সাইদুর রহমান

গভীর রাতে বাসায় ফিরে বউয়ের জ্বালাময়ী কটু কথা সহ্য করে বসে রইল আবির। বউ বক বক করতেই থাকে। রিনা খানের মতো জ্বালাময়ী ভাষণ। মায়ের পক্ষ নিয়ে ছেলেটাও বাবার বিরুদ্ধে বলতে লাগলো। মনে হলো যেন তারা আজ প্ল্যান করে লেগেছে, বউ তার স্বামীকে এবং সন্তান তার বাবাকে উচিত শিক্ষা দেবে। বাবার অপরাধ, রাত করে বাসায় ফেরা। সারা দিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেও সন্তান এবং বউয়ের চাহিদা না মেটাতে পারা। আসলে সত্যি বলতে কি দারিদ্র্যই হচ্ছে তাদের সমস্যার মূল কারণ। ছোটবেলায় আবির পড়েছিলÑ অভাব দরজায় এসে দাঁড়ালে, ভালোবাসা জানালা দিয়ে পালায়। আজ সেটা সে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে।

আবিরের বাবা ছিল একজন ভূমিহীন কৃষক। মা লেখাপড়া না জানা একজন গৃহিণী। একেবারে গ্রামে বেড়ে ওঠে আবির। মানুষের জীবনে দুঃখই হচ্ছে আসল ঠিকানা। সুখ সামান্য একটা অনুভূতি মাত্র। দুঃখ হচ্ছে মানুষের ঐশ্বর্য। আসলে মানুষ দুঃখকেই বেশি মনে রাখে। সুখটাকে খুব তাড়াতাড়ি ভুলে যায়।

আবির দেখেছে তার বাবাকে দারিদ্র্যের সাথে যুদ্ধ করে এগিয়ে যেতে। মাকে দেখেছে অসম্ভব কষ্ট করতে। তবুও মা কখনো তার বাবাকে অবহেলা করেনি। অসম্মান করেনি। জীবনের সবটুকু দিয়ে বাবাকে আগলে রেখেছে। যেন বাইরের কোনো অমঙ্গল বাবাকে স্পর্শ করতে না পারে।

ঈদের সময় বাবা বাজার থেকে অনেক কম দামে মায়ের জন্য কাপড় কিনে আনতেন। যেটা ছিল খুবই কম দামি। কাপড়টা থাকত পত্রিকা দিয়ে মোড়ানো। যাতে ভেঙে যাওয়ার হাত থেকে কাপড়টাকে কোনোভাবে দাঁড় করিয়ে রাখা যায়। তবুও আবিরের মা সেই কাপড়টাকে পরম মমতায়, ভালোবাসায় বুকে ধরে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে একটা মলিন হাসি দিয়ে বলতেন, তোমার কাপড়টা তো সুন্দর হয়েছে। তুমি শুধু শুধু কেন এত খরচ করতে গেলে। আমার তো কাপড় ছিল। তুমি তোমার জন্য কিছু একটা কিনতে।

আবিরের বাবা বলতেন, আমি জানি তুমি এ কথাই বলবে। তোমায় যদি আমি সারা জীবন কিছু নাও দিই, তাও কখনো তুমি আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করবে না।

আবির ভাবে, বাবা-মায়ের বিবাহিত জীবনটা কত ভালো ছিল। কেউ কাউকে অভিযোগ করত না। কেউ কাউকে অবহেলা করত না। তাদের সংসারে কত অভাব ছিল। কিন্তু ভালোবাসার কমতি ছিল না।

অথচ তার বউ অহনা কিছু একটা এদিক-ওদিক হলেই বলে, তোমার সাথে বিয়ে করে আমার জীবনটা নিঃস্ব হয়ে গেল। তোমাকে বিয়ে করে আমি কি পেয়েছি। শুধু অভাব আর অভাব।

একদিন অহনা ফোন দিল, বাসায় আসার সময় বাজার করে আনবে।

আবির পকেটের দিকে তাকিয়ে দেখল, বউ যে লিস্ট দিয়েছে তাতে তার বাজার হবে না। তারপর সে অফিসের এক কলিগের কাছ থেকে টাকা ধার করে রাতে বাজার নিয়ে বাসায় ফিরল।

অহনা দেখল, যা যা বলেছে তার ভেতর থেকে মেয়ের দুধ এবং ছেলের স্কুলের খাতা এবং কলম আনেনি।

আর আবির যাবে কোথায়। শুরু হয়ে গেল সেই একই বয়ান। তোমাকে আনতে বললাম কী, আর তুমি আনলে কী। এখন তোমার মেয়ে রাতে কী খেয়ে থাকবে। তাছাড়া তোমার ছেলে সকালে স্কুলে যাবে। ওর খাতা-কলম ছাড়া ও কি নিয়ে স্কুলে যাবে।

আবির অহনার কথার কোনো উত্তর দিল না।

প্রায় প্রতি মাসেই শেষের ১০ দিন খুবই আর্থিক অনটনে কাটে তাদের।

আবিরের ছেলে আসিফ বলল, বাবা তুমি আসলে আমাদের কোনো চাহিদাই পূরণ করতে পার না। আসলে তুমি বাবা হওয়ার যোগ্য নও।

আবির বলল, হ্যাঁ আসিফ আমি বাবা হওয়ার যোগ্য নই। কিন্তু একটা কথা মনে করে দেখ তো, তোমার জন্মের পর থেকে আমি তোমাকে কোনো প্রকার অবহেলা করেছি কিনা। যখন তোমার জন্ম হয়, তার পরের দিন থেকে তোমাকে আমার এই বুকের ওপর রেখে ঘুম পাড়িয়েছি। তুমি যখন প্রশ্রাব-পায়খানা করেছ, তোমার এই বাবা সবকিছু পরিষ্কার করে দিয়েছে। তুমি যখন যা চেয়েছ, সেটা আমার জীবনের সমস্ত শখ অপূরণ রেখে তোমাকে দেবার চেষ্টা করেছি। তোমাকে স্কুলে যাওয়ার রিকশা ভাড়া দিয়ে আমি খালি পকেটে বের হয়ে গেছি। স্কুলের টিফিন কিনে দিয়ে তারপর অফিসে আমি গেছি হেঁটে। দুপুরে না খেয়ে থেকেছি। কিন্তু তোমাদের কখনো না খাইয়ে রাখিনি।

বাসায় তোমাদের সমস্ত অনুযোগ শোনার পর যখন অফিসে যাই, তখন শুনতে হয় অফিসের বসের বকুনি। পান থেকে চুন খসলে তো আর রেহাই নেই। কারণ আমি তো চাকরি করি। আর চাকরি মানেই চাকর। সেটা যেখানেই হোক। বড় কোম্পানি কিংবা ছোট কোম্পানি। পদবি হোক বড় কিংবা ছোট। কাজের বোয়া এবং চাকরি যারা করে তাদের মধ্যে পার্থক্য শুধু এটুকুই। বোয়ারা ইচ্ছে করলে ছুটি কাটাতে পারে। কিন্তু আমরা ছেলেরা যারা চাকরি করি সেটাও পারি না।

হ্যাঁ বাবা, আমি তোমার বাবা হওয়ার যোগ্য নই। এটা আমার অপারগতা। কীভাবে ভালো বাবা হওয়া যায় সেটা আমার জানা নেই। তবে এটুকু জানিÑ অনেক বাবাদের সাধ থাকলেও সাধ্য থাকে না। আজকে তুমি এবং তোমার মা যেভাবে আমার সাথে ব্যবহার করছ, তাতে মনে হচ্ছে আমি তোমাদের জন্য কিছুই করতে পারিনি। আমার সমস্ত জীবনটাই ব্যর্থ।

তবে শোনো বাবা, আমারও সাধ হয়। তোমাদের সব চাওয়া পূরণ করতে। কিন্তু সেখানে আমি তো অপারগ। আমি তো আর তোমাদের জন্য চুরি করতে পারব না।

এ কথা বলে আবির সেই রাতেই বাসা থেকে বের হয়ে গেল। কিন্তু অহনা এবং আসিফ কেউই তাকে আটকানোর চেষ্টা করল না।

সমস্ত রাত রাস্তায় পায়চারি করে সকালে ফজরের নামায শেষ করে বাসায় ফিরল। কেউ কোনো কথা বলল না। আবার সেই নিয়মমাফিক অফিসে যাওয়ার জন্য বের হয়ে গেল। মানিব্যাগ চেক করে দেখল, ফাঁকা। কোথাও কোনো টাকা নেই। বাধ্য হয়ে সে সকালে নাশতা না করে খালিপেটেই হেঁটে অফিসে এলো।

কিন্তু আজ আবিরের কিছুতেই বাসায় ফিরতে ইচ্ছে হচ্ছে না। মনে হচ্ছেÑ যেখানে টাকা দিয়েই মান-সম্মান, ভালোবাসা সবকিছু বিবেচনা করা হয়। যেখানে ভালোবাসার কোনো মূল্য নেই, তার কোনো মূল্য নেই সেখানে না যাওয়াই ভালো। কিন্তু কি এক বন্ধনে আবার ফিরে এলো বাসায়।

সালাম দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল। অহনা সালামের উত্তর দিল। বলল, সারা দিন তুমি কোথায় ছিলে? আমি তো ভেবে নিয়েছিলাম তুমি আর বাসায় আসবে না। ঠিকই তো আবার এলে। এসো হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে রাতের খাবার খেয়ে আমাকে রক্ষা কর।

আবির কোনো কথা না বলে ফ্রেশ হয়ে বেডে চলে গেল।

তার কোনো কথা বলতে ইচ্ছে করল না। তার শরীরটা কেমন যেন জ¦র জ¦র লাগছে।

সে নিজের অজান্তেই ঘুমিয়ে গেল। অনেক রাতে তার ঘুম ভেঙে গেল। পাশে অহনা ঘুমাচ্ছে। কি নির্বিঘ্নে। কত প্রশান্তি। মুখে এক চিলতে হাসি খেলা করছে।

আবির খাট থেকে নেমে বারান্দায় এলো। গভীর রাত। নিস্তব্ধ চারদিক। দূর থেকে কুকুরের ডাক ভেসে আসছে। ঝিঁঝি পোকাগুলো শব্দ করে ডাকছে।

আবির আকাশের দিকে তাকায়। দেখল তারাগুলো সঙ্গীবিহীন একা জেগে আছে। ওর মনে পড়ে, ওর জীবনটাও তো এমনই। চারদিকে কত লোক, কিন্তু ওর আপন বলতে কেউ নেই। সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। ওকে নিয়ে ভাবার, ওকে নিয়ে বোঝার মতো কেউ নেই। আবিরের মনে পড়ে নচিকেতার ওই গানটা, ‘নগর জীবন একই রকম, একই ভাবে বয়ে যায়...।’ মানুষের জীবনে কি টাকা-পয়সাই সব। যদি তাই হয়, তাহলে যাদের অগাধ টাকা আছে তারা কেন আজ পালিয়ে বেড়াচ্ছে। কেন বাংলাদেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। কেন এত ঋণখেলাপি। যারা জনগণের প্রতিনিধিত্ব করবে তাদের ভেতর ৫৯ শতাংশ ঋণখেলাপি। তাহলে তাদের হাতে এ দেশের ভবিষ্যৎ কী! এসব ভাবতে ভাবতে আবির অস্থির হয়ে গেল।

আবির ভাবল, আমার অভাব আছে। কিন্তু আমার মনে শান্তি আছে। আমি না খেয়ে থাকলেও নিজের সম্মান নিয়ে চলতে পারি। ঋণখেলাপিদের মতো আমাকে আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয় না। এসব ভাবতে ভাবতে ফজরের আযান হয়। আবির অজু করে মসজিদে যায়। নামাজ শেষ করে বাড়িতে আসে। যথারীতি ছেলেকে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে অফিসের উদ্দেশ্যে পা বাড়ায়।

এখন রমযান মাস। আর কিছুদিন পরই ঈদ। ছেলে-মেয়ে এবং অহনার জন্য তো কিছু কিনতেই হবে। নিজের জন্য কিছু কেনার ইচ্ছে তার নেই। আসলে বাবারা মনে হয় এমনই। তারা অন্যদের দিতে পারলেই খুশি। বাবাদের আলমারি ভরা কাপড় থাকে না। একটা পুরনো জুতা জোড়া দিয়েই বছরের পর বছর কাটিয়ে দেওয়া যায়। বাবাদের কোনো চাহিদা থাকতে নেই। তারা অন্যদের মাঝেই নিজেদের সুখ খুঁজে পায়।

আবির নিয়মমাফিক অফিস করে আর বাসায় ফেরে। অহনার বকুনি আর ছেলের চাহিদা দিন দিন বাড়তেই আছে। কী করবে সে ভেবে পায় না। ওদেরই-বা দোষ দিয়ে লাভ কী। ওরা তো তাদের চাহিদার বাইরে কিছু চায় না। যেটা প্রয়োজন সেটা দিতে না পারলে তারা তো সেটা বলবেই।

আবির অফিস থেকে বের হলো। অফিসের পাশে যে ফকিরটা ছিল তাকে কিছু দান করল। সে প্রতিদিনই কাউকে কিছু না কিছু দান করে। সে কোথায় যেন পড়েছিল, অভাবের সময় দান করলে আল্লাহ খুশি হয়। কিন্তু সে দান করে নীরবে। যেন কেউ সেটা দেখতে না পায়। আসলে দান সবসময় নীরবেই করতে হয়। অথচ আমাদের সমাজের ধনী এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিরা দান করে নিজেকে জাহির করার জন্য। পত্রিকায় ছবি ছাপানোর জন্য। যে ব্যক্তি তাদের দান নেয়, তারও তো মান-সম্মান আছে, পরিবার আছে, আত্মীয়-স্বজন আছে, তাদের কাছে তাকে কতটুকু ছোট হতে হয়, সেটা কি যারা দান করে তারা কখনো ভেবে দেখেছে।

আবির ভাবতে থাকে, মধ্যবিত্তদের জীবনটাই কষ্টের। তারা না পারে কারো কাছে হাত পাততে। না পারে নিজের এবং পরিবারের চাহিদা মেটাতে। এভাবেই কেটে যাচ্ছে মধ্যবিত্ত পরিবারের বাবাদের জীবন।

আর মাত্র পাঁচ দিন পর ঈদ। গভীর রাত। আবিরের শরীর পুড়ে যাচ্ছে জ¦রে। এখন প্রায়ই ওর রাতে জ¦র আসে। কিন্তু অবহেলা করে কাটিয়ে দেয়। ডাক্তার দেখানোর মতো টাকা ওর কাছে থাকে না। প্রতি মাসে ভাবে এবার টাকা পেলে দেখাবে। কিন্তু বাচ্চাদের স্কুলের বেতন, রিকশা ভাড়া সবকিছু দিয়ে তার কাছে আর কিছুই থাকে না। কিছুক্ষণ পর আবির জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। অহনা এবং আসিফ আবিরকে নিয়ে হাসপাতালে গেল। ডাক্তার কিছু টেস্ট দিল। কিন্তু টেস্ট করানোর মতো কোনো টাকা নেই অহনার কাছে। একান্ত বাধ্য হয়ে অহনা তার বড়লোক বাবার কাছে তার ছেলে আসিফকে পাঠালো। কিন্তু তার বাবা টাকা দিল না। আসিফকে একপ্রকার অপমান করে বাসা থেকে বের করে দিল।

আসিফ খালি হাতে ফিরে এলো। অহনাকে বলল, নানাভাই বলেছে, তার কাছে বাজে খরচ করার মতো কোনো টাকা নেই। তারপর আসিফ গেল, আবিরের অফিসে। ওখানে গিয়ে আবিরের বসকে সব খুলে বলল। সেখান থেকে সে কিছু টাকা পেল। সেই টাকা দিয়ে আবিরের টেস্টগুলো করাল। ডাক্তার বলল, তোমার স্বামীর কিডনি দুটিই নষ্ট। অহনার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। সে কী করবে কিছুই ভেবে পেল না। সে ভাবল, যে মানুষটা সারা জীবন এত কষ্ট করল, আবার তার কিডনি দুটিই নষ্ট। এ কথা আমি আবিরকে কীভাবে বলব। তাছাড়া বলতে তো হবেই। না বললেও তো একদিন না একদিন ও জানতে পারবে।

অহনা আর কিছু ভাবতে পারে না। সে এখন কোথায় যাবে। এতদিন তো তার একজন অবলম্বন ছিল। অভাব থাকলেও আবির তো তাকে কোনোদিনও অবহেলা করেনি। কোনোদিন একটা কটু বাক্যও ওর মুখ থেকে বের হয়নি। অহনাকে কোনোদিন আবির একটুও অসম্মান করেনি। যতটুকু পেরেছে, সবটুকু দিয়েই ওকে আগলে রাখার চেষ্টা করেছে। তারপরও আল্লাহ কেন ওর জীবনটা এমন করল। আঠারো বছর বিবাহিত জীবনে ওকে আমি কখনো কারো সাথে ভালো ছাড়া খারাপ ব্যবহার করতে দেখিনি। কাউকে উপকার ছাড়া অপকার করেনি। কেউ ওকে একটা চড় মারলেও সেটা হজম করে চলে এসেছে। কিন্তু কারো সাথে ঝামেলায় জড়ায়নি। আমি কিছু বললে, বলেছে যার যতটুকু জ্ঞান সে তো সেই ব্যবহারই করবে। কেউ যদি ইচ্ছা করে ওকে ধাক্কা দিয়েছে, ও নিজে সরি বলে সেখান থেকে চলে এসেছে। অহনা আর ভাবতে পারে না। তার দুই পা অবস হয়ে যাচ্ছে। মাথাটা কেমন যেন চক্কর দিয়ে উঠছে। ও এখন কী করবে। এত ব্যয়বহুল চিকিৎসা ও কীভাবে করাবে।

আবির জানতে পারল তার দুটি কিডনিই নষ্ট। সে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না। আনমনে দু’চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। সে মুখে কিছুই বলতে পারল না অহনাকে। শুধু অপলক চেয়ে রইল অহনা, আসিফ এবং ওর মেয়ের দিকে।

আবির আসিফকে কাছে বসিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে চোখে-মুখে চুমু খেল। আর বলল, তোমার মাকে দেখে রেখ। আমাকে পারলে তুমি ক্ষমা করে দিও। আমি তোমার জন্য হয়তো কিছুই করতে পারলাম না। আমি তোমার খারাপ বাবা। খারাপ বাবার মৃত্যুর পর তাকে মাটিটা অন্তত দিও।

হাসপাতালে দুইদিন থাকার পর আবিরকে ডাক্তার ছেড়ে দিল।

ডাক্তার অহনা এবং আসিফকে বলল, আবির আর বেশিদিন বাঁচবে না। শুধু টাকা খরচ করে আর লাভ নেই। ওনাকে বাসায় নিয়ে যান।

ঈদের মাত্র একদিন আগে আবির মারা গেল। আবিরের লাশ নিয়ে ওরা গ্রামের বাড়িতে গেল। যখন অন্যরা নতুন জামা-কাপড় পরে আনন্দ করছে, তখন ওদের জীবন কাটছে এক অনিশ্চয়তার মধ্যে। ওদের ঈদের দিনটা কাটল সবচেয়ে কষ্টে। চারদিকে ওরা অন্ধকার দেখতে লাগল।

আবির সমস্ত কষ্ট, সমস্ত যন্ত্রণা নিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিল। তবুও কারো বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করল না। কাউকে বলল না, তার কষ্টের কথা। কিছু কিছু ফুল যেমন পথের ধারে নীরবে ঝরে যায়, আবিরও নীরবে ঝরে গেল পৃথিবী নামক গ্রহ থেকে।

আজ অহনা, আসিফ এবং আয়েশা বুঝতে পারছে ওদের বাবা ওদের জন্য কত কিছুই না করেছে। এখন ওরা বুঝছে পৃথিবীটা কত কঠিন। এখন ওদের চাহিদা বলতে কিছু নেই।

বাবার ওপর ওরা কত রাগ করেছে। কত কটু কথা বলেছে। কোনো কিছু না পেলে কত অভিযোগ করেছে। তবুও বাবা রাগ করেনি। আজ ওরা এতিম। ওদের এখন চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই।

আসিফ আজ বুঝে গেছে, বাবা কিছু না দিতে পারলেও, বাবা থাকাটাই একটা বড় বটবৃক্ষ। আজ ওদের সেই বটবৃক্ষটা চলে গেছে। ওদের মাথার ওপর ছায়া দেবার মতো কেউ নেই। বাবা থাকা অবস্থায় মনে হতো আমার বাবা সবচেয়ে খারাপ। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে আমার বাবাই ছিল সবচেয়ে ভালো।

সবাই যখন ঈদের আনন্দে মাতোয়ারা, তখন আসিফ বাবাকে বিদায় দিতে ব্যস্ত।