মুহাম্মদ নিজাম উদ্দিন

যে সব আনুষ্ঠানিক উৎসব মুসলমানদের অস্তিত্বের জানান দেয় ‘ঈদ’ তার অন্যতম। ‘ঈদ’ শব্দটি আরবি। যা আওদ্ থেকে উৎকলিত। এর শাব্দিক অর্থ ঘুরে ঘুরে আসা, প্রত্যাবর্তন করা। প্রচলিত অর্থে ঈদ মানে আনন্দ বা খুশি। যেহেতু এ আনন্দ বছর ঘুরে ফিরে আসে এজন্য ঈদকে ‘ঈদ’ বলে নামকরণ করা হয়েছে। মুসলমানদের জাতীয় সাংস্কৃতিক চেতনার প্রধান হাতিয়ার হচ্ছে ঈদ। প্রতি বছর পালিত হয় ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা নামে দু’টি উৎসব।

সর্বাধিক মহিমান্বিত ও সাওয়াবে ভর্তি মাস পবিত্র রামাদ্বানের পরেই চন্দ্র বর্ষের দশম মাসের সূচনা দিনের মধ্য দিয়েই মাহে সাওয়ালের আগমন। সাওয়ালের বাঁকা চাঁদ বয়ে আনে মুমিন মুসলমানের আনন্দ উৎসবের এক গুচ্ছ স্লোগান: ‘ঈদ ঈদ ঈদ!/ হে! মোবারক ঈদ!/ তুমি আসবে বলে/ চোখে নেই নিদ।’ ঈদ প্রতিটি মুসলিম নর-নারী, শিশু-কিশোর, যুবক-বৃদ্ধ, তরুণ-তরুণীর মনে নির্মল আনন্দের স্নিগ্ধ পরশ বুলিয়ে দেয়। মুসলমানদের জন্য এ যেন এক মহোৎসবের দিন।

ইসলামের ইতিহাস পাঠে জানা যায় মদীনাবাসী জাহেলী যুগ থেকে শরতের পূর্ণিমায় ‘নওরোজ’ এবং বসন্তের পূর্ণিমায় ‘মেহেরজান’ নামে দু’টো উৎসব পালন করতো। আরবরা এ উৎসবে অশ্লীল কর্মকাণ্ড, কুরুচিপূর্ণ কাজ ও আদিম উচ্ছ্বলতায় মেতে ওঠতো। সেগুলো ছিল উচ্চবিত্তের খেয়ালিপনার উৎসবÑ যা ছিল ইসলামের সাথে সামঞ্জস্যহীন। এ ব্যাপারে হযরত আনাস রাদ্বি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘‘বিশ্বনবী (সা.) যখন (৬২২ খ্রিষ্টাব্দে) পবিত্র মক্কা নগরী থেকে হিজরত করে মদীনায় তাশরীফ আনলেন, তখন তাদেরকে (বৎসরে) দু’দিন খেলাধুলা করতে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, এ দু’দিন কিসের? তারা জবাবে বললেন, জাহেলী যুগে আমরা এই দুই দিবসে খেলাধুলা বা আনন্দ প্রকাশ করতাম। অতঃপর রাসূলে পাক (সা.) বললেন, ‘আল্লাহ তায়ালা উপর্যুক্ত দিন দু’টির পরিবর্তে তা অপেক্ষা উত্তম দু’টি দিন তোমাদের খুশি প্রকাশ করার জন্য দান করেছেন- এর একটি হচ্ছে ‘ঈদুল আযহা’ এবং অপরটি হচ্ছে ‘ঈদুল ফিতর’। তখন থেকেই ইসলামী শরীয়তে দু’টি ঈদ অনুষ্ঠান পালিত হয়ে আসছে।

বাংলা সাহিত্যে ঈদুল ফিতরের আনন্দ, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের বার্তা নিয়ে অনেক কবি-সাহিত্যিক কবিতা ও প্রবন্ধ লিখেছেন। ঈদ নিয়ে প্রথম বাংলা কবিতা রচনার নিদর্শন পাওয়া যায় ১৯০২ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতার মাসিক ‘প্রচারক’ পত্রিকায়। এই পত্রিকায় চতুর্থ বর্ষ ৯-১০ সংখ্যায় মুন্সী মোহাম্মদ আসাদ আলী রচিত ‘ঈদুল-আজহা’ নামে একটি কবিতা প্রকাশিত হয়। ড. আনিসুজ্জামান সম্পাদিত মুসলিম বাংলার সাময়িক পত্র (১৯৬৯) থেকে এ তথ্য জানা যায়। অন্যদিকে সৈয়দ এমদাদ আলী দাবি করেছেন, ১৯০৩ সালের ডিসেম্বর মাসে মাসিক ‘নবনূর’ পত্রিকায় ‘ঈদ’ নামে যে কবিতাটি প্রকাশিত হয় সেটিই মুসলিম বাংলার ঈদ বিষয়ক প্রথম কবিতা। সৈয়দ এমদাদ আলী ১৯০৪ সালেও ঈদ নিয়ে আরেকটি কবিতা লেখেন। পরবর্তীতে কায়কোবাদ, মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, কাজী নজরুল ইসলাম প্রমুখ কবিগণ ঈদ নিয়ে কবিতা রচনা করেন।

কবি নজরুলের ‘কুরবানী’, ‘ঈদ মোবারক’, ‘শহীদী ঈদ’, ‘কৃষকের ঈদ’ বাংলা কাব্য সাহিত্যে মূল্যবান সংযোজন। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো: কাজী নজরুল ইসলামের ‘ও মন রমযানেরই রোযার শেষে এল খুশির ঈদ/ তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন আসমানি তাগিদ’ গানটি। এ গানের মাধ্যমে তিনি ঈদের আনন্দকে চিরস্থায়ী করেছেন। নজরুল কবিতা ও গানের মাধ্যমে সাম্য ও ত্যাগের বাণী প্রচার করেছেন। তিনি লিখেছেন- “ঈদ্-অল-ফিতর আনিয়াছে তাই নব বিধান, ওগো সঞ্চয়ী, উদ্বৃত্ত যা করিবে দান, ক্ষুধার অন্ন হোক তোমার!” নজরুলের লেখায় ঈদ কেবল আনন্দের উৎসব নয়; বরং এটি ত্যাগ, ভ্রাতৃত্ব, ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান দূর করা এবং ইসলামি মূল্যবোধের প্রতীক। তাঁর লেখা “ঈদ মোবারক” কবিতায় তিনি দোস্ত-দুশমন ভুলে ভ্রাতৃত্বের হাত মেলানোর আহ্বান জানিয়েছেন। এছাড়া সৈয়দ এমদাদ আলী, কায়কোবাদ, গোলাম মোস্তফা, বেগম রোকেয়া, মীর মশাররফ হোসেন, জসীম উদ্দীনসহ বহু কবি ঈদকে কেন্দ্র করে কবিতা ও গদ্য সাহিত্যে অবদান রেখেছেন। তাঁদের কাব্যে ঈদের আনন্দ, সাম্য ও গ্রামীণ মুসলিম জীবনের চিত্র ফুটে উঠেছে।

বাংলা সাহিত্যে ঈদের লেখনীতে সাধারণত এক মাস সিয়াম সাধনার পর আনন্দ, সাম্য, দরিদ্রের প্রতি সহানুভূতি এবং ভ্রাতৃত্ববোধ ফুটে ওঠে। ঈদকে ঘিরে এই সাহিত্যকর্মগুলো মূলত মুসলমান সম্প্রদায়ের এই বড় উৎসবের আত্মিক অনুভূতি ও আনন্দের রূপায়ণ। সাহিত্যে ঈদুল ফিতর ও মুসলিম সংস্কৃতি প্রধানত ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ও বিংশ শতাব্দীর শুরুতে জায়গা করে নেয়। এতে কবিতা, ছোটগল্প ও উপন্যাসে সেমাই, নামায, নতুন পোশাক এবং সামাজিক ভ্রাতৃত্বের অনন্য দলিল উঠে এসেছে। গ্রামের সাধারণ মানুষের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার চিত্র জসীম উদ্দীনের কাব্যে পাওয়া যায়। সাহিত্যে ঈদ কেবল একটি উৎসব নয়; বরং ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য ভুলে সবাইকে এক কাতারে আসার সাম্যবাদী বার্তার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত হয়।

কবি ফররুখ আহমদের কাব্যে ইসলামী ঐতিহ্যের সাথে সাথে মানবিক বোধের প্রতিফলন দেখা যায়। তাঁর ‘ঈদগাহ হবে দুনিয়াটাই’ কবিতা এ প্রসঙ্গে স্মরণযোগ্য। কবি বলেন: ‘আজকে এল খুশীল ঈদ/ দেখনা চেয়ে খুশীর চিন/ দেখনা চেয়ে আজ রঙিন/ খুশীর ঝলক ঈদগাহে।’ (হরফের ছড়া) অপরদিকে কবি আল মাহমুদ তাঁর ‘গৃহলতা’ কবিতায় স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন তাঁর শৈশবের ঈদের কথা স্মরণ করে। যেমন তিনি বলেন: ‘ঈদের দিনে জিদ ধরিনা আর/ কানে আমার বাজেনা সেই/ মায়ের অলঙ্কার।’ কবি আবদুল হাই সিকদারের কবিতায় রমযান ও ঈদের বৈশিষ্ট্য উঠে এসেছে এভাবেÑ ‘খুলে প্রাণ/ রমযান/ ঈদ এলো ফিতরের,/ দূরে যায়/ শংকায়/ কষ্টরা ভিতরের। একমাস/ পরে মহাউৎসব,/ কেউ নাই/ পর ভাই/ ভেদাভেদহীন সব।’

বাংলা সাহিত্যে ঈদের বর্ণনায় চাঁদ দেখা, ঈদের নামায, কোলাকুলি, সেমাই বা ফিরনি রান্না এবং নতুন পোশাক পরার সংস্কৃতি বারবার উঠে এসেছে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষে মুসলিম সাহিত্যিকরা নিজস্ব সংস্কৃতির উপাদান হিসেবে ঈদকে সাহিত্যে উপস্থাপন শুরু করেনÑ যা পরবর্তীতে বাঙালি সংস্কৃতি ও সাহিত্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। বাংলা সাহিত্যে ঈদুল ফিতর কেবল উৎসবের আমেজ নয়; বরং বাঙালি মুসলিম সমাজের সামাজিক ও আধ্যাত্মিক জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন

ঈদে সকলের মাঝে সাম্য, মৈত্রীর বন্ধন জোরদার হয়ে উঠুক। শান্তির বিপরীতে অশান্তি আর আনন্দের পরিবর্তে দুঃখ-কষ্ট ও শোকগাথা আর্তনাদ যতই আসুক, মানুষকে ঘুরে দাঁড়াতেই হবে। আমাদের প্রত্যাশা, এই নিশ্চল পৃথিবী আবার জেগে উঠবে। দুঃখ-বেদনাকে জয় করে হাসি-কান্নায় আপ্লুত জনজীবনের সংকট ও প্রতিবন্ধকতাকে সঙ্গে নিয়েই মানুষের জীবন। সকলের মাঝে তৃপ্তি, প্রশান্তি ও আনন্দধারা নেমে আসুক। সকলের মাঝে নেমে আসুক স্বস্তি ও শান্তির ছোঁয়া। ঈদ আসুক সবার ঘরে। ঈদ আসুক সবার তরে।

লেখক: কবি, গল্পকার ও

অবসরপ্রাপ্ত সহকারী অধ্যাপক (বাংলা)