আহমদ মতিউর রহমান

রামপুরার বনশ্রী বি ব্লকের ৬ নম্বর রোডটা দিনে যেমন সাধারণ, রাতে ততটাই অস্বস্তিকর। রাস্তার বাতিগুলো সবসময় ঠিকমতো জ্বলে না। মাঝেমধ্যে হঠাৎ নিভে যায়, আবার জ্বলে ওঠে, ঠিক যেন কেউ ইচ্ছে করেই খেলছে আলো-অন্ধকারের সাথে। বি ব্লকের একটি বাড়ির মালিক প্রবাসী এক ব্যক্তি। জটিল নকশাসংবলিত নির্মাণাধীন বাড়িটি ঘিরে মানুষের আগ্রহের কমতি নেই। বাড়ির মালিক যখন ঢাকা আসেন তখনই বাড়িটির নির্মাণ কাজ চলে, তিনি না থাকলে কাজ প্রায় বন্ধ থাকে। দিনের পর দিন নির্মাণ কাজ বন্ধ থাকায় অনেকের মনে নানা জল্পনা-কল্পনার সৃষ্টি হয়েছে। সবাই এই বাড়িটিকে ‘ভূতের বাড়ি’ বলেই চেনে। স্থানীয় রিকশাচালকেরাও এক নামে চেনেন। ভিন্ন ধরনের নকশা দেখেই মানুষ এটিকে ভূতের বাড়ি নাম দিয়েছে, এমনটাই মনে করেন অনেকে।

অনেকেই বাড়িটি দেখতে আসে। এই রোডের মাঝামাঝি একটা সাততলা ভবন। রঙ একসময় ছিল সাদা, এখন ধূসর হয়ে গেছে। ভবনের পাঁচতলায় থাকেন মধ্যবয়সী ভদ্রলোক তারিক উমর। ঐ বাড়ি নিয়ে তার আসলে কোন আগ্রহ নেই। ভিন্ন ডিজাইনের একটি বাড়ি। আর ভূতপ্রেতে মোটেই বিশ্বাস নেই উমরের। তিনি একটি বইতে পড়েছিলেন, পানি জমে ররফ হয় আর অন্ধকার জমে ভূত হয়। আসলে ভূত বলে কিছু নেই। ভূত থাকে মানুষের মনে।

এখন দুপুর। রোদের বেশ তেজ। জোর বাতাসও বইছে। সামনের একটি বাড়ির গেটের কাছে লাগানো নিম গাছটির পাতা বাতাসে দুলছে।

উমর ব্যবসায়ী মানুষ। ঢাকায় কাপড়ের পাইকারি ব্যবসা। বাইরে থেকে দেখলে একদম সাধারণ, পরিপাটি শার্ট, চোখে চশমা, কথাবার্তায় ভদ্র। সাততলা ভবনের পাঁচতলার ফ্ল্যাটে তিনি থাকেন। তারিক উমরের কিছু কিছু খটকা বেশ ভাবিয়ে তোলে। তার সাথে থাকেন স্ত্রী মেহজাবিন খান আর ১৭ বছরের মেয়ে আদিবা। উমর ভূতের বাড়ি পার হয়ে তার বাসায় যাওয়া আসা করেন। যে সব বিষয়ে তার খটকা তা তিনি স্ত্রী আর মেয়েকে শেয়ার করতে চান না। আদিবা সবেমাত্র কলেজে ভর্তি হয়েছে। কাছেই কলেজ। বনশ্রী আর আফতাব নগরের মাখখানের খালটা কাঠের সাঁকো দিয়ে পার হয়ে কলেজে যায়। একটা দল হয়েছে, তাদের সাথেই আসা যাওয়া করে। মা মেহজাবিন বাসাতেই থাকেন। মাঝে মাঝে এখানে সেখানে যান।

খটকাটা তারিকের মনেই থাকে। কাউকে বলা হয় না।

২.

রাত তখন প্রায় সাড়ে দশটা।

আদিবা নিজের ঘরে পড়ছিল। হঠাৎ করেই সে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থমকে গেল।

: “আম্মু” । কণ্ঠটা কেঁপে উঠল।

মেহজাবিন রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন।

: “কি হয়েছে?”

আদিবা ফিসফিস করে বলল,“দেয়ালের ওদিকে কেউ হাঁটছে, শব্দ পাচ্ছি।”

মেহজাবিন বিরক্তির ভঙ্গিতে বললেন,

: “এই বয়সে এসব কল্পনা কেন করিস? পাশের ফ্ল্যাটের শব্দ হবে।”

কিন্তু আদিবার চোখে ভয়।

: “না আম্মু শব্দটা ঠিক মানুষের মতো না।”

ঠিক তখনই টুপ টুপ খালি পায়ের হাঁটার শব্দ। ড্রয়িংরুমের দিক থেকে। মেহজাবিন এবার চুপ করে গেলেন। রাস্তার দিকে তাকালেন জানালা গলিয়ে। স্ট্রিট লাইট যথারীতি নিভে আছে। এলাকাটা অন্ধকারে আচ্ছন্ন।

: শুনছ? এদিকে এস। তিনি স্বামী তারিককে ডাকলেন।

কোনো উত্তর নেই।

তারিক উমর তখন ড্রয়িংরুমে ছিলেন। কিন্তু তিনি অন্য কিছু দেখছিলেন, যেটা স্ত্রী কিংবা মেয়ে কেউই দেখছিল না।

ড্রয়িংরুমের এক কোণে, জানালার পাশে, একজন বয়স্ক লোক দাঁড়িয়ে।

চুল ধবধবে সাদা। মুখ কুঁচকে গেছে। চোখ দুটো অদ্ভুতভাবে জ্বলজ্বল করছে। না এটা কোন ভূত প্রেত নয়, আবার মানুষও নয়। কি সেটা তারেক অনুমান করেন মাত্র।

তারিক ধীরে বললেন,

: “আপনি আবার এলেন” ?

বয়স্ক লোকটা মুচকি হাসল।

: “এটাই তো আমার জায়গা, তারিক।”

তারিক নিচু স্বরে বললেন,

: “আজকে আসার কথা ছিল না। মেয়েটা বড় হয়ে গেছে। ও বুঝতে শুরু করেছে।”

লোকটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

: “তানহাও তো বুঝতে শুরু করেছিল।”

এই নামটা শোনামাত্র তারিকের শরীর শিউরে উঠল।

তানহা।

এই ভবনের কেউ জানে না নামটা। কেউ জানে না গল্পটা।

লোকটা জানালার বাইরে তাকাল। বাইরে অন্ধকার।

: “আমি মেয়েটার খবর নিতে আসি, তারিক। শুধু একটিবার।”

তারিক কড়া গলায় বললেন,

: “আপনি জানেন, ও বেঁচে নেই।”

লোকটা হেসে উঠল। সেই হাসিতে দাঁত নেই, কিন্তু ভয় আছে।

: “জীনের কাছে বাঁচা-মরা আলাদা না।” বলল বুড়ো।

ঠিক তখনই পেছন থেকে আদিবার কণ্ঠ

: “আব্বু?”

তারিক ঘুরে তাকালেন। আদিবা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে।

: “কার সাথে কথা বলছ?”

তারিক দ্রুত বললেন,

: “কারো সাথে না। ফোনে কথা বলছিলাম।”

আদিবা সন্দেহভরা চোখে তাকাল।

: “কিন্তু আব্বুৃ আমি তো কারো গলার আওয়াজ পেলাম।”

তারিক কিছু বলার আগেই হঠাৎ ঠান্ডা বাতাস। ড্রয়িংরুমের পর্দা দুলে উঠল।

আদিবা চিৎকার করে উঠল,

: “আম্মু!”

মেহজাবিন দৌড়ে এলেন।

: “কি হয়েছে?”

আদিবা কাঁপতে কাঁপতে বলল,

: “এই ঘরে কেউ ছিল!”

মেহজাবিন চারদিকে তাকালেন। কেউ নেই।

তারিক উমর নিশ্চুপ। কারণ তিনি জানেন লোকটা মিলিয়ে গেছে। যেমন সে সবসময়ই যায়।

৩.

এই ভবনে অনেকদিন ধরেই গুজব। কেউ বলে পাঁচতলায় রাতে দরজা নিজে নিজে খোলে।

কেউ বলে, লিফট মাঝেমধ্যে পাঁচতলায় আটকে যায়, যদিও কেউ ওঠে না।

কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর কথাটা শোনা যায় দারোয়ানের মুখে।

: “এই ভবনে এক বুড়ো জীন থাকে।”

দারোয়ান বলেছিল,

: “রাতে ওকে দেখছি। মেয়ের নাম ধরে ডাকে।”

কেউ বিশ্বাস করে না। কেউ শুনেও চুপ থাকে।

কারণ এই শহরে ভয় পাওয়ার সময় নেই।

১২ বছর আগের কথা। এই ভবনেরই পাঁচতলায় থাকত আরেক পরিবার। তাদের একমাত্র মেয়ে তানহা। বয়স তখন ১৫। এক সন্ধ্যায় তানহা ছাদে উঠেছিল। এরপর আর নামেনি।

পুলিশ বলেছিল, আত্মহত্যা। কিন্তু তারিক জানেন, সেটা সত্য নয়।

পরদিন তানহার লাশ পাওয়া যায়।

আর সেই দিন থেকেই জীনটা মাঝে মাঝে আসে।

তারিক সাহেব প্রথম জীনটাকে দেখেছিলেন কিছু দিন আগে। ছাদের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা বয়স্ক জীন। কণ্ঠটা ভাঙা, কিন্তু কণ্ঠে ছিল হাহাকার।

: সালাম নিন। বলে ওঠেন বয়স্ক জীন।

: ওয়ালাইকুম সালাম। আপনি কে? কি চান?

: আমি কিছু চাই না। আমার মেয়ের খোঁজ নিতে আসি।

: কে আপনার মেয়ে?

: “ও আমার মেয়ে, ওকে কেউ দেখতে পায় না?” তিনি নাম বলেন না।

তারিক ভয়ে কথা বলতে পারেননি। তার পর মিলিয়ে যায়।

সেই রাতেই আবার হাজির হলো সে। ঘড়িতে তখন রাত ২টা।

তারিকের চোখ খুলে গেল। বুকের ওপর চাপ অনুভব করলেন।

বিছানার পাশে বসে আছে বয়স্ক জীন।

: “চুপ করুন,” তারিক ফিসফিস করে বললেন।

: “ওরা জেগে উঠবে।” তারিক সাহেবের গলা শুকিয়ে গেল। তিনি আবার জানতে চান,

: “আপনি কি চান?”

জীন ধীরে বলল,

: “তানহার মতো আরেকটা মেয়ে।”

তারিকের চোখ বিস্ফারিত।

: “মানে?”

জীন তাকাল পাশের ঘরের দিকে যেখানে আদিবা ঘুমাচ্ছে।

: “শুধু একটু সময়,” সে বলল।

: “আমি বাবা।” তারিক চিৎকার করতে চাইলেন। পারলেন না।

কারণ ঘরের বাতাস জমে বরফ হয়ে গেছে।

৪.

রাত তিনটার দিকে আদিবার ঘুম ভাঙল।

কারণ. কেউ তার নাম ধরে ডাকছে।

: “আদিবাৃ”

স্বপ্নের মতো নরম কণ্ঠ, কিন্তু কানে ঢুকতেই বুকের ভেতর কেমন জানি কেঁপে উঠল।

সে উঠে বসে চারপাশে তাকাল। ঘর অন্ধকার। জানালা বন্ধ। ফ্যান চলছে।

: “আম্মু?”

কোনো উত্তর নেই। আবার সেই কণ্ঠ

: “এখানে এসো”

আদিবা ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নামল। দরজার কাছে গিয়ে থমকে গেল। দরজার ফাঁক দিয়ে ড্রয়িংরুমের আলো জ্বলছে। এত রাতে আব্বু জেগে?

দরজা খুলতেই সে দেখল তারিক উমর সোফায় বসে আছেন। কিন্তু তার সামনে আরেকজন। পরিষ্কার বোঝা যায় না। আবছায়ার মতো। মনে হয় একজন বুড়ো লোকের অবয়ব। আবছায়াটার পা মেঝেতে লাগছে না। আদিবার গলা শুকিয়ে গেল।

: “আ আব্বুৃ”

তারিক ঝট করে ঘুরে তাকালেন।

: “আদিবা! ঘুমাওনি কেন?”

বুড়ো লোকটার আবছায়া ধীরে ঘুরল বলে মনে হল। তার চোখ দুটো যেন অনেক পুরোনো। অনেক কান্না জমে আছে সেখানে।

সে ফিসফিস করে বলল,

: “তানহা”

আদিবা চিৎকার করতে যাচ্ছিল। তারিক দৌড়ে এসে মুখ চেপে ধরলেন।

: “চুপ! চুপ কর!”

আদিবার চোখে পানি। সে লোকটার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। কিন্তু স্পষ্ট কিছু দেখতে পাচ্ছে না।

: “আব্বুৃ উনি কে?”

তারিক কিছু বলার আগেই বুড়ো জীন কথা বলল,

: “আমি কাউকে ভয় দেখাতে আসিনি।” তুমি ভয় পেয়ো না।

তার কণ্ঠ আশ্চর্যভাবে শান্ত।

: “আমি শুধু আমার মেয়েকে খুঁজি।”

আদিবা কাঁপতে কাঁপতে বলল,

: “আমি তানহা না”

জীন মৃদু হাসল।

“আমি জানি। কিন্তু তুমি ওর মতো।”

এই কথা বলেই সে মিলিয়ে গেল। ঘর আবার স্বাভাবিক।

আদিবা হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল।

: “আব্বুৃ এটা কী?”

তারিক মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন। তার নিজের চোখেও পানি।

“কাল সব বলবো, এখন ঘুমাও।” তিনি বললেন।

কিন্তু সেই রাতে আর কেউ ঘুমাতে পারেনি।

৫.

সকালে মেহজাবিন লক্ষ্য করলেন, তারিক অস্বাভাবিক।

চা হাতে নিয়ে তিনি বললেন,

: “গত রাতে তুমি আবার জেগে ছিলে, তাই না?”

তারিক সাহেব চুপ।

: “আদিবা ভয় পেয়েছে। কিছু একটা লুকাচ্ছো তুমি।”

তারিক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

: “এই বাসা ঠিক বাসা না।”

মেহজাবিন ভ্রু কুঁচকালেন।

: “মানে?”

তারিক ধীরে ধীরে সব বললেন।

তানহা। ছাদ। জীন এবং সেই রাতের বিবরণ।

মেহজাবিনের চেহারা ফ্যাকাসে হয়ে গেল।

: “তুমি এতদিন এটা লুকালে?”

: “আমি ভেবেছিলাম চলে যাবে, কিন্তু ও যাচ্ছে না।” তারিক বললেন।

মেহজাবিন কাঁপা কণ্ঠে বললেন,

: “আমাদের এখান থেকে চলে যেতে হবে।”

তারিক মাথা নাড়লেন।

ঠিক তখনই কলিংবেল বেজে উঠল। দরজা খুলতেই দারোয়ান দাঁড়িয়ে।

: “স্যার”। সে নিচু স্বরে বলল,

“রাতে আবার ছাদে কেউ ছিল।”

তারিকের বুক ধক করে উঠল।

: “কী দেখেছ?”

: “এক বুড়ো মানুষ,”

দারোয়ান বলল।

: “মেয়ের নাম ধরে ডাকছিল, তানহা তানহা”।

পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন মেহজাবিন। শুনে চেয়ারে বসে পড়লেন।

৬.

এই ভবনের নির্মাণের সময় ১২ বছর আগে এক দুর্ঘটনা ঘটেছিল। এক শ্রমিক মারা যায়।

নামও ওমর। তানহার বাবা। দারোয়ানের কাছ থেকে এই বিবরণ শুনে তারিকের চোখ স্থির হয়ে গেল।

দারোয়ান বৃদ্ধ তোতা মিয়া। মুখে চাপ চাপ দাড়ি। সিরাজগঞ্জের দিকে বাড়ি। বয়স চল্লিশের কোঠা ছাড়িয়েছে। তবে লোকটা বেশ সাহসী। এই ভয়ের এলাকায় এই ফ্লাট বাড়িতে কাটিয়ে দিয়েছে অনেকগুলো বছর।

উমর ফিসফিস করে বললেন তোতা মিয়াকে, আগে এসব তো বলোনি।

তোতা মিয়া হাসে। সে ভেবে পায় না কি বলবে। সে জানালো,

: সেই দিনই স্যার ওমরের মেয়ে তানহাও মারা যায়। মাইয়াডা শোক সহ্য করতে পারে নাই। কাছাকাছি কোথাও ছিল ওমরের বাসা। তানহার মা শোক বুকে চেপে ভাইয়ের বাড়িতে চলে যায়।

দাড়োয়ান আবার বলতে শুরু করে।

: তার পর তানহার খোঁজে আসতে থাকেন এই বুড়ো জীন। তানহাকে তিনি খুব আদর করতেন। ওমরের সাথে আর তানহার সাথে বুড়োর কি সম্পর্ক কোন দিন বলেনি জীন। তানহাকে দেখতে এসে আবার চলে যান। কারো ক্ষতি করেন না।

: সে আমার সামনেও আসে। তবে সালাম দিয়ে মিলিয়ে যায়। বললেন উমর।

: জি স্যার, শুনছি ভাল মানুষ হইলে সে দেখা দেয়, বদলোকের সামনে দেখা দেয় না।

৭.

মেহজাবিন বাসায় নেই। মৌচাক মার্কেটে গেছেন এক বান্ধবীর সাথে। পথেই কথা উঠলো তাদের বাসার বিষয় নিয়ে। তার মানে শুধু পারভীন ভাবী নয়, বোধহয় আরো কেউ জানে বিষয়টা।

: কি বলেন ভাবী? ও তেমন কিছু না। বললেন মেহজাবিন। এটা বলে কাটাতে চাইলেন। তবে কু কথা বাতাসে রটে, এটা মনে হলো তার।

: না না তেমন কিছু না ভাবী। পারভীন বিষয়টা হালকা করার চেষ্টা করেন। পারভীন কয়েক বিল্ডিং পরের একটি ফ্লাটে থাকেন। দু’জন মাঝে মধ্যে এক সাথে মার্কেটে শপিং এ যান। সম্পর্কটা সে থেকেই।

কথা আর বাড়ান না মেহজাবিন। তবে মনটা খচ খচ করে। কিছু একটা করতে হবে।

রাতেই স্বামীর সাথে কথা বলতে হবে।

অবশ্য তার আর প্রয়োজন হলো না।

দারোয়ানের কাছে বাসা ছাড়ার কথা বলে কাজে চলে গেছেন উমর। খবরটা যেন ফ্লাটের মালিক মিজান সাহেবকে পৌঁছে দেয় দারোয়ান। তারিক মনস্থির করে ফেলেছেন এই বাসায় আর থাকা চলে না। কোন দিন তার মেয়ে বা স্ত্রী বড় কোন বিপদে পড়েন। চোখের আড়াল হলে বুড়ো জীন হয়তো শান্ত হবে। রাতে বাসায় ফিরে এই কথা জানালেন মেহজাবিনকে। শুনে মেহজাবিন দোয়া দুরুদ পড়তে থাকেন।

রাত নেমে আসে। ভয়ংকর অন্ধকার রাত। রাস্তাটা অন্য দিনের চেয়েও যেন অন্ধকার।

রাতে আবার এলেন বুড়ো। এবার একা না।

তার সাথে এক কিশোরী ছায়া। চুল লম্বা। চোখ খালি।

তানহা।

: আমার আদরের তানহা। আপনার সাথে দেখা করতে এসেছে। বললেন বুড়ো জীন।

: তার দরকার ছিল না। আপনার কাছেই তো জানতে পাই। বললেন উমর।

: ভাবলাম আপনি চলে যাবেন, একবার দেখা হওয়া দরকার।

অবাক হন উমর। বুড়ো জিন জানতে পেরে গেছে সব?

এমন সময় আদিবা চিৎকার করে উঠল।

: “আব্বু! ওটা কে?”

জীন শান্ত গলায় বলল,

: “আমার মেয়ে। ’ তারিক বললেন,

: “আপনি যান, ও ভয় পাবে”।

জীনের চোখ কঠিন হয়ে উঠল।

: না না, আমি তো কারো ক্ষতি করি না।

হঠাৎ বাতাস থেমে গেল। ঘরের আলো নিভে গেল।

তানহার ছায়া আদিবার দিকে এগোতে লাগল। আদিবা আবছা আবছা কিছু দেখতে পেয়ে আব্বুকে জড়িয়ে ধরল। তবে অবাক কান্ড, মেয়েটা দেখতে যেন তারই মতো। এতে আরো ভয় পেয়ে যায় আদিবা।

ড্রয়িংরুম অন্ধকার। নীরবতা নেমে এসেছে। ফ্যান থেমে গেছে। তানহা বা বুড়ো জীনকে আর দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না।

ঘরের বাতাস ভারী, শ্বাস নিতেও কষ্ট।

জানালার পর্দা কেঁপে উঠল। মনে হলো কে বা কারা যেন সে পথে বের হয়ে গেল।