যাত্রা শুরু: নীলিমার হাতছানি
নভেম্বরের শেষভাগ। ঢাকার আকাশে হিমেল হাওয়ার পরশ লেগেছে মাত্র। জনাকীর্ণ রাজপথের কোলাহল পেছনে ফেলে যখন শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভেতরে প্রবেশ করলাম, তখন ঘড়িতে রাত ১০টা বেজে ১৫ মিনিট। ২৭ নভেম্বর ২০২৪, বুধবার। চায়না সাউদার্ন এয়ারলাইন্সের (CZ392) বিশাল ডানায় চড়ে বসার সময় মনের ভেতর এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ আর কৌতূহল উঁকি দিচ্ছিল। গন্তব্য চীনÑপ্রাচীন সভ্যতার সেই দেশ, যা আজ আধুনিকতার চরম শিখরে। তবে আমাদের গন্তব্য কেবল বেইজিং বা সাংহাই নয়; আমরা যাচ্ছি চীনের মুসলিম অধ্যুষিত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল ‘জিনজিয়াং’-এ। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের এর নেতৃত্বে বাংলাদেশের বিভিন্ন ইসলামী রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের সমন্বয়ে গঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের সফরসঙ্গী হিসেবে আমার এই যাত্রার উদ্দেশ্য ছিল চীনকে নতুন করে দেখার। রেশম পথের সেই প্রাচীন ধুলোবালি আজ আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় কতটা বদলেছে, তা দেখার এক দুর্লভ সুযোগ এটি।
গুয়াংজু থেকে প্রাচীন কাশগরের পথে
২৮ নভেম্বর ভোরে আমরা চীনের বাণিজ্যিক কেন্দ্র গুয়াংজুতে অবতরণ করি। সেখান থেকে সকাল ৮টায় উড়াল দিই কাশগরের উদ্দেশে। দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে জিনজিয়াং রাজধানী উরুমচিতে পৌঁছি। উরুমচি চীনের থাং সাম্রাজ্যের সময় রেশম পথের একটি প্রধান কেন্দ্র ছিল এবং ১৯ শতকে ছিং রাজবংশের সময় এটি একটি নেতৃস্থানীয় সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। সেখান থেকে কানেক্টিং ফ্লাইটে কাশগর যাওয়ার কথা। কিন্তু তুষারপাতের কারণে আমাদের যাত্রা বিলম্বিত হয়। সে সময় তাপমাত্রা ছিল -৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যদিও বিমানবন্ধরে সেটা অনুভুত হয়নি। অবশেষে বিমান কর্তৃক নির্ধারিত একটি হোটেলে পরবর্তীতে উরুমচির জিনজিয়াং গেষ্ট হাউজে রাত্রি যাপন করতে হয়। যদিও সফরের শেষ দিকে এই ছায়ানিবীড় এই রাষ্ট্রীয় গেস্ট হাউজে ওঠার কথা ছিল।
পরদিন ২৯ নভেম্বর সূর্য ওঠার আগেই আমরা রেষ্ট হাউজ ত্যাগ করি। আমরা যখন এয়ারপোর্টে পৌঁছি ততক্ষণে বোর্ডিং শেষ দিকে। নিরাপত্তা তল্লাশী অতিক্রম করে অনেকটা দৌড়ে বিমানে উঠতে হয়।
আকাশপথে উরুমচি থেকে কাশগরের দূরত্ব প্রায় ১,০৮০ কিলোমিটার। বিমানে এই পথ পাড়ি দিতে সময় লাগে প্রায় ২ ঘণ্টা। এই রুটটি জিনজিয়াংয়ের অভ্যন্তরীণ যাতায়াতের জন্য অত্যন্ত জনপ্রিয়, কারণ আকাশপথ ছাড়া সড়ক বা রেলে এই বিশাল মরুভূমি পাড়ি দিতে অনেক বেশি সময় ব্যয় হয়।
কাশগরÑইতিহাসে যা ‘কাশি’ নামে পরিচিত। এটি কেবল একটি শহর নয়, এটি প্রাচীন সিল্ক রোডের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র। মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার সংযোগস্থল হিসেবে এর গুরুত্ব শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অপরিবর্তিত।
বিমানবন্দরে আমাদের স্বাগত জানালেন স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। তাদের আতিথেয়তায় কোনো কৃত্রিমতা ছিল না। আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল লাইনিং হোটেলে। হোটেলের জানালা দিয়ে যখন কাশগর শহরের দিকে তাকালাম, দেখলাম প্রাচীন ও আধুনিকতার এক অপূর্ব মিলনমেলা। সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে শহরটি যেন কোনো মায়াবী রূপকথার দেশ হয়ে ধরা দিচ্ছিল।
ঈদকাহ মসজিদ: যেখানে ঈমান ও ইতিহাস একীভূত
২৯ নভেম্বর ২০২৪, শুক্রবার। আমাদের সফরের সবচেয়ে আবেগপূর্ণ দিন। কাশগর শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ঐতিহাসিক ঈদ কাহ (Eid Kah) মসজিদ। ১৪৪২ সালে নির্মিত এই মসজিদটি চীনের বৃহত্তম ঈদগাহ।
জুমআর নামাজের সময় যখন ঘনিয়ে এল, আমরা দেখলাম স্থানীয় উইঘুর মুসলিমরা মসজিদে প্রবেশ করছেন। মসজিদের সুবিশাল প্রাঙ্গণ, সবুজ বাগান আর প্রাচীন স্থাপত্যের এক শান্তিময় আবহ। আমরা প্রতিনিধি দলের সদস্যরা প্রথম কাতারেই নামাজের সুযোগ পেলাম। ইমাম সাহেবের তেলাওয়াত আর খুতবা ছিল অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী। জুমআ শেষে যখন মুসল্লিরা বেরিয়ে আসছিলেন, তখন তাদের সাথে আমাদের মোসাফাহা ও শুভেচ্ছা বিনিময় হলো। ভাষার দেয়াল থাকলেও ঈমানি ভ্রাতৃত্বের হাসিতে কোনো বাধা ছিল না। অনেক প্রবীণ উইঘুর মুসলিম আমাদের হাত ধরে দোয়া চাইলেন, কেউবা উষ্ণ আলিঙ্গনে বেঁধে নিলেন আমাদের।
ওল্ড সিটি: শতাব্দীর পাহারাদার
নামাজ শেষে আমরা গেলাম ম্যাটক বাজার বা কাশগরের প্রাচীন শহরে। এই শহরটিকে চীন সরকার প্রাচীন ঐতিহ্য ঠিক রেখে অবিশ্বাস্য দক্ষতায় আধুনিকায়ন করেছে। মাটির তৈরি দোতলা বাড়ি, কারুকাজ করা কাঠের জানালা আর সরু অলিগলি আপনাকে নিয়ে যাবে কয়েকশ বছর আগের ইতিহাসে। ২০২৪ সালের প্রথম আট মাসেই প্রায় ১৯.৫ মিলিয়ন পর্যটক এই শহরটি ভ্রমণ করেছেন। পর্যটকদের ভিড় আর স্থানীয় হস্তশিল্পীদের কর্মব্যস্ততা প্রমাণ দেয় যে, কাশগর এখন এক সমৃদ্ধ পর্যটন নগরী।
আমরা দেখলাম সুফু কাউন্টির ‘ন্যাশনাল মিউজিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট ভিলেজ’। সেখানে উইঘুরদের ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র তৈরির প্রক্রিয়া দেখে আমরা অভিভূত হলাম। তাদের দোতারা, সিতার এবং তাম্বুরার সুর যেন রেশম পথের হাজার বছরের বিরহ ও বিজয়ের কথা বলে। সরকার এই হস্তশিল্পীদের ভর্তুকি দিচ্ছে যাতে এই প্রাচীন শিল্প হারিয়ে না যায়।
তুরপান: মরুভূমির বুকে সবুজের কারুকাজ
১ ডিসেম্বর আমাদের কাফেলা পৌঁছাল মরুভূমির কোলঘেঁষা শহর তুরপানে। তুরপান মানেই মরুভূমির মাঝে এক এক ফালি সবুজ উদ্যান। এখানে আমরা পরিদর্শন করলাম বিখ্যাত ‘গ্রেপ ভ্যালি’ বা আঙুর উপত্যকা। মরুভূমির প্রচণ্ড দাবদাহকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সেখানে কীভাবে মাইলের পর মাইল আঙুরের বাগান গড়ে তোলা হয়েছে, তা না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।
সেদিন সকালে আমরা সরাসরি চলে গেলাম শিনচেংয়ের সিমেন গ্রামে। সেখানে উইঘুর মুসলিম পরিবার প্রধান আলী হায়দারের বাড়িতে আমাদের আপ্যায়ন করা হয়। আলী হায়দারের বাড়িতে বসে চা-পান আর স্থানীয় শুকনো ফলমূল খাওয়ার মুহূর্তটি ছিল অত্যন্ত ঘরোয়া। আলী হায়দার আমাদের জানালেন, তার তিন ছেলেমেয়ের কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে, কেউ চাকরিতে। তারা তাদের ধর্মীয় সংস্কৃতি এবং পারিবারিক ঐতিহ্য মেনেই জীবনযাপন করছেন। তাদের ঘরের স্থাপত্যশৈলী এবং অন্দরমহলের সাজসজ্জায় উইঘুর সংস্কৃতির ছাপ স্পষ্ট।
এরপর আমরা গেলাম তুরপানের কাজী খান মসজিদ পরিদর্শনে। মসজিদের ইমাম ওমরের সাথে দীর্ঘ সময় আলাপ হলো। তিনি মসজিদের ইতিহাস এবং স্থানীয় মুসলমানদের ধর্মীয় শিক্ষার পরিবেশ সম্পর্কে আমাদের ধারণা দিলেন।
প্রযুক্তি ও শিল্পের জয়গান: কুয়েরলা ও তশি সোলার
২ ডিসেম্বর আমাদের কাফেলা পৌঁছাল বেইনগোলিন মঙ্গোলিয়ান স্বায়ত্তশাসিত প্রিফেকচারের কুয়েরলা (Korla) শহরে। সেখানে তশি সোলারের (Tashi Solar) সুবিশাল ১০০,০০০ মেগাওয়াট ফটোভোলটাইক প্রজেক্ট পরিদর্শন করলাম। মাইলের পর মাইল জুড়ে বসানো এই সোলার প্যানেলগুলো দেখে মনে হলো চীন নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য কতটা প্রস্তুত। মরুভূমির প্রচণ্ড রোদকে কাজে লাগিয়ে তারা যে বিপুল বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে, তা কেবল চীনের নয়, বরং বিশ্বের জ্বালানি সংকটের সমাধানে বড় ভূমিকা রাখবে।
সেই বিকেলেই আমরা কুয়েরলার তুনজিয়ে (Unity) মসজিদে নফল নামাজ আদায় করলাম। মসজিদের ইমাম মাওলানা কাসেমি আমাদের স্বাগত জানালেন। এই মসজিদের নকশায় ইসলামি স্থাপত্যের সাথে স্থানীয় চীনা বৈশিষ্ট্যের এক অপূর্ব সমন্বয় দেখা গেছে। আমরা দেখলাম মসজিদগুলোতে বায়োমেট্রিক ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা রয়েছে, যা নিরাপত্তার পাশাপাশি শৃঙ্খলার কাজেও ব্যবহৃত হচ্ছে।
ইউরোপীয় লজিস্টিক্সের কেন্দ্রবিন্দু: জিনজিয়াং
৩ ডিসেম্বর আমরা জিনজিয়াংয়ের বাণিজ্যিক সক্ষমতা পর্যবেক্ষণ করলাম। জিনজিয়াং এখন আর কেবল মরুভূমি নয়, এটি হয়ে উঠেছে ইউরোপ ও এশিয়ার লজিস্টিক্স হাব। আমরা যখন কোরগাস (Khorga) বর্ডার গেট নিয়ে আলোচনা করলাম, তখন উঠে এল চমকপ্রদ তথ্য। চীন-ইউরোপ মালবাহী ট্রেনগুলো এই পথ দিয়েই জার্মানি, ফ্রান্সসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পৌঁছায়। শুল্ক পদ্ধতিতে ডিজিটাল সিস্টেম চালু করার ফলে কার্যকারিতা ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। জিনজিয়াংয়ের এই লজিস্টিক সেন্টারগুলো প্রমাণ করে যে, এটি মধ্য এশিয়ার অর্থনীতির প্রাণভোমরায় পরিণত হয়েছে।
উরুমকি: আধুনিকতার শিখরে
৪ ডিসেম্বর আমরা পৌঁছালাম জিনজিয়াংয়ের রাজধানী উরুমকিতে। এটি একটি অতি আধুনিক শহর। আকাশচুম্বী অট্টালিকা, প্রশস্ত রাস্তা আর উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা যেকোনো ইউরোপীয় শহরকে হার মানাবে। এখানে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশÑরাষ্ট্রীয় সংবর্ধনা ও বৈঠক। স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের আঞ্চলিক পার্টি কমিটির সেক্রেটারি মা জিংরুই এবং স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের চেয়ারম্যান এরকেন তুনিয়াজ আমাদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। গ্র্যান্ড বলরুমে আয়োজিত এই বৈঠকে বাংলাদেশের ইসলামি দলগুলোর নেতৃবৃন্দ জিনজিয়াংয়ের দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রশংসা করেন। মা জিংরুই তাঁর বক্তব্যে বলেন, আমরা বিশ্বাস করি সব জাতিগোষ্ঠীর উন্নয়নই রাষ্ট্রের উন্নয়ন। জিনজিয়াংয়ে আমরা চরমপন্থাকে পরাজিত করে উন্নয়নের পথ বেছে নিয়েছি।
উন্নয়নের মডেল ও দারিদ্র্য বিমোচন
জিনজিয়াং সফরের একটি বড় শিক্ষা ছিল তাদের দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি। গত এক দশকে এই অঞ্চলের পাহাড়ী ও মরু এলাকাগুলো থেকে দারিদ্র্য প্রায় সম্পূর্ণ দূর করা হয়েছে। প্রতিটি পরিবারের জন্য নিশ্চিত করা হয়েছে মাথা গোঁজার ঠাঁই, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবা। যারা আগে কেবল পশুপালনের ওপর নির্ভর করত, তারা আজ আধুনিক কলকারখানায় কাজ করছে বা ই-কমার্সের মাধ্যমে নিজেদের উৎপাদিত পণ্য সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিচ্ছে। চীনের এই মডেলটি প্রমাণ করে যে, উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা যখন হাতে হাত রেখে চলে, তখন যেকোনো কঠিন লক্ষ্য অর্জন সম্ভব।
শেষ রজনী ও বিদায়ের করুণ সুর
৫ ডিসেম্বর ভোরে যখন উরুমকি বিমানবন্দর থেকে ঢাকার পথে রওয়ানা হলাম, তখন মনের ক্যানভাসে বারবার ফিরে আসছিল ৯ দিনের হাজারো স্মৃতি। আমার কাছে মনে হয়েছে, জিনজিয়াং হলো সেই স্থান যেখানে অতীত ও ভবিষ্যৎ একে অপরের হাত ধরে হাঁটছে। একদিকে ১৪শ’ শতকের মসজিদ, অন্যদিকে ১০০ গিগাওয়াট সোলার প্ল্যান্টÑএই বৈপরীত্যই জিনজিয়াংয়ের সৌন্দর্য।
সত্যের সন্ধানে সরাসরি দেখার বিকল্প নেই। জিনজিয়াংয়ের ডালিম যেমন অসংখ্য দানাকে এক ভেতরে আগলে রাখে, তেমনি এখানকার বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী মিলেমিশে আধুনিক চীন গড়ে তুলছে। রেশম পথের সেই ধুলোবালি আজ ধূসর ইতিহাস নয়, বরং তা এক সোনালি ভবিষ্যতের দিকে ধাবমান।
লেখক: বার্তা সম্পাদক, দৈনিক সংগ্রাম