নজরুলের এই গানের গঠন শৈলী ও শিল্প সৌকর্য

হাসান আলীম

এক.

আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ভাওইয়া সম্রাট আব্বাসউদ্দীন আহমেদের একান্ত পীড়াপীড়িতে ইসলামি সঙ্গীত বিশেষত গজল আঙ্গিকের গান লেখার ইচ্ছে প্রকাশ করেন এবং এই গানটি লেখেন ১৯৩১ সালে। এই গান রচনার প্রেক্ষাপট আমরা কমবেশি অনেকেই জানি। আমি আজ কেবল এই গানের গঠন এবং শিল্প প্রসঙ্গে সামান্য আলোকপাত করবো।

গানটি নিম্নরূপ:

১.ও মন /রমজানের ঐ/ রোজার শেষে / এলো খুশির /ঈদ।

২.তুই/ আপনাকে আজ/ বিলিয়ে দে/ শোন আসমানি / তাকিদ।।

৩.তোর/ সোনা দানা / বালাখানা / সব রাহে লিল্/ লাহ।

৪.দে/ জাকাত মুর্দা /মুসলিমের আজ /ভাঙাইতে নিদ।।

৫.আজ/ পড়বি ঈদের / নামাজরে মন/ সেই সে ঈদগা/হে।

৬.যে/ ময়দানে সব/ গাজি মুসলিম / হয়েছে শ/হিদ।।

৭.আজ/ ভুলে যা তোর / দোস্ত ও দুশ/মন হাত মিলাও/ হাতে।

৮.তোর / প্রেম দিয়ে কর / বিশ্ব নিখিল / ইসলামে মু/রিদ।।

৯.ঢাল / হৃদয়ের তোর / তশতরিতে / শিরনি তৌহি/দের।

১০.তোর / দাওয়াত কবুল/ করবে হজরত/ হয় মনে উম/মীদ।।

এটি স্বরবৃত্ত ছন্দে চার মাত্রার চালে রচিত এবং এর তাল কাহারবা।

এই গীতিকবিতার প্রতি পঙক্তিতে মাত্রা মান বিন্যাস নিম্নরূপ করা যায় -

১.২/৪/৪/৪/১

২. ১/৪/৪/৪/২

৩.১/৪/৪/৪/১

৪.১/৪/৪/৪

৫.১/৪/৪/৪/২

৬. ১/৪/৪/৪/১

৭.১/৪/৪/৪/২

৮.১/৪/৪/৪/১

৯.১/৪/৪/৪/১

১০.১/৪/৪/৪/১

এখানে প্রতি পঙক্তিতে তাল ৪-৪ করে ৮ মাত্রা এবং এর পর্ব বিভাগ ৪/৪ করে, বোল বিন্যাস :ধা(১) গে না তি/না(৫) ক ধিন না এবং এর তালি : ধা(১) খালি:না (৫) তাই এই গীতি কবিতাটি কাহারবা বা কার্ফা তালের।

গীতিকবিতা প্রধানত - ১. আস্থায়ী ২. অন্তরা, ৩. সঞ্চারী ও ৪.আভোগ এই চারটি স্তবকে বিন্যাস্ত করে একটি ঐক্য বিধানে লেখা হয়। তবে তিন স্তবক - আস্থায়ী, প্রথম অন্তরা, দ্বিতীয় অন্তরা হিসেবেও লেখা হয়ে থাকে।

নজরুলের এই গীতিকবিতাকে চার স্তবক হিসেবে বিশ্লেষণ করা যায়।

এর প্রথম স্তবকের দুটি পঙক্তি আস্থায়ী বা ভূমিকা বা প্রস্তাবনা হিসেবে বিবেচনা করা যায়।

‘’ ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ/তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন আসমানি তাগিদ “

পরবর্তী চার পঙক্তি অন্তরা যা বিস্তৃতি হিসেবে ধরা যায়।

“ তোর সোনা দানা বালাখানা সব রাহে লিল্লাহ/দে জাকাত মুর্দা মুসলিমের আজ ভাঙাইতে নিদ/আজ পড়বি ঈদের নামাজ রে মন সেই সে ঈদগাহে /যে ময়দানে সব গাজী মুসলিম হয়েছে শহীদ”/

আর সঞ্চারী পরবর্তী দুটি পঙক্তি যা ভার বহন করে পুরো বক্তব্যের এবং এর ভাষার ফ্লেভারও আলাদা।

“ আজ ভুলে যা তোর দোস্ত ও দুশমন হাত মিলাও হাতে /তোর প্রেম দিয়ে কর বিশ্ব নিখিল ইসলামে মুরিদ “/

শেষের দুটি পঙক্তি আভোগ যা গীতিকবিতাটির উপসংহার বা সার্থকতা প্রকাশ করে।

“ঢাল হৃদয়ের তোর তশতরিতে শিরনী তৌহিদের /

তোর দাওয়াত কবুল করবে হজরত হয় মনে উম্মীদ”/

দুই.

নজরুলের এই গীতি কবিতাটি ফরমায়েশি এবং তাৎক্ষণিক হলেও এর ভাব গুরুগম্ভীর এবং আনন্দময় আধ্যাত্মিকতা পূর্ণ।

এর অলঙ্কার, চিত্রকল্প এবং কাব্যরসও অভাবনীয় এবং নতুনত্বে ভরপুর।

এ বিষয়ে কিছুটা আলোকপাত করা যায়।

এই গীতি কবিতার কিছু শব্দালংকার -

১.ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ (র,বৃত্তানুপ্রাস)

২.তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন আসমানি তাগিদ ( ন,বৃত্তানুপ্রাস)

৩.তোর সোনাদানা বালাখানা সব রাহেলিল্লাহ (ন,বৃত্তানুপ্রাস)

৪.দে জাকাত মুর্দা মুসলিম আজ ভাঙাইতে নিদ (ম, প্রারম্ভানুপ্রাস)

৫.আজ পড়বি ঈদের নামাজরে মন সেই সে ঈদগাহে (জ,ঈ,দ,ন,ম,স,এই অক্ষরগুলো বিভিন্ন শব্দে দ্বি-অনুপ্রাস)

৬.যে ময়দানে সব গাজি মুসলিম হয়েছে শহীদ ( স,শ,উষ্ম- অনুপ্রাস)

৭. আজ ভুলে যা তোর দোস্ত ও দুশমন হাত মিলাও হাতে ( দ,ত,ম,হ,দ্বি- অনুপ্রাস)

৮. তোর প্রেম দিয়ে কর বিশ্ব নিখিল ইসলামে মুরিদ ( র,বৃত্তানুপ্রাস, ল,দ্বি-অনুপ্রাস,ম,পার্শ্ব-অনুপ্রাস)

৯. ঢাল হৃদয়ের তোর তশতরিতে শিরনি তৌহিদের ( র,বৃত্তানুপ্রাস, ত,প্রারম্ভানুপ্রাস,শ,দ্বি- অনুপ্রাস,ত,একান্তর-অনুপ্রাস,ত, বৃত্তানুপ্রাস)

১০. তোর দাওয়াত কবুল করবে হজরত হয় মনে উম্মীদ ( ত,বৃত্তানুপ্রাস, ক,প্রারম্ভানুপ্রাস,র,বৃত্তানুপ্রাস, হ,দ্বি-অনুপ্রাস,)

এখানে দেখা যাচ্ছে কবি প্রতিটি পঙক্তিতে একাধিক শব্দালংকার সৃষ্টি করে গানের জন্য একটি সুর সাম্য, তাল ও লয়ের নতুন ঐক্য বিধানে চমৎকারিত্ব দেখিয়েছেন।

এবার এর অর্থালংকার প্রসঙ্গে কিছু বয়ান করছি।

শব্দালংকার গানের তাল লয় এবং সুরের বৈচিত্র্য সৃষ্টিতে বিশেষ ভূমিকা রাখে।আর অর্থালংকার গানের ভাষা ও ভাব সৃষ্টিতে গভীরতা তৈরি করে।

১. ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ / তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন আসমানি তাগিদ। এখানে আসমানি তাগিদ বলতে আল্লাহর নির্দেশের কথা বলা হয়েছে। এখানে আল্লাহ তথা উপমানকে আড়াল করে বা অপ্রধান করে নিশ্চয় সাদৃশ্য মূলক অর্থালংকার সৃষ্টি করা হয়েছে।

২. তোর সোনাদানা বালাখানা সব রাহেলিল্লাহ - এখানে সোনাদানা বালাখানা বলতে সব সুখ শান্তি বিসর্জনের কথা বলা হয়েছে। এখানে সোনাদানা বালাখানা হচ্ছে উপমান এবং এটাকে প্রধান করে আড়াল করা হয়েছে সুখশান্তির কথা, তাই এটা অপহ্নতি সাদৃশ্য মূলক অর্থালংকার।

৩. দে জাকাত মুর্দা মুসলিম আজ ভাঙাইতে নিদ -

এখানে মুর্দা মুসলিম বলতে মুর্দা মতো মুসলিম জাতির কথা বলা হয়েছে। এটা হলো লুপ্তোপমা।

ভাঙাইতে নিদ বলতে নিস্তেজতা, বা দূর্বলতা কাটানোর কথা বলা হয়েছে। দূর্বলতার পরিবর্তে নিদের কথা বলা হয়েছে। নিদ হলো উপমান এবং এটাকে প্রধান করা হয়েছে তাই এটা অপহ্নতি সাদৃশ্য মূলক অর্থালংকার।

৪.ঢাল হৃদয়ের তোর তশতরিতে শিরনি তৌহিদের -

এখানে হৃদয়কে তশতরির সাথে তুলনা করা হয়েছে, এটা সাদৃশ্য মূলক রূপক উপমা।

আবার শিরনি, তৌহিদেরও সাদৃশ্য মূলক রূপক উপমা। তৌহিদ বা একত্ববাদকে শিরনি মিষ্টান্নের সাথে তুলনা করা হয়েছে।

৫.তোর দাওয়াত কবুল করবে হজরত হয় মনে উম্মীদ -এখানে দাওয়াত কবুল করাকে হজরত মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আনন্দ উম্মীদ বা খুশির চাঁদের সাথে তুলনা করা হয়েছে। এটা লুপ্তোপমা অর্থালংকার।

কবিতা বা গীতিকবিতা মূলত কল্পনার চিত্রাঙ্কন। একজন কবি তার শক্তিমন্ত ভাবের তথা কল্পনার যে উচ্ছ্বাসময় বর্ণনা দেন তাই কবিতা বা গীতিকবিতা। এ ক্ষেত্রে যে কবির কল্পচিত্র বা চিত্রকল্প যত আবেগময় ও শক্তিশালী হয়ে মানব মনে সঞ্চারিত হয়, আনন্দ উতপাদন করে তা চমৎকারিত্ব অর্জন করে।

এই গীতিকবিতার কিছু চমৎকার চিত্রকল্প তুলে ধরছি-১.দৃশ্যময় চিত্রকল্প বা ভিজুয়াল ইমেজ:

১.১-ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ।

১.২-তোর সোনাদানা বালাখানা সব রাহেলিল্লাহ

১.৩- আজ পড়বি ঈদের নামাজ রে মন সেই সে ঈদগাহে

২. স্মরণ ভাবের চিত্র কল্প রিকালেকশনএবল ইমেজ:

২.১- যে ময়দানে সব গাজি মুসলিম হয়েছে শহীদ

২.২- আজ ভুলে যা তোর দোস্ত ও দুশমন হাত মিলাও হাতে।

৩.বিমূর্ত ভাবের চিত্র কল্প -

৩.১- তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন আসমানি তাগিদ

৩.২- মুর্দা মুসলিম আজ ভাঙাইতে নিদ

৪.মনো জৈবিক বা সাইকো অর্গানিক চিত্র কল্প :

৪.১- তোর প্রেম দিয়ে কর বিশ্ব নিখিল ইসলামে মুরিদ

৪.২- ঢাল হৃদয়ের তোর তশতরিতে শিরনি তৌহিদের

৪.৩-তোর দাওয়াত কবুল করবে হজরত হয় মনে উম্মীদ।

কাব্য অলংকার ও চিত্রকল্প নির্মিত হয় কাব্যলক্ষ্যকে মানব মনে একটি প্রচণ্ড আবেগ ও রস সৃষ্টির মাধ্যমে সঞ্চারিত করা এবং প্রভাবিত করার প্রয়াসে।

আর এই রস সৃষ্টি করতে যিনি যত সার্থক তিনি তত সফলতা অর্জন করতে পারেন।

নজরুলের এই গীতিকবিতাটি রস সৃষ্টিতে এক অনন্য বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছে।

ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ - এই গীতি কবিতাটির মূল বক্তব্য হলো আত্মত্যাগ, পরোপকার এবং আধ্যাত্ম-আনন্দ রসে অভিষিক্ত করা।

কবি এটি করতে সক্ষম হয়েছেন।

একটি গীতিকবিতার ভাষা, সুর এবং শিল্পীর কণ্ঠের কারুকাজ গীতিকবিতার জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান।

একটি কথা মনে রাখা প্রয়োজন ভাব, ভাষা এবং সুর স্বরলিপি যেত উন্নত হোক যদি কণ্ঠশিল্পী ভালো ভাবে তা উপস্থাপন করতে না পারেন তবে তা সার্থকতা পায় না। আবার সুর এবং গায়কীও মৌলিক হতে হয়, নকল বা প্যারোডি হলে তা মৌলিকত্ব হারায়।

নজরুলের এই গানটি সর্বক্ষেত্রে সফলতা এবং জনপ্রিয়তা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। আমাদের বাঙালি মুসলিম জাতির ঈদ শুরুই হয় এই গানের আনন্দময় আবাহনের মাধ্যমে।

লেখক : কবি ও গবেষক