সীমান্ত আকরাম
সারাবিশ্বে মুসলিম জাহানের ইতিহাস-ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির বড় একটি মাধ্যম হলো ঈদ। মুসলিমদের মহা মিলনের মহা উৎসব এই ঈদ আনন্দ। ইসলামের দেয়া দু’টি আনন্দ-উৎসবের সঙ্গে মিশে আছে আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য। ঈদ আমাদের ত্যাগের শিক্ষা দেয়। ভেদাভেদ ভুলে ঐক্য গড়ার। শ্রেণিবৈষম্যের মূলোৎপাটন করার। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে গরিব-ধনী এক কাতারে চলার।
পৃথিবীতে ইসলামের পূর্বেও মানুষের জন্য বিভিন্ন উৎসবের প্রচলন ছিল। সে সময়ে তারা তাদের নিজস্ব মনগড়া
বানানো সংস্কৃতির চর্চা হতো। বিভিন্ন দিন-তারিখকে কেন্দ্র করে এ সকল আনন্দ উৎসব পালন করত। তাদের সংস্কৃতি কিংবা আনন্দ উৎসবে ছিল না সভ্যতার শিক্ষা, ভ্রাতৃত্ববোধ ও সহমর্মিতার দৃষ্টান্ত। মুসলমানদের ঈদ সংস্কৃতির আগে মদিনায় ‘নাইরোজ’ ও ‘মেহেরজান’ নামে দুটি উৎসব পালিত হতো। দুটি উৎসবই পারস্য সংস্কৃতি ও সভ্যতার প্রতিকৃতি। বর্ষবরণকে কেন্দ্র করে ‘নাইরোজ’ এবং বসন্ত উৎসবকে উপলক্ষ করে ‘মেহেরজান’ নামে দুটি বিনোদনমূলক উৎসব পালন করা হতো। অপরিশুদ্ধ মানব মননে আবিষ্কৃত দুটি উৎসবই বেহায়াপনা, বেহেল্লাপনা ও অশ্লীলতার কালো নিকৃষ্ট আঁধারে নিমজ্জিত ছিল। তাদের ভিত্তিহীন সংস্কৃতির মূলোৎপাটন করে শুদ্ধ সংস্কৃতির উদ্যাপনের বানী নিয়ে হাজির হলেন মানবতার নবী মুহাম্মদ (সা.)। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা দিলেন, ‘প্রতিটি জাতির জন্যই আনন্দ-উৎসব রয়েছে। আর আমাদের আনন্দ-উৎসব হলো দুই ঈদ।’ (বুখারি, হাদিস : ৯৫২)
নবী করিম (সা.) একদিন আল্লাহর নির্দেশে মুসলিম জাতির ঈদোৎসবের ঘোষণা দিলেন। ঈদুল ফিতর সম্পর্কে বললেন, সব সম্প্রদায়েরই ঈদ (আনন্দ-উৎসব) আছে। এটি আমাদের ঈদ। অপরদিকে ১০ জিলহজ তারিখকে ঘোষণা করলেন কুরবানীর ঈদ হিসাবে। ঈদুল ফিতর মুসলিম জাতির জন্য একাধারে আনন্দোৎসব ও ইবাদত। এ আনন্দ আল্লাহর রহমত ও ক্ষমাপ্রাপ্তির, জাহান্নাম থেকে মুক্তির। এ আনন্দ সিয়াম-কিয়ামের শুকরিয়া ও কৃতজ্ঞতার। এ আনন্দে নেই কোনো অশ্লীলতা ও পাপ-পঙ্কিলতা। এ আনন্দ সওয়াব ও পুণ্যময়তা। এ আনন্দ শুধুই মুসলিম জাতির সংস্কৃতির বড় একটি ধারক ও বাহক।
এক মাস রোজা পালনের পর এই দিনে সেই সাধনার পুরস্কার হিসেবে ক্ষমা পাওয়াই সেই আনন্দের কারণ। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, “আল্লাহ তা’আলা ঈদের দিন ফেরেশতাদের মধ্যে রোজাদারদের নিয়ে গর্ব করে বলেন, ‘হে ফেরেশতারা, আমার কর্তব্যপরায়ণ প্রেমিক বান্দার বিনিময় কী হতে পারে?’ ফেরেশতারা বলেন, ‘হে প্রভু, পুণ্যরূপে পুরস্কার দান করাই তো তার প্রতিদান।’ আল্লাহ বলেন, ‘আমার বান্দারা তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব (রোজা) পালন করেছে। অতঃপর দোয়া করতে করতে ঈদগাহে গমন করেছে। সুতরাং আমার মর্যাদা, সম্মান, দয়া ও বড়ত্বের কসম! আমি তাদের দোয়া কবুল করব এবং তাদের মাফ করে দেব।” (বায়হাকি : ৩/৩৪৩)
প্রতি বছর মুসলিমদের সংস্কৃতি হিসেবে ঈদ আসে সুশৃঙ্খল আচার-আচরণের বারতা নিয়ে। নৈতিক, আত্মিক ও সামাজিক পরিশুদ্ধির সীমানা পেরিয়ে সামষ্টিক কল্যাণ নিয়ে ঈদ আসে। ঈদ আসে শুভ্র ও শুদ্ধতার প্রতীক হয়ে।
তাকওয়ার শক্তিতে বলীয়ান হয়ে নতুন জীবনে ফেরার অঙ্গীকার নিয়ে। রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতমণ্ডিত অফুরন্ত কল্যাণের সঙ্গে আলিঙ্গন করে ঈদ আসে। ঈদ আসে শত্রুতা ও বৈরিতার প্রাচীর ডিঙিয়ে বন্ধুতা ও প্রেম-ভারোবাসার হাত বাড়িয়ে। ঈদ আসে মহামিলনের মহোৎসবে মনকে মাতিয়ে তুলতে, পরিশোধিত হৃদয়ে পরিতৃপ্তির ছোঁয়া লাগাতে।
আজ আমরা গলা টিপে হত্যা করছি আমাদের সভ্যতা ও শিকড়ের সংস্কৃতিকে। ঈদ এলেই ঈদের নামে চলে বেহায়াপনার প্রদর্শনী। ঈদ নাটক, ঈদ গান, ঈদের ছবি, ঈদ রেসিপি ও ঈদ ফ্যাশন বলে নোংরা সংস্কৃতির চর্চার সয়লাভ চতুর্দিকে ছড়িয়ে পরে। সপ্তাহব্যাপী চলে ঈদের নামে এসব বিজাতীয় সংস্কৃতির প্রদর্শন। চ্যানেলে চ্যানেলে ভাঁড়ামি, নষ্টামি প্রেম-পিরিতি নিয়ে চলে মাতামাতি।
হিন্দি গানের উন্মাদনা, উশৃঙ্খল ডিজে পার্টি, শহরের অলিতে-গলিতে তরুণরা ট্রাকে ট্রাকে উচ্চ সাউন্ডে সংস্কৃতির নামে ভণ্ডামি। ক্লাবগুলোতে ভীনদেশীয় সংস্কৃতির সয়লাব। ইসলামের আবিষ্কৃত ঈদের উৎসবে থাকে না ইসলামের কোনো তাহজিব-তমদ্দুনের শিক্ষা।
আমরা কোন ধরণের সংস্কৃতির চর্চা করছি ঈদের আদলে? মানুষ আজ ঈদকে বানিয়ে ফেলেছে পার্থক্যের সুবিস্তৃত মাঠ। ঈদের দিনে ধমানুষ হয়ে যাচ্ছে মানুষ থেকে ভিন্ন। ধনী-গরীবের মধ্যে সৃষ্টি হচ্ছে যোজন যোজন ফারাক। পৃথিবীর এ বিচিত্র পাঠশালার মধ্যে আমরা ভুলে যাচ্ছি আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য, সভ্যতার ও সংস্কৃতিকে।
মুসলিম জাতির উৎসব হবে অপসংস্কৃতি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। উৎসবের নামে অনাচার, কদাচার, পাপাচার আর নৈতিকতাবিবর্জিত বল্গাহীন অনুষ্ঠান আড়ম্বরের অবকাশ নেই ইসলামে। আবার বৈধ ও নির্দোষ আনন্দ-ফুর্তি, শরীরচর্চামূলক খেলাধুলা, নৈতিক মূল্যবোধ ও ঈমানি ব্যঞ্জনাসমৃদ্ধ শিল্প-সংগীত Ñএগুলোও ঈদের দিনের বৈধ আনুষ্ঠানিকতার বাইরে নয়। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ঈদের দিন হাবশিরা খেলা করছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) ক্রীড়ারত হাবশিদের উৎসাহ দিয়ে বলেছিলেন, “ছেলেরা, খেলে যাও! ইহুদিরা জানুক যে আমাদের দ্বীনের প্রশস্ততা আছে। আমাকে প্রশস্ত দ্বীনে হানিফসহ প্রেরণ করা হয়েছে।” (বুখারি : ১/১৭৩, মুসলিম : ২/৬০৮)
ঈদের বাঁকা শুভ্র চাঁদ দেখার পর সবার মনে যে আনন্দ খেলা করে, তার স্বাদ, রং ও গন্ধ খুবই তৃপ্তিকর। পাড়ার কিশোররা জেগে ওঠে ঈদ বরণের মিছিলে। মিঠাই-মিষ্টান্নের গন্ধে ম ম করে পাড়ার অলিগলি। নতুন জামায় এক কাতারে সারিবদ্ধ দেখা যায় মানুষকে। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নামাজে দাঁড়ায়। এক শামিয়ানার নিচে রবের দরবারে শুদ্ধ প্রেমের জানান দেয়। মানুষে মানুষে কুশল বিনিময়, মুসাফাহ, কোলাকুলি আমাদের শাশ্বত ঐহিত্য ও সংস্কৃতির সাক্ষী।
ইসলামের নবীর আবিষ্কৃত ঈদ উৎসব পালিত হোক শুদ্ধতার সরোবরে। বেহায়াপনা, নোংরা কুসংস্কার ও অপসংস্কৃতির তরী ডুবে যাক পবিত্রতার পরশ পেয়ে। আমাদের বিশুদ্ধ সংস্কৃতি, ইতিহাস আর ঐতিহ্যের ছোঁয়ায় পৃথিবীর আলো-বাতাসে সুশোভিত সৌরভ ছড়াক । আমাদের সংস্কৃতি সৃজন ও নির্মাণ হোক কল্যাণমুখী ও পরকালমুখী।
পারস্পরিক সম্পর্ক রক্ষা, সহানুভূতি প্রদর্শন, ভ্রাতৃত্ব স্থাপন, আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখা ঈদের অন্যতম উদ্দেশ্য। সে হিসেবে ঈদে আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশি, বন্ধুবান্ধব ও হিতাকাক্সক্ষীদের কাছে বেড়াতে যাওয়ার প্রচলন রয়েছে। এছাড়া লোকজন বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রেও বেড়াতে যায়। এতে কোনো আপত্তি নেই। আপত্তির বিষয় হলো, পর্দাহীন যুবক-যুবতীদের জুটিবদ্ধ হয়ে এখানে-সেখানে ঘুরে বেড়ানো। বছরের প্রায় সময় এ দৃশ্য দেখা গেলেও ঈদ উপলক্ষে এই নীতিহীন অপ্রীতিকর দৃশ্য বেশি দেখা যায়। যা গ্রহণযোগ্য নয়। এ অবস্থার পরিবর্তনে মা-বাবা ও অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। নিজেদের সন্তানদের লাগামহীন ছেড়ে দেয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। সাবালিকা মেয়েদের ঘর থেকে মাহরাম ছাড়া একাকি বের হতে দেয়া যাবে না।
ঈদ মূলত ইসলামের নিজস্ব সংস্কৃতি। এটা ইসলামের স্বকীয় বিশেষ বৈশিষ্ট্য। কিন্তু প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলো এই ঈদকে এমনভাবে উপস্থাপন করে, যাতে ইসলামের কোনো নিয়ম অনুসরণ করা হয় না।
মনে হয়, এ যেন ভিন্ন ধর্মের কোনো উৎসব। বিদেশী সংস্কৃতি বিশেষত ভারতীয় সংস্কৃতি চ্যানেলগুলোতে প্রাধান্য পায়। ইসলামের ঈদ ইসলামের নিয়মে পালন করতে হবে। অন্য নিয়মে পালন করলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। যেহেতু ঈদের শিক্ষা নিছক নিয়মবহির্ভূত আনন্দদান নয়। যে উদ্দেশ্যে ঈদের প্রচলন হয়েছে, সে উদ্দেশ্য পূরণ হলেই আমাদের ঈদ উদযাপন সার্থক হবে। মুসলিম হয়েও যারা ইসলামের কিছু নিয়ম মানে, আর কিছু মানে না, তাদের শাস্তি হলো দুটি। এক. দুনিয়ায় চরম লাঞ্ছনা, দুই. পরকালে কঠিন শাস্তি। তাই আসুন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের নিয়ম মেনে চলি। একজন প্রকৃত মুসলিম হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করি।
বাংলাদেশের শতকরা ৯২ ভাগ মানুষ মুসলিম। তাদের জীবনে ইসলামি বোধ-বিশ্বাস ও চেতনার সাথে মিশে আছে বাঙালির জীবনযাত্রা। যেমন, বাঙালি মুসলমানের জীবনে আজান, নামাজ, মসজিদ, মাদরাসা, আলেম, পীর, মাশায়েখ, ওয়াজ, তাফসীর, সভা, মাহফিল, দাড়ি, টুপি, পর্দা, হিজাব, নেকাব, কিরাত, হামদ, নাত, জায়নামাজ, তাসবি, তারাবিহ ইত্যাদি আত্মার সঙ্গে মিশে আছে।
আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, ঈদ আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে একটি ইবাদত। এই উৎসবে সততাবর্জিত, নৈতিকতাহীন কোন আচরণ যেনো আমাদের থেকে প্রকাশ না পায়। ঈদকে বাঙালী সংস্কৃতির নামে অপসংস্কৃতি নয়; বরং মুসলিম পরিচয়ে ইসলামী ভাবধারার সুস্থ সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হিসেবে গণ্য করতে হবে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, কোনো জাতি ধ্বংস হওয়ার জন্য তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধ্বংস হওয়াই যথেষ্ট।
তাই আসুন ঈদকে আল্লাহর দেয়া নেয়ামত মনে করে ইসলামে বিধিবিধান অনুযায়ী পালনের চেষ্টা করি।
লেখক : প্রাবন্ধিক,
গবেষক ও সম্পাদক: কাঠপেন্সিল।