জাফর তালুকদার

লুসাইলের কর্নিশে সন্ধ্যাটা ভালোই কাটে হাঁটাহাঁটি করে। সমুদ্রপাড়ের অভিজাত এলাকা বলে কথা। বিশ্বকাপের হাওয়া লেগে রঙ ধরেছে আরো। আলোর বন্যায় ভেসে যাচ্ছে চারদিকটা। চাঁদের মতো বাঁকানো ক্রিসেন্ট টাওয়ার হোটেল থেকে ছিটকে বেরুচ্ছে অপূর্ব আলোর রোশনাই। অদূরে জল-নৃত্যে মুখর চঞ্চল পানির ফোয়ারা। আলো আর জলের যুগল ক্রীড়া নৈপুণ্যে বিচিত্র এক মুগ্ধতা ছড়িয়েছে সঙ্গীতের তালে তালে।

নাদিয়ার খুব মনে ধরেছে জায়গাটা। সময় পেলেই এখানে এসে বসে থাকে একটু। সন্ধের দিকে অবশ্য লোকজনের আনাগোনা বাড়ে। জমাটি আড্ডার পরিবেশ তৈরি হয়।

এ নিয়ে তার মাথাব্যথা নেই।

সারাদিন কেটে যায় ঘোরাঘুরির মধ্যে। কাজ তেমন কিছু না। ম্যানিলা অফিস ওভারসিস ফাণ্ডে তাকে পাঠিয়েছে এখানের ফিলিপিনো প্রবাসীদের ওপর একটা সার্ভে-স্টাডির জন্য। বিশেষ করে হাউস মেডের কেসটা একটু খতিয়ে দেখতে হচ্ছে বিশেষভাবে।

সময় মাত্র দশদিন।

বিশ্বকাপের হায়া কার্ডের সুযোগে কাতার এলেও ফুটবল নিয়ে তার আগ্রহ নেই।

তবে খেলাধুলার এই সুযোগটা তার কাজের জন্য সহজ হয়েছে অনেকটা।

ইচ্ছেমতো ঘুরতে পারছে। দেখতে পাচ্ছে এখানের নানা দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে আনা প্রকৃত ছবিটা। কাজের জন্য শপিং মলগুলোকে একটু টার্গেটে এনেছে বেশি। ওখানের কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলছে যতটা সম্ভব। কিছু ছেলেমেয়ের সঙ্গে আলাদা একটা সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। ওরা দাওয়াত দিয়ে নিয়ে গেছে নিজেদের ডরমিটরিতে। ফ্যামিলি পার্কগুলো থেকেও ভালো ফিডব্যাক পাওয়া গেছে।

এখানে বেড়াতে আসা বেশিরভাগ ফ্যামিলির সঙ্গে ফিলিপিনো মেড থাকে। বাচ্চাটাচ্চা ওরাই সামলায়। ওদের আলাদা পোশাক। দেখেই চেনা যায়।

সেদিন এসি পার্কে দেখা হয়েছিল লুসি নামের একটা মেয়ের সঙ্গে ।

মেয়েটা বেশ নরমশরম। মায়া মায়া সুন্দর মুখের ফুটফুটে চেহারা। দুটো বেসামাল বাচ্চা নিয়ে ছোটাছুটি করছিল অস্থির ভঙ্গিতে। মালকিন দলবল নিয়ে মাতোয়ারা হয়ে আছেন গালগল্পে।

লুসি কথায় সাড়া দিলেও কেমন যেন একটু আড়ষ্ট হয়ে থাকল।

মালকিন মনে হয় আড়চোখে লক্ষ্য করছিল ব্যাপারটা। বাচ্চার দিকে চোখ না রেখে গপ্পোয় মশগুল হওয়া অন্যায়।

নাদিয়া ব্যাপারটা বুঝতে পেরে নিজেই সরে পড়ল। কী দরকার বাপু ঝামেলা পাকিয়ে!

সে যতটুকু বোঝার বুঝে নিয়েছে। সবার গল্পইতো কমবেশি একই রকম।

সুক ওয়াসিকের গোল্ড মার্কেটে সেদিন যে মেয়েগুলোর দেখা মিলছিল সেটার অভিজ্ঞতা আবার অন্যরকম। ওরা দলবেঁধে এসেছিল শপিংয়ে। সম্ভবত ভ্যাকেসনের কেনাকাটা বলেই সবাই একটু উত্তেজিত আর হাস্যমুখর।

গল্পটা জমল না। সবাই তাকিয়ে আছে ফুর্তির মেজাজে। ঘ্যান ঘ্যান পছন্দ হলো না কারো।

দোহা পোর্টে দেখা মেয়েগুলোকেও মেপে নিল একই কাতারে। আসলে গল্পটা তো কমবেশি একই রকম।

আলো-অন্ধকার দুটোই আছে সেখানে। সে যতটুকু নেবার নিয়েছে। এবার ফেরার পালা।

কর্নিশের কাছেই হোটেল। সন্ধ্যায় হোটেলে আটকে না থেকে এখানে সময়টা মন্দ কাটে না।

অনেক সময় বসে থেকে থেকে একটু রাত হয়ে যায়। সমুদ্র কেন যেন বড় বেশি টানে তাকে। ম্যানিলা বসেও এই সমুদ্র তাকে ঘিরে রেখেছে অষ্টপ্রহর। সুযোগ পেলেই মাকাতির অফিস থেকে বেরিয়ে সোজা চলে যেত ম্যানিলা বে-তে। বিকেলে বাতাস খেতে খেতে একটু হাঁটাহাঁটিতে মনটা চাঙা হয়ে উঠত। দোহা আসার আগে তেমন কিছু জানা ছিল না এই শহর সম্পর্কে। খুব একটা কৌতূহলও যে বোধ করেছে তাও নয়। আরব মানে সে চেনে দুবাইকে।

চমকের গালগল্পের কারণেই হয়ত এই ধারণাটা পোক্ত হয়েছে। কিন্তু কাতার আসার আগ পর্যন্ত এ দেশটি ছিল একরকম অচেনা। বিশ্বকাপের কারণে একটা অছিলার সুযোগে তবেই না আসা হলো এক ঢিলে দুই পাখি মারতে।

অগ্রিম টিকিটের কারণে একটা খেলা অবশ্য সে দেখেছে। না দেখলেও হতো। তবে কানাডা নিয়ে একটু দুর্বলতা থাকায় যেতে হলো আল থুমামা স্টেডিয়ামে।

খেলাটা ছিল কানাডার সঙ্গে মরক্কোর। কিছু সময় যেতেই বিরক্তি ধরে যায়। খেলা তো নয়, কানফাটা হৈহল্লা।

তার হাতে কানাডার ছোট্ট পতাকা। এটা নিচ থেকে ধরিয়ে দিয়েছিল একটা মেয়ে। ভালোই হলো। মাঝে মাঝে এটা নাড়ছিল নির্বিকারভাবে। তার চারদিকে মরক্কোর লাল পতাকার ছড়াছড়ি। উচ্ছ্বাসটা ওখানেই বেশি। শুধু পাশের কয়েকটি ছেলের হাতে ভিন্ন দেশের লাল সবুজ পতাকা।

একটু চেনা মনে হলো। কোন দেশের যেন!

হঠাৎ গোল হতেই কানের কাছে ফেটে পড়ল ভয়ংকর চিৎকার—-বাংলাদেশ, বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ কেন? গোল তো দিয়েছে মরক্কো। এই নিয়ে গল্প জমে উঠল লাল-সবুজের সঙ্গে।

পাশের মিষ্টি স্বভাবের ধারাল ছেলেটি বলল, বাংলাদেশ মাঠে নেই তো কী হয়েছে! আমরা এসেছি খেলাটা এনজয় করতে। দুই দলই আমাদের কাছে সমান। বাংলাদেশকেও সঙ্গে রাখছি সেই আনন্দের ভাগ বসাতে।

নাদিয়া আমূল চমকে উঠল কথাটা শুনে। ওরা সবাই বন্ধু। কাজ করে এখানে। স্টেডিয়াম বানানোর সঙ্গে জড়িত ছিল। আসলে খেলার আনন্দটা ওদের হবে নাতো কার হবে!

নাদিয়া বাংলাদেশের পতাকাটা চেয়ে নিল ওদের কাছ থেকে। তারপর খেলার পুরোটা সময় পতাকাটা হাতে নিয়ে গলা মিলিয়ে চেঁচাল বাংলাদেশ -বাংলাদেশ করে। ম্যানিলা থেকে ঢাকা কতদূর!

কার্নিশে আজ দারুণ এক চাঁদ উঠেছে।

পার্লের ভবন থেকে ছিটকে আসা বর্ণাঢ্য আলোর রোশনাই চাঁদের আলোয় মিলে অপূর্ব রঙ ধরেছে আরব সাগরের রহস্যময়ী জলে।

বাতাস দিয়েছে অল্প। কেমন এক স্নিগ্ধ শিহরণ খেলে যাচ্ছে শরীরে। বুকটা অনবরত হু হু করে উঠছে। এই অচেনা প্রাকৃতিক বলয়ের ওপর কেমন এক মায়াবী টান গড়ে উঠেছে কদিনের মধ্যে। মনে হচ্ছে তার হাতপা ফুঁড়ে অজস্র শিকড় নেমেছে চারদিক থেকে। এই বন্ধনের মায়াজাল ছিঁড়ে সে কিছুতেই বেরোতে পারবে না। কেন এমন হয় কে জানে!

ওই যে মানুষটাকে প্রতিরাতে সমুদ্র ছুঁয়ে কাঠের গ্যালারিতে গুটিশুটি বসে থাকতে দেখছে তাকে সহসা কেন জানি বড় আপন মনে হলো।

কে এই মানুষটা? কী তার দুঃখ!

সে কী এই অচেনা নিশিবন্ধুটির কাছে গিয়ে একবার বসবে! মাথায় আলগোছে হাত রেখে জিজ্ঞেস করবে—- কে তুমি গো?

কেন এমন করে প্রতিরাতে নির্জনে এসে বসে থাকো সমুদ্র ছুঁয়ে।

কী হয়েছে তোমার?

মন খারাপ করেছে!

বাড়ি কোথায় তোমার?

হ্যালো।

সাড়া নেই।

হ্যালো....

গভীর ধ্যান থেকে মানুষটা জেগে উঠে আড়মোড়া ভাঙল। চোখে তার আশ্চর্য বিস্ময়!

আমাকে বলছ?

হ্যাঁ।

বাড়ি যাবে না? অনেক রাত হয়েছে। বাড়ি! আমার তো বাড়ি নেই....

কেন?

সবার কী বাড়ি থাকে?

থাকে। আবার নাও থাকতে পারে। তোমার নেই কেন?

তুমি এভাবে জেরা করছ কেন? কোনো সমস্যা!

মোটেই না। এমনি কৌতূহলে। কয়েক দিন হলো নিয়মিত এখানে আসি সময় কাটাতে। তোমাকে দেখি অনেক রাত অবধি বসে থাকো চুপটি করে। কেন থাকো?

তোমার পুলিশি জেরা দয়া করে বন্ধ করবে। আমি একা থাকতে চাই।

কেন, একা কেন?

আমার কেউ নেই।

তাই বলে সমুদ্র পারে সারারাত...

আমি সমুদ্র দেখতে আসি না।

তাহলে কেন আসো?

ঝাঁপিয়ে মরতে।

হোয়াট!

হ্যাঁ। এটাই সত্যি।

কফি খাবে?

খেতে পারি। বেশ শীত শীত লাগছে...

ফাইন। চলো, খেতে খেতে একটু গল্প করি।

তুমি?

আমি নাদিয়া ফ্রম ম্যানিলা। একটা প্রজেক্ট কাভার করতে দোহা এসেছি। হাওয়েভার, কালই ফিরে যাচ্ছি। তুমি?

আমি রাজু। বাংলাদেশ থেকে কামলা খাটতে এসেছিলাম বছর চারেক আগে। এখন ফাঁদে আটকে আছি সব খুইয়ে।

সো স্যাড!কী করছ তাহলে?

নাথিং। বৈধ নই বলে কাজকর্ম পাচ্ছি না।

বৈধ নয় কেন?

ওটা দালাল আর কোম্পানির ব্যাপার। আধা বেতনে বেগার খাটানোর পর খেদিয়ে দিল পাসপোর্ট-আকামা রেখে। এখন না পারছি কোথাও কাজ করতে। না পারছি দেশে ফিরতে। যাকে বলে ত্রিসঙ্কু অবস্থা।

কোনো লিগ্যাল অ্যাকসন নাওনি?

কার বিরুদ্ধে নেব বলো! ধোঁকা তো দেশ থেকে খেতে খেতে এসেছি। কী চাকরি, কতো বেতন, কোনো ধারণাই দেয়া হয় না ঠিক মতো। যা বলা হয়, বাস্তবে এসে দেখি আর একটা।

জমিজিরেত বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা দালালকে দিয়ে এসেছি। এখন কথা বললে উল্টো চোখ রাঙানি। পাসপোর্ট তো আগেই হাতিয়ে নিয়েছে।

এখন কী করব বলো! চার বছর ধরে আছি খরচের টাকাটাই তুলতে পারিনি। দেশে ফিরে যাবো সে উপায়ও নেই।

মেয়েটার জন্য খুব খারাপ লাগে। সেই এতটুকু দেখে এসেছি। এখন কতো বড় হয়ে গেছে।

ওদিকে নানা রোগেশোকে মার শরীরটাও গেছে ভেঙে। হাসপাতালে যমে-মানুষে টানাটানি চলছে। কখন কী হয় কে জানে! স্ট্রেঞ্জ..! খুব কষ্ট হচ্ছে শুনে।

কী করব বলতে পারো! এভাবে কারো জীবন চলে? রাত-বিরাতে এখানে ওখানে খেয়ে না খেয়ে থাকি। ধারদেনা করে চলছে। ছুটকো কাজও তেমন মিলছে না। কদিন ধরে কেবলই মনে হচ্ছে এ-জীবন রেখে কী করব! সমুদ্রে ঝাঁপ দেবার চিন্তা নিয়ে রোজ আসি। কিন্তু মেয়েটার কথা মনে করে আর পারি না।

ওহ গড! প্লিজ স্টপ ইট..। কফি খাও।

কী নাম তোমার মেয়ের?

রোজ।

ওয়াও, বিউটিফুল!

চাঁদ কখন যেন আলতো ঢাকা পড়েছে হালকা মেঘের নিচে।

বাতাস দিয়েছে সামান্য। তবে শীতের অনুভূতি প্রকট নয়। চমৎকার জলজ গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে হাওয়ায়।

একটু নিচ থেকে গোঙাতে গোঙাতে উড়ে গেল একটা দানব উড়োজাহাজ।

আকাশ থেকে কর্নিশ আর ওয়েস্ট বে-র রাতের ছবিটা দারুণ খেলে। মনে হয় আগুনের মেলা বসেছে চারদিকে।

চাঁদটা গড়িয়ে গড়িয়ে ফুটে বেরিয়েছে আবার। মরিচ বাতির মতো জ্বলছে নিভছে অজস্র তারার ফুটকি।

আশ্চর্য নীরবতা ভেঙে সহসা উড়ে গেল একঝাঁক গাঙচিল।

দূরের জাহাজখানা আলোর মুকুট পরে দাঁড়িয়ে আছে রাজার মতো।

কই, কফি খাও।

আর খাবো না। শরীরটা ভারি গুলোচ্ছে কেন যেন।

মেয়ের কথা মনে পড়ছে?

এখানে এলেই পড়ে। মরাটা আসলে সহজ নয়।

তোমার বউয়ের খবর কী?

আছে এক রকম।

আহা, বেচারা! তুমি কেন এলে?

কেউ কী ইচ্ছে করে আসে! লেখাপড়া শিখে বেকারগিরি কতোদিন ভালোলাগে বলো!

কিন্তু এসে লাভ হলো কী?

কিছুই না। ধারদেনা করে এসে পুরোটাই লোপাট হয়ে গেল।

তা হবে কেন? এর একটা নিয়ম থাকবে না!

আর নিয়ম! নিয়ম থাকলে এরকম ঘটে কী করে?

সরি, একটা কথা জিজ্ঞেস করা হয়নি। তুমি কী ঢাকা চিন?

চিনব না কেন! আমার ফ্যামিলিতো ওখানেই থাকে।

ফাইন। তোমাদের ঢাকায় কিন্তু একবার গিয়েছি আমি।

বটে! তা বাংলাদেশ যাবার কারণ?

সাধে নয় অবশ্য। কারণ তো নিশ্চয় আছে।

বলতে আপত্তি না থাকলে কারণটা একটু শুনতে পারি।

চলো হাঁটতে হাঁটতে কথা বলি। যা ভিড় দেখছি...

এরা সব ফুর্তিতে পাগল হয়ে আছে। আতশবাজি হবে নাকি আবার?

মনে হয় না।

আল বাইকের নাগেট খাবে?

থাক। ইচ্ছে হচ্ছে না।

তুমি কোথায় থাকো?

মুসিরিব। এক একদিন একেকজনের সঙ্গে শেয়ার করছি।

সেদিন একটা কাজে নাজমা গিয়েছিলাম গাইড লোরনার সঙ্গে।

ওটাকে বাঙালি পাড়া বলা ভালো।

একটু কৌতূহল নিয়ে কথা বলেছিলাম একজনের সঙ্গে। উনি উবার চালক। ওর কাছে জানতে পারলাম অনেক কথা।

এখানে বাঙালিরা অনেকে দোকানপাট চালালেও এখন তারা কুলোতে পারছেন না। বিশ্বকাপের পর একটা খরা শুরু হয়েছে। অনেকে চাকরি-হারা হয়েছে। নতুন কাজকর্ম জুটছে না তেমন।

ব্যবসার সুদিনও নেই আগের মতো। খুব খারাপ লাগল মানুষটার কথা শুনে। এভাবে হলে কী করে চলবে! যেখানে যাই না কেন, বাংলাদেশের লোকজনের সঙ্গে কেন যেন দেখা হয়ে যায়! এটাকে কপালের ফের বলতে পারো। থুমামা স্টেডিয়ামে খেলা দেখার সময় পাশের সারিতে বসেছিল কয়েকটি বাঙালি ছেলে। চমৎকার আড্ডা জমেছিল ওদের সঙ্গে। আবার এই যেমন তুমি। বাংলাদেশ আমাকে কেন যেন ছাড়ছে না। ভালো লাগলো শুনে। তুমি তো ঢাকায় গিয়েছিলে! ব্যাপারটা কী বলতো?

মেঘের আড়াল ফুঁড়ে চাঁদটা ভেসে উঠছে একটু একটু। আলো আলো ভাবটা ছড়িয়ে পড়েছে পানিতে। হু হু বাতাসে মৃদু ঢেউ খেলেছে পানিতে। একটা উড়োজাহাজ সমস্ত নিস্তব্ধতা ভেঙে উড়ে গেল হাসতে হাসতে। নাদিয়া মাফলারটা গলায় টেনে বেঁধে বলল, চলো গার্ডেনের ওদিকে গিয়ে একটু বসি। বেশ শীত। সমুদ্রের এদিকটা পার্ল ছুঁয়ে বেঁকে গেছে শহরের পেটের দিকে।

ওপারের ভবনগুলো বহুবর্ণ আলোয় সেজে রঙের দুনিয়া বানিয়ে দিয়েছে। পানিতে ছিটকে পড়েছে সেই অদ্ভুত রঙের বহুবর্ণ কারুকাজ।

বাগানটা ভারি সুন্দর।

যেমন গাছপালা তেমনি বাহারি ফুলে ভরপুর চারদিকটা। ওরা একটা ঝোপের আড়াল ছুঁয়ে বসল।

একটু নিশ্চুপ থেকে নাদিয়া ধরা গলায় বলল, কেন যে ঢাকায় গিয়েছিলাম সেটা এককথায় বলা যাবে না। একটু গোড়া থেকে শুরু করতে হবে।

আমি তখন ফিলিপিনস ইউনিভার্সিটির ছাত্রী। মিন্দানাওয়ের মুসলিম পরিবারের মেয়ে বলেই হয়ত রুচি আর মানসিকতায় একটু ভিন্নতা ছিল। বাংলাদেশের আদনান ছিল আমার সহপাঠী।

দারুণ মেধাবী আর তুখোড় আলরাউণ্ডার। সে ছিল সকল কাজের কাজি। খেলাধুলা, বক্তৃতা, প্রেজেন্টেশন, থিসিস, সোসাল ওয়ার্ক, লিডারশীপ—- সব তরফেই সে ছিল সবার শীর্ষে।

আমি মুসলিম বলেই হয়ত একটু গায়ে পড়ে ভাব জমাতে চেষ্টা করত। আমি এটা আমলে না নিলেও কেন জানি সহজ হতে পারতাম না। অথচ নানা অজুহাতে সে ঝুলে থাকত আমার পেছনে।

একবার একটা গ্রুপে পেপার ওয়ার্ক করতে গিয়ে মানুষটা অজান্তেই কাছে চলে এলো খানিকটা।

এভাবেই শুরু হয় এক উদ্দাম জীবনের মাতামাতি। খবরটা যথারীতি চাউর হয়ে যায় মিন্দানাওয়ের বাড়িতে। বুঝতেই পারো, শত হলেও আমরা মুসলিম। একটা বিধিনিষেধের ভেতর চলতে হয় আমাদের। ওদিকে পলিটিকালি মিন্দানাওয়ের রাজনীতি তখন তোপের মুখে।

সেখানে ভিনদেশি এক ছেলের সঙ্গে মেয়ের ওঠাবসা নিয়ে রীতিমতো ঝড় উঠলো পরিবারে।

আদনান নির্বিকার। সে ততদিনে আমাকে বাঙালি বউ বানিয়ে নিয়েছে। এখন শুধু ঘরে তুলে নিলেই হলো। বাবা-মা বেঁকে বসলেন। কিছুতেই ভিনদেশী ছেলেকে মেনে নেবেন না জামাই হিসেবে। এবার আসল যুদ্ধটা শুরু হলো আমার সঙ্গে। বিয়ে করতে হলে এই ছেলেকেই মেনে নিতে হবে। অন্যথা নয়। সে এক বিতিকিচ্ছিরি ব্যাপার। বলে বোঝাতে পারব না।

অনেক ঝড়জাপ্টা পেরিয়ে সম্মতি মিলল অবশেষে।

একটা সিগাল হঠাৎ উড়ে এসে পাক খেল খানিক। তারপর কী মনে করে ডানা জাপ্টে চলে গেল ওপারের পানে। চাঁদটা কখন যেন গুটি গুটি হেঁটে চলে এসেছে মাথার ওপর।

আকাশজুড়ে অগণিত তারার মেলা। এই মেলার হাটে দুটো তারা মানিকজোড় হয়ে জ্বলছে আলাদা মহিমায়।

পানির রঙ এখন কিছুটা লালচে। আশপাশ ভবনের সজ্জিত আলোকমালার ঠিকরানো দ্যুতিতে এই রঙ বদলে যায় আরো। আজ বিকেল-সন্ধ্যা কেটেছে লুসাইলের বুলেবার্ডে। সে এক দারুণ দোল-দোলানো অভিজ্ঞতা। বিশ্বকাপের তাতানো রঙের আগুনে একাকার হয়ে যায় প্রকৃতি ও মানুষ। আশ্চর্য এক মনোরম দৃশ্য।

দেশ-বিদেশের অগণিত মানুষের মাতামাতির মধ্যে থেকেও সে যেন একটু আলাদা করে নিজেকে সরিয়ে রাখে সব ফুর্তি থেকে। হাজারো মানুষের উল্লাস, নৃত্য, সঙ্গীতের গগনবিদারি সুরেলা মুর্ছণা, বর্ণাঢ্য লেজার শো, ঝুলন্ত রঙিন পতাকা, ঝকমকে হাঙর—-কিছুই টানছে না তাকে। সে একান্তে গিয়ে বসে থাকল সমুদ্রের কোণটিতে। বিশ্বকাপের রঙের ছটা থেকে বাদ পড়েনি সমুদ্রের গভীর জলরাশি। রঙবেরঙের আলোর নৌকা ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে পানিতে। মৃদু বাতাসে সেগুলোর দোল-খাওয়া দৃশ্য অভূতপূর্ব।

সমুদ্র পারে বহুদূর বিছিয়ে দেয়া হয়েছে অজস্র আলোর ফুটকি।

নিশিকাব্যের পৃষ্ঠাগুলো এভাবে ধীরে ধীরে উল্টে সে দ্রুত পৌঁছে যায় অন্য এক অচেনা রাজ্যে।

সেই ছবিটা পুনরায় ফিরে এলো কর্ণিশে।

বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলে দৃষ্টি ফেরাল সমুদ্রের দিকে।

কিছুক্ষণ নীরবতার পর ফিসফিসিয়ে বলল, এতো করে লাভ হলো কী?

কেন?

সেটা তোমার দেশের আদনান সাহেবকে জিজ্ঞেস করো।

হাজারো কাঠখড় পুড়িয়ে আদায় করলাম বাবা-মার সম্মতি।

বললাম, চলো, এখন তো আর বাধা নেই। এবার নির্বিঘ্নে বিয়েটা সেরে ফেলি।

বাড়িতে সাজ সাজ রব। বিদেশী জামাই। তারওপর বিয়েশাদি নিয়ে আত্মীয়কুটুমের কৌতূহলের শেষ নেই।

হঠাৎ অবাক করে সে বলল, বাড়িতে জানান দিতে দু’দিনের জন্য ঢাকা যাবে।

তার একটাই কথা, এই যাবে আর আসবে। তারপর এসেই বসবে বিয়ের পিড়িতে।

এরপর আর কথা খাটে না।

ওদিকে দিন যায়। মাস যায়। তার দেখা নেই।

কী যে এক অবস্থা বলে বোঝাতে পারব না।

ওদিকে বাড়িতে মুখ রাখার জায়গা নেই।

তারা চাপ দিচ্ছেন অনবরত।

কী করব দিশা করতে পারছি না! চোখে অন্ধকার দেখছি।

মানুষটা ওই যে গেছে আর সাড়া নেই। কোনোভাবেই ধরতে পারছি না তাকে।

সব যোগাযোগ কেটে দিয়ে সে লাপাত্তা হয়ে গেছে।

কিছু উড়ো খবর পাই লোকজনের মুখে।

সে নাকি একটা ইউনিভার্সিটিতে পড়ায়। আরো কিছু টুকটাক খবর ভেসে আসে হাওয়ায়। যা আমাকে পাগল করে তোলে অবিরত।

নাদিয়া একটু থামল। আকাশে মুখ তুলে কী যেন দেখল খানিক।

রাত এখন গভীর। কিন্তু কর্ণিশের চোখে ঘুম নেই। সে জেগে আছে বিপুল আমোদে।

বিশ্বকাপ রাতদিন এক করে দিয়েছে।

শুধু আনন্দে জাগো। উল্লাসে মাতো।

তারপর?

সরি, মাথাটা যেন কেমন করছিল একটু।

চা খাবে?

না, না, ঠিক আছে। আমি শেষ করছি।

কোনো কুলকিনারা না পেয়ে একদিন চড়ে বসলাম প্লেনে।

ঢাকার ঠিকানা জানা ছিল না।

অনেক খুঁজেপেতে এক সকালে গিয়ে হজির হলাম ওর বাসায়।

মানুষটা ভুত দেখার মতো চমকে গেল আমাকে দেখে।

শুধু তো তো করে বলল, তুমি!

ওর পেছনে এসে সলজ্জ ভঙ্গিতে দাঁড়াল মায়াবী মুখের একটি মেয়ে। কোলের ছোট্ট শিশুটি মায়ের মুখ কেটে বসানো। এক রাজ্যের বিস্ময় নিয়ে মহিলা তাকিয়েই রইল শুধু।

আদনান রক্তিম মুখে কী যেন বিড়বিড় করল সামান্য। অতপর প্রচণ্ড ক্রোধে দরজাটা সশব্দে বন্ধ করে দেয় মুখের ওপর—- হাউ ডেয়ার। ইউ, ইউ....!

চাঁদটা এতক্ষণে পুরোপুরি ঢেকে গেল মেঘের আড়ালে।

বাতাসের সেই বয়ে-যাওয়া স্নিগ্ধ ভাবটা আর নেই। কেমন এক অস্হির গুমোট ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে।

নাদিয়া হঠাৎ আমূল চমকে হাহাকারের গলায় চিৎকার করে উঠল—-ও এটা কী করে পারল? আফটার অল আমি তো একজন মানুষ। একজন মানুষের সঙ্গে কতটুকু শিষ্টাচার মানতে হয় সেটাও কী জানেন না তোমার দেশের প্রফেসর? আমি ওর কী করেছি বলতো! বরং ওই ভণ্ডটাই আমার জীবনটাকে শেষ করে দিয়েছে। চিরদিনের জন্য আমাকে ছোট করে দিয়েছে সবার কাছে। কিন্তু কেন? আমার অপরাধটা কোথায়? তোমরা কী আসলে এরকম! সরি,আমার কথায় দুঃখ পেও না। আমি কালই ম্যানিলা চলে যাচ্ছি। বড় ভালো লাগল তোমার সঙ্গে গল্প করে। আমার একটা অনুরোধ, এভাবে কখনও রাত-বিরেতে আর সাগরের কাছে এসো না। একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। এখন ঘরে যাও। রাত হয়েছে। আমি আর একটু বসি। বাই...

এই নিশি অচিরেই ভোর হবে সত্য, কিন্তু সেই চিরন্তন কাব্যটি থেকে যাবে অজানা মোড়কে চিরতরে তালাবদ্ধ ।