ড. ফজলুল হক তুহিন

‘বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার’ বাংলাদেশে মননশীল ও সৃজনশীল সৃষ্টির ক্ষেত্রে অসামান্য ভূমিকা পালন করে। বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষে, জ্ঞান ও চেতনাগত প্রভাব বিস্তারের জন্য গবেষণামূলক বই প্রকাশ, ‘মাসিক পৃথিবী’ পত্রিকা, গানের প্রচারে ‘ইসলামী সংগীত’ অডিও ক্যাসেট এবং সাহিত্যের জন্য ‘মাসিক কলম’ সাহিত্য পত্রিকার প্রকাশ দেশে ইসলামী সাহিত্য-সংস্কৃতির জগতে যুগান্তকারি ভূমিকা রাখে। বিশেষভাবে সৃজনশীল ও গবেষণামূলক পত্রিকা হিসেবে ‘কলম’ পত্রিকার আছে ঐতিহাসিক অবদান।

‘বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার’। নিউ এলিফ্যান্ট রোডে এর একটি মাঝারি আকারের অফিস ছিলো। এখানে পরিচালক ছিলেন অধ্যাপক এ. কে. এম. নাজির আহমদ। এখান থেকে প্রকাশিত হয় সাহিত্য ও গবেষণা ত্রৈমাসিক ‘কলম’। ‘কলম’ একটি সৃজনশীল সাহিত্য পত্রিকা। যে পত্রিকাটি ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে। প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৭৪ সালে, শিশুসাহিত্যিক সাজজাদ হোসাইন খানের সম্পাদনায়। ১৯৭৯ সাল থেকে ঢাকার কাঁটাবনে অবস্থিত বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টারের সহযোগিতায় সাজজাদ হোসাইন খান সম্পাদনায় নিয়মিত প্রকাশ হতে থাকে ‘সৃজনশীল সাহিত্য ও গবেষণা ত্রৈমাসিক’ হিসেবে। ১৯৮১ সালে পত্রিকাটি ‘সৃজনশীল সাহিত্য ত্রৈমাসিক’ হিসেবে নিবন্ধিত হয়। প্রধান সম্পাদক সাহিত্যিক ও ইসলামী চিন্তাবিদ আবদুল মান্নান তালিব এবং সম্পাদক ও প্রকাশক ছিলেন সাজজাদ হোসাইন খান [তৃতীয় বর্ষ ৪র্থ সংখ্যা মে-জুলাই ১৯৮২ পর্যন্ত]। পরবর্তীকালে পত্রিকাটির সম্পাদক হন বহুগুণের অধিকারি আবদুল মান্নান তালিব এবং সহকারী সম্পাদক হিসেবে কবি মতিউর রহমান মল্লিক দায়িত্ব পালক করতে থাকেন। কিন্তু মতিউর রহমান মল্লিকের নাম পত্রিকায় প্রকাশিত হতো না। ১৯৮৮ সালের মার্চ সংখ্যা থেকে ‘নির্বাহী সম্পাদক’ হিসেবে মতিউর রহমান মল্লিকের নাম প্রকাশ হতে থাকে। পরের সংখ্যা থেকে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে নাম লেখা হতে তাকে। এই সময় থেকে কবি পত্রিকাটির সার্বিক দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখেন। ১৯৯৬ সালে ‘কলম’ পত্রিকার নিবন্ধন জটিলতার কারণে ‘নতুন কলম’ ‘সৃজনশীল সাহিত্য সংকলন’ হিসেবে মতিউর রহমান মল্লিকের সম্পাদনায় প্রকাশ হতে থাকে নতুন আঙ্গিকে। ১৯৯৬-এর শেষ থেকে ১৯৯৮ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ‘নতুন কলমে’র সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীকালে ‘নতুন কলম’ নামে প্রকাশ পেতে থাকে কবি মোশাররফ হোসেন খানের সম্পাদনায়। সেখানেও কবি মল্লিক দীর্ঘ দিন উপদেষ্টা [১৯৯৮-২০০৫] ছিলেন।

‘কলম’ পত্রিকাটি সেই সময়ে বিশ্বাসী ও ঐতিহ্যবাদী সাহিত্যের ধারা সৃষ্টিতে এবং প্রচার-প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অসাধারণ ভূমিকা রাখে। এই ভূমিকার যিনি প্রধান কারিগর, কাণ্ডারি ও অগ্রপথিক, তিনি হচ্ছেন কবি ও সংগঠক মতিউর রহমান মল্লিক। তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন পরিকল্পনা ও বাস্তব কর্মসূচির মাধ্যমে ‘কলম’ একটি কার্যকর ও ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়। ঐতিহ্যবাদী সৃজনশীল ও মননশীল সাহিত্য প্রবাহে ‘কলম’ সম্ভাবনা ও উদ্দীপনার নতুন দ্বার উন্মোচন করে। একদিকে ‘বিপরীত উচ্চারণে’র নিয়মিত সাহিত্য আসর ও কর্মশালার মাধ্যমে তরুণ লেখকদের সৃজনশৈলীর দক্ষতা অর্জন; অন্যদিকে ‘কলমে’র মাধ্যমে প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ লেখকদের আত্মবিকাশ, পরিচিতি ও প্রতিষ্ঠা পায়। ঐতিহ্যবাদী প্রবীণ ও অগ্রজ লেখকদের একত্রিত করে নতুন উদ্যোগ ও উদ্দাম সৃষ্টি এবং নবীন-তরুণ লেখকদের মাঝে আশা, আত্মবিশ্বাস ও সম্ভাবনা সৃষ্টির গুরু দায়িত্ব পালনে কবি ছিলেন কর্মমুখর, উদ্যমী ও নিবেদিত। ফলে ‘কলমে’র মাধ্যমে যেমন একদল প্রতিশ্রুতিশীল নতুন লেখক সৃষ্টি হয়েছে যারা একটি সাহিত্যধারা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন। অগ্রজ ও অনুজ লেখকদের সমন্বয়ে সমবায়ী একটি বিশ্বাসী ও ঐতিহ্যবাদী সাহিত্যান্দোলন সৃষ্টি হয় ঢাকায়। এই সাহিত্য স্ফূরণ ও প্রকাশের স্রোত সমগ্র দেশে ছড়িয়ে পড়ে। চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট, খুলনা, বরিশাল-কুমিল্লা-যশোর-বগুড়াসহ দেশের সর্বত্র ‘কলমে’র পাঠক, লেখক, গ্রাহক ও শুভাকাক্সক্ষী গড়ে ওঠে। ফলে বাংলাদেশে বিরাজমান বুর্জোয়া, পুঁজিবাদি, অবিশ্বাসী ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক সাহিত্যে একটি বিশ্বাসী ও ঐতিহ্যবাদী সাহিত্যধারার সৃষ্টি হয়। অসংখ্য লেখক ‘কলমে’র মোহনায় এসে সম্মিলিত হয়ে সুস্থ প্রবাহ নির্মাণ করেন। ‘কলমে’ লিখেছেন, লিখে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন এবং পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ও সংশ্লিষ্ট দেশের বিখ্যাত সব কবি ও সাহিত্যিকবৃন্দ।

মতিউর রহমান মল্লিক ‘কলমে’র অফিস করতেন নিয়মিত। অধিকাংশ দিন দীর্ঘপথ পায়ে হেঁটে অফিস করেন। গ্রীষ্মের সময় পাঞ্জাবী ঘামে ভিজে যেতো। অনেক সময় কোন লেখককে বাসায় ধরে নিয়ে যেতেন অতিথি হিসেবে। অথচ সংসার জীবনের সূচনায় অল্প বেতনে পত্রিকাটির সার্বিক দায়িত্ব পালন করেন। কবি নিবেদিত চিত্তে ও আন্তরিক নিষ্ঠায় সাহিত্যপত্রটি সম্পাদনা করেন। কোন লেখক অফিসে আসলে আন্তরিক অভ্যর্থনায় আলিঙ্গন করে গ্রহণ, আবশ্যিক আপ্যায়ন, প্রয়োজনে লেখার সম্মানি প্রদান, নতুল লেখকদের উৎসাহ উদ্দীপনা সৃষ্টি, প্রাণবন্ত আড্ডা, প্রবীণ লেখকদের সম্মানজ্ঞাপন ও টার্গেট করে সম্পর্ক স্থাপন ও লেখা আদায় করা, সম্পাদনা ও সাহিত্যচর্চাকে আন্দোলন হিসেবে কাজ করার মাধ্যমে একটি সার্বাত্মক কর্মসূচি পালন করেন। ‘কলম’ ও মতিউর রহমান মল্লিককে কেন্দ্র করে সেই সময়ে লেখকদের একটা আড্ডা, যোগাযোগ ও মিলনমেলা তৈরি হয়েছিলো। প্রায় প্রতিদিন তাঁর সাথে সারাদেশ থেকে দেখা করতে আসতেন সাহিত্য ও সংস্কৃতি-কর্মীরা। একটি স্বতঃস্ফূর্ত ও প্রাণবন্ত সাহিত্য ধারা গড়ে ওঠে কবিকে কেন্দ্র করে।

মতিউর রহমান মল্লিক ‘কলম’ পত্রিকায় বিষয়-বৈচিত্র্য নিয়ে আসেন ব্যাপকভাবে। সাহিত্যের সকল বিভাগ ও মননশীল অনেক বিষয় সংযোজন করেন এখানে। ‘কলমে’র পাঠকদের নিয়ে গঠন করেন ‘কলম পাঠকবৃত্ত’; লেখকদের নিয়মিত সাহিত্যচর্চার জন্য শুরু করেন ‘কলম সাহিত্য সভা’Ñ যেখানে জমায়েত হতেন লেখকবৃন্দ এবং একটি সম্পর্ক গড়ে উঠতো পরস্পরের সঙ্গে।

আশির দশকের শেষে ইসলামী আন্দোলন এই সময় ক্রমাগত সমগ্র দেশে বিস্তার লাভ করেছে। বিশেষভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্র আন্দোলন জনপ্রিয়তা অর্জন এবং ছাত্রসংসদে শিক্ষার্থীদের ভোটে জয়লাভ করেছে। এই সময় সাহিত্য-সংস্কৃতিক আন্দোলন নতুন গতি পায় কবি মতিউর রহমান মল্লিকের অক্লান্ত পরিশ্রম, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন পরিকল্পনা ও বাস্তব কর্মসূচির মাধ্যমে। সৃজনশীল সাহিত্য পত্রিকা ‘কলম’ এই আন্দোলনে সম্ভাবনা ও উদ্দীপনার নতুন দ্বার উন্মোচন করে। একদিকে ‘বিপরীত উচ্চারণে’র নিয়মিত সাহিত্য আসর ও কর্মশালার মাধ্যমে তরুণ লেখকদের সৃজনশৈলীর দক্ষতা অর্জন; অন্যদিকে ‘কলমে’র মাধ্যমে প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ লেখকদের আত্মবিকাশ, পরিচিতি ও প্রতিষ্ঠা পায়। ঐতিহ্যবাদী প্রবীণ ও অগ্রজ লেখকদের একত্রিত করে নতুন উদ্যোগ ও উদ্দাম সৃষ্টি এবং নবীন-তরুণ লেখকদের মাঝে আশা, আত্মবিশ্বাস ও সম্ভাবনা সৃষ্টির গুরু দায়িত্ব পালনে কবি ছিলেন কর্মমুখর, উদ্যমী ও নিবেদিত। ফলে কলমের মাধ্যমে যেমন একদল প্রতিশ্রুতিশীল নতুন লেখক সৃষ্টি হয়েছে যারা একটি সাহিত্যধারা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন। অগ্রজ ও অনুজ লেখকদের সমন্বয়ে সমবায়ী একটি বিশ্বাসী ও ঐতিহ্যবাদী সাহিত্যান্দোলন সৃষ্টি হয় ঢাকায়। এই সাহিত্য স্ফূরণ ও প্রকাশের স্রোত সমগ্র দেশে ছড়িয়ে পড়ে। চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট, খুলনা, বরিশালসহ দেশের সর্বত্র ‘কলমে’র পাঠক, লেখক, গ্রাহক ও শুভাকাক্সক্ষী গড়ে ওঠে। ফলে বাংলাদেশে বিরাজমান বুর্জোয়া, পুঁজিবাদী ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক সাহিত্যে একটি বিশ্বাসী ও ঐতিহ্যবাদী সাহিত্যধারার সৃষ্টি হয়। অসংখ্য লেখক ‘কলমে’র মোহনায় এসে সম্মিলিত হয়ে সুস্থ প্রবাহ নির্মাণ করেন। ‘কলমে’ লিখেছেন, লিখে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন এবং পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ও সংশ্লিষ্ট লেখকদের মাঝে উল্লেখযোগ্য হলেন:

দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ, সৈয়দ আলী আহসান, কাজী দীন মুহাম্মদ, আবু রুশদ, আশরাফ সিদ্দিকী, আবদুল মান্নান তালিব, আল মাহমুদ, আবদুস সাত্তার, মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ, আবদুল মান্নান সৈয়দ, আফজাল চৌধুরী, মাহবুবুল হক, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, জয়নুল আবেদীন আজাদ, আতা সরকার, আবুল হোসেন মজুমদার, আশরাফ আল দীন, ইমদাদুল হক দূর, মতিউর রহমান মল্লিক, সোলায়মান আহসান, মোশাররফ হোসেন খান, বুলবুল সরওয়ার, আসাদ বিন হাফিজ, আহমদ আখতার, সৈয়দ রফিক, ফজল মুহাম্মদ, আবু আহমদ ফজলুল করিম, জামেদ আলী, মিন্নাত আলী, হাবীবুল্লাহ, হোসেন মাহমুদ, শামসুন্নাহার সাকী, ইব্রাহিম মণ্ডল, ব’নজীর আহমদ, মোস্তফা আযম, ইউসুফ হায়দার, নাজিব ওয়াদুদ, আবদুল ওয়াহিদ, চৌধুরী গোলাম মওলা প্রমুখ।

‘কলমে’ প্রকাশিত লেখার বিষয় বৈচিত্র্য ছিলো ব্যাপক। যেমন: বিশেষ রচনা, কবিতা, গুচ্ছ কবিতা, প্রবন্ধ, গল্প, সাক্ষাৎকার, বিশ্বসাহিত্য, ধারাবাহিক উপন্যাস, গান, ভ্রমণ, জীবনকথা, পুনর্মুদ্রণ, স্মৃতিকথা, অনুবাদ, রম্য রচনা, সাহিত্য কোষ, সাম্প্রতিক, সাহিত্য-সংস্কৃতি-জীবন, শিল্পমাধ্যম, অপ্রকাশিত লেখা, চিঠিপত্র, গ্রন্থালোচনা, পাঠক মন্তব্য, সাহিত্য জিজ্ঞাসা, সাহিত্য সংবাদ, পাঠকের কলম ইত্যাদি।

সম্পাদনার ক্ষেত্রে সম্পাদক মতিউর রহমান মল্লিকের দক্ষতা ও বিশেষ বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়। গবেষক ও লেখক নাসির হেলাল এ-সম্পর্কে বলেন: “মাসিক কলম পত্রিকার দীর্ঘদিন সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন মল্লিক ভাই। এ দায়িত্বটি অত্যন্ত যত্নসহকারে পরিশীলিতভাবে পালন করতেন তিনি। লেখাগুলো কম্পোজে যাওয়ার আগে তিনি এতটাই যত্নসহকারে দেখতেন যে কম্পোজিটর তার কম্পোজ করতে কোন অসুবিধাই হতো না। তা ছাড়া লেখা কাটা-ছেড়া করে প্রকৃত লেখা তৈরিতেও তিনি ছিলেন ওস্তাদ।”

কলমের পাঠকবৃন্দ নিয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় গঠন করা হয় কেন্দ্রীয় ‘কলম পাঠকবৃত্ত’। প্রতিটি অঞ্চলে আলাদা নামে নামকরণ করা হয় এই পাঠকবৃত্তের শাখাগুলোর। পাঠকবৃত্তের সংবাদ আবার কলমে প্রকাশিত হতো। কয়েকটি নাম এ-রকম: ‘পল্লব কলম পাঠকবৃত্ত’, ‘হাসানুল বান্না কলম পাঠকবৃত্ত’, ‘প্রবাহ কলম পাঠকবৃত্ত’, ‘মুজাহিদ কলম পাঠকবৃত্ত’ ইত্যাদি।

‘কলম’ পত্রিকায় যে-সকল লেখক লিখতেন এবং ঢাকায় থাকতেন তাদের নিয়ে প্রতি মাসে ‘কলম সাহিত্য সভা’র আয়োজন করা হতো। মতিউর রহমান মল্লিকের নেতৃত্বে এই সভায় লেখকদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি সাহিত্য সভাকে প্রাণবন্ত করে তোলে। প্রতিটি লেখকের সঙ্গে সাক্ষাৎ, যোগাযোগ ও উৎসাহ দেয়া থেকে শুরু করে মতিউর রহমান মল্লিক একটি সার্বিক সংযোগ ও আয়োজনের ব্যবস্থা করতেন। সভায় লেখকদের লেখা পাঠ ও পর্যালোচনা করে পারস্পরিক পরামর্শও দেয়া হতো। ফলে কলম কেন্দ্রিক শক্তিশালী একটি সাহিত্যধারা সৃষ্টি হয়। নতুন লেখক সৃষ্টি এবং অগ্রজদের একত্রিত করার মাধ্যমে তিনি একটি পূর্ণ সাহিত্যান্দোলনে রূপান্তরিত করেন ‘কলম’কে কেন্দ্র করে। ঐতিহ্যিক উত্তরাধিকারকে ধারণ করে সম্পাদনা করেন তিনি। ফলে কলম হয়ে ওঠে বাঙালি মুসলমানের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের পৃষ্ঠপোষকতার ও মূল্যায়নের একটি মূল্যবান মাধ্যম।

কলম সম্পাদনা, ব্যক্তিগত রোজগার ও মেহমানদারি নিয়ে নাট্যকার আ.জ.ম. ওবায়েদুল্লাহ বলেন : “খুব স্বল্প বেতনে মল্লিক ভাই এই মাসিকটিতে কাজ করতেন। এরই মাঝে তিনি, আল্লাহর ইচ্ছায় দ্বার-পরিগ্রহ করেন। বিআইসি’তে কর্মরত অবস্থায় মল্লিক ভাই আজিমপুরেই ছিলেন। স্বল্প আয়ের কর্মজীবী মানুষ হয়েও তিনি কখনো কাউকে জানতে দেননি ব্যক্তিগত আর্থিক টানাপোড়নের কথা। তার এক ভাতিজা তখন বুয়েটে পড়তেন। মাঝে মাঝেই এসে চাচা মতিউর রহমান মল্লিকের কাছে টাকা চাইতো। মল্লিক ভাই যেভাবেই হোক তাকে টাকাটা জোগাড় করে দিতেন। কোনদিন এখন হবে না/নাই-এ ধরনের কথা বলতে শোনা যায়নি। ‘বিআইসি’তে দর্শণার্থীদের এক বড় অংশ সবসময় মল্লিক ভাইর সাথে দেখা করতে আসতেন। কোনদিন কাউকে খালি মুখে বিদায় করেছেন মল্লিক ভাই- এটি আমার জানা নেই।

সাংগঠনিক দায়িত্বের পরিধি যখন যাই থাক না কেন মল্লিক ভাই ছিলেন সারা দেশের সাংস্কৃতিক সংগঠক, শিল্পী, গায়ক ও সাহিত্যকর্মীদের আকর্ষণের কেন্দ্র। পরম ধৈর্য ধরে তাদের সমস্ত কথা শুনতেন তিনি, সম্ভাব্য সহযোগিতা করতেন এবং মাঝে মধ্যেই দেখা যেতো সবেমাত্র তোলা বেতনের সবগুলো টাকা কাউকে ধার দিয়ে বসে আছেন। রাতে বাসায় ফিরে গিয়ে ভাবীকে বলতেন- একজন ভাইয়ের খুব দরকার ছিলো বলে সবটাকা দিয়ে দিয়েছি। আল্লাহ ভরসা, ব্যবস্থা একটা হয়ে যাবে। এতবড় তাওয়াক্কল খুব কম মানুষের জীবনেই লক্ষ্য করা যায়।”

মতিউর রহমান মল্লিক সম্পাদিত ‘কলম’ পত্রিকার অসামান্য ভূমিকা। কলম বাংলাদেশের সাহিত্যে একটি ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছে। আশির দশক থেকে শুরু করে নব্বই দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত ঐতিহ্যবাদী ও বিশ্বাসী সাহিত্যধারার পুনর্জাগরণ ঘটে এই পত্রিকাকে কেন্দ্র করে। স্বাধীনতা-উত্তর কালে সাহিত্যাঙ্গন এতো বেশি অবিশ্বাসী ও যৌনতায় সমৃদ্ধ হয় যে, সাহিত্য বলতেই নেতিবাচক কিছু, এমন ধারণা বদ্ধমূল হয়। সেই জায়গা থেকে একটি নতুন ক্ষেত্র তৈরি এবং পূর্বতন জমিনকে উর্বর করার মহৎ কাজ করেন সম্পাদক মতিউর রহমান মল্লিক।

লেখক : কবি ও গবেষক

সম্পাদক, নতুন এক মাত্রা