পবিত্র ঈদ উৎসব বা ঈদের আনন্দ মনের ভিতর থেকে উৎসারিত স্বয়ংক্রিয়ভাবে আনন্দের বহিঃপ্রকাশ। এই আনন্দ অন্য কোন কিছুর সঙ্গে তুলনীয় নয়। বরং বলা হয় বৈষয়িক জীবনে আনন্দঘন কোন মুহূর্ত এলে তখন স্মরণ হয় ঈদের আনন্দের মতো। ঢাকা মহানগরীসহ দেশের অন্যত্র বিশেষ করে গ্রামের কথা যদি বলা হয় তাহলে আনন্দের ধরন বিভিন্ন রকম হলেও ঈদ আনন্দ একই সুরে গাথা। ধনী গরীব নির্বিশেষে ঈদের নামাযে সবাই এক কাতারে দাঁড়ানো এক সৌহার্দের বার্তা বহন করে। ঈদকেন্দ্রিক আমাদের এই একত্র হওয়া সারা বছরব্যাপী যেন পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করতে পারি এটাই ঈদের শিক্ষা।

এই ঢাকায় ঈদ নিয়ে নানা কথা প্রচলিত রয়েছে। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বলা যায় প্রায় ৪০০ বছর আগে ঢাকার সঠিক লোকসংখ্যার সুনির্দিষ্ট রেকর্ড পাওয়া না গেলেও এটি ধীরে ধীরে জনবহুল হতে থাকে এবং পরবর্তী পর্যায়ে (শায়েস্তা খানের আমলে) এটি প্রায় নয় থেকে ১০লক্ষের শহরে পরিণত হয়েছিল। ১৬১০ সালে সুবাদার ইসলাম খান ঢাকাকে মুঘল বাংলার রাজধানী করার সময় এটি ছোট শহর থেকে প্রশাসনিক কেন্দ্রে পরিণত হতে শুরু করে। ১৬১০ সালে রাজধানী স্থানান্তরের পর এটি ‘জাহাঙ্গীরনগর’ নামে পরিচিত হয়। শুরুর দিকে এটি একটি ছোট সামরিক ও প্রশাসনিক শহর ছিল। সপ্তদশ শতাব্দীতে সুবাদার শায়েস্তা খানের সময়ে (১৬৬৪ -১৬৮৮) ঢাকা বড় বাণিজ্য ও জনবহুল কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পায়। যদিও কিছু সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী ঢাকার বসতি আরো পুরনো তবুও ১৬১০ সালের মুঘল পত্তনের সময় এটি ক্ষুদ্রাকার ছিল যা পরবর্তীতে বিশাল শহরে রূপ নেয়।

ইতিহাসের পাতা থেকে জানা যায়, ১৬১০ সালে বাংলাদেশের বর্তমান রাজধানীর ঢাকা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বাংলা অঞ্চলের নিযুক্ত মুঘল সুবাহদার ইসলাম খান। ১৬০৮ সালে রাজমহল থেকে তিনি রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তরিত করেন। আর এর নাম পরিবর্তন করে রাখেন জাহাঙ্গীরনগর। কিন্তু মুসা খানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কারণে তার এখানে আগমন দুই বছর পিছিয়ে যায়।

পরবর্তীতে ঢাকাকে কমপক্ষে আরো চারবার এই অঞ্চলের রাজধানী নামকরণ করা হয়।

ঢাকা যে প্রায় আড়াই হাজার বছরের পুরনো তা পুরান ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে নতুন এক প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান থেকে জানা যায়। ইতোপূর্বে অন্তত: দুইবার ঢাকা ছিল এ অঞ্চলের রাজধানী এটিও এই অনুসন্ধানে প্রতীয়মান হয়।

১৭২৯ সালের পবিত্র রমজান মাসের শেষ দিন। রাত পোহালেই ঈদ। দ্বিতীয় মুর্শিদ কুলি খান খবর পেলেন ত্রিপুরা রাজ্য জয় হয়েছে, এটি এখন তাদের দখলে। এই সংবাদ মুর্শিদ কুলি খানের আনন্দ দ্বিগুণ করে দিল।

মীর সৈয়দ আলী ও মীর মোহাম্মদ জামানকে তিনি আদেশ দিলেন, ঢাকা কেল্লা থেকে ধানমন্ডির ঈদগাহ পর্যন্ত দুই মাইল রাস্তায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ১০০০ টাকা বিলিয়ে দিতে। ঈদযাত্রা করে তাই- ই করা হলো। ঘটনাটি সম্পর্কে স্যার যদুনাথ সরকার তার বিখ্যাত বই বেঙ্গল নওয়াবস-এ বিশদভাবে লিখেছেন।

এই দান আর ঈদের আনন্দ যাত্রা সব সময়ই যে এমন ছিল, তা নয়। তবে পরবর্তী দুই -আড়াই শ বছর পর্যন্ত নায়েব -নাজিমরা ধারাটি অব্যাহত রেখেছিলেন। এসব ঘটনা থেকে বোঝা যায়, সেকালে ঈদ উৎসবের সময় নবাবেরা নিজেদের শান শওকত আর আনন্দ প্রকাশের জন্য বড় একটা বহর নিয়েই ঈদগাহে যেতেন এবং সাধারণ মানুষকে দিতেন উপহার। নিম্নবিত্ত মানুষও তখন রাস্তার দুই ধারে দাঁড়িয়ে থাকত, মোগল- আমিরদের ঈদ যাত্রা দেখার জন্য বা উপহার পাওয়ার আশায়।

বাংলায় ঘটা করে ঈদ উদযাপনের ইতিহাসের সূচনা মোগলদের হাত ধরে। তার আগে বাংলা অঞ্চলে জাঁকজমকপূর্ণ ভাবে ঈদ উৎসব বা ঈদের সংস্কৃতির খোঁজ সেভাবে মিলে না। ইতিহাস ঘাঁটলে এই অঞ্চলে প্রথম যে ঈদগাহের সন্ধান মেলে সেটি ১৬৪০ সালের দিকে ধানমন্ডিতে নির্মিত এবং শাহী ঈদগাহ নামে পরিচিত। বাংলার সুবেদার শাহ সুজার নির্দেশে তাঁর প্রধান অমাত্য মীর আবুল কাশেম এটি নির্মাণ করেন।

ঢাকার ইতিহাসবিদ হেকিম হাবিবুর রহমানের লেখা থেকে জানা যায়, ১৬৪০ সালে প্রথম দিকে গড়ে ওঠা ধানমন্ডির ওই ঈদগাহে সবার যাওয়ার সুযোগ ছিল না, কেবল নবাব উচ্চপদস্থ রাজ কর্মচারী কাজী হাকিম এবং তাদের বন্ধু-বান্ধবই ঈদগাহে যেতেন।

জাতীয় ঈদগাহের বিষয়টি আসে মূলত বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর। ইতিপূর্বে ঈদের নামাজ নিয়ে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে যেটা বলা যায় তা হচ্ছে বাংলাদেশের মুসলমানদের সবচেয়ে বড় দুইটি অনুষ্ঠান ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার নামাযের পড়ার জন্য কেন্দ্রীয় ঈদগাহ’র বিষয়টি আসে। এটি ঢাকা মহানগরী দক্ষিণে অবস্থিত হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে অবস্থিত। বলা যায় এটি ঢাকা জেলার অন্তর্গত। এই ঈদগাহে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ব্যক্তিগণ ঈদের নামাজ আদায় করে থাকেন। জাতীয় ঈদগাহ হচ্ছে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নির্ধারিত একটি ঈদের নামাজের স্থান। এখানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধান বিচারপতি, মন্ত্রিসভার সদস্য, তিন বাহিনীর প্রধান, সংসদ সদস্য, রাজনীতিবিদ, সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা সহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার নানা বয়সী মানুষ নামাজ আদায় করে থাকেন। এখানেই মোগল আমলে নির্মিত ঢাকার প্রধান ঈদগাহ ধানমন্ডিতে শাহী ঈদগাহ এবং বর্তমানে জাতীয় ঈদগাহের নামাজে অংশগ্রহণের ব্যাপারে একটু পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। সে আমলে শাহী ঈদগাহে ঈদের নামাজের সময় জনসাধারণের অংশগ্রহণ ছিল না। কিন্তু বর্তমানে জনসাধারণের সম্পৃক্ততা এবং ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।

স্বাধীনতার আগে থেকেই হাইকোর্টের পাশের জায়গাটি ছিল ঝোপ জঙ্গলে পূর্ণ। সেই জায়গার মাঝে ছিল একটি পুকুর। ১৯৮১-৮২ সালের দিকে সেই ঝোপজঙ্গল কিছুটা পরিষ্কার করা হয়। জায়গাটি একটু পরিচিত হয়ে উঠলে সেখানে ছোট পরিসরে শামিয়ানা টানিয়ে ঈদের নামাজ পড়ানো শুরু হয়। ১৯৮৫ সালের দিকে সেই পুকুরটি ভরাট করে ফেলে কর্তৃপক্ষ। পরে ১৯৮৭-৮৮ সালের দিকে ওই ঈদগাহকে জাতীয় ঈদগাহ হিসেবে ঘোষণা করে সরকার। বর্তমানে বাংলাদেশ হাইকোর্টের অধীনে ঈদগাহটি পরিচালিত হলেও তার দেখভাল করে গণপূর্ত বিভাগ। ২০০০ সালে ২ ঈদেই ঈদগাহ প্রস্তুতের দায়িত্ব পায় ঢাকা সিটি কর্পোরেশন।

চারদিকে লোহার প্রাচীর দেওয়া বিশাল মাঠটিতে রয়েছে একটি মূল ফটক সহ কয়েকটি ফটক। কিবলার দিকে রয়েছে একটি মিহরাব। মিহরাবটি মূলত পাঁচটি মিনারে তৈরি। জাতীয় ঈদগাহে একটি জামাতে অন্তত এক লাখ মুসল্লী একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন। সেখানে একই জামাতে নারীদের নামাজ আদায়ের জন্য থাকে ভিন্ন ব্যবস্থা। এখানে ২০ হাজার নারী একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন। এই জাতীয় ঈদগাহের পর ঢাকায় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে একাধিক ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এর বাইরে বড় দুটি ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয় কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠ এবং দিনাজপুরের গোর -এ- শহীদ বড় ময়দানে। সেখানেও লক্ষাধিক মানুষ ঈদের নামাজে শরীক হন।

লেখক : সাংবাদিক ও ইতিহাস গবেষক