আশরাফ পিন্টু
গুপ্তধন
গুপ্তধনের খোঁজে জহিরুদ্দিন জীবনটাই পার করে দিলেন। কৈশোরে তিনি কোনো এক ডিটেকটিভ বইয়ে পড়েছিলেন গুপ্তধনের কথা। তখন থেকেই তার নেশা ধরে যায়- বাস্তবে তিনি গুপ্তধন খুঁজবেন। শুধু বই পড়ে নয়, নানি-দাদির মুখে কতই না চমকপ্রদ কাহিনী শুনেছেন তখন। গুপ্তধন নাকি মাঝেমধ্যে মাটি ফুঁড়েও বেরিয়ে আসে। সোনাদানা, হিরেজহরত আরো কত কি! ‘হ্যা, আমার ওগুলো চাই।’
জহিরুদ্দিন একদিন এক পাথরখণ্ডের ওপর বসে আছেন পাহাড়ি এলাকার এক নির্জন স্থানে। গুপ্তধন খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত তিনি। এমন সময় জুব্বাধারী এক মুসাফির এসে তার সামনে দাঁড়ান। মুসাফিরের মুখে দাঁড়ি, হাতে লাঠি। তিনি লাঠি নাড়িয়ে জহিরুদ্দিনকে বলেন, গুপ্তধন খুঁজছো বাছা, গুপ্তধন?
- হ্যাঁ, কিন্তু আপনি তা...
- পেয়েছো? জহিরুদ্দিনের কথা শেষ না হতেই বলেন মুসাফির।
- না।
-পাবে।
- পাবো! জহিরুদ্দিন খুশিতে লাফিয়ে ওঠেন।
- হ্যাঁ, পাবে। কিন্তু তোমার সন্ধান ছিল ভুলপথে।
- মানে...?
-গুপ্তধন তো তোমার সাথেই রয়েছে।
-হেঁয়ালি না করে খোলাসা করে বলুন কোথায় পাবো গুপ্তধন? জহিরুদ্দিন আবেগে উত্তেজিত হয়ে পড়েন।
Ñএইখানে। মুসাফির জহিরুদ্দিনের বুকের ঠিক মাঝখানে দু’আঙুল দিয়ে ¯পর্শ করে দ্রুত ওখান থেকে চলে যান।
জহিরুদ্দিন দ্বিতীয় কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ পান না।
চাঁদ আর অবনীর প্রেম
সেই কতকাল আগের কথা!
চাঁদ আর অবনীর মাঝে বেশ বন্ধুত্ব ছিল। বন্ধুত্ব থেকে ধীরে ধীরে প্রেম-ভালোবাসা। চাঁদ কাব্যি করে অবনীকে নিয়ে। তার দেহের সমস্ত আলো ছড়িয়ে দিতে চায় অবনীর মাঝে। অবনীও তাতে মুগ্ধ হয- সারা শরীর আলোকিত হয়ে ওঠে।
বেশ চলছিল চাঁদ আর অবনীর প্রেম। কিন্তু কিছুদিন যাবার পর চাঁদের স্নিগ্ধপ্রেম অবনীর ভালো লাগে না। এ প্রেমের মধ্যে কোনো উত্তাপ নেই, নেই কোনো ক্লাইমেক্স। হঠাৎ তার সূর্যের দিকে নজর পড়ে। সূর্যের শক্তি আর ক্ষমতা দেখে অবনী অবাক হয়। একসময় সে সূর্যের প্রেমে পড়ে যায়। অবনী চাঁদের কাছ থেকে সরে পড়ে।
অবনীর এমন ব্যবহারে চাঁদ বিমর্ষ হয়ে পড়ে। তার জীবনে অমাবশ্যার কালো অন্ধকার নেমে আসে। কিছুই ভালোলাগে না ওর। চাঁদ অবনীকে ভুলতে চেষ্টা করে কিন্তু পারে না। প্রতিদিন রাতে অবনীর দেহে আলো ছড়ায়; নীরবে ভালোবেসে মনে শান্তি খোঁজার চেষ্টা করে। কিন্তু চাঁদের আলোর উত্তাপ অবনী কি টের পায় কখনো?।
সেই থেকে চাঁদ শুধু এভাবেই ঘুরে বেড়ায় অবনীর পিছে; আর অবনী ছুটে চলে সূর্যের দিকে।
হাবিল-কাবিল
হাবিল আর কাবিল। পূর্বযুগের নয়, এ যুগের আদম সন্তান ওরাÑ একই গ্রামের বাসিন্দা দুজন। সৎ আর পরোপকারিতার জন্য হাবিবুল্লাহকে গ্রামের সকলে হাবিল বলে ডাকে। কাবিলের নাম অবশ্য তেমন পরিবর্তন হয় নি তবে কেউ কেউ ওকে কাবিলা বলেও ডাকে।
কাবিলের জুলুম আর অত্যাচারে জর্জরিত গ্রামের লোকজন। হেন অপকর্ম নেই যে তার দ্বারা হয় না। কাবিল অত্র এলাকার ইউপি চেয়ারম্যান। ফলে তার ক্ষমতার দাপট কয়েক গ্রাম জুড়ে বিস্তৃত।
হাবিল সততা আর পরোপকারিতার গুণে প্রায় সব গ্রামবাসীর হৃদয়ই জয় করেছে। সকলের মুখে মুখে হাবিলের গুণকীর্তন।
হঠাৎ করে দুজনেই পর পর মারা গেল। হাবিলের মৃত্যুতে সবার চোখ অশ্রুসজল, শোকে মুহ্যমান। তার জন্য বিধাতার কাছে দোয়া প্রার্থনা করল অনেকেই। আর কাবিলের মৃত্যুতে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল সবাই। আপদ বিদায় হয়েছে শুনে মনে মনে অনেকেই খুশি হলো।
কিছুদিন গ্রামে স্থবিরতা বিরাজ করল। গ্রামে আগের মতো কোনো প্রাণ-চাঞ্চল্যতা নেই। কেমন যেন একঘেয়েমিতায় কাটছে গ্রামবাসীর জীবন।
বছর খানেক পর গ্রামে এক অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটল। হাবিল কাবিল আবার গ্রামে ফিরে এসেছে। এটা কীভাবে সম্ভব? গ্রামবাসীরা অবাকচোখে দেখলÑ দুজনকে হাবিল কাবিলের মতোই দেখাচ্ছে তবে বয়স একটু কম মনে হচ্ছে।
দুজন নিজেদেরকে হাবিল কাবিলের ছেলে বলে পরিচয় দিলো।
ওদের কথা শুনে গ্রামবাসীরা আরো এক ধাপ অবাক হলো- হাবিল কাবিলের তো কেউ ছিল না; ওরা নিঃসন্তান ছিল।