে বাংলা একাডেমি প্রকাশ করে ১৯৯১ সালে। আর যা-ই হোক, তাঁর অন্যসব রচনাকে বাদ দিলেও এই একটিমাত্র অনুবাদগ্রন্থের জন্য বাংলাসাহিত্যে তিনি অমর হয়ে থাকবেন।

‘জনপ্রশাসনের বিভিন্ন দিক’ নামে একখানি গ্রন্থ ইংরেজি থেকে তিনি বাংলায় অনুবাদ করেন। এর প্রকাশকাল ছিল ১৯৬৩ সাল।

সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি অনেকগুলো পুরস্কার পেয়েছিলেন। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম গভর্নর স্বর্ণপদক (১৯৬৬), হাবিব ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬৮), বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬৮), আবুল মনসুর আহমদ সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৫) ইত্যাদি। এ ছাড়াও মরণোত্তর একুশে পদক পান ১৯৯৩ সালে। অর্ধাৎ এ দেশের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্মানীয় সাহিত্য পুরস্কারের সবগুলোই অর্জন করেছেন তিনি।

যে কথা দিয়ে লেখাটা শুরু করেছিলাম। সাহিত্য সাধনা ও সাহিত্য সাধক। মনিরউদ্দীন ইউসুফ ইতিহাসের এমন উপকরণ সমূহ নিয়ে সাহিত্যচর্চা করেছেন, যা সমৃদ্ধ করেছে আমাদের বাংলা সাহিত্যকে। মননে ও চিত্তে সম্পদশালী করেছে এ দেশের সুধী সমাজকে। আমাদের সাহিত্যকে সমৃদ্ধতর করার জন্য নিজে যেমন সুশীল সাহিত্যের চর্চা করেছেন, সাথে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সাহিত্য থেকে রসদ আমদানি করে আমাদেরকে প্রাচুর্যময় করেছেন। এ সব করতে তাঁকে অনেক সাধনা করতে হয়েছে। মননশীলতার সাধনা, কৃষ্টির সাধনা, ঐতিহ্যের সাধনাÑ যার উৎস তাঁর মননশীল সাহিত্যের সাধনা।

তাই সার্বিক সংজ্ঞায় তিনি একজন প্রজ্ঞাশীল সাহিত্য-সাধক তো বটেই।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও ছড়াকার