হারুন ইবনে শাহাদাত
ঈদুল ফিতর ধর্মীয় উৎসব। ইসলামের প্রতিটি আনন্দ উৎসব ও বিনোদনের সাথেই জড়িয়ে আছে এক জান্নাতি পবিত্রতা। আনন্দ বিনোদন বলতে প্রচলিত অর্থে সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গগুলোকেই বুঝানো হয়। সাহিত্য, সংস্কৃতির উৎসের সন্ধানে গেলে দেখা যায় এর সাথে জড়িয়ে আছে বিশ্বজাহানের স্রষ্টার সাথে সম্পর্ক সৃষ্টির প্রয়াস। বিনোদন বা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মানুষের মন, মনন, চিত্ত নির্র্র্মল হয়। শান্ত হয়। বিশ্বমানবতা শান্তি পায়। তাই তো সাংষ্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও বিনোদনকে বলা হয় আত্মা বা মনের খাবার। মানুষের শরীর গঠিত হয়েছে কিছু জৈব-রাসায়নিক উপাদানে। তাই শরীর গঠনের জন্য আমরা যে খাদ্য গ্রহণ করি, তা মূলত জৈব রাসায়নিক উপাদান বৈ কিছু নয়। কিন্তু আত্মা বা মন কী দিয়ে তৈরি, এ এক জটিল প্রশ্ন। কিন্তু অমীমাংসিত নয়। আত্মা অদৃশ্য। তার খাবারও অদৃশ্য। আত্মার বিকাশের উপাদান বা খাবারও অদৃশ্য। তাই তো প্রত্যেক ধর্মের মানুষই তার আত্মার প্রশান্তির জন্য বিভিন্ন আচার বা অনুষ্ঠান উদযাপন করে। অনেকে ভুল খাদ্য নির্বাচন করে, তারা বিনোদন ও সাহিত্য সংস্কৃতির নামে এমন সব কর্মকাণ্ড করে যা আত্মার মৃত্যু তরান্¦িত করে। অশ্লীলতার বিস্তার ঘটিয়ে মানব সভ্যতার ধ্বংস ডেকে আনে।
ঈদ উৎসবসহ ইসলামের প্রতিটি আনন্দ উৎসবই ইবাদাত এবং আত্মার বিকাশের জন্য অপরিহার্য। সংস্কৃতি বা কালচার শব্দের বুৎপত্তির দিক বিবেচনায় নিয়ে বিচার করলে দেখা যায় বিনোদনের লক্ষ্যও তাই।
আমরা যদি সংস্কৃতি শব্দের ব্যুৎপত্তি বিশ্লেষণ করি। তাহলে বিষয়টি বোঝা সহজ হবে। তখন আমরা বুঝতে পারব এক মাস সিয়াম সাধনা এবং সিয়াম ভাঙার উৎসব কেন আত্মশুদ্ধি এবং শ্রেষ্ঠ চিত্তবিনোদন উপাদান। ল্যাটিন colere (সৃষ্টিকর্তার সাধনা) থেকে cultura ইংরেজি cultivation বাংলায় চাষ করা। ব্্ুযৎপত্তি সম্যক (ভালো) কৃষ্টি পরিমার্জন বা সংস্কার। শব্দমূল সম (উপসর্গ)+কৃ(ধাতু)+ক্তি(প্রত্যয়)।
অর্থাৎ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড মানুষের আত্মা, মন, মনন ও মস্তিককে জাহেলিয়াতের আগাছা মুক্ত এবং নির্মল করে। এমন নির্মলতাই স্রষ্টার সাথে সেতুবন্ধন তৈরির মাধ্যম। এক মাস সিয়াম সাধনার পর প্রতিদান দিবসের দিন ঈদুল ফিতর। আরবি ফিতর শব্দের অর্থ ভাঙা। পারিভাষিক অর্থে সিয়ামভাঙার দিন হলো ঈদুল ফিতর। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানব জাতির আত্মশুদ্ধির জন্য যুগে যুগে নবী ও রাসূল (সা.) এর ওপর সিয়ামের বিধান দিয়েছেন। একথা তিনি পবিত্র কুরআনে উল্লেখ্য করেছেন, “হে মুমিনগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর; যাতে তোমরা তাকওয়া (আল্লাহ ভীতি বা তার বিধান মেনে চলার যোগ্যতা) অর্জন করতে পারো।” (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৮৩)
আল্লাহ তা’আলা আরো বলেন, রমযান মাস, তাতে কুরআন নাযিল হয়েছে, যা মানুষের জন্য হিদায়াত, সৎপথপ্রাপ্তির স্পষ্ট নিদর্শন ও হক্ব-বাতিলের মধ্যে পার্থক্যকারী। কাজেই তোমাদের যে কেউ এ মাস পাবে সে যেন অবশ্যই এর রোযা রাখে এবং কেউ পীড়িত হলে কিংবা সফরে থাকলে, তাকে অন্য সময় এই সংখ্যা পূরণ করতে হবে। আল্লাহ তাআলা তোমাদের জন্য সহজসাধ্যতা চান, তোমাদের প্রতি কঠোরতা আরোপ করতে চান না এবং এই জন্য যে, তোমরা সংখ্যা পূরণ করবে এবং যাতে তোমরা আল্লাহর মহিমা বর্ণনা কর যে, তিনি তোমাদেরকে হিদায়াত করেছেন। আর যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হও।’-সূরা বাকারা : ১৮৫
মুসলমানদের জাগ্রত করা দিন
ঈদ বিনোদনের লক্ষ্য হতে হবে ঘুমন্ত মুসলমানদের জাগ্রত করা। এই দিন আমাদের বিনোদন বা আনন্দ আয়োজন সাজাতে হবে সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য। আল্লাহর তাকওয়ার বিধান মেনে। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম গানে গনে সে কথাই বলেছেন, ‘ও মন রমযানের ঐ রোজার শেষে/এলো খুশির ঈদ’ এর প্রতিটি ছত্রে ঈদের খুশি বা বিনোদন কেমন হবে, তা তুলে ধরেছেন। ঈদের খুশি ভোগে নয় ত্যাগে- এই বার্তা জাতীয় কবি এ গানের মাধমে সবার কানে পৌঁছে দিয়েছেন। কিন্তু তা অনেক বিত্তবান, সমাজের প্রভাবশালীদের কানেই পৌঁছে বলে অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় না। তারা ভুলে যান, ‘তোর সোনা দানা বালাখানা/সব রাহে লিল্লাহ/দে জাকাত মুর্দা মুসলিমে আজ/ভাঙাইতে নিদ/’।
ভুলে গেলে চলবে না, আমাদের বিনোদনের লক্ষ্য হবে ঘুমন্ত মুসলমানদের জাগ্রত করা। ইসলামের শান্তি ও ইনসাফের বিধান ঐক্যবদ্ধভাবে বাস্তবায়নের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করার দিন হলো ঈদুল ফিতর। জাতীয় কবির ভাষায়, ‘আজ পড়বি ঈদ এর নামাজ রে মন/সেই সে ঈদ্গাহে/যেই ময়দানে সব গাজী মুসলিম/হয়েছে শহীদ/ও মন রমযানের ঐ রোজার শেষে/এলো খুশির ঈদ/আজ ভুলে যা তোর দোস্ত দুশমন/হাত মিলাও হাতে/আজ ভুলে যা তোর দোস্ত দুশমন/হাত মিলাও হাতে/তোর প্রেম দিয়ে কর বিশ্ব নিখিল/ইসলামে মুরিদ/’
ঈদ উৎসবে কেমন হতে হবে আনন্দ বিনোদন
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। আনন্দ উৎসব হাসি কৌতুক আল্লাহর নির্দিষ্ট সীমানা মেনে উদযাপন নিষিদ্ধ নয়। উম্মুল মুমিনীন হজরত আয়েশা র. একটি ঈদের দিনে কথা এভাবে বর্ণনা করেছেন, ‘রাসুলুল্লাহ স. ঈদের দিন আমার ঘরে আগমন করলেন, তখন আমার নিকট দুটি ছোট মেয়ে গান গাইতেছিল, বুয়াস যুদ্ধের বীরদের স্মরণে। তারা পেশাদার গায়িকা ছিল না।
ইতোমধ্যে আবু বকর রা. ঘরে প্রবেশ করে এই বলে আমাকে ধমকাতে লাগলেন যে, নবীজির ঘরে শয়তানের বাঁশি? রাসুলুল্লাহ স. তার কথা শুনে বললেন, ‘মেয়ে দুটিকে গাইতে দাও হে আবু বকর! প্রত্যেক জাতির ঈদ আছে, আর এটি আমাদের ঈদের দিন।’ (সহিহ বুখারি : ৯৫২)
হযরত আয়েশা রা. অন্য একটি বর্ণনায় আছে, ঈদের দিন মসজিদে নববীতে হাবশীদের ঢাল-তলোয়ার নিয়ে যুদ্ধের কসরত বা খেলা রাসুল সা. নিজে দেখতেন এবং আয়েশা রা.-কে দেখাতেন। এটি আনন্দের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে অনুমোদিত ছিল ঈদের দিনে রাসুল সা. ঈদের দিন খেলাধুলার অনুমতি দিয়েছেন। সুদানীরা বা হাবশীরা মসজিদে নববীর ভেতর তলোয়ার ও ঢাল নিয়ে বীরত্বপূর্ণ খেলা বা কসরত দেখাত। রাসুল সা. খেলাটি উপভোগ করতেন এবং হযরত আয়েশা রা.-কে দেখার সুযোগ করে দিতেন।
রাসুল সা. শরীর চর্চা ও শারীরিক সুস্থতার জন্য সাঁতার, ঘোড়দৌড়, ধনুর্বিদ্যা (তীর ছোড়া) ও দৌড় প্রতিযোগিতাকে উৎসাহিত করতেন। শরীর ও মনকে নির্মল করে এমন বিনোদনের আয়োজন ইসলামে নিষিদ্ধ নয়। ঈদ উপলক্ষে টেলিভিশন, ইউটিউব, ওটিটি ইত্যাদি বাংলাদেশের ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াগুলো অনেক নাটক, সঙ্গীতসহ বিনোদন আয়োজন উপস্থাপন করে থাকে। তাদের বিরুদ্ধে অশ্লীলতার অভিযোগ ছাড়াও আছে, ঈদের ঘ্রাণ তাদের উপস্থাপনায় থাকে না। বিনোদন যেন উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যহীন শুধু টাকা উপার্জনের জন্য না হয়। এর পিছনে থাকতে হবে ঈদের শিক্ষার আলোকপাত। তবেই এ আয়োজনগুলো সার্থক হবে।
রাসুল সা. বলেছিলেন যে, আল্লাহ আমাদের জাহেলী যুগের (অন্ধকার যুগ) খেলার পরিবর্তে এর চেয়েও শ্রেষ্ঠ দুটি দিন (ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা) দিয়েছেন। তিনি মানবাত্মাকে আলোকিত করে দুনিয়ায় ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা এবং আখেরাতে মুক্তির জন্য আমাদের উপহার দিয়েছেন ঈদ। এ লক্ষ্য থেকে যেন বিচ্যুত না হয় আমাদের আনন্দ আয়োজন।
আনন্দের জোয়ারে আমরা যেন আমাদের সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষদের ভুলে না যাই। কারণ তাহলে সমস্ত আয়োজনই হবে বৃথা। ধ্বংস হবে আমাদের দুনিয়া ও আখেরাত। ইনসাফের অভাবে সমাজ, দেশ ও বিশ্ব আচ্ছন্ন হবে জাহেলিয়াতের অন্ধকারে। জাতীয় ভাষায়, ‘যারা জীবন ভরে রাখছে রোজা/নিত্য উপবাস/ যারা জীবন ভরে রাখছে রোজা/নিত্য উপবাস/সেই গরীব ইয়াতিম মিসকিনদের দে/যা কিছু মুকিব/ও মন রমযানের ঐ রোজার শেষে/এলো খুশির ঈদ।’
ভোগ নয়, ত্যাগের মহিমায় যেদিন উদযাপিত হবে ঈদুল ফিতর সেই দিন খুশির চাঁদের সাথে হেসে উঠবে সারা জাহান।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক।