জাকির আলী রজনিশ

অনুবাদ: মুহাম্মদ আবুল হুসাইন

(জাকির আলী রজনীশ: হিন্দি সাহিত্যের জনপ্রিয় লেখক। ‘বুড়ো নাবিকের বিশ্ব জয়’ গল্পটি লেখকের Best of Adventure stories A daring journey গল্পের অনুবাদ।)

যখনই কোন বিপজ্জনক ও দুঃসাহসিক অভিযাত্রার কথা আসে, স্যার ফ্রান্সিস চিশেস্টারের নাম সব সময় অত্যন্ত সম্মানের সাথে নেওয়া হয়। ৬৫ বছরের বিপজ্জনক বয়সেও তিনি এমন কিছু উত্তেজনাপূর্ণ অভিযানে সফলতা অর্জন করেছিলেন যা আজও অনেক তরুণ অভিযাত্রির কল্পনার বাইরে।

একদিন, ফ্রান্সিস তার প্রিয় বোট ‘জিপসি মথ’কে অত্যন্ত মনযোগের সাথে দেখছিলেন। এই জিপসি মথকে নিয়েই তিনি আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দেওয়ার দুটি প্রতিযোগিতা জিতেছিলেন। বোটটিকে দেখতে দেখতে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লেন এবং চুমু খেলেন। বিড়বিড় করে বললেন, “প্রিয় জিপসি, তুমি আমাকে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় সাহায্য করেছো। তুমি আমার সাহসী ছেলের মতো!”

ফ্রান্সিস পরম মমতায় তার বোটের পাশে বসলেন এবং এটিকে তার নিজের ছেলের মতো আদর করতে শুরু করলেন। তিনি বরং আবেগপ্রবণ হয়ে বললেন, “আমি জানি যে তোমার সামর্থ্য পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি। কেন আমরা দুজনেই এমন অনন্য কিছু করি না যে...বিশ্ব আমাদের চিরকাল মনে রাখবে। সমুদ্রপথে কেন আমরা বিশ্বভ্রমণ করছি না? তুমি কি বলো?” এই বলে ফ্রান্সিস কেবিনে ঢুকে ইঞ্জিন স্টার্ট করলেন। তারপর তার কান বোটটির বুকের উপর রাখার মতো করে সাবধানে তার স্পন্দন শোনার চেষ্টা করলেন। প্রায় ত্রিশ সেকেন্ড পর আনন্দে চিৎকার করে বললেন, “আমি জানতাম। ঠিক আছে, আমরা সমুদ্রপথে একটি বিশ্বভ্রমণ করব। তখন সবাই তোমাকে দেখতে আসবে এবং গর্ব করে তোমার সাহসের গল্প অন্যদের কাছে বলবে।”

ফ্রান্সিস চিশেস্টার তার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে ফেলেন এবং বহির্বিশ্বের কাছে তার ইচ্ছার কথা ঘোষণা করলেন। তার অভিপ্রায় যেই শুনল সেই বিস্মিত হল। ৬৫ বছর বয়সে বিশ্বভ্রমণ! অসম্ভব! কেউ কেউ ভাবলো ফ্রান্সিসের মাথায় গণ্ডগোল দেখা দিয়েছে। আবার কেউ কেউ ভাবলো তার মতিভ্রম হয়েছে।

কিন্তু ফ্রান্সিস ছিলেন একজন আত্মবিশ্বাসী এবং প্রবল ইচ্ছাশক্তি সম্পন্ন মানুষ। তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অটল। ফিরে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। কে কি বললো তা নিয়ে তার কোন মাথা ব্যথা নেই। তিনি বরং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে থাকেন।

এটা কোন সহজ কাজ ছিল না। বড় বড় ঢেউ, বিপজ্জনক হাঙ্গর, সামুদ্রিক ঝড় ইত্যাদি- সব মিলে এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। কিন্তু ফ্রান্সিসের নিজের উপর পূর্ণ বিশ্বাস ছিল। ভয়কে জয় করাই ছিল তার নেশা। স্বপ্ন, সাহস ও আত্মবিশ্বাস যাদের থাকে, পৃথিবীতে দুর্দান্ত কিছু আসলে তারাই করে থাকে।

১৯৬৬ সালের ২৭শে আগস্ট। সকালে, ফ্রান্সিস তার যাত্রা শুরু করেন। তার সব বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজন তাকে দেখতে এসেছিলেন। সবাই তার সফলতা ও নিরাপদে ফিরে আসার জন্য দোয়া করেন। ফ্রান্সিস ককপিটে ঢুকে ইঞ্জিন চালু করল। যেহেতু রুট আগেই ঠিক করা ছিল, জিপসি মথ তার গন্তব্যে ছুটে চলল!

যখন বোটটি তীর ছেড়ে গেল, ফ্রান্সিস তার স্ত্রী এবং সন্তানদের স্মরণ করলেন। তার মুখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। কিন্তু শীঘ্রই তিনি নিজেকে সম্বরণ করেন এবং টেপ রেকর্ডারটি চালু করেন। সঙ্গে সঙ্গে, কেবিন জুরে তার প্রিয় গানের সুর লহরি ছড়িয়ে পড়ল।

জিপসি মথ সমুদ্রের ঢেউ অতিক্রম করে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু ফ্রান্সিস ভালো বোধ করছিলেন না। তার পায়ে প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হয়। প্রায় অসহ্য ছিল। তিনি সঙ্গে নিয়ে আসা ব্যথানাশক ওষুধ খেলেন। কিন্তু কোনো লাভ হলো না। ব্যথা কমেনি। ফলে সে রাতে ফ্রান্সিস ঠিকমতো ঘুমাতে পারলেন না। বাধ্য হয়ে তিনি ওষুধটির ডবল ডোজ খেলেন। প্রায় বারো ঘণ্টা পর ব্যথা থেকে কিছুটা উপশম হলো।

পরের দিন যখন ফ্রান্সিসের ঘুম ভাঙলো, তখন সমুদ্র শান্ত ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই অপ্রত্যাশিতভাবে বোটটি দুলে উঠলো এবং ঢেউয়ের উচ্চতা বাড়তে থাকলো। ফ্রান্সিস দ্রুত কেবিন থেকে বেরিয়ে এলেন। এরপর যা দেখলেন, তাতে তার চক্ষু ছানাবড়া হওয়ার যোগার। বোটের সামনে ইয়া বড় এক হাঙর। তিনি তৎক্ষণাৎ নৌকার দুলেওঠার কারণ বুঝতে পারলেন। হাঙ্গরকে থামানো না গেলে বোটটি উল্টে দিতে পারে, ফ্রান্সিস তাড়াতাড়ি তার রাইফেল বের করে হাঙরের দিকে দুটি গুলি চালিয়ে দিলেন। হাঙর পালিয়ে গেল এবং নৌকার দোলাচল বন্ধ হয়ে গেল। ফ্রান্সিস স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।

১৭ই সেপ্টেম্বর ফ্রান্সিসের জন্য ছিল একটি বিশেষ দিন। কারণ এটি ছিল তার জন্মদিন। এটা ছিল তার ৬৫ তম জন্মদিন। পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে জন্মদিন পালন করতেন তিনি। কিন্তু এবার তার সঙ্গে কোনো বন্ধু বা পরিবার না থাকায় তাকে একাই জন্মদিন পালন করতে হয়েছে। তিনি কেক কাটলেন কিন্তু মোমবাতি নিভিয়ে দিলেন না। আগের জন্মদিনে রেকর্ড করা গানটি তিনি বাজিয়েছেন। ‘হ্যাপি বার্থডে টু ইউ’ গানে গোটা কেবিন মুখরিত হয়ে উঠল। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে ফ্রান্সিস সঙ্গীতের সুরে নাচতে শুরু করেন এবং শীঘ্রই তিনি তার নাচে মগ্ন হয়ে পড়েন।

হঠাৎ প্রবল ঝাঁকুনি শুরু হল। ফ্রান্সিস কেবিনের ফ্লোরে টালমাটাল হয়ে প্রায় পড়ে গেলেন। সঙ্গে সঙ্গে কেবিন থেকে বেরিয়ে আসেন তিনি। জিপসি মথ ঝড়ে আটকা পড়েছে। বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ৫০ নটিক্যাল মাইলের কম ছিল না। বোটটি নিয়ন্ত্রণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ল। বাতাসের তোড়ে এটি পিছনে হটছিল। আর ফ্রান্সিস একে সামনের দিকে নিতে। এটা সত্যিই অনেক কঠিন ছিল। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে চলে ঝড়ের তাণ্ডব। এ সময় বোট নিয়ন্ত্রণ করা ছিল পাহাড়ে ওঠার মতো দুঃসাধ্য ব্যাপার। ফ্রান্সিস ক্লান্ত হয়ে পড়েন এবং তার হাতও ব্যথা করতে শুরু করে। যদিও তার ক্লান্তি শীঘ্রই কেটে গিয়েছিল, তবে হাতে ব্যথা কয়েক দিন ধরে ছিল।

আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত অতিক্রম করার সময় ফ্রান্সিস আবারও ঝড়ের মুখোমুখি হন। প্রচণ্ড ঝড়। ঢেউ উঠছিল প্রায় একশো ফুট উচ্চতায়। জিপসি মথ এত শক্তিশালী ঝড় সহ্য করতে পারল না এবং খুব বাজেভাবে নষ্ট হয়ে যায়। বোটের ভিতরে যে পানি ওঠে তা বের করতে ফ্রান্সিসকে অন্তত তিন ঘণ্টা পরিশ্রম করতে হয়।

ঘন্টার পর ঘন্টা কঠোর পরিশ্রম করার পর ফ্রান্সিস পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আন্তে পারলেও নিজের শরীরকে আর নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছিলেন না। অতিরিক্ত পরিশ্রম আর ক্লান্তির কারণে ফ্রান্সিস ফ্যাকাশে হয়ে পড়েন এবং তার পুরো শরীর ব্যথায় টনটন করতে থাকে। আর কোনো উপায় না পেয়ে ব্যথানাশক ওষুধের সাহায্য নেন এবং একপর্যায়ে ঘুমিয়ে পড়েন। ঘুমের মধ্যে তিনি এক ভয়ঙ্কর স্বপ্ন দেখেন। তিনি দেখেন- একটি হাঙ্গর তার দিকে তেড়ে আসছে। আবার তার স্ত্রীও ভয়ঙ্কর বিপদে, কিছু ডাকাত তাকে ধরার চেষ্টা করছে। আবার এক উপজাতি ফ্রান্সিসকে বলি দেওয়ার জন্য তলোয়ার হাতে দাঁড়িয়ে আছে। তরবারি দিয়ে যেই আঘাত করল, সাথে সাথে ফ্রান্সিসের ঘুম ভেঙ্গে গেল।

একনাগাড়ে প্রায় বারো ঘন্টা ঘুমের পর জেগে উঠলেন ফ্রান্সিস।

পরের রাতে আবার ঝড়। ঢেউগুলো এত শক্তিশালী ছিল যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালিত যন্ত্রপাতির উইন্ড ভ্যান সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গেল। ফলে বোটের স্বয়ংক্রিয়তা বন্ধ হয়ে যায়। ফ্রান্সিস এটি মেরামত করার অনেক চেষ্টা করলেন, কিন্তু তার সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়। বাধ্য হয়ে তিনি নৌকার পাল মেরামত করে যথাস্থানে স্থাপন করেন। পালে বাতাস লাগায় বোটটি ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে লাগলো।

১১ই ডিসেম্বর। জিপসি মথ সিডনির (অস্ট্রেলিয়া) উপকূলে পৌঁছল। তখন নাবিক ফ্রান্সিসের কাছে খাওয়ার কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। তিনি সেখানে কিছুক্ষণ থাকার কথা ভাবলেন। সবার আগে তিনি বিশেষজ্ঞ মেকানিক্স দ্বারা নৌকা মেরামত করান। তারপর খাবার কিনে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে লাগলেন। এমন সময় তার দেখা হল শৈশবের এক বন্ধুর সাথে। বন্ধু ফ্রান্সিসের গন্তব্যের কথা শুনে তাকে একটি মেশিনগান দিয়ে বললেন, “এটা তোমার কাছে রাখো। তুমি হয়তো সমুদ্র ডাকাতদের কবলে পড়তে পারো। এটা তোমাকে কঠিন সময়ে সাহায্য করবে।”

ফ্রান্সিস আবার যাত্রা করলেন। সিডনির উপকূল ছেড়ে যাওয়ার পর আবার একের পর এক ঝড়। টানা দুই মাস ঝড় মোকাবেলা করে এগিয়ে যেতে হয়েছে তাকে। এরমধ্যে বারবার ককপিটে পানি উঠেছে, অনেকবার তিনি ভিজেও গেছেন। এর ফলে তিনি আবাট অসুস্থ ও দুর্বল হয়ে পড়েন। কিছুক্ষণ কাজ করলেই হাপিয়ে ওঠেন। তবে এত কষ্টের মধ্যেও তিনি সাহস হারাননি। সাগরের ঢেউকে সাহসের সাথে মোকাবিলা করে ক্রমাগত এগিয়ে চলেন।

বোটটি যখন দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, ফ্রান্সিস দেখতে পেলেন কিছু স্টিমার তার দিকে আসছে। মুহূর্তের মধ্যেই ফ্রান্সিস বুঝতে পারলেন যে তারা জলদস্যু। তিনি তার নৌকার গতি বাড়িয়ে দিলেন। কিন্তু জলদস্যুরা আরও কাছে চলে আসে। চারটি মোটর বোটে চড়ে তারা জিপসি মথকে ঘিরে ফেলার চেষ্টা করে।

ফ্রান্সিস হিসাব করে দেখলেন, জলদস্যুরা যদি জানতে পারে যে তিনি একা, তাহলে তিনি চরম বিপদে পড়ে যাবেন। তাই, তিনি সঙ্গে সঙ্গে কিছু মূর্তি তৈরি করে কেবিনের চার কোনায় দাঁড় করিয়ে দিলেন। জলদস্যুরা নৌকার কাছে এলে ফ্রান্সিস তার মেশিনগান থেকে গুলি ছুড়তে থাকেন। জলদস্যুরা কিছুক্ষণ লড়াই করতে সক্ষম হলেও শেষ পর্যন্ত পালিয়ে যায়। ফ্রান্সিস তার সাফল্যে অত্যন্ত উউৎফুল্ল হন। তিনি মেশিনগানে চুমু খেয়ে নাচতে থাকেন।

এক সপ্তাহ পর ফ্রান্সিসকে আবার জলদস্যুরা ঘেরাও করে। এবার তারা জেনে যায় তিনি একা। জেনে জলদস্যুরা দ্বিগুণ উৎসাহে বোট ঘেরাও করতে থাকে। বাধ্য হয়ে ফ্রান্সিস তার মেশিনগান থেকে গুলি চালান। এতে অনেকে মারা যায় আবার অনেকে আহত হয়। একটি লোক তখনও অক্ষত ছিল; সে জিপসি মথের কাছে আসতে থাকে। হঠাৎ করেই একটি তীর ফ্রান্সিসের বাম বাহুতে বিদ্ধ হয়। ভারসাম্য বজায় রাখতে না পেরে সে পড়ে যায়। সে ভেবেছিল মৃত্যু ঘনিয়ে এসেছে। সে এখন স্পষ্টভাবে শুনতে পাচ্ছে স্টিমারের শব্দ, ক্রমশ কাছে আসছে।

হঠাৎ, ফ্রান্সিস প্রচণ্ড ব্যথায় ককিয়ে উঠলেন এবং চোখ বন্ধ করে ফেললেন। ঠিক সেই মুহূর্তে বোটের নিচে একটা বিস্ফোরণ হল। বোটটি বাতাসে অনেক উপরে উড়ে গেল। ফ্রান্সিস তৎক্ষণাৎ একটা লোহার রড শক্ত করে ধরে ফেলেন। বোটটি নেমে পানির উপর আছরে পড়ল, কিন্তু ভাগ্যক্রমে, তা উল্টে গেল না।

ফ্রান্সিস যখন চারপাশে তাকালেন, তখন জলদস্যুদের দেখা গেল না। তিনি তার বাহু থেকে তীরটি বের করে ক্ষতস্থানে অ্যান্টিসেপটিক লাগিয়ে দিলেন এবং বোটের উপর স্থির হয়ে শুয়ে পড়লেন। বাতাসের তোরে নৌকাটি ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে লাগলো। কিন্তু হঠাৎ, নৌকার পাল ভেঙে পড়ল ফ্রান্সিসের মাথার উপর। ফ্রান্সিস অজ্ঞান হয়ে গেলেন।

যখন ফ্রান্সিসের জ্ঞান ফিরে এলো, তিনি নিজেকে একটি দ্বীপে আবিষ্কার করলেন। তার নৌকা প্রায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছে এবং তীরে পড়ে ছিল। নৌকার অবস্থা দেখে ফ্রান্সিস দুঃখ পেলেন। সমুদ্রের তীরে শুয়ে তিনি বিড়বিড় করতে লাগলেন। তার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। তখন ছিল চাঁদনী রাত। ফ্রান্সিস ঘুমিয়ে পড়লেন এবং শীঘ্রই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলেন।

ভোরবেলায় ফ্রান্সিস কিছুটা সতেজ বোধ করলেন। কাছেই ঘন জঙ্গল। কোনও মানুষের চিহ্নই ছিল না। কিছু খাবার খাওয়ার পর ফ্রান্সিস তার প্রিয় জিপসি মথ মেরামত করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। হঠাৎ মানুষের গন্ধ পেয়ে কোথা থেকে একটা লিওপার্ড এসে হাজির হল। ভয়ে ফ্রান্সিস দ্রুত তার বন্দুক তুলে নিলেন, কিন্তু তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে কীভাবে চালাবেন তা ভুলে গেলেন। লিওপার্ডটি হা করে ফ্রান্সিসের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস চিতাবাঘের মুখের ভিতর বন্দুকের নল ঢুকিয়ে দিলেন। হঠাৎ বন্দুকের ট্রিগার চাপা পড়ায় কয়েকটি গুলি জন্তটিকে আঘাত করে এবং সে মারা পড়ে।

এতক্ষণে ফ্রান্সিস বুঝতে পারলেন যে সেখানে থাকা নিরাপদ নয়। তাই, তিনি নৌকাটি যতটা সম্ভব মেরামত করেন যাতে এটি ব্যবহারযোগ্য হয়। তারপর, মানচিত্র এবং কম্পাসের সাহায্যে, তিনি দিক খুঁজে বের করে এগিয়ে যান। জিপসি মথ আটলান্টিক মহাসাগরের পানিতে প্রবেশ করার পর লোকেরা ফ্রান্সিসের আগমনের কথা জানতে পারে। খবরটি দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের লোকেরা ফ্রান্সিসকে এক ঝলক দেখার জন্য সেখানে জড়ো হয়েছিল। রেডিওতেও ফ্রান্সিসের সাফল্যের খবর ঘোষণা করা হয়েছিল। ফ্রান্সিসের পরিবার, বন্ধুবান্ধব এবং আত্মীয়স্বজনরা তাকে স্বাগত জানাতে সমুদ্র তীরের কাছে জড়ো হয়েছিল। জিপসি মথ যখন তীরে স্পর্শ করে, তখন ফ্রান্সিসকে স্বাগত জানাতে হেলিকপ্টার থেকে ফুল ফেলা হয়েছিল। লোকেরা তার প্রশংসায় স্লোগান দিতে শুরু করে।

২২৬ দিন ভ্রমণের পর, ১৯৬৭ সালের ২৩শে মে, ফ্রান্সিস প্লাইমাউথের তীরে পা রাখেন এবং এত অল্প সময়ের মধ্যে বিশ্ব ভ্রমণকারী প্রথম ব্যক্তি হন। তাকে স্বাগত জানাতে সেখানে কমপক্ষে ৩০ হাজার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। ফ্রান্সিস তাদের অভিবাদন গ্রহণ করার জন্য হাত নাড়লেন। আনন্দের অশ্রু তার মুখে নেমে এলো। তার সাফল্য উদযাপন করতে লোকেরা তাদের বাড়ি আলোক সজ্জিত করল এবং পটকা পোড়াল । ইংল্যান্ডের রানী তার সম্মানে একটি ভোজসভার আয়োজন করলেন এবং তাকে ‘স্যার’ উপাধিতে ভূষিত করলেন। সেই মুহূর্তে ফ্রান্সিস তার জিপসি মথকে খুব মিস করলেন। সর্বোপরি, এটি ছিল জিপসি মথ, তার প্রিয় বোট, যা তাকে তার লক্ষ্য অর্জনে সাহায্য করেছিল।

“ধন্যবাদ মথ”, ফ্রান্সিস বিড়বিড় করে চোখ বন্ধ করে ফেললেন। ফ্রান্সিসের মতো সাহসী নাবিকও তার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া আনন্দের অশ্রু নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি।