ড. এম এ সবুর

বিশ্ব সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ঈদ উৎসব। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই ঈদ উদযাপিত হয়ে থাকে। ঈদের সাথে ধর্মের গভীর সম্পর্ক আছে। অধিকন্তু ঈদ ধর্মীয় উৎসবও বটে। ঈদ উদযাপিত হয় ইসলামের তথা একত্ববাদের ভিত্তিতে। রমযান মাসের সিয়াম সাধনার পর সাওয়াল মাসের প্রথম তারিখে ঈদ-উল-ফিতর এবং জিলহজ্জ মাসের ৮-১০ তারিখে ঈদ-উল-আযহা বা কুরবানির ঈদ উদযাপিত হয়ে থাকে। সমগ্র বিশ্বের সকল মুসলিমের এ উৎসবে অংশগ্রহণের অধিকার আছে। শুধু অধিকারই নয় বরং ইসলামি বিধানে অংশগ্রহণের অপরিহার্যতাও আছে। এভাবে সাম্য-ভ্রাতৃত্বের ভিত্তিতে ঈদের উৎসব উদযাপন বিশ্ব সংস্কৃতিকে অনন্য ও সুশোভিত করেছে।

প্রতিবছর আনন্দ ও খুশির বার্তা নিয়ে ঈদ উৎসবের আগমন ঘটে। এ আনন্দ-উৎসব জাতি-ভৌগলিক গন্ডি পেরিয়ে বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত হয়ে থাকে। এতে সব দেশের ও সব পেশার মুসলমানের অংশগ্রহণের সমান অধিকার আছে। নির্দিষ্ট কোন দেশ-জাতি-গোষ্ঠীর আধিপত্য নাই ঈদের আনন্দ-উৎসবে। অধিকন্তু গরিব-অসহায় মুসলিমদেরকে এ আনন্দ-উৎসবে সম্পৃক্ত করতে ধনী-বিত্তবানদের উৎসাহিত ও বাধ্য করা হয়েছে। তাই ধনীর অট্টালিকার পাশাপাশি দরিদ্রের জীর্ণ কুটিরেও ঈদের আনন্দ সমীরণ প্রবাহিত হয়ে থাকে। তবে ভৌগলিক ব্যাপকতায় এবং সংস্কৃতির ভিন্নতায় বিভিন্ন দেশে এ উৎসব উদযাপিত হয় নিজস্ব আঙ্গিকে।

পুণ্যময় ঈদ উৎসবে মুসলমানদের মহাসম্মিলন ঘটে। সকল মুসলিমের অংশ গ্রহণের সুবিধার্থে বিশ্বের বিভিন্ন ঈদগাহে কিংবা মসজিদে একই লক্ষ্য-উদ্দেশ্যে এ সম্মিলন অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এতে ধনী-গরিব, শাসক-শাসিত, অধিবাসী-অনাবাসী সকল মুসলিমের অংশ গ্রহণের বিধান আছে। তাঁতি-কৃষক, জেলে-কুমার, ধোপা-মুচি, ইত্যাদি পেশা-ভাষা-বর্ণ ভেদাভেদ নাই এ মহাসম্মিলনে। বিশ্বের যে কোন মুসলিম উপস্থিত হতে পারেন যে কোন ঈদের ময়দানে। এতে সারিবদ্ধ হয়ে মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা হয় অবনত মস্তকে। অধিকন্তু হাতে হাত, বুকে বুক রেখে পরস্পর কোলাকুলি করেন পরম মমতা নিয়ে। পুরনো দিনের হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে মুসলমানরা পরস্পরে আবদ্ধ হন ভালোবাসার বন্ধনে। ঐক্য, সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ সুসংহত হয় ঈদের পবিত্র এ উৎসবে।

জামাতে নামাজ আদায় ঈদ উৎসবের প্রধান অনুষঙ্গ। আর ইমাম বা খতিবের ভাষণ ঈদ জামাতের অপরিহার্য অঙ্গ। মুসলিম সমাজের করণীয়-বর্জনীয় বিষয়ে দিকনির্দেশনা এ ভাষণের মূল লক্ষ্য। ধর্মীয় অনুরাগ-অনুভূতি, সামাজিক শিষ্টাচার-সম্প্রীতি, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, রাজনৈতিক সহনশীলতা, সাংস্কৃতিক উৎকর্ষতা, আর্ন্তজাতিক সম্পর্ক ইত্যাদি জীবনঘনিষ্ঠ বিষয়ের সঠিক দিকনির্দেশনা দেয়া এ বক্তব্যের উদ্দেশ্য। মুসলিম জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্য, শিক্ষা-সংস্কৃতি, জ্ঞান-বিজ্ঞানসহ সামগ্রিক বিষয় উল্লেখ করে জাতীয় চেতনার জাগরণ এ ভাষণের বৈশিষ্ট্য। এ সময় দেশ-জাতির বিভাজন নয় বরং মুসলিম বিশ্বের ঐক্যের সুর ধ্বনিত হয়। ভৌগলিক দূরত্ব, অর্থনৈতিক বৈষম্য, রাজনৈতিক অনৈক্য, সামাজিক অবস্থানের ভিন্নতা সত্ত্বেও সব মুসলমান ঈদের জামাতে একত্রিত হয়। এতে ঐক্যবদ্ধভাবে মহান আল্লাহর স্তুতি-মাহাত্ম্য গাওয়া হয় এবং মুসলিমসহ সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য শান্তি-সমৃদ্ধি চাওয়া হয়। অধিকন্তু নির্যাতিত-বঞ্চিত মুসলিমদের জন্য দুয়া করা হয়। এ সময় সমবেত কণ্ঠের ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনিতে ঈদের ময়দান মুখরিত হয়। সমগ্র বিশ্বের প্রতিটি ঈদগাহে ঈদ উৎসবের একই রকম মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখা যায়।

ঈদ উৎসব মুসলিম বিশ্বের ঐক্যবদ্ধ সংস্কৃতি ও সংহতির প্রতীক। সুস্থ বিনোদন ও আনন্দ উপভোগ ঈদ উৎসবের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তাই ঈদের উৎসবে আনন্দÑখুশিতে মেতে ওঠে গোটা মুসলিম বিশ্ব। এ উৎসব উদযাপনে নেই কোন শ্রেণী বৈষম্য। কৃষক-শ্রমিক, জেলে-তাঁতি, কামার-কুমার, ধনী-দরিদ্র, রাজা-প্রজা ঈদ উৎসবে অভিন্ন। সৌহার্দ্য-সদ্ভাব এ উৎসবের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। সহমর্মিতা-ভ্রাতৃত্ববোধ সুদৃঢ় করা ঈদ উৎসবের উদ্দেশ্য। সম্মিলিতভাবে মহান আল্লাহর আনুগত্য প্রকাশ ও তার সন্তুষ্টি অর্জন এ উৎসবের লক্ষ্য। তাই সক্ষম ও বিবেকসম্পন্ন বিশ্বের সকল মুসলিমের এ উৎসবে অংশ গ্রহণ অপরিহার্য।

ঈদ আন্তর্জাতিক উৎসব হলেও এতে স্থানীয় সংস্কৃতির গুরুত্ব আছে। ঈদের মূল চেতনা ও মৌলিক বিধানাবলী অপরিবর্তিত রেখে স্থানীয় সংস্কৃতিতে উৎসব করা যেতে পারে। তাই দেখা যায়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঈদ উদযাপিত হয় বিভিন্ন সংস্কৃতিতে। বাঙালি মুসলমানরা ঈদগাহে যায় সকালে সেমাই-পায়েস ও অন্যান্য মিষ্টান্ন জাতীয় খাবার খেয়ে। আর গোস্ত-খিচুরি, পোলাও-কোরমা ইত্যাদি মুখরোচক খাবার খায় বিকালে বা রাতে। ঈদের দিন সাধারণত বাঙালি পুরুষ ও ছেলেরা পায়জামা-পাঞ্জাবি এবং নারীরা শাড়ী, সালোয়ার-কামিস পড়ে। অর্থাৎ বাংলাদেশে ঈদ উদযাপিত হয় বাঙালি সংস্কৃতিতে। এমনিভাবে মালেশিয়া, আমেরিকা, আফ্রিকা, ইউরোপ, সৌদি আরব ও বিশ্বের অন্যান্য দেশের মুসলমানরা ঈদ উদযাপন করেন তাদের নিজস্ব সংস্কৃতিতে। অধিকন্তু কালপরিক্রমায় ভৌগলিক বিস্তৃতি ও সাংস্কৃতিক রূপান্তরের কারণে ঈদ উৎসবের ধরণেরও পরিবর্তিন হয়েছে। প্রায় ১৪শত বছর আগে অর্থাৎ ৬২৩ খ্রিস্টাব্দে মদিনায় প্রবর্তিত ঈদ উৎসব কালক্রমে পরিবর্তিত হয়ে বর্তমানের রূপ ধারণ করেছে।

ঈদ উৎসবের সূচনা হয় হিজরী দ্বিতীয় সনে অর্থাৎ মহানবি হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের দ্বিতীয় বছর থেকে। জাহেলিয়া যুগে আরবের মক্কায় ‘উকাজ মেলা’ এবং মদিনায় ‘নীরোজ’ ও ‘মিহিরগান’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। আর সে সব অনুষ্ঠানে লোকজন অশ্লীল আনন্দ-উল্লাস করতো। মদিনায় আগমনের পর মহানবি সা. এসব ক্ষতিকর ও অশ্লীলতামুক্ত মুসলমানদের জন্য আলাদা আনন্দ-উৎসবের প্রয়োজন মনে করলেন। এজন্য তিনি মুসলমানদের নির্মল আনন্দ উৎসব করতে মহান আল্লাহর নির্দেশিত বিধানে বছরে দু’টি ঈদ উৎসবের প্রর্বতন করেন। একটি ‘ঈদুল ফিতর’ বা রোজার ঈদ অন্যটি ‘ঈদুল আযহা’ বা কুরবানির ঈদ। দীর্ঘ একমাস সিয়াম সাধনার মাধ্যমে মুসলমানদের ধৈর্য-ত্যাগ ও নৈতিক-আধ্যাত্মিক উন্নতি সাধিত হয়। এতে তাদের মনে এক স্বর্গীয় সুখ-আনন্দ বিরাজ করে। এ মহান সুখানুভূতি উৎসবে রূপ লাভ করে পবিত্র ঈদুল ফিতরে। অনুরূপভাবে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে মানুষের পরিবর্তে পশু কুরবানি করার বিধান করায় মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশিত হয় পবিত্র ঈদুল আজহার উৎসবে। মদিনায় প্রবর্তিত ঈদ উৎসব বর্তমানে প্রায় সমগ্র বিশ্বেই বিস্তৃত হয়েছে। আর বিভিন্ন দেশের মুসলিমরা এ আনন্দ-উৎসব করেন নিজস্বভাবে।

বিশ্ব মুসলিমের ভ্রাতৃত্ববোধ ও ঐক্য সুসংহত করা আন্তর্জাতিক এ উৎসবের প্রধান দীক্ষা। পারস্পরিক সহমর্মিতা-সহানুভূতি জাগ্রত করা এ উৎসবের বিশেষ শিক্ষা। ধনীদের পাশাপাশি দরিদ্রদেরও ঈদের উৎসব-আনন্দে সম্পৃক্ত করার জন্য ইসলামি বিধানে বিত্তশালীদের উপর ‘সদকাতুল ফিতর’ আদায় অপরিহার্য। শুধু অসহায়-দরিদ্র মুসলমানরা এ সদকাতুল ফিতরের প্রাপ্য। বিশ্বের সকল মুসলিমের জন্যই এ বিধান প্রযোজ্য। আর বিশ্বের সকল মুসলিমকে ঈদের উৎসবে সম্পৃক্ত করা এর উদ্দেশ্য। ঈদগাহে যাওয়ার আগেই সদকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব। পরিবারের অপ্রাপ্ত বয়স্ক ও অধীনস্ত সদস্যদের সদকাতুল ফিতর আদায় করার দায়িত্ব পরিবার প্রধানের। সদকাতুল ফিতর আদায় ও গ্রহণের মাধ্যমে পরস্পরের প্রতি সহমর্মিতা-সহানুভূতি জাগ্রত হয়। ‘মুসলমান পরস্পর ভাই’ মহান আল্লাহর এ ঘোষণা ঈদের দিনে বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়। ভেদাভেদ ভুলে এক মুসলিম অন্য মুসলিমকে বুকে টেনে নেয় আন্তর্জাতিক এ আনন্দের দিনে। পারস্পরিক উপহার-শুভেচ্ছা বিনিময় ঈদ উৎসবকে প্রীতিময় করে তোলে।

ঈদ উপলক্ষে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র-সরকার প্রধান, রাজনীতিবীদ, কূটনীতিকদের শুভেচ্ছা বিনিময় আন্তরাষ্ট্রীয় যোগাযোগ-সম্পর্ক স্থাপনে বিশেষ ভূমিকা রাখে। এতে বৈশ্বিক শান্তি-সম্প্রীতির পরিবেশ গড়ে ওঠে এবং মুসলিম দেশসমূহের ঐক্য-সংহতি বাড়ে। এ ছাড়া বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও ঈদ উৎসবের প্রভাব পরে। কারণ মুসলিম অধ্যুষিত দেশসমূহে ঈদ উপলক্ষে ক্রয়-বিক্রয় ও লেন-দেন বেশি হয়ে থাকে। অধিকন্তু সাম্প্রতিক ঈদ মৌসুমে মুসলিম দেশসহ বিভিন্ন দেশের পর্যটন-পরিবহন শিল্প চাঙ্গা হয়ে ওঠে। এছাড়া ঈদ উৎসবে মুসলিম বিশ্বের শিল্প-সাহিত্য ক্ষেত্রে নতুনমাত্রা যোগ হয়ে থাকে।

প্রকৃতপক্ষে ঈদ সাম্য-ভ্রাতৃত্বের এক বৈশ্বিক উৎসব। বিশ্ব স্রষ্টা-নিয়ন্ত্রক মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি-সান্নিধ্য এর উদ্দেশ্য। বিশ্ব শান্তি-সংহতি-সৌহার্দ্য-ঐক্য এর লক্ষ্য। শোভনীয়-মোহনীয়-অতুলনীয়-অপরূপ এর দৃশ্য! আর বিশ্ব সভ্যতায় ঈদ উৎসব অনন্য।

লেখক : আহ্বায়ক, ডক্টরস এসোসিয়েশন অব নন-গবর্নমেন্ট টিচার্স (ড্যাঙ্গট)