ফিলিস্তিনের সত্য কাহিনি অবলম্বনে

জসীম উদ্দীন মুহম্মদ

০১

নূর একদম চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। তার বয়স মাত্র আট। কিন্তু চোখে এমন এক দৃষ্টি, যা দেখে মনে হয় সে পৃথিবীর সমস্ত বেদনা বুঝে ফেলেছে। গায়ে মলিন একটি শার্ট। পায়ে জুতো নেই। কনুইয়ের কাছটা কাটা। সে জানে, এই ক্ষত সে কখনোই ভালো করতে পারবে না। কারণ এখানে সবকিছুই একদিন না একদিন ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যায়। আজকের দিনটা অন্যরকম। সকাল থেকেই তার মনে হচ্ছিল, কিছু একটা বদলে যাবে। তবে কী হবে সেটা সে জানত না। মায়ের হাত ধরে স্কুলে যাচ্ছিল। রাস্তার পাশ দিয়ে ছোট ছোট দোকানগুলোতে বিক্রি হতে থাকা কুকিজ ও চিপসগুলো তাকে আকর্ষণ করছিল। কিন্তু তার মন ছিল অন্যখানে। ফিলিস্তিনের আকাশের দিকে। যেখান থেকে দানবের মতো যুদ্ধবিমান উড়ে আসে। মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু পুড়ে ছারখার করে দিয়ে যায়। ক্ষত বিক্ষত, ছিন্নভিন্ন লাশ যেখানে সেখানে পড়ে থাকে। তার মায়ের মুখে উদ্বেগের রেখা। চোখে ভিন্ন ধরনের চাহনি। এক সমুদ্র শূন্যতা। যা জীবনের যন্ত্রণা ছাড়া আর কিছু নয়। কিন্তু নূর জানে, মা কখনো তাকে ভয় দেখায় না। মা বলে, “সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে। তুমি শুধু জীবনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আনন্দগুলোকে আঁকড়ে ধরো।”

আজও তারা হাঁটছে। কিন্তু তাদের পথ অন্তহীন ভয়ঙ্কর। বিকেলের দিকে শহরের পাশে পরপর অনেকগুলো বোমা বিস্ফোরিত হয়েছে। তারপর শুরু হয় প্রচণ্ড গুলী। মা তাকে দ্রুত হাত ধরে টেনে নেয়। নূর ভাবছিল, এটা আবার কেন হলো? কেন গুলী আর বোমার শব্দ শুনতে শুনতে তাদের দিনগুলি শেষ হয়ে যাবে? রাতগুলো নির্ঘুম কেটে যাবে। তাদের দেখে পথে একটি পুরানো গাড়ি থামে। একজন সিনিয়র বন্ধু ফিরদাউস ভাই। তাকে হেসে বলেছিল, “নূর, সাহস রাখো। একদিন সবকিছু বদলে যাবে।” তার মা যেভাবে বলেন, তিনিও ঠিক একইভাবে বলেন। কিন্তু নূরের মনে কিছু একটা কাঁটার মত বিঁধে আছে। যা গিলতেও পারছে না; উগড়াতেও পারছে না। সবাই বলে, “সব কিছু বদলাবে, কিন্তু কখন?”

হাঁটতে হাঁটতে এখন তারা বাড়ির কাছাকাছি চলে এসেছে। ছাদে দাঁড়িয়ে আছেন তার বাবা। আব্দুল ফাত্তাহ। তিনি তখনও রেডিওতে খবর শুনছেন। মা তাকে মৃদু ভাষায় বললেন, “চলো, ঘরে যাই।” কিন্তু নূর জানতো, তিনি আজ আর ঘরে ফিরে যাবেন না। যুদ্ধের ছায়া এত কাছে চলে এসেছে যে, আর কাউকে নিয়ে আশা করা যাবে না। যুদ্ধের মধ্যে থেকেই তাদের লক্ষ লক্ষ স্বপ্নেরা একে একে মুছে যাবে!

০২

নূর আর তার মা বাড়ির দিকে চলতে চলতে এক মুহূর্তের জন্য থেমে যায়। গুলীর শব্দ ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে। সে জানে, এসব শব্দ কেবল সবার মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি করবে। কিন্তু সবার অন্তরে যুদ্ধের বাস্তবতা সয়ে যাবে। তার হৃদয়েও। সেও যেন সেই বাস্তবতাকে কিছুটা মানিয়ে নিতে শুরু করেছে। এক সময়ের যুদ্ধ উন্মাদনা এখন আর তেমন ভয় পাইয়ে দেয় না। যুদ্ধ শিখিয়েছে, ভয় নিজেও এক ধরনের শক্তি। নুর মায়ের হাত শক্ত করে ধরে। কোনো অজানা ভয় বা বিপদ যেন তাকে কেড়ে নিতে না পারে।

তাদের বাড়ি ছিল শহরের একেবারে শেষ প্রান্তে। আর সেখানে আছে একটুকরো জমি। যেখানে তার বাবা কাজ করতেন। সে জমির কোণে কিছুটা সবজি ও ফল তুলে পরিবার চলতো। কিন্তু এখন সেই সজীব পৃথিবীও মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। গত সপ্তাহের বোমাবর্ষণে পুরো জমি একেবারে ধ্বংস।। এখন তাদের খাবার নেই। যুদ্ধের সেই যন্ত্রণা মেনে চলা শুধু কঠিন নয়; ভয়ংকর কঠিন। অবশেষে তারা বাড়িতে ফিরে এসেছে। বাবা এখন আর বাসায় নেই। কোথায় গেছেন কেউ জানে না। মায়ের মুখে অস্বস্তির ছাপ। গভীর চিন্তারেখা। তাকে আর কখনো এমনভাবে অস্থির হতে দেখেনি নূর।

নূর জানত, আজ রাতে খেতে অনেক দেরি হবে। কারণ মা সবকিছু আগের মতো করতে পারবেন না। এখন তার কাছে শুধুমাত্র একটাই দায়িত্ব ছিল ঘরের ভিতরে থেকে সুরক্ষা পাওয়া। যদিও সে জানে, যুদ্ধের মধ্যে কোথাও কোনো নিরাপত্তা নেই। ফিলিস্তিনের একইঞ্চি জায়গাও এখন আর নিরাপদ নয়।

শহরের বাইরে থেকে যেসব উঁচু ধ্বংসস্তূপ দেখা যায়, সেই জায়গাগুলো আজ তার কাছে আরও বাস্তব মনে হচ্ছে। বাইরে বাচ্চাদের কান্না আর হাসির শব্দ। নূরের চোখে অদ্ভুত এক কষ্ট জেগে ওঠে। তারা খেলছে। খেলার মাঝে হাসছে। কাঁদছে। নুরের মধ্যে কিছু পরিবর্তন হয়েছে। পৃথিবীটাকে সে এখন নতুনভাবে অনুভব করছে এটা আর তার পুরানো পৃথিবী নয়। বাবা এসে বললেন, “এখন ঘুমাও যে কোনো সময় যে কোনো কিছুই হতে পারে।” তবে তার বাবা জানেন, যে কোনো সময় তাদের দরজায় রক্তাক্ত যুদ্ধ এসে পৌঁছাতে পারে। নূর কেমন করে ঘুমাবে? হয়তো আজ রাতে তাদের বাঁচার কোনো নিশ্চিত পথ থাকবে না।

তার মা সবসময়ই বলেন, “সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। একটা দিনও বাকি থাকতে পারে, তবে আশা কখনো ফুরাবে না।” নূর মনে মনে ভাবতে থাকে, যেন সে জানে যুদ্ধের যে বিশাল ছায়া; তাতে সবকিছুই হারাতে পারে, তবে আশাটা সঙ্গী থাকবে। হঠাৎ ঘর অন্ধকার হয়ে এলো।

০৩

রাতটা থেমে থেমে বোমার শব্দে কেঁপে উঠছে। নূর তার বিছানায় লুকিয়ে আছে। কিন্তু শব্দগুলো তাকে ঘুমোতে দিচ্ছে না। মায়ের কোলই তার সঙ্গী। কিন্তু এখানেও নিরাপত্তা নেই। বাবা ঘরে ফিরে এসে ফ্লোরে বসে পড়েন। তাঁর মুখে কোনো আলো ছিল না। একজন চরম হতাশাগ্রস্ত মানুষ। দিনভর কাজ করতে গিয়ে প্রতিটি মুহূর্তে তিনি আড়ালে আড়ালে একেবারে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছেন। “আমরা কীভাবে বাঁচব, বাবা?” নূর জিজ্ঞেস করল। কিন্তু তার বাবা এমনভাবে তাকালেন, যেন কোনো উত্তর নেই। মা সেদিনই বলেছিলেন, “যুদ্ধে যুদ্ধের শিকার হতে হয়, কিন্তু তোমরা যদি একে অপরকে ভালোবাসো, তবে যে কোনো বাধা অতিক্রম করা যাবে।” নূর জানত, এ কথা তার মা শুধুমাত্র শান্তির জন্য বলেছিলেন। আসল সত্যটা কি ছিল? কীভাবে সুরক্ষা পাওয়া যায় যখন প্রতিটি পা যেন মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলে?

নূরের এখন আর কোনো দুশ্চিন্তা নেই। তার চোখে সেদিন থেকে সবকিছু যেন ধুয়ে মুছে গেছে। একটাই চিন্তা ছিল কীভাবে তাদের এই দুঃখের দিনগুলো শেষ হবে? কীভাবে সে আবার তার পুরনো পৃথিবীকে ফিরে পাবে। যেখানে তাকে খেলা করতে দেওয়া হতো। যেখানে সুখের ছোট ছোট মুহূর্তগুলোকে সম্মান জানানো হতো! ঠিক সেই মুহূর্তে তার দরজায় একটা অদ্ভুত শব্দ ভেসে আসে। শব্দটা জানালা ভাঙার, ধ্বংসের, অন্ধকারের। পুরো শহরটা যেন একটা বিপদগ্রস্ত বস্তু হয়ে উঠেছে। আবার সেই যুদ্ধ আগমনের আভাস। কিছু সময় পরে গুলীর বিকট শব্দ শোনা যায়। এমন শব্দ যেন পৃথিবীটা টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে।

নূর জানে, এই ঘরই একদিন ছিল তার একমাত্র নিরাপত্তার চাদর। কিন্তু সেই নিরাপত্তা এখন আর কোনো ভরসা হতে পারছে না। তার মা, বাবা, আর সে তিনজন একে অপরকে আঁকড়ে ধরে। তারা বুঝতে পারছে না, এই এক মুহূর্তের পরিণতি কী হবে। গুলী, বোমা, আর ধ্বংসের মধ্যে জীবন কিভাবে চলবে? এটা এখন কেবলই একটা প্রশ্ন; যে প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই!

পরদিন সকালে শহরের মাঝখানে চলমান একটি ছোট্ট শিশুর কাফেলা। ভয়ার্ত চোখে একে একে তাদের বাড়ি পাড়ি দিচ্ছে। নুরের চোখের সামনে শিশুরা পালিয়ে যাচ্ছে। যেমন নূর পালিয়ে যাচ্ছে। যদিও জানে, যেদিকে যাচ্ছে সেদিকেও কোনো নিরাপত্তা নেই। নুর মাকে জিজ্ঞেস করল, মা, আমরা কোথায় যাবো? কিন্তু মা তাকে চুপ করে ঘরের মাঝখানে বসিয়ে রাখল। কোনো জবাব দিল না।

০৪

আজকের দিনটা একেবারে আলাদা। মাটি থেকে আকাশ পর্যন্ত সবকিছু যেন এক সুনসান মৌনতায় ডুবে আছে। শহরের রাস্তায় যে কোলাহল ছিল, সেটা আর নেই। কোথাও কোনো মানুষের শব্দ শোনা যাচ্ছে না। শুধু একপেশে বাতাসে আর ধ্বংসস্তূপ। সকাল থেকেই তার মায়ের চোখে নতুন ধরনের এক অস্থিরতা। বাবা ঘর থেকে বেরিয়ে গেছেন। বলে গেছেন, কাজ করতে যাচ্ছেন। তবে আজ আর সেটা আগের মতো হবে না। যুদ্ধ আজ তাদের সকলের জীবনে এক নতুন বাস্তবতা নিয়ে এসেছে। ।

নূর জানে, তাদের বাড়ির বাইরে এখন আর কোনো নিরাপত্তা নেই। অস্বস্তি, ভয় আর একে অপরের জন্য উদ্বেগই ছিল জীবনের নতুন রূপ। কিন্তু তার মায়ের মুখে একটা তীব্র দৃঢ়তা ছিল, যা নূরকে সাহস দিত। কিন্তু এখন সেই মায়ের চোখেও এখন অন্ধকার। মা বলেন, “এটা শুধুমাত্র আরেকটি মুহূর্ত। আমরা সবাই একসাথে আছি, এইটুকুই যথেষ্ট।” কিন্তু নূর জানে, তার মা নিজেও এ কথা বিশ্বাস করতে পারছিল না। যুদ্ধে মা-বাবা যেমন সবার মাঝে শক্তি হয়ে দাঁড়ান, তারাও নিজেদের মাঝে সেই শক্তির খোঁজে থাকে। সেদিন নূর তার মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, “মা, আমরা কী কখনও বাড়ি ফিরে যাবো?”

মা চুপ ছিল। তিনি কোনো উত্তর দেননি। তবে তার হাত নুর কে আরও শক্ত করে ধরে রাখে। ওই মুহূর্তে, নূরের মনে হয়েছিল, তার মা কিছু একটা বলতে চায়। কিন্তু কোনো শব্দই যেন তার পক্ষে বেরোতে পারছিল না।

তাদের পাড়ায় কিছু নতুন পরিস্থিতি শুরু হয়েছে। শহরের মধ্যে ঘুরতে থাকা একদল অচেনা মানুষ। যারা সহায়তা নিয়ে আসছিল। কিছু খাদ্য, পানি, ও সামান্য কিছু ওষুধ নিয়ে তারা সাহায্য করতে এসেছিল। তবে যুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যে এসবের প্রভাব খুবই ক্ষীণ। তাদের কষ্ট কমানোর মতো কিছু ছিল না। নূরের মনে হচ্ছিল, মানুষ যতই সহানুভূতি দেখাক না কেন, এই বিশাল দুর্দশার মধ্যে আসলে কিছুই করা সম্ভব নয়।

হঠাৎ করে তাদের দরজায় একটি চিঠি এসে আসে। মায়ের চোখে এক ঝলক উদ্বেগ। এটি কোনো সরকারি চিঠি না। বরং কারো কাছ থেকে সাহায্য পৌঁছানোর একটি প্রস্তাব। চিঠি হাতে নিয়ে মা একটু চিন্তায় পড়ে গেলেন। এরপর চিঠির শব্দগুলো নূরকে যেন আবার সত্যিকার যুদ্ধের দৃশ্যের সামনে নিয়ে চলে গেল। চিঠিতে বলা হয়েছে, “যত দ্রুত সম্ভব শহরটির কাছে নিকটবর্তী একটি আশ্রয় শিবিরে পৌঁছাতে হবে। যে কোনো মুহূর্তে এখানে হামলা হবে।”

নূর জানে, এবার তাদের আর ঘরে থাকা সম্ভব হবে না। মা চিঠিটি পড়ে থেমে গিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত নূর মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমরা যাবো, তাই না মা?” মা এক টুকরো হাসি দিয়ে বললেন, “হ্যাঁ, আমাদের যেতে হবে। যেখানে জীবন, সেখানে আশা।”

এরপর তারা দুইজন একে অপরকে শক্ত করে ধরে, নিঃশব্দে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে আসল। যুদ্ধের বিপর্যয়ে একে অপরকে খুঁজে বের করার গল্প যেন শুরু হলো। এটি ছিল শুধু এক নতুন পথের শুরুর মুহূর্ত।

০৫

পথে বেরিয়ে আসার পর নূর বুঝতে পারছিল না, তারা কোথায় যাচ্ছে। মা তাকে দ্রুত হাঁটতে বলছিলেন ।কিন্তু পথটা একদম অচেনা ছিল। রাস্তার দুপাশে ভাঙা বাড়ি, ধ্বংসস্তূপ আর পোড়া গাড়ির চিহ্ন ছাড়া কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। একসময় শহরের সেই চিরচেনা দৃশ্য আর নেই। শহরটা কি আর কখনো তার পূর্বের চেহারায় ফিরবে না?

পথে চলতে চলতে কিছু শিশুরা তাদের পাশ দিয়ে দৌড়াচ্ছিল, কিন্তু তাদের মুখে কোনো হাসি নেই। চোখে এক ধরনের শূন্যতা আর ক্লান্তি। যা অন্যদের চাইতে অনেক গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারছিল নূর। সে জানত, তারা সবাই এখানে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু তাদের কাছে কোন গন্তব্য নেই। তার মতো শিশুরাও, শুধু বেঁচে থাকার জন্য যুদ্ধের কাঁটায় ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যাচ্ছে।

মা মাঝে মাঝে থেমে গিয়ে দেখছিলেন যেন কোনো মানুষ, কোনো সাহায্য, কিছুই আর তাদের কাছে নেই। হঠাৎ একপাশে দৃষ্টি গেল। একটা ছোট্ট দোকানে কিছু খাবার এবং পানির বোতল। দোকানটাতে একজন বৃদ্ধ লোক দাঁড়িয়ে ছিল। তার মুখ গম্ভীর। কিন্তু সেই বৃদ্ধ লোক তাদের দিকে তাকিয়ে কিছু বলল না। নূর মায়ের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, “মা, আমরা কি কিছু খাবো?”

মা একটু কঠিন হাসি দিলেন, “হ্যাঁ, কিন্তু আগে আমাদের আশ্রয়ের দিকে যেতে হবে। এরপর সবাই মিলিয়ে খাবো।”

তবে নূরের মনে সন্দেহ, কারণ সে জানত কোনো আশ্রয়, কোনো শরণার্থী শিবির এখন আর সুরক্ষিত নয়। কিছু কিছু শিবিরে তো হামলা হওয়ারও খবর শোনা গিয়েছে। কিন্তু নূরের মা তার চোখে সাহস জাগিয়ে দিয়েছিল। মা বলছিলেন, “সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। বিশ্বাস রেখো, আমরা একসাথে আছি। যেখানেই থাকি, একে অপরকে ছাড়া কিছুই আমাদের কাছে মূল্যবান হবে না।”

রাস্তায় চলতে চলতে নূর আর তার মা একে অপরকে সাহস দেয়ার জন্য নিজেদের হাত শক্ত ধরে রাখে। মাঝে মাঝে দূরে কোথাও কিছু মানুষের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে৷ হয়তো তারা অন্য কোনো গন্তব্যে যাচ্ছে। তবে নূর জানত, সে যে সুরক্ষা খুঁজে বের করবে, তা এখানে পাওয়া যাবে না। একদিন তাদের এই পথের অবসান হতে হবে, কিন্তু কখনো কখনো বাস্তবতা এত তীব্র হয়ে ওঠে যে, তাকে মেনে নেয়া ছাড়া আর কিছুই থাকে না।

একটি বাচ্চা। যাকে নূর চিনত না। তার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মায়ের কাছে কিছু খাবার চেয়েছিল। নূর মায়ের দিকে তাকিয়ে দেখল, তার চোখে একটি অদ্ভুত দৃষ্টিভঙ্গি। যেন এই ভাঙা পৃথিবীকে নিয়ে কখনো আর কোনো কথা বলার চেষ্টা করা যাবে না। শহরের বাইরে শরণার্থী শিবিরের পাশে পৌঁছে গেল তারা। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর দেখা গেল, একদল সৈন্য শিবিরে প্রবেশ করেছে, আর তারা দেখে-শুনে যাচ্ছিল। এক মুহূর্তের মধ্যে, নূর এবং তার মা বুঝতে পারলেন, এবার তাদের জন্য অপেক্ষা করছে এক নতুন বিপদ।

০৬

নূর এবং তার মা শিবিরের কাছাকাছি পৌঁছানোর আগেই সৈন্যদের হাতের ইশারা এবং গুলীর শব্দ শোনে থমকে গেল। চারপাশে এক ধরনের তীব্র অস্থিরতা। মানুষের চিৎকার, ছোট ছোট শিশুর কান্না সবকিছু যেন এক ধরনের অরাজকতা। শিবিরের আশেপাশে সৈন্যদের উপস্থিতি মানে নিরাপত্তাহীনতা। নূর জানত, এখন যে কোনো সময় হামলা হতে পারে। মা তাকে দ্রুত একটি পাকা বাড়ির পাশ দিয়ে চলে যেতে বললেন, যাতে কোনোভাবেই সৈন্যরা তাদের লক্ষ্য না করে। নূর বুঝতে পারছিল, তার মা কি চাচ্ছিলেন এখন আর কোনো আশ্রয়স্থল নিরাপদ নয়। শিবিরের পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।

একদিকে তাদের চলার পথ বন্ধ। অন্যদিকে শিবিরের ভেতর থেকে শিশুদের কান্নার শব্দ। কোনো কিছুতেই শান্তি ছিল না। দম বন্ধ করা পরিবেশ। মায়ের কাঁপা হাত নূর অনুভব করছে। তার মায়ের ভেতরে এক অদ্ভুত শক্তি আছে। যতটুকু ভয়, ঠিক ততটুকু সাহস। মা বলছিলেন, “সব কিছু ঠিক হবে, শুধু তুমি আমাকে বিশ্বাস রেখো।” কিন্তু নূর জানত, এটা শুধু আশা বলেই। বাস্তবতা তো অন্য কিছু। ঠিক তখন, একটি গাড়ি শিবিরের দিকে চলে গেল। ধীরে ধীরে সেটি থেমে গেল। সৈন্যরা সবাই সজাগ। নূর জানে, এখন আর এখান থেকে পালানো সহজ হবে না। তবুও বলল, “মা, আমরা কি পালাতে পারবো?”। তার মা এই প্রশ্নের কোনো উত্তর দিল না। তাদের ভাগ্য হয়তো এখানেই শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু সে আশা করছে, অন্তত তার মা নিরাপদ থাকবে।

যতই তারা পেছনে হাঁটছে, সৈন্যরা তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। ছোট ছোট শিশুদের কান্না, শিবিরের ভেতরে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা এবং সৈন্যদের অবস্থান আর তাদের প্রমত্ত আচরণ সবকিছু মিলিয়ে একটা বিশ্রী অবস্থা।

একটি ভয়াবহ মুহূর্ত। নূরের মা তাকে দ্রুত কাছে টেনে বললেন, “আমার হাত ধরো। ভয় পেও না। আমরা বেঁচে থাকবো, একে অপরকে শক্তি দিচ্ছি।” কিন্তু নূর জানত, তারা কতোদূর পালাবে? শেষ পর্যন্ত, সৈন্যরা তাদের দিকে এগিয়ে আসল। নূর অনুভব করলো, তার মা তাকে চুমু দিলেন। যেন তারা একে অপরকে শেষবারের মতো জড়িয়ে নিল। নুরের মা আবারও বলল, “ভয় পেও না। এটাই জীবন। আমরা যদি একসাথে থাকি, আমরা হারবো না।

০৭

সৈন্যরা একে একে এগিয়ে আসছে। নূরের চোখে ভয়, উদ্বেগ এবং গভীর নিস্তব্ধতা। তার মা তাকে আরও কাছে টেনে ধরলেন। মনে হচ্ছিল, এই মুহূর্তে পৃথিবী থেমে গেছে। চারপাশের সবকিছু যেন এক ধরনের অদৃশ্য অন্ধকারে নিমজ্জিত। সৈন্যদের একচোখ লোহার মতো কঠোর আর অন্য চোখ নির্বিকার। তাদের চোখে কোনো মানবিকতা নেই যতটা সম্ভব দ্রুত এবং নির্বিকারভাবে কাজ করাই তাদের লক্ষ।

নূর তার মায়ের হাত শক্ত করে ধরে আছে। যেন মায়ের এই শক্তি তার ভেতরে প্রবাহিত হয়। কিন্তু মা জানতেন, কিভাবে তাদের এই অবস্থা থেকে বের হতে হবে।

একজন সৈন্য ধীরে ধীরে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। কিন্তু মা কোনো শব্দ না করে একপা একপা পেছনে সরতে শুরু করলেন। সৈন্যটি এসে তাদের সামনে দাঁড়াল। তার হাতে বন্দুক ঝুলছিল। কিন্তু কোনো প্রশ্ন ছিল না—সরাসরি তাদের দিকে তাকিয়ে ছিল সে। নূরের চোখে শুধু একটি প্রশ্ন ছিল: “এটা কীভাবে শেষ হবে?”

তবে কিছু সময় পর, সৈন্যটি অদ্ভুতভাবে নীরব থেকে তাদের সামনে দাঁড়িয়ে রইল। কিছুক্ষণ বিরতি নিয়ে সৈন্যটি একপাশে ঘুরে চলে গেল। পুরো পরিবেশটি যেন স্থির হয়ে গেল। সময়টা থেমে ছিল। নূর জানত, তাদের এই অবস্থা কতটা আশঙ্কামুখী, কিন্তু তার মা এক সেকেন্ডের জন্যও বিচলিত হননি। নুরের মা বললেন,

এখন তোমার সবার সাথে চলতে হবে, নূর। তুমি জানো, পৃথিবীটা কখনোই সহজ ছিল না। আজও তা নয়। কিন্তু যদি আমরা একে অপরকে সঙ্গী করি, তাহলে আমাদের হারানোর কিছু নেই।” নুর তার মায়ের কথায় মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে আরো শক্ত করে মায়ের হাত জড়িয়ে ধরলো।

এভাবে তাদের জীবন থেমে থাকেনি। সৈন্যদের চলে যাওয়ার পরে মনের মধ্যে হাজারো প্রশ্ন রেখে নীরবে তাদের পথ চলা আবার শুরু করল। শেষ পর্যন্ত, তারা একটি আশ্রয় শিবিরে গিয়ে পৌঁছল। সেখানে পৌঁছানোর পর হৃদয়ে কিছুটা স্বস্তি ফিরে পেল, তবে তারা জানে, এই স্বস্তিও একটা ক্ষণস্থায়ী বালির বাঁধ বই অন্য কিছু নয়। এখন তাদের চোখে প্রিয় মাতৃভূমি ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা ভিন্ন অন্য আর কোনো স্বপ্ন নেই।

আশ্রয় শিবিরের ভেতরে শিশুরা খেলার মতো কিছুটা জায়গা পেয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধের ক্ষত থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব হয়নি। তবে নূরের মা জানতেন, জীবন তার নিজস্ব পথে এগিয়ে যায়। কোনো যুদ্ধ, কোনো ক্ষতি, কোনো ধ্বংস তাদের ভেতরে যে শক্তি তৈরি করেছে, সেটা সহজে মুছে ফেলতে পারবে না। একদিন না একদিন তাদের সেই প্রত্যাশিত বিজয় আসবেই। হয়ত সেদিন তিনি জীবিত থাকবেন না। নুরও থাকবে না। অন্য কেউ তাদের স্থান দখল করবে। তাদের মতো তারাও রক্ত দিয়ে ফিলিস্তিনের ইতিহাস লিখবে।

তবুও আশ্রয় শিবিরে এই মুহূর্তে নুর ভালো আছে। সে তার মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, আমরা বেঁচে আছি, মা। আমরা বেঁচে আছি ।

মা তার চোখে-মুখে এক আকাশ ভালোবাসা নিয়ে নুরের দিকে তাকিয়ে বললেন, “হ্যাঁ, তুমি ঠিক বলেছো বাবা। আমরা যতদিন বেঁচে থাকবো, একে অপরকে ভালোবাসবো, ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করে যাবো।”

গল্পটি সত্য কাহিনি অবলম্বনে লিখিত। অত্যন্ত বেদনার সাথে জানাচ্ছি যে, নুর এবং তার মা আর আমাদের মাঝে নেই। সেই আশ্রয় শিরিরেই তারা দুজন জায়নবাদীদের বোমার আঘাতে শহীদ হন।