আর ঈদুল আযহা মুসলিম উম্মাহর জন্য ‘ত্যাগের উৎসব’। প্রচলিত কথায় উৎসবটি কুরবানির ঈদ নামেও পরিচিত। এ উৎসবকে ঈদুজ্জোহাও বলা হয়। ঈদুল আযহা মূলত আরবি বাক্যাংশ। এর অর্থ হলো ‘ত্যাগের উৎসব’। এ উৎসবের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হল ত্যাগ করা। এ দিনটিতে মুসলমানেরা ফযরের নামাযের পর ঈদগাহে গিয়ে দু’রাক্বাত ঈদুল আযহার নামায আদায় করে ও অব্যবহিত পরে স্ব-স্ব আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী গরু, ছাগল, ভেড়া, মহিষ ও উট আল্লাহর নামে কুরবানি করে। ইসলামি চান্দ্র পঞ্জিকায় ঈদুল আযহা জ্বিলহজ্জের ১০ তারিখে অনুষ্ঠিত হয়। আন্তর্জাতিক (গ্রেগরীয়) পঞ্জিকায় তারিখ প্রতিবছর ভিন্ন হয়, সাধারণত এক বছর থেকে আরেক বছর ১০ বা ১১ দিন করে কমতে থাকে। ঈদের তারিখ স্থানীয়ভাবে জ্বিলহজ্জ মাসের চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করে।

‘ঈদ’ অর্থ ‘আনন্দ, খুশি বা উৎসব’ একথায় বহুল প্রচলিত। বস্তুত, ‘ঈদ’ শব্দটি আরবী ‘আওদ’ থেকে এসেছে। অর্থ ঘুরে আসা, প্রত্যাবর্তন করা। ঈদ মানে প্রতি বছর ঘুরে-ফিরে আসে এ রকম একটি দিন। আরবীতে বিশেষ দিবস বা উৎসবের দিনকে ঈদ বলে। ফিতর অর্থ রোজা ভাঙা বা ইফতার করা। আমাদের কাছে পরিচিত ‘রোজার ঈদ’কে ইসলামী পরিভাষায় বলা হয় ঈদুল ফিতর বা রোজা ভাঙার উৎসব। পুরো রমযানে প্রতিদিন সূর্যাস্তের পর মুসলমানরা পানাহার শুরু করে। এটা শুধু সেদিনের রোজার ইফতার। ঈদের দিন এক মাসের নিয়মিত রোজা ভাঙা হয়। সেটাও এক রকম ইফতার। রোজাদারের জন্য প্রত্যেক দিনের ইফতারের মুহূর্তই আনন্দের, ঈদুল ফিতরের দিন বিশেষভাবে আনন্দের ও উৎসবের। রাসুল (সা.) বলেছেন, রোজাদারের জন্য দু’টি আনন্দক্ষণ রয়েছে, ইফতারের সময় সে আনন্দিত হয়, রবের সঙ্গে দেখা করার সময় আবার সে আনন্দিত হবে। (বুখারি ৭৪৯২)। বস্তুত, ঈদ হচ্ছে মুসলিম উম্মাহর বার্ষিক সম্মেলন; যা মুসলিম ভ্রাতৃত্বকে দৃঢ় ও মজবুত করে।

পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্মে যেসব প্রধান ধর্মীয় উৎসব উদযাপিত হয় সেগুলির মধ্যে ঈদুল ফিতর হচ্ছে কনিষ্ঠতম। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মদীনাতে হিজরতের অব্যবহিত পরেই ঈদুল ফিতর উৎসব পালন শুরু হয়। হযরত আনাস (রা.) বর্ণিত একটি হাদীস থেকে জানা যায়, নবী করিম (সা.) মদীনা আগমন করে দেখলেন মদীনাবাসীগণ দু’দিন আনন্দ-উল্লাস করে থাকে। মহানবী (সা.) জিজ্ঞাসা করলেন, এ দিবসদ্বয় কী? তারা বললেন, জাহেলী যুগ থেকেই এ দু’টি দিবসে আনন্দ-উল্লাস করা হয়। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘আল্লাহ তোমাদেরকে এ দিবসগুলোর পরিবর্তে উত্তম দু’টি দিবস দান করেছেন। দিবসদ্বয় হলো ঈদুল আযহার দিবস ও ঈদুল ফিতরের দিবস। (সুনান আবূ দাউদ, কিতাবুল ঈদায়ন) প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, পারসিক প্রভাবে শরতের পূর্ণিমার নওরোয নামে এবং বসন্তের পূর্ণিমার মিহিরজান নামে উৎসব দু’টি মদীনাবাসী বিভিন্ন ধরনের আনন্দ-আহলাদ, খেলাধুলা ও কুরুচিপূর্ণ রং-তামাশার মাধ্যমে উদযাপন করত। উৎসব দু’টির রীতি-নীতি, আচার-ব্যবহার ছিল সম্পূর্ণরূপে ইসলামের আদর্শ পরিপন্থী। জরথুস্ত্র প্রবর্তিত নওরোয ছিল নববর্ষের উৎসব। কিন্তু এটি ছয়দিন ব্যাপী উদযাপিত হতো যার মধ্যে শুধুমাত্র একটি দিবস নওরোয-এ-আম্মা বা কুসাক ছিল সাধারণ মানুষের জন্য নির্দিষ্ট। অন্যান্য দিনগুলি ছিল সম্ভ্রান্ত ও উচ্চবিত্তের ব্যক্তিবর্গের জন্য সুনির্দিষ্ট। অনুরূপভাবে ৬ দিনব্যাপী মিহিরজান অনুষ্ঠানেও শুধুমাত্র একটি দিন সাধারণ, দরিদ্র মানুষেরা উপভোগ করতে পারত। শ্রেণি বৈষম্য, ধনী ও দরিদ্রদের মধ্যে কৃত্রিম পার্থক্য, ঐশ্বর্য-অহমিকা ও অশালীনতার পূর্ণ প্রকাশে কলুষিত ছিল এ দুটি উৎসব। ইসলামী আদর্শে উজ্জীবিত আরববাসীরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশে শুরু করল ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা উৎসব উদযাপন। জন্ম নিল শ্রেণি বৈষম্য বিবর্জিত, পঙ্কিলতা ও অশালীনতামুক্ত সুনির্মল আনন্দে ভরা সুস্নিগ্ধ, প্রীতি-সঘন মিলন উৎসব ঈদুল ফিতরা। উল্লেখ্য যে, ইসলাম ধর্মীয় উৎসব বলে ঈদুল ফিতর প্রধানত মুসলমানদের মধ্যেই সীমিত থাকে। তবে, ইসলাম শান্তি ও সম্প্রীতির ধর্ম এবং ঈদের অর্থ আনন্দ বিধায় প্রকারান্তরে ঈদ সকল মানবের জন্যই কল্যাণ বয়ে আনে।

ঈদ মুসলিম উম্মাহর এক অতিগুরুত্বপূর্ণ ও জনপ্রিয় উৎসব। মুসলিম অধ্যুসিত দেশ হিসাবে বাংলাদেশ এ থেকে আলাদা নয়। সারাদেশেই ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা ও ভাব গাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মুসলিম সমাজ ঈদ উদযাপন করেন। রাজধানীর পুরাতন ঢাকায় ঈদ জীবনমুখী এবং রঙিন উৎসব পর্যায়ে পরিচিত। যখনই পুরাতন ঢাকা ঈদ হয়, রাস্তা এবং ইমারতগুলী রঙিন মুসলিন, গেঁড়া ফুল, ক্রাফট, বেলুন এবং প্যান্ডেল দিয়ে সাজানো হয়, যা একটি উৎসবময় এবং জীবনমুখী পরিবেশ সৃষ্টি করে। পুরাতন ঢাকায় ঈদ মেলা, ঈদ মিছিল এবং ঈদ শোভাযাত্রা সমস্তই জনপ্রিয় ঘটনার সুযোগ যা সঙ্গীত, নৃত্য, ইত্যাদির আয়োজন করা হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব হিসেবে, ঈদুল ফিতর উদযাপন বাংলাদেশের সংস্কৃতির একটি অংশ হয়ে উঠেছে।

এ সময় প্রধান শহরগুলি থেকে সমস্ত বহির্গামী পাবলিক ট্রান্সপোর্ট অত্যন্ত ভিড় হয়ে ওঠে এবং অনেক ক্ষেত্রে সরকারী বিধিনিষেধ সত্ত্বেও ভাড়া বেড়ে যায়। ঈদের দিন, ঈদের নামায সারা দেশে, মাঠ, ঈদগাহ বা মসজিদের ভিতরের মতো খোলা জায়গায় অনুষ্ঠিত হয়। ঈদের নামাযের পর, লোকেরা বাড়ি ফিরে, একে অপরের বাড়িতে যায় এবং শিরনি, সেমাই এবং অন্যান্য সুস্বাদু খাবার যেমন বিরিয়ানি, কোরমা, চপ, টিকিয়া, কাবাব, লুচি, মাছ ভাজা, রেজালা, ইত্যাদি খায়। দিনভর লোকেরা একে অপরকে আলিঙ্গন করে এবং শুভেচ্ছা বিনিময় করে। গ্রামাঞ্চলে ব্যাপক ধুমধাম করে ঈদ উৎসব পালন করা হয়। প্রত্যন্ত গ্রামগুলোও জনাকীর্ণ হয়ে ওঠে।

বস্তুত, ‘ঈদ’ অর্থ যা ফিরে ফিরে আসে। ‘ফিতর’ অর্থ ভেঙে দেওয়া বা ইফতার (নাস্তা) করা। ঈদুল ফিতর মানে সে আনন্দঘন উৎসব, যা দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর আসে। নৈতিক, আত্মিক ও সামাজিক পরিশুদ্ধির সীমানা পেরিয়ে সামষ্টিক কল্যাণ নিয়ে ঈদ আসে। ঈদ আসে কৃচ্ছ্র ও শুদ্ধতার প্রতীক হয়ে। তাকওয়া তথা আল্লাহভীতির শক্তিতে বলীয়ান হয়ে নতুন জীবনে ফেরার অঙ্গীকার নিয়ে ঈদ আসে। আল্লাহপাকের খাস রহমত, মাগফিরাত ও নাজাত লাভের এক মাস সিয়াম সাধনার মধ্য দিয়ে আমাদের মাঝে যে ঈদ আসে, তা হলো ঈদুল ফিতর। একজন রোজাদারের জন্য অত্যন্ত আনন্দের বিষয় হলো খোদাতায়ালার আদেশ অনুযায়ী মাসব্যাপী রোজা রাখতে আল্লাহ তাকে তৌফিক দিয়েছেন। এ খুশি প্রকাশ করতেই রমযান মাস শেষ করে শাওয়াল মাসের ১ তারিখে ঈদের আনন্দে মিলিত হয়।

শরয়ী বিধান মতে, ঈদের নামায আদায় করা ওয়াজিব। যারা ঈদের নামায আদায় করে না তারা অবশ্যই গুনাহগার হবে। ঈদ আসে বিশ্ব মুসলিমের দ্বারপ্রান্তে বার্ষিক আনন্দের মহা বার্তা নিয়ে, আসে সীমাহীন প্রেম-প্রীতি বিলাবার সুযোগ নিয়ে, বিগত দিনের সকল ব্যথা বেদনা ভুলিয়ে দিতে, কল্যাণ ও শান্তির সওগাত নিয়ে। বছরে দু’দিন ঈদের নামাযের মাধ্যমে মহান আল্লাহ মুসলমানদের জন্য যে মহাসম্মেলনের ব্যবস্থা করেছেন তার মধ্যে রয়েছে ইসলামী সমাজ কায়েমের প্রেরণা। সমাজকে কলুষ কালিমা মুক্ত করার জজবা, মানবতা ও মনুষ্যত্ব বিকাশের এক বিশেষ অনুশীলন।

ঈদের দিনের অনেক ফজিলত রয়েছে। যারা ঈদের দিন যথারীতি ঈদগাহে গিয়ে যথানিয়মে ঈদের নামায আদায় করে মহান আল্লাহ তাদের দোয়া কবুল করেন এবং তাদের অফুরন্ত পুরস্কার দানে ধন্য করেন। হাদিসে রাসুল (সা.)-এ এসেছে, যারা ঈদের নামায আদায় করার জন্য ঈদের ময়দানে একত্র হয়, আল্লাহতায়ালা তাদের সম্পর্কে ফেরেশতাদের ডেকে জিজ্ঞেস করেন যারা স্বেচ্ছায় দায়িত্ব পালন করে আজ এখানে সমবেত হয়েছে তাদের কী প্রতিদান দেওয়া উচিত? ফেরেশতারা বলেন, পুণ্যময় কাজের পুরোপুরি পারিশ্রমিক দেওয়াই উচিত। তখন আল্লাহতায়ালা তার ইজ্জতের শপথ করে বলেন, অবশ্যই তিনি তার প্রার্থনা মঞ্জুর করবেন। এরপর আল্লাহতায়ালা ঈদের নামায সমাপনকারী তার নেক বান্দাদের উদ্দেশে ঘোষণা করেন, ‘আমি তোমাদের ক্ষমা করে দিয়েছি এবং তোমাদের কৃত অতীত পাপকে সওয়াবে পরিণত করে দিলাম’ এ পর্যায়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘নামায সমাপনকারীরা ঈদের মাঠ থেকে এমন অবস্থায় আপন গৃহে প্রত্যাবর্তন করল যেন তারা নিষ্পাপ শিশু।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি পুণ্য লাভের আশায় দু’ঈদের রাত জেগে ইবাদত করে কিয়ামতের দিন তার অন্তর এতটুকু ভীত-সন্ত্রস্ত হবে না যেমন অন্যদের অন্তর ভীত-সন্ত্রস্ত হবে।

মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে রোজাদারদের জন্য বিশেষ একটি পুরস্কার হচ্ছে, ঈদুল ফিতর। আর ঈদের তাৎপর্য অপরিসীম। হাদিসে রাসুল (সা.)-এ এসেছে, ‘ঈদুল ফিতরের দিন যখন আসে তখন আল্লাহতায়ালা রোজাদারের পক্ষে গর্ব করে ফেরেশতাদের বলেন, হে আমার ফেরেশতাগণ, তোমরাই বলো রোজাদারের রোজার বিনিময়ে আজকের এ দিন কী প্রতিদান দেওয়া যেতে পারে? সে সমস্ত রোজাদার যারা তাদের দায়িত্ব পুরোপুরি আদায় করেছে। তখন ফেরেশতারা আল্লাহকে বলেন, দয়াময় আল্লাহ, উপযুক্ত প্রতিদান তাদের দান করুন। কারণ তারা দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনা করেছেন, প্রাপ্য পারিশ্রমিক তাদের দান করুন। তখন আল্লাহতায়ালা রোজাদারদের বলতে থাকেন, ‘হে আমার বান্দা, তোমরা যারা যথাযথভাবে রোজা পালন করেছ, তারাবির নামায পড়েছ, তোমরা তাড়াতাড়ি ঈদগাহে ঈদের নামায পড়ার জন্য যাও এবং তোমরা তোমাদের প্রতিদান গ্রহণ কর। ঈদের নামাযের শেষে মহান আল্লাহ তার বান্দাদের উদ্দেশে বলতে থাকেন, হে আমার প্রিয় বান্দারা, আমি আজকের এ দিনে তোমাদের সকল পাপগুলোকে পুণ্যের দ্বারা পরিবর্তন করে দিলাম। অতএব তোমরা নিষ্পাপ হয়ে বাড়িতে ফিরে যাও’। -বাইহাকি মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন যে, ‘যে ব্যক্তি দু’ঈদের রাতে পুণ্যের প্রত্যাশায় ইবাদত-বন্দেগি করে, কিয়ামতের দিন সে ব্যক্তির জন্য রয়েছে মহা পুরস্কার অর্থাৎ কিয়ামতের দিন অন্যান্য লোকদের অন্তর মরে যাবে, কিন্তু কেবল সেই ব্যক্তির অন্তর জীবিত থাকবে, সেদিনও মরবে না।’ (আত তারগিব) রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি পুণ্যময় ৫টি রাতে ইবাদত-বন্দেগি করে সে ব্যক্তির জন্য সুসংবাদ রয়েছে। আর সে সুসংবাদটি হচ্ছে জান্নাত। পুণ্যময় ৫টি রাত হলো ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, লাইলাতুল কদর, জ্বিলহজ্জের রাত, আরাফাতের রাত।-(বাইহাকী) জুবাইর ইবনু নুফাইর (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুল (সা.)-এর সাহাবায়ে কেরাম ঈদের দিন পরস্পর সাক্ষাৎ হলে বলতেন ‘তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়ামিন কুম’ অর্থাৎ আল্লাহ আমার ও আপনার যাবতীয় ভাল কাজ কবুল করুক। (ফাতহুল কাদির ২/৫১৭

আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও গরিব-দুঃখীদের খোঁজ-খবর নেওয়া এবং তাদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করা ঈদের দিনের অন্যতম আমল। আনন্দ-বিনোদনের নামে কেউ যেন ইসলামী শরিয়ত পরিপন্থী কাজে লিপ্ত না হয়, এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। ঈদের দিন পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হওয়া, মিসওয়াক করা ও গোসল করা সুন্নাত। আতর ইত্যাদি সুগন্ধি ব্যবহার করা সুন্নাত। সকালে ইদগাহে গমন করা সুন্নাত। সুন্দর ও উত্তম কাপড় পরিধান করা সুন্নাত। ঈদুল ফিতরের নামাযের জন্য ঈদগাহে বা মসজিদে যাওয়ার পূর্বে বেজোড় সংখ্যায় খেজুর খাওয়া (বা কোনো মিষ্টি দ্রব্য খাওয়া) সুন্নত। -সহিহ বুখারি

এক মাস সিয়াম সাধনার পর মুসলিম জাতি পালন করে ঈদুল ফিতর। মুসলিমদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান এটি। ‘ফেস্টিভ্যাল অব ব্রেকিং দ্য ফাস্ট’ হিসেবে ঈদুল ফিতরকে আখ্যা দেওয়া বিশ্বব্যাপী। শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখার পর ঈদ পালন করেন মুসলিমরা। পুরো বিশ্বই যেন ঈদের খুশি ও আনন্দে মেতে ওঠে। সুবহে সাদিকের পর মিষ্টি খেয়ে ঈদের নামায আদায়, অন্য মুসলিমকে আলিঙ্গন করা ঈদের সংস্কৃতি।

মজার মজার খাবার, আত্মীয়-প্রতিবেশীর বাড়িতে যাওয়া, অন্যদের দাওয়াত করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও ইবাদতের মধ্য দিয়েই পালন করা হয় ঈদুল ফিতর। তবে বিশ্বের একেক দেশের ঈদ পালনের সংস্কৃতিতে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। এটি মূলত স্থানভেদের কারণেই হয়েছে। এমনকি ইসলামী শরীয়াহ বিরোধী কিছু কাজও ঈদ উৎসবের অনুসঙ্গ হয়ে গেছে। আমরা এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ঈদ পালনের ঐহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা করবো।

তুরস্ক

তুরস্কের ঈদ উদযাপন বেশ ব্যতিক্রমধর্মী। তুর্কিবাসীরা ঈদ উদযাপন করেন সমুদ্র সৈকতে। তপ্ত রোদে সমুদ্র সৈকতে এসে ভিড় জমান সবাই। ঈদের ছুটি কাটাতে তুরস্কের বিভিন্ন সমুদ্র সৈকতে পরিবারসহ সময় কাটান তুর্কিবাসীরা। তুরস্কের জনসংখ্যার প্রায় ৯৮ শতাংশই ঈদের ছুটিতে সেখানকার বিভিন্ন প্রদেশে ভ্রমণ করে। এছাড়া অনেকে ঈদুল ফিতরের প্রথম দিন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করেন এবং ২য় ও ৩য় দিন তারা সমুদ্রে কাটান। এ সময় তারা মাছ ধরা, সাঁতার কাটাসহ এবং আনন্দ হুল্লোড়ে মেতে ওঠেন। বালুকাময় উপকূলে বসে সমুদ্রের ঢেউ দেখেই পরিবার এবং বন্ধুদের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করে থাকেন তুর্কিবাসীরা। ঈদ মানে তাদের কাছে বিশ্রাম, আনন্দ, আবার বিশ্রাম!

মিশর

ঈদ উপলক্ষে তিন দিনের সরকারি ছুটিতে পরিবারের সঙ্গে সমুদ্রতটে ভ্রমণ করতে পছন্দ করে অধিকাংশ মিশরীয়। এছাড়া এ দিনটিতে মিশরের বিখ্যাত অবকাশযাপন কেন্দ্র ‘শারম আল শেখ’-এ উপচেপড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়। ঈদের দিনটিতে মিশরে বিশেষ খাবারের আইটেমে চিনি ও বাদামের ব্যবহার বেশি লক্ষ্য করা যায়। ঈদের বিশেষ খাবার হিসেবে মিশরে ‘কাহক’ নামের এক ধরনের বিশেষ কুকি বা পিঠা বেশ জনপ্রিয়। সে দশম শতাব্দীতে মিশর রাজপ্রাসাদ থেকে আবির্ভাব হয়েছে এ বিশেষ পিঠার, যার ভেতর খেজুরভর্তা, বাদাম বা টার্কিশ ডিলাইটের পুর দেওয়া হয়। এমনই আরেকটি মিষ্টিজাতীয় পদের নাম ‘কাতায়েফ’, যা মিশরজুড়ে জনপ্রিয়। মিশরে ঈদুল ফিতর আনুষ্ঠানিকভাবে তিন দিনের একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান। বন্ধুবান্ধব, নিকটজন, পাড়া-প্রতিবেশী একে অপরকে ঈদ মোবারক বলে ঈদের শুভেচ্ছা জানায়। ঈদের প্রথম দিনটি সবাই কাটায় আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করে, বাকি দিনগুলো তারা কাটায় সিনেমা হলে, পার্কে বা সমুদ্রসৈকতে। ‘হারম আল শেখ’ জায়গাটি ঈদের ছুটি কাটানোর জন্য অন্যতম জনপ্রিয় স্থান। শিশুরা বড়দের কাছ থেকে নতুন জামা এবং ঈদ সালামি পেয়ে থাকে।

বিভিন্ন রকম খাবার রান্না করা হয়, যার মধ্যে ‘ফাতা’ ঈদের বিশেষ একটি খাবার। এটি বাদাম এবং চিনি দিয়ে তৈরি। ‘কাহক’ নামক আরও একটি খাবার আছে যার কারণে মিশরের বেকারিগুলো ঈদের সময় কোলাহলপূর্ণ থাকে। টেলিভিশনেও বিভিন্ন অনুষ্ঠান সম্প্রচারের মাধ্যমে ঈদ উদযাপিত হয়। শিশুরা রাতে সবাই একসঙ্গে হয়ে গল্পগুজব করে অথবা বড়দের কাছ থেকে গল্প শোনে, গানের আসর বসে। শিশুদের জন্য মোটরসাইকেল ভাড়া করে শহর ঘুরে বেড়ানো অপরিহার্য বলা যায় মিশরে। মিশরের মানুষ সবাই মিলে একসঙ্গে ঈদের আনন্দ উপভোগ করে বলে তাদের রাস্তাগুলো এ সময় অনেক বেশি কোলাহলপূর্ণ থাকে।

আফগানিস্তান

আফগানিস্তানের ৯৯.৭ শতাংশই মুসলিম! ঈদ উৎসব বিশেষভাবে পালিত হওয়াই স্বাভাবিক। আফগানরা নতুন পোশাক পরিধান করে, ঈদের নামায আদায় করে, আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে গিয়ে, বাড়ি পরিষ্কার করে, মজার সব খাদ্য রান্না করে ঈদকে স্বাগতম জানায় অন্য যে কোনো দেশের মতোই। তবে তাদের ভীষণ মজার একটি ঈদ ঐতিহ্য আছে যার নাম টখম-জ্যান্গি অথবা ডিম যুদ্ধ! এই উৎসবে সব বয়সের মানুষ খোলা জায়াগায় মিলিত হয় সেদ্ধ ডিম নিয়ে এবং একে অপরের ডিম ভাঙার চেষ্টা করে!

সোমালিয়া

সোমালিয়ার ৯৯ শতাংশ মানুষ মুসলিম। ঐতিহ্যবাহী নাচের মাধ্যমে ঈদকে স্বাগতম জানাচ্ছেন এক সোমালি পুরুষ। ঈদ উপলক্ষ্যে এক নারী হাতে মেহেদি দিয়েছেন। অন্যান্য দেশের মতোই, ঈদের দিনে নতুন পোশাক পরিধান করেন সোমালিরা। পরিবার পরিজনের সঙ্গে মুখোরচক ট্রাডিশনাল খাদ্য উপভোগ করে থাকেন।

মরক্কো

দেশটির ৯৯ শতাংশ জনগোষ্ঠী ইসলাম ধর্মালম্বী। জাকাত আল ফিতর মরক্কোর গুরুত্বপূর্ণ ঈদ ট্রাডিশন। এদেশে জাকাত আল ফিতার শোধ করার আগে পরিবারগুলো পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর উদযাপন করতে পারেনা! জাকাত আল ফিতর পরিশোধের শেষ সময়সীমা ঈদের নামাযের আগ পর্যন্ত। তারপরে যদি কেউ দেয় তবে সেটা দান হিসেবে গণ্য হলেও জাকাত হিসেবে গণ্য হবে না। এটা অপশনাল না, প্রতিটি পরিবারকে যাকাত আল ফিতর আদায় করতেই হবে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে। দেশটির ইসলামিক আইন বাধ্যতামূলক করেছে জাকাত আল ফিতরকে। বেশিরভাগ পরিবারই ঈদের কদিন আগেই জাকাত আল ফিতর আদায় করে দেয়। পরিবারের প্রধানকে দায়িত্ব পালন করতে হয়। সাধারণত যাকাত আল ফিতর হিসেবে প্রধান খাদ্য দ্রব্য গম ও ময়দা নেওয়া হয়, তাছাড়া টাকা, এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যও গ্রহণ করা হয়। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী এক ব্যাগ গমের সমান দান করতে হবে পরিবারের প্রতি সদস্যের পক্ষ থেকে। পুদিনার চা এবং প্যানকেক, পেস্ট্রি সহ নানা ধরনের খাবার মরোক্কানরা পরিবারের সঙ্গে উপভোগ করেন ঈদের দিনে।

সিঙ্গাপুর

সিঙ্গাপুরে ঈদ উদযাপিত হয় বেশ জাকজমকতার সঙ্গে। গিলং সেরাই এলাকায় ঈদুল ফিতরের দিন রঙিন আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে। গিলং সেরাইয়ের রাস্তাগুলো ঈদ উপলক্ষ্যে সাজানো হয় বেশ ঘটা করে। ৫০টিরও বেশি আলোক এবং ভিজ্যুয়াল ইনস্টলেশনের মাধ্যমে আলোকসজ্জা করা হয় সেখানে। গিলং সেরাইকে কেন্দ্র করেই সিঙ্গাপুরের ঈদুল ফিতরের উৎসব পরিপূর্ণতা পায়। সেখানেই সব মুসলিমরা ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে ভিড় জমায়। ১০০ এরও বেশি খাবারের দোকান বসে। যেখানে ঐতিহ্যবাহী মালয় খাবার পরিবেশন পাওয়া যায়। চোখ ও পেট ভরাতে সিঙ্গাপুরে একবার হলেও ঈদুল ফিতর উদযাপন করতে পারেন।

আইসল্যান্ড

আইসল্যান্ডবাসী ঈদের দিনও রোজা থাকেন। কারণ গ্রীষ্মের শুরুতে সূর্য স্বাভাবিকের চেয়ে দীর্ঘ সময়ের জন্য থাকায় মধ্যরাতে সূর্যাস্ত যায় সেখানে। আইসল্যান্ডে বসবাসরত মুসলমানরা প্রতিদিন ২২ ঘণ্টা রোজা রাখে। যদিও এটি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং বিষয়। তবে ইসলামিক নির্দেশনা অনুযায়ী, তারা নিকটতম দেশের সূর্যাস্তের সময়কালের ভিত্তিতে রোজা ভাঙেন। আইসল্যান্ডের রাজধানী রেকজাভাকের কয়েকটি মসজিদে ঈদুল ফিতর উদযাপিত হয়। মসজিদের আশেপাশের এলাকাতেই অতিথিদের সমাগম ঘটে। সেখানেই তারা পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপন করেন। এ সময় তারা ইন্দোনেশিয়ান, মিশরীয় এবং এরিটরিয়ানে বিভিন্ন খাবার ও পানীয় খেয়ে থাকেন। শিশুরা নতুন পোশাক পরে ছোটাছুটি করে। এভাবেই আইসল্যান্ডবাসীরা ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেন।

সৌদি আরবে ঈদ উৎসব

ঈদুল ফিতর উপলক্ষে সৌদিরা বিভিন্ন উৎসবমুখর অনুষ্ঠান এবং বিনোদনমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়। দিনটি উদযাপনের অংশ হিসাবে দেশটি জাঁকজমক সাজে সাজানো হয়। পরিবার এবং বন্ধুরা সাধারণত ঈদের বিশেষ খাবারের জন্য একত্রিত হয়। সকালে খাবার পরিবেশন করার আগে পরিবারের বাচ্চারা বয়স্কদের থেকে ‘সালামি’ নেয়।

সৌদি আরবে ঈদে একটি অনন্য ঐতিহ্য হলো-স্থানীয়রা কম তুলনামূলক গরীব কিংবা সবার বাসার দরজায় প্রচুর পরিমাণে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী ও খাবার রেখে যান। সৌদিতে ঈদের স্পেশাল খাবারের মধ্যে রয়েছে মুগলগাল, জেরিশ এবং ঘুরাইবাহ। মুগলগাল সৌদি আরবের অন্যতম বিখ্যাত খাবার। ঈদের সময় সাধারণত উপভোগ করা এই খাবারে মশলার সাথে ভাজা ভেড়ার মাংস, তাজা টমেটো, পেঁয়াজ এবং সবুজ মরিচ থাকে। দেশটিতে ঈদুল ফিতর ‘মিষ্টি ঈদ’ হিসাবেও পরিচিত। দিনটিতে বিভিন্ন ধরণের মিষ্টি খাবার খাওয়া হয়।

ভারত-পাকিস্তানে ঈদ

ভারত-পাকিস্তানে ঈদ উদযাপনের রীতি অনেকটা আমাদের দেশের মতোই। ভারতে ঈদের দিন স্কুল-কলেজ, ইউনিভার্সিটি, সরকারি অফিস আদালত এমনকি কিছু কিছু দোকান ও রেস্টুরেন্ট বন্ধ থাকে। রাষ্ট্রীয়ভাবে একদিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়। ঈদগাহ ও বড় বড় জামে মসজিদগুলোতে ঈদের জামায়াত অনুষ্ঠিত হয়। বড়দের সালাম দিয়ে ছোটরা পেয়ে থাকে ঈদের সালামি। খাবারের মধ্যে রয়েছে মাংস, পোলাও, রুটি, পরোটা। পাকিস্তানে ঈদের দিন সকালে পরিবারের সবাই এক হয়ে বিভিন্ন ধরনের মিষ্টিজাতীয় খাবার, ঐতিহ্যবাহী শির-কোরমা দিয়ে নাশতা করে। টিভির পর্দায় সারাদিন ঈদ ঘিরে থাকে নানা আয়োজন। অনেকে পার্ক, মনোরম স্থান ও সাগর তীরে ঘুরতে যায়।

আরব আমিরাতে ঈদ

আমিরাতে ঈদ মানেই ‘ওউজি’ নামক একটি বিখ্যাত স্থানীয় খাবার। উৎসবের জন্য একচেটিয়াভাবে দেশজুড়ে এটি প্রস্তুত করা হয়। দীর্ঘ সময় নিয়ে রান্না করা খাবারটির মধ্যে রসালো ছাগলের মাংস ও ভাতের মিশ্রণ থাকে। এর সঙ্গে ভাজা পাইন বাদাম দেওয়া হয়। দিনটিতে আমিরাতিরা বাহারি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে। এতে ম্যাজিক ট্রিকস খুব জনপ্রিয়।

মালয়েশিয়ায় ঈদ

মালয়েশিয়ানরা ঈদের আগের দিন তাদের নিজ নিজ শহরে ভ্রমণে বের হয়। উৎসবের আগের দিনটি তাদের জন্য সবচেয়ে ব্যস্ত সময় থাকে। তারা পেলিটা’ (তেলের প্রদীপ) দিয়ে ঘর সাজায় এবং ঐতিহ্যবাহী নানা খাবার প্রস্তুত করে। কেতুপাট, কুইহ রায়া, লেমাং, রেন্ডিং ইত্যাদি দেশোটিতে ঈদের দিনের জনপ্রিয় খাবার। সবাই মিলেমিশে খাওয়াদাওয়া ও শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। মালয়েশিয়ার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য হলো ‘উন্মুক্ত ঘর’। যেখানে খাবারের পাশাপাশি সবাই মিলে আনন্দ-আয়োজনের সঙ্গে ভালো সময় উপভোগ করার জন্য একত্রিত হয়।

ইন্দোনেশিয়ায় ঈদ

ইন্দোনেশিয়ায় ‘লেবারান’ নামে পরিচিত একটি বিশেষ আয়োজনের মধ্য দিয়ে ঈদুল ফিতর উদযাপিত হয়। লোকেরা ‘ল্যাপিস লেজিট’ নামে একটি ঐতিহ্যবাহী হাজার স্তরের কেক বেক তৈরি করে। লেবারান উৎসবের আগে প্রচুর মানুষ ড্রাম বাজায় ও আতশবাজি জ্বালায়। শপিং মলগুলো শেষ মুহূর্তের কেনাকাটার জন্য লোকারণ্য হয়ে যায়।

নিউজিল্যান্ডে ঈদ

নিউজিল্যান্ডে মসজিদ বা বাহিরের খোলা স্থানে নামাযের মধ্য দিয়ে ঈদ উদযাপন শুরু হয়। তারপর মুসলিমরা সমেবেত হন ও বিভিন্ন পরিবার উপহার বিনিময় করে। একসাথে ঐতিহ্যবাহী খাবারও খাওয়া হয়। সম্প্রতি অকল্যান্ড, ওয়েলিংটন এবং ক্রাইস্টচার্চের মতো বড় শহরগুলোতে ঈদ উৎসব আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, খাবারের স্টল এবং শিশুদের জন্য বিনোদনের ব্যবস্থা থাকে। দেশটির অকল্যান্ডে বাড়িঘর পরিচ্ছন্নতার মাধ্যমে দিন শুরু হয়। তারপর ইডেন পার্কে যান্ত্রিক ষাঁড়, হিউম্যান ফুসবল এবং বিভিন্ন স্থানে অস্থায়ীভাবে খাবার বিক্রি করা হয়। এ উদযাপন মুসলিম সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং বৃহত্তর নিউজিল্যান্ড সম্প্রদায়ের মিশ্রণকে প্রতিফলিত করে, দেশের বৈচিত্র্য এবং অন্তর্ভুক্তি প্রদর্শন করে।

যুক্তরাষ্ট্রে ঈদ

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পটভূমি থেকে মুসলিমরা ঈদ উদযাপন করে। দেশটিতে মসজিদ বা উন্মুক্ত স্থানে ঈদের নামায আদায় করা হয়। তারপর পরিবার এবং বন্ধুদের সাথে নানা আয়োজন ও সুন্দর সময় উদযাপন করে। আমেরিকান মুসলিমরা তুলনামূলক গরিবদের সাহায্য করার জন্য কমিউনিটি সার্ভিস প্রকল্পে অংশ নেয়। যুক্তরাষ্ট্রে ঈদের সংস্কৃতির মধ্যে ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরা, ঐতিহ্যবাহী সংগীত শোনা এবং ঐতিহ্যবাহী খাবার উপভোগ করা উল্লেখযোগ্য।

যে কোনো সম্প্রদায়, জাতি বা জনগোষ্ঠীর চিন্তা-চেতনা, কর্ম ও দীর্ঘদিনের জীবনাচারের বাস্তব রূপকেই যদি সংস্কৃতি বলা হয়, তাহলে নামায, রোজা ও ঈদকেই বাংলাদেশী মুসলমানদের জাতীয় সংস্কৃতি হিসেবে আখ্যায়িত করতে হবে। সত্যিকারার্থে পবিত্র ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার মধ্য দিয়েই আমাদের সাংস্কৃতিক জীবনের বাস্তব প্রতিফলন ঘটে।

কারণ, যে কোনো জাতির সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রদর্শনী হয় ওই জাতির জাতীয় উৎসবের মাধ্যমে। অর্থাৎ জাতীয় উৎসবগুলোই জাতীয় সংস্কৃতিকে সমাজের সামনে তুলে ধরে। যেসব আচার-অনুষ্ঠান জাতীয় উৎসবে স্থান পায় না, সেগুলোকে ওই জাতির সংস্কৃতি বলে চালিয়ে দেয়ার প্রবণতা সত্যের অপলাপ ছাড়া কিছু নয়।

বস্তত, দু’ঈদই আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির মূর্ত প্রতীক। এ ঈদে শামিল হয় নিঃস্ব, গরিব আর ধনী ও সামর্থ্যবানরাও; ছোট শিশু থেকে নিয়ে মৃত্যুমুখী বৃদ্ধও। ঈদ অনুষ্ঠানে অংশ নেয় না, ঈদের জামাতে শামিল হয় না, ঈদের আনন্দ উপভোগ করে না-এরূপ একটি লোকও খুঁজে পাওয়া যাবে না বাংলার মুসলিম সমাজে। তাই এ দুই ঈদই হলো আমাদের জাতীয় উৎসব। এর বিপরীতে যারা শিল্প ও সংস্কৃতি চর্চার নামে এ সমাজে নাচগান ও বাদ্যযন্ত্রের আমদানি করতে চায়, আর এ নাচগানকে জাতীয় সংস্কৃতি হিসেবে চালিয়ে দিতে চায়, তারা আসলে সংস্কৃতির মানেই বোঝেনি; বরং নফস, শয়তান ও বিজাতীয় শয়তান দ্বারা চালিত হয়ে আমাদের জাতীয় সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে জাতীয় স্বকীয়তা বিসর্জন দেয়ারই চক্রান্ত করে। বিজাতির কাছ থেকে আমদানি করা চিন্তাধারা নয়; বরং স্বকীয় চিন্তাধারার আলোকে আমাদের বুদ্ধিজীবীরা জাতীয় জীবনের এসব মৌলিক বিষয় নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করবেন, এ কামনা করছি।

ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা বাঙালি মুসলমানদের কাছে কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের চেয়ে অনেক বেশি। এটি একটি সাংস্কৃতিক উৎসব যা আনন্দ, উদ্যাপন এবং পরিবারের সাথে মিলিত হওয়ার সময়।

মূলত, ভারতীয় উপমহাদেশে মুঘল আমলে ঈদ উৎসব আরও জাঁকজমকপূর্ণ হয়ে ওঠে। নবাব ও সম্রাটরা ঈদ উপলক্ষে শানশওকত প্রদর্শন করতেন। ঈদগাহে নামায আদায়ের পর মেলার আয়োজন করা হত। এ মেলাগুলোতে বিভিন্ন ধরনের খাবার, পোশাক ও জিনিসপত্র বিক্রি হত। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, খেলাধুলা, আতশবাজি-এইসবের মাধ্যমে ঈদের আনন্দ উদযাপন করা হত।

ব্রিটিশ আমলে ঈদ উৎসব ধর্মীয় অনুষ্ঠানের বাইরেও সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়। শহর ও গ্রামে ঈদের আয়োজন করা হত। ঈদ মেলার আকর্ষণ আরও বৃদ্ধি পায়। ঈদে নতুন পোশাক পরা, আত্মীয়স্বজনের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ, মিষ্টি খাওয়া, ঈদ বাজারে কেনাকাটা-এইসব ঈদের নিয়মিত রীতিনীতিতে পরিণত হয়। ঈদের দিন সকালে ঈদের জামাতে একত্রিত হয়ে নামায আদায় করা হয়। ঈদের নামাযের পর সবে জাকাত বিতরণ করে। ঈদের আচার-অনুষ্ঠান ঈদের আধ্যাত্মিক গুরুত্বকে তুলে ধরে। নামাযের পর একে অপরকে ঈদের শুভেচ্ছা জানায়। ‘ঈদ মোবারক’সহ বিভিন্ন ধরনের শুভেচ্ছা বার্তা ঈদের আনন্দকে আরও মধুর করে তোলে।

ঈদ জামায়াতের পর প্রতিবেশীর সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করে। মিষ্টি খায় এবং বিভিন্ন ধরনের খাবার পরিবেশন করে। ঈদের খাবারে ঐতিহ্যের ছোঁয়া স্পষ্ট। বিভিন্ন ধরনের পিঠা, পায়েস, মাংস, খিচুড়িসহ নানাবিধ উপাদেয় খাবার খাওয়া হয়। প্রতিটি পরিবারের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী খাবার রয়েছে যা ঈদের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে তোলে। ঈদের সময় আত্মীয়স্বজনের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করা ঐতিহ্যের অংশ। ঈদের ছুটিতে অনেকে গ্রামে বাড়ি ফিরে আত্মীয়স্বজনের সাথে সময় কাটান।

ঈদের আনন্দ আত্মীয়স্বজনের সাথে ভাগ করে নেওয়ার মাধ্যমে আরও বৃদ্ধি পায়। ঈদের দিন আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে উপহার বিনিময় করা হয়। এই উপহার বিনিময় ঈদের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে তোলে। ঈদের দিন সরকারি ছুটি থাকে। এই ছুটির দিনগুলোতে অনেকে ভ্রমণে যান বা বিভিন্ন বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেন।

ঈদের দিন বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। গান, বাজনা, নাচ, থিয়েটার-বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ঈদের আনন্দকে আরও বর্ণিল করে তোলে। সময়ের সাথে সাথে ঈদ উদযাপনের রীতিনীতিতে কিছু পরিবর্তন এসেছে। আধুনিকতার ছোঁয়া ঈদের আনন্দকে কিছুটা ভিন্ন করে তুলেছে। তবে ঐতিহ্য এখনও ঈদ উৎসবের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে টিকে আছে। ঐতিহ্য ঈদ উৎসবকে আরও আকর্ষণীয় ও মর্যাদাপূর্ণ করে তোলে।

ঈদ মুসলিম উম্মাহর আনন্দের উৎসব। রমযানের এক মাস রোজা রাখার পর ঈদের দিন সবাইে নতুন পোশাক পরে, সুস্বাদু খাবার খায় এবং আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের সাথে সময় কাটায়। ঈদুল ফিতর কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের চেয়ে অনেক বেশি। এটি একটি সাংস্কৃতিক উৎসব যা আনন্দ, উদ্যাপন এবং পরিবারের সাথে মিলিত হওয়ার সময়। ঈদের আনন্দ শুধু মুসলমানদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং সব ধর্মের মানুষ এই আনন্দে অংশীদার হয়। ঈদের আনন্দ আমাদের মনে আশা, সুখ ও ভালোবাসার বার্তা বহন করে।

বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঈদ উদযাপনের রীতিনীতিতে কিছুটা বৈচিত্র্য ও ভিন্নতা দেখা যায়। ঢাকা ও ঢাকার বাইরে ঈদ জামায়াতে লাখ লাখ মুসলমান একত্রিত হয়, যা বিশ্বের বৃহত্তম ঈদের জামাতের একটি। চট্টগ্রামে ঈদের দিন নৌকা বাইচের আয়োজন করা হয়। ঈদের খাবারেও আঞ্চলিক বৈচিত্র্য ও ভিন্নতা দেখা যায়। সময়ের সাথে সাথে ঈদ উদযাপনের রীতিনীতিতে কিছু পরিবর্তন এসেছে। আধুনিকতার ছোঁয়া ঈদের আনন্দকে কিছুটা ভিন্ন করে তুলেছে।

ঈদের খাবারে ঐতিহ্যের ছোঁয়া এখনও স্পষ্ট। তবে আগে যেখানে ঘরে তৈরি খাবারের উপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হত, এখন বাইরের খাবারের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছে। ঈদের দিন আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে উপহার বিনিময়ের রীতি এখনও প্রচলিত আছে। তবে আগে যেখানে ঐতিহ্যবাহী উপহারের উপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হত, এখন আধুনিক উপহারের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছে।

ঈদের দিন বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। তবে আগে যেখানে ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের উপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হত, এখন আধুনিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছে। ঈদের ছুটিতে অনেকে ভ্রমণে যান। তবে আগে যেখানে দেশের ভেতরে ভ্রমণের উপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হত, এখন বিদেশ ভ্রমণের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছে।

আধুনিকতার প্রভাবে ঈদ উদযাপনের রীতিনীতিতে কিছু পরিবর্তন এসেছে। মানুষ এখন আর আগের মতো ঐতিহ্যের উপর বেশি গুরুত্ব দেয় না। জীবনযাত্রার মান উন্নত হওয়ার ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে মানুষ এখন আরও বেশি টাকা খরচ করে ঈদ উদযাপন করে।

যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে মানুষ এখন দ্রুত ও সহজে দূর-দূরান্ত স্থানে যেতে পারে। সঙ্গত কারণে ঈদের ছুটিতে অনেকে দেশের ভেতরে ও বাইরে ভ্রমণে যান। ঈদ উদযাপনের রীতিনীতিতে পরিবর্তন আসলে ঈদের আনন্দকে কিছুটা ভিন্ন করে তুলেছে। আধুনিকতার ছোঁয়া ঈদের আনন্দকে আরও বর্ণিল করে তোলে।

ঈদ উৎসব অর্থনীতির ওপরও একটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। ঈদের আগে নতুন জামাকাপড়, খাবার, ঘরবাড়ি সাজানোর জিনিসপত্র কেনার জন্য বাজারে প্রচুর কেনাকাটা হয়। এর ফলে ব্যবসায়ীদের ব্যবসা বৃদ্ধি পায় এবং অর্থনীতি গতিশীল হয়। ঈদের ছুটিতে অনেকে ভ্রমণে যান। এর ফলে পর্যটন শিল্প বিকশিত হয় এবং স্থানীয় অর্থনীতি লাভবান হয়।

ঈদ উৎসব মানুষের মানসিক উপরও একটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। রমযান মাসের এক মাস সিয়াম সাধনা করার পর ঈদ আসে। ঈদের আনন্দ মানুষের মনকে প্রফুল্ল করে তোলে এবং তাদের মধ্যে আশাবাদের সঞ্চার করে। ঈদের দিন মানুষ একে অপরের প্রতি ক্ষমাশীল হয় এবং ভালোবাসার বার্তা ছড়িয়ে দেয়।

ঈদ একটি ধর্মীয় ইবাদত ও উৎসব এর তাৎপর্য সুদূরপ্রসারী। বস্তুত, ঈদ একটি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মনোস্তাত্তিক উৎসব, যা আমাদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আমাদের ঈদ উৎসব ঐতিহ্য, আনন্দ এবং সাংস্কৃতিক সমাহারের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। ঈদের আনন্দ শুধু মুসলমানদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং সব ধর্মের মানুষ এ আনন্দে অংশীদার হয়। ঈদ বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

অমুসলিম মনীষী ও পর্যটকদের দৃষ্টিতে ঈদ হলো ভ্রাতৃত্ব, ত্যাগ, সামাজিক সমতা এবং আত্মশুদ্ধির এক অনন্য উৎসব। তারা ঈদকে শুধু মুসলমানদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান হিসেবেই দেখেননি, বরং এটিকে সামাজিক ঐক্যের এক শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবেও অভিহিত করেছেন, যা ধনী-দরিদ্রের ভেদাভেদ দূর করে সবাইকে একই কাতারে নিয়ে আসে। সর্বোপরি অমুসলিম মনীষীন্ মনে করেন, ঈদ হলো একটি সার্বজনীন উৎসব, যা সমাজের সবাইকে ভালোবাসা, সহানুভূতি ও ত্যাগের মাধ্যমে পারস্পরিক সৌহার্দ্য বাড়াতে উৎসাহিত করে।

মূলত, ঈদ মুসলিম উম্মাহর সর্ব বৃহত উৎসব ও মৌলিক ইবাদত। কিন্তু স্থান, কাল, পাত্র ও দেশভেদে এ উৎসব পালনে ভিন্নতা রয়েছে। এমনকি এ অত্যাবশ্যকীয় ও মৌলিক ইবাদতের মধ্যে অনেক অনৈসলামী অনুসঙ্গের অনুপ্রবেশ ঘটেছে; যা কোন ভাবেই কাক্সিক্ষত ও গ্রহণযোগ্য নয়। তাই ঈদ বিষয়ক যেকোনো ইবাদত-বন্দেগী ও উৎসব পালনে কঠোর ইসলামী বিধি-নিষেধ অনুসরণ করতে হবে। অন্যথায় এ উৎসব আমাদের আধ্যাত্মিক বা জাগতিক কোনো কল্যাণ বয়ে আনবে না।

লেখক :

গ্রন্থকার, সাংবাদিক ও কলামিস্ট