আতা সরকার
পর্ব ১
ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না
বকুলতলা খ্যাত এই শহর বদলে যাচ্ছে। রাস্তার দুপাশে সরি সারি টিনের চালাঘর বা চৌচালা আর সেভাবে নেই। দালান-কোঠা বানানোর ধুম পড়েছে। হাউজ বিল্ডিংয়ের লোনের বরকতে উঠছে তিন তালা চার তালার পাকা বাড়ি।
অনেক দিন আসা হয়নি এই শহরে। এতদিন বাদে এই শহরে ঢুকে দুই পাশের দৃশ্যগুলো দেখতে দেখতে মন খারাপ হয়ে যায় রনজুর। চেনাজানা শহরটা ক্রমেই অচেনা হয়ে যাচ্ছে। পথেঘাটে একজনও জানাশোনা লোক চোখে পড়ল না।
রনজু তার মা রাহেলা বেগমের দিকে তাকাল। তার কোন প্রতিক্রিয়া বুঝতে পারল না। তাকিয়ে আছেন সামনে। নির্বিকার। চোখের পাতাও যেন পড়ছে না।
গোপালের মিষ্টির দোকানটা তেমনি আছে। এতটুকুও বদলায়নি। পাল্টে যাওয়া শহরের সাথে পাল্লা দিয়ে যেন প্রাণপণে ধরে রাখার চেষ্টা করছে তার ঐতিহ্য।
রনজু ড্রাইভারকে গাড়ি থামাতে বলল। গোপালের মিষ্টির দোকানের সামনেই কারটা পার্ক করল। রনজু নেমে গেল মিষ্টির দোকানে।
সামনের দিকে তাকিয়ে ছটফট করে উঠলেন রাহেলা বেগম। ড্রাইভারকে জানালেন, এখানে তিনিও নামবেন। ড্রাইভার দরজা খুলে দিলে তিনি নেমে এলেন। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলেন বকুলতলার মোড়ে।
বকুল ফুলের গাছটা অনেক বুড়িয়ে গিয়েছে। সেই ঝাকড়া চুলের মাথা আর নেই। এক সময় বকুলতলা মোড়ের চারপাশে ছড়িয়ে ছিল তার ডালপালা। এখন শুধু একদিকেই ডালপালা, অন্য দিকটা ডাল ভাঙ্গা ন্যাড়া হয়ে রয়েছে। গাছের তলায় পাকা বেদী বানানো হয়েছে, আগের উঁচিয়ে থাকা শেকড়গুলো আর দেখা যায় না। সাধুর পানের দোকানটাও আগের জায়গায় নেই, সেখান থেকে রাস্তার একপাশে কিনারের দিকে অনেকখানি সরে গিয়েছে। গাছের গোড়ায় রঘু নাপিত নেই। খানের চায়ের দোকানটাও বুঝিবা উঠে গিয়েছে। অবাক চোখে পরিবর্তনগুলো দেখছেন রাহেলা বেগম।
রনজুর ডাকে চমক ভাঙল রাহেলা বেগমের। রনজু বলছে: মা, সবকিছু বদলে গিয়েছে, তাই না? জামালপুরকে এখন প্রায় চেনাই যায় না!
রাহেলা বেগম ছোট করে জবাব দিলেন: হ্যাঁ।
দীর্ঘশ্বাস গোপন করলেন।
গাড়িতে যেতে যেতে রাহেলা বেগম বললেন: রনজু, তোর মনে আছে, মাঝে-মধ্যেই ভোরবেলায় তোকে নিয়ে বকুলতলায় বেড়াতে আসতাম?
রনজু ঘাড় নেড়ে বলল: হ্যাঁ মা, খুব মনে আছে।
রনজু বুঝতে পারে, মা এখন অনেক দিনের পেছনের স্মৃতি নিয়ে মগ্ন হয়ে আছেন।
আত্মমগ্নতা থেকেই তিনি বলে যাচ্ছেন: এক ভোরে ফুল কুড়াতে কুড়াতে বৃষ্টি নামল ঝমঝম করে। তুই আমি গাছের তলায় জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। সময় যায়, বৃষ্টি আর থামে না। আমরা বৃষ্টির ঝাপটায় এরই মধ্যে আধ-ভেজা হয়ে গিয়েছি। এই সময় তোর আব্বা এলেন ছাতা নিয়ে। এসেই কী বকাবকি!
সেই দিনকার স্মৃতি আমাকেও ছুঁয়ে যায়। ঘোরের মধ্যে বললাম: বকুল ফুল দিয়ে তুমি সুন্দর সুন্দর মালা গাঁথতে।
: অন্তু বকুল ফুলের মালা খুব পছন্দ করত। বলতো, মা, আমি মরে গেলে তুমি আমার কবরে বকুল ফুল ছড়িয়ে দিও। মালা দিয়ে সাজিও।
রনজু টের পায়, মার মুখটা থমথমে হয়ে গিয়েছে। স্মৃতির সাথে অন্তু এতো জড়িয়ে আছে!
রনজু কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, দেখতে পায়, মা আঁচল দিয়ে মুখ ঢাকছেন।
রনজু:
গ্রাম ছাড়া ঐ শহর পথে
১.
আজ রাতেও বৃষ্টি হলো। সন্ধ্যারাতে টিনের চালে শিল পড়েছিল ধুপধাপ। আর এর সাথে ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমক। বৃষ্টি দেখলেই আজকাল নিজের ভিতর গুটিয়ে যাই। বিছানার উপর জড়োসড়ো হয়ে বসেছিলাম। বরাবর দেখেছি ঝড়-বাদলে ইলেক্ট্রিসিটি ফেল হয়ে যায়, হ্যারিকেনের ময়লা চিমনি চুইয়ে ঘোলাটে আলো ঘরে আলো-আঁধারি তৈরি করে পরিবেশ আরো ছমছম করে তুলেছে।
জায়নামাযের উপর বসে আছেন আম্মা। মোনাজাত শেষেও হাঁটু মুড়ে চুপচাপ বসে আছেন। আমার দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে চাইলেন, বললেন না। কী এক ভাবনায় তন্ময় হয়ে রইলেন। মনে হলো তাঁর চোখ কাউকে খুঁজছিল। আমি জানি, কাকে। বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।
বিছানায় বসেই দেখছিলাম, অন্তু- আমাদের ছোট অন্তু ঘরময় ছুটোছুটি করছে। হঠাৎ সে হুট করে ঘরের দরজা খুলে বৃষ্টি মাথায় নিয়েই নেমে গেল উঠোনে। আকাশ ভেঙ্গে পড়া কুচি কুচি বরফের টুকরোগুলে কুড়োচ্ছে। দরজায় দাঁড়িয়ে চেঁচামেচি করছেন আম্মা। বরফের কুঁচিগুলো ছুঁড়তে ছুঁড়তে অন্তু হাসছে। আম্মা হায় হায় করে ডাকছেন: বাজ পড়বে রে! ঘরে আয়!
দেখতে না দেখতেই দৃশ্যটা মিলিয়ে গেল। আম্মা জায়নামাযের উপরেই বসে রয়েছেন। কোথাও বজ্রপাত হলো। আম্মা চমকে তাকালেন। আমি হাই তুলে কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লাম।
সারা রাত বৃষ্টি।
আম্মার গুণগুণ কুরআন তেলাওয়াতে ঘুম ভাঙে। জেগে দেখি ভোর হচ্ছে। সারা রাতের পর বৃষ্টি তখন কেটে গিয়েছে। তবে আঁধার কাটেনি। ঝিঁঝিঁ আর ব্যাঙের ডাক শুনছি। আমি বিছানার উপরই গুটিশুটি মেরে পড়ে রইলাম। চোখ বন্ধ করে। আম্মার কণ্ঠে গুণ গুণ সুরে সূরা ইয়াসিন।
কতদিন থেকে আম্মাকে এমন আবেগ নিয়ে কুরআন তেলাওয়াত করতে শুনি নাই!
অনেক দিন পর এই শহরটায় এসেছি। আম্মাকে নিয়ে। আব্বা তাঁর চাকরি জীবনের এক বিরাট সময় আমাদেরকে নিয়ে এই শহরে কাটিয়েছেন। এখানে থাকতেই তিনি চাকরিতে অবসর নেন। আমাদের বেহিসাবী আব্বা সুযোগ থাকলেও এই শহরে নিজের জন্য কোন বাসাবাড়ি করে উঠতে পারেন নাই।
আমি তখন সবেমাত্র চাকরি নিয়ে ঢাকায় এসেছি। এসময়ই ঘটল এক বিপর্যয়। আব্বা-আম্মা দুজনই ভেঙে পড়লেন। আব্বার অবসর নেয়ার পরপরই চলে গেলেন গাঁয়ের ভিটেজমিতে।
অফিস ছুটিকালে এবার বাড়ি ফিরে দেখি, আব্বা ও আম্মা দুজনেরই কথা বলা কমে গিয়েছে। আব্বা এমনিতে সাত-পাঁচ কথা বলতে গাল-গল্প করতে পছন্দ করতেন। একটি বাচ্চা ছেলেকেও সামনে পেলে তাকে নিয়েই মেতে উঠতেন জটিল সব প্রসঙ্গ নিয়ে আলাপচারিতায়। লোকজনও এ নিয়ে খুব মজা পেত। আব্বার এমন আচরণ নিয়ে আম্মা কখনো কখনো বকাঝকা করতেন। আম্মার সাথে তিনিও তর্ক জুড়ে দিতেন, ঝগড়া করতেন। আব্বা-আম্মার ঝগড়া ছিল তাঁদের সম্পর্কের এক বিচিত্র মাত্রা।
এবার বাড়িতে ফিরে তাঁদেরকে ঝগড়া করতে দেখলাম না। আব্বা মাথায় গামছা ফেলে ধাঁ ধাঁ রোদে এই বয়সেও গাঁয়ের ভিতর হেঁটে বেড়ান। জমি-জমা হাল-আবাদের তদারকি করেন। কখনো দুপুরে গাছের নিচেই গামছা বিছিয়ে আধশোয়া হয়ে বিড়ি টানেন। একনাগাড়ে বিড়ি টানতেই থাকেন। জ্বলন্ত বিড়ি হাতে নেই- এমন অবস্থায় আব্বাকে কল্পনাই করা যায় না।
আর আম্মা সারাদিন বসে আছেন রান্নাঘরে চুলার আগুনের পাশ ঘেঁষে। তাঁরা দুজন যখন মুখোমুখি হন, তখন আমার কাছে মনে হয়: মুখোমুখি দুটি পাথর বসানো মুখ।
এবার বাড়িতে আসতেই আম্মা আমাকে বললেন: তুই ছুটি আরো কয়েকটা দিন বাড়িয়ে নে। তোকে নিয়ে জামালপুর যাব।
আব্বা বসে ছিলেন পাশেই। তাঁর দিকে তাকালাম। থমথমে মুখ।
রহস্য কিছুই বুঝলাম না। আম্মাকে জিজ্ঞেস করলাম: কেন?
আম্মা একটুখন চুপ করে রইলেন। ধীরে ধীরে বললেন: শানু-পানুর কবর জিয়ারত করতে যাব।
আম্মার কথাটা পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারলাম না। সানু ও পানু আমাদের ছোট যমজ দুই বোন। জন্মের মাস কয়েক পরই আচানক নিউমোনিয়া হয়ে দু’জনই মারা যায়। জামালপুর গোরখানায় তাদের কবর রয়েছে। বহু আগেকার অস্পষ্ট স্মৃতি।
আম্মাকে নিয়েই এসেছি এই শহরে। উঠেছি কলেজ রোডে আমাদের সাবেক ভাড়াটে বাসায়। বাসার মালিক আনন্দ মিস্তিরি ভালো মানুষ। পরিবার নিয়ে তিনি নিজেই এখন বাস করেন এই বাসায়। আমাদের জন্য ছেড়ে দিয়েছেন দুটি কামরা।
শহরের এখন অনেক পরিবর্তন হয়েছে। হিন্দু বোর্ডিং মাঠ- যেখানে আমরা খেলাধূলা করতাম আর বন্ধুরা মিলে গোল হয়ে বসে আড্ডাবাজি করতাম- সেই মাঠটার উপরই একজন এসডিও নিজের নামে গোলাম মোস্তফা পার্ক বানিয়েছিলেন, সেই মাঠটার পাশেই ছিল একটা প্রাইমারি স্কুল- এখন সেটাকে লুপ্ত করে গড়ে উঠেছে আরেকটা হাই স্কুল। বকুলতলার মোড় থেকে সাধুর পানের দোকানটা একপাশে সরে গিয়েছে, সাধু আর দোকানে বসেন না। খানের চায়ের দোকানটাও নেই।
টিনের চৌচালা আর চালার ঘর এই শহরের বৈশিষ্ট্য ছিল। এখন সবগুলো বদলে গিয়েছে ইটের দালানঘরে। বদলে গিয়েছে ব্রহ্মপুত্রও।
২.
১৯৫২ সাল। ভাষা আন্দোলনের কথা বুঝেছি বড় হয়ে। তখন গাঁয়ের লোকজনের মুখে মুখে শুনেছিলাম: শহরে ভীষণ গোলমাল হচ্ছে। বাঙ্গালিদেরকে বেধড়ক মারা হচ্ছে। কেউই এখন অফিস-আদালতে যাচ্ছে না। পুলিশ লোকজনদেরকে ধরে ধরে জেলে পুরছে।
তখন পর্যন্ত শহর দেখিনি। শহরে যাইনিও কখনো। পুলিশকে ভীষণ ভয় পাই। পুলিশ নামটা শুনলেই গায়ে কাঁপুনি এসে যায়। তখন বয়স আমার সাত। তখনকার স্মৃতিগুলো ঝাপসা, তেমন কিছু স্পষ্ট মনে নেই।
সেই আমার প্রথম রেলগাড়িতে চড়া। সমন্তরাল রেললাইনে কয়লার ইঞ্জিন ভক ভক নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে দৌড়ায়। লাল বগির গাড়িগুলো নাকি মাল টানে। তাই তারা মালগাড়ি। সবুজ রঙ-এর বগিগুলোতে চড়ে যাতায়াত করে মানুষ- এই হলো প্যাসেঞ্জার ট্রেন। চলতে চলতে প্রত্যেকটা স্টেশন ছুঁয়ে যায়। জংশন শহর বলে জামালপুর স্টেশনে সবগুলো গাড়ি দু-চার-দশ মিনিট জিরিয়ে নেয়। ট্রেনের চলতি পথে রেললাইনের পাশের ধানী ক্ষেতের কর্মব্যস্ত কিষাণরা হঠাৎ কাস্তে তুলে বা হুঁকো উঁচিয়ে চেঁচায়: ও ভদ্দর মাইনষ্যের গাড়ি, আহো, তামুক টাইন্যা যাও।
কোন কোন ট্রেন বুঝি এই লাইনে এখানে তামাকও সেবন করে।
গ্রামের বাড়ি থেকে গরুর গাড়িতে চড়ে সাত মাইল বালির চর ভেঙে আমরা এসেছি দেওয়ানগঞ্জ বাজার স্টেশনে। আমি, আম্মা আর ছোট মামা। এই আমি প্রথম একটা রেলস্টেশন দেখি। রেলগাড়িও দেখা এই প্রথম। বুক-ভরা উত্তেজনা আমার। রেলগাড়িতে প্রথম চড়ায়। আর প্রথমবারের মতো একটি শহর আবিষ্কার করতে যাচ্ছি, এই নিয়েও প্রবল আনন্দ। টান টান উত্তেজনা। এদিকে আম্মার মুখের দিকে তাকিয়ে উত্তেজনা থিতিয়ে আসে। আম্মা এমনিতে কথাবার্তা কম বলেন, আজ অসম্ভব রকম একদম চুপচাপ।
ট্রেনে লোকজন কম। যে কয়েকজন যাত্রী রয়েছে, তাদের মধ্যেও একধরনের চাপা উত্তেজনা। তাদের কথাবার্তা থেকেই তার আঁচ পাওয়া যাচ্ছে। কথায় কথায় গালাগাল করছে সরকারকে। তখনো আমার সরকার সম্বন্ধে স্পষ্ট ধারণা গড়ে ওঠে নাই। সরকারের কথা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে আমাদের গাঁয়ের মোড়ল টেকো মাথার মিনহাজ মণ্ডলের মুখ। আব্বা এই লোকটাকে দেখতে পারেন না। আমিও না। তাই সরকারের প্রতিও কেমন জানি অপছন্দের ভাব সংক্রমিত হলো আমার মধ্যেও।
ছোট মামা মনোযোগ দিয়ে ট্রেনে বসা লোকদের আলাপ কথাবার্তা শুনছিলেন। এক ফাঁকে তিনি হঠাৎ বলে উঠলেন: কিন্তু এসব হচ্ছে কি. পাবলিকের বিরুদ্ধে গবমেন্ট এসব করার সাহস পেলো কোথা থেকে?
তার প্রশ্নটা ছিল আকস্মিক। লোকজনের কথাবার্তা থেমে গেল। সবার নজর এসে পড়ল ছোট মামার দিকে। এমনকি আম্মাও তাঁর দিকে তাকালেন। সবাইকে তাঁর দিকে তাকাতে দেখে মামা ভ্যাবাচ্যাকা খেলেন। একজন বুড়ো গোছের লোক এবার নিরবতা ভেঙে বলল: ওদের হাতে ক্ষমতা, সাহস ওদের এমনিতেই এসে যায়। সাহস যোগায় মামদো ভূতে। নূরুল আমিনের কাঁধে যে সে ভূত নয়, জ্বীন আছর করেছে। বাঙ্গালি এখন মরতে প্রস্তুত। ওরা কয়জনকে মারবে? মরণ তো এবার ওদের হবে।
মামা নিজের উত্তেজনা সামলে নিয়ে জানতে চাইলেন: জামালপুর টাউনেও কি গোলমাল হয়েছে? মারা গিয়েছে কেউ?
অন্য একজন লোক জবাব দিল: গোলমাল কোথায় নেই? শুধু টাউন কেন, গ্রামে গঞ্জে বন্দরেও লোকজন নেমে আসছে রাস্তায়, রাজপথে। তবে জামালপুর টাউনে এখনো গোলাগুলি হয় নাই, তবে খুব ধর-পাকড় চলছে।
চলমান ট্রেনেই পুরুষ যাত্রীদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা তর্ক-বিতর্ক জমে উঠল। ওসব কথা আমার বুঝার কথা নয়। বাইরে সবুজ মাঠ, ফসল-ভরা ক্ষেত, রূপালি নদী আর ঝলমলে রোদের চলমান দৃশ্য। অবাক চোখে দেখছি। আর ভাবছি: এইসব মাঠ, ক্ষেত, নদী, গাছপালা, আকাশ দৌড়ায় কেমন করে?
দেখতে দেখতে স্টেশনে এসে ট্রেন দাঁড়ায়। সাথে সাথে ট্রেনের বাইরের দৃশ্যও দাঁড়িয়ে পড়ে। আবার হুঁ... উ... স...। বাঁশি বাজিয়ে ধূঁয়ো উড়িয়ে ট্রেন ছোটে।
জামালপুর জংশন স্টেশনে পৌঁছতেই ট্রেনের কম্পার্টমেন্ট খালি হয়ে গেল।
মামা বললেন: এসে পড়েছি বুবু। তাড়াতাড়ি নামো।
গাড়ির দুলুনিতে আম্মা একটুখানি ঝিমিয়ে পড়েছিলেন। হকচকিয়ে বললেন: জামালপুর এসে পড়েছি?
মামা তাড়া দিয়ে বললেন: হ্যাঁ। তাড়াতাড়ি নামো। নইলে ঢাকায় নিয়ে ফেলবে।
বোরকা-শাড়ি ঠিকঠাক করে তাড়াহুড়োয় নামতে গিয়ে শাড়িটায় ফরফর আওয়াজ হলো। যাহ! শাড়িটা ছিঁড়েই গেল।
আমাদের দুই ঘণ্টার ট্রেন-জার্নি শেষ। প্লাটফরমে নেমে এলাম। ফুলতোলা একটা ভারি ট্রাংক, মুড়ি-খৈ-এর টিন, গুড়, সব্জি ইত্যাদির পোটলা হাতে ধরে আমরা তিনজন যাত্রী প্লাটফরমে দাঁড়িয়ে তাকালাম চারপাশে।
মামা এদিক-ওদিক তাকিয়ে বললেন: ভাইসাব বোধহয় আসেন নাই।
আম্মা চিন্তিত হয়ে অনিশ্চিত কণ্ঠে বললেন: তো?
কথা বলতে আম্মার গলা কাঁপছে।
আমাদের আসার খবর জানিয়ে মামা দুদিন আগে আব্বাকে পোস্টকার্ড লিখে পাঠিয়েছিলেন।
স্টেশনের কুলি এসে দাঁড়াল সামনে। বলল: মাল লইয়্যা যাই সাব, আটানা দিয়েন।
মামা বিজ্ঞের মতো মাথা নেড়ে আম্মার হাতে পোটলা-পুটলি, আমার হাতে মুড়ির টিন ধরিয়ে দিলেন। আর নিজে তুলে নিলেন ট্রাংক। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন: বুঝলে ভাগ্নে, এরা কুলি তো নয়, একেকজন রক্তচোষা।
স্টেশনের বাইরে তিন-চারটা রিক্সা। কয়েকটা টমটমও রয়েছে। ঘোড়া আর টমটম দেখে আমার খুব সাধ জাগল। মামার কাছে আব্দার জানালাম, ঘোড়ার গাড়িতে দুলতে দুলতে আব্বার কাছে যাব।
এদিকে যাত্রীরা চটপট রিক্সা ভাড়া করে নিচ্ছে। মামা ঝটপট একটা রিক্সায় সবগুলো মালামাল তুলে দিলেন।
রিক্সায় চড়েই আমরা শহরে প্রবেশ করলাম।
৩.
মহকুমা সদর এ শহরে তখন একটাও পাকা রাস্তা নেই। কবে যেন শুধু ইট বিছিয়ে বড় রাস্তাটি স্টেশন থেকে পাথালিয়ায় সরকারি হাসপাতাল পর্যন্ত তৈরি করা হয়েছিল। সে রাস্তায় খরার সময় লাল ধূলো ওড়ে। বৃষ্টিতেই থকথকে লাল কাদা। কোথাও ভাঙা টুকরো ইটের সূঁচাল মাথা রিকসার টায়ার ফাটায়। সে সময় কোন রিক্সার টায়ার ফাটাও একটা ঘটনা। দেখতে না দেখতে বিপুল দর্শক ঘটনাস্থল জুড়ে বৈঠক বসায়। টমটমের ধাক্কায় সে বৈঠকের ভিড়-ভাড়াক্কা ভাঙে। লোকগুলো বকাবকি খিস্তি-খেউর করতে করতে সরে দাঁড়ায়: টমটমের ঝামেলা কবে উঠবে? একটা সাবডিভিশনাল টাউন দিব্বি বরবাদ করছে টমটমের চাকা। টমটমের কল্যাণেই রাস্তার বুকে খানা-খন্দকের ক্ষত।
অফিস-কাছারির কাছাকাছি এক বাসায় আব্বা থাকেন। চা-মিষ্টি-নিমকির রেস্টুরেন্ট আলম কেবিন ঘেঁষে এই বাসায় গড়ে উঠেছে নিউ স্টার মেস। আব্বারই কলিগ কেরানিরাই এই মেসের মেম্বার। এখানেই তাঁদের বাস, আহার-বিহার। আমাদের রিক্সা এসে থামল মেসবাড়ির সামনেকার মাঠটাতে। আরেকটু সম্মুখেই ব্রহ্মপুত্রের চ্ছলাৎ-চ্ছলাৎ। ওপারে ধূ-ধূ, বহুদূরে সবুজের আভাস।
মাঠের মাঝখানে গোল হয়ে গল্প করছিল কিছু লোকজন। ওখান থেকেই ভেসে আসছে আব্বার ভরাট কণ্ঠস্বর: কি হবে এতোসব হৈচৈ করে? রক্তপাতে কি ফায়দা? বাংলা ভাষাটা চালু হওয়া দরকার। কিন্তু দোষটা তো আমাদের বাঙালিদেরই। তা না হলে নাজিমুদ্দিন কি করে ইস্ট বেঙ্গল থেকে বাঙালিদের ভোট পায়? নিজে বাঙালি হয়ে নূরুল আমিন কিভাবে বাঙালিদেরই গুলি করার হুকুম দেয়? আমরাও কিছুদিন পর সেলাম ঠুকব পশ্চিমাদের। আসলে আমাদের স্বভাবটাই হলো গোলামির।
তাঁর কথাগুলো সম্ভবত এধরনেরই ছিল। আজ তেমন স্পষ্ট করে মনে নাই। আব্বার স্বভাবসিদ্ধ কথা বলার ধরণ-ধারণ জেনেছি ধীরে ধীরে, তাঁর পক্ষাপক্ষ সমর্থনের কায়দা-কানুনও।
সেসময় তিনি কথা বলতে বলতে বাক্য অসম্পূর্ণ রেখেই থেমে গিয়েছিলেন। রিক্সা থেকে আমাদের নামার দিকে তাঁর চোখ গিয়েছিল। তিনি বিস্ময়ে থমকে গিয়েছিলেন। তাঁর কথা থেমে গেল।
আমি আব্বাকে দেখতে পেয়েছিলাম। রিক্সা থেকে নেমেই এক দৌড়ে ছুটে গিয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরলাম। তিনি আমাকে নিয়ে রিক্সার দিকে এগিয়ে এলেন। এরমধ্যেই আম্মা নেমে পড়েছেন। রিক্সার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন আড়ষ্ট ভঙ্গিতে। মামা মাল-সামান নামাচ্ছেন।
আব্বাকে সামনে দেখে বোরখার আড়ালে আম্মার ফোঁৎ-ফোঁৎ কান্না ভেসে এলো। তেমন অবস্থাতেই এক হাট লোকের সামনে আম্মা আব্বার পায়ে হাত রেখে কদমবুচি করলেন।
মামা বললেন: নিন ভাইসাব, আপনার সম্পদ বুঝে নিন। আপনি তো সুস্থ-সবল ভাবে বেঁচে আছেন। বেঁচে থেকে আমাদের বাঁচালেন। শহরে গোলমালের খবর পেয়ে বুবুজানকেই সামলানো দায়।
আব্বার মেসমেটরা সবাই দাঁড়িয়েছেন আমাদেরকে ঘিরে। ওঁরা আম্মাকে সালাম জানালেন। মামা এর আগেও এখানে বার কয়েক এসেছিলেন। দেখলাম, সবার সাথেই তাঁর আলাপ-পরিচয় সখ্যতা। হেসে হেসে ঠাট্টা-মস্করায় সবার সাথে গল্প করছেন। ওঁরা সবাই মামাকে শালা বলে ডাকছেন দেখে আমার খুব অবাক লাগল। পরে মামাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি হাসতে হাসতে জবাব দিয়েছিলেন: ওঁদের সবার কাছে আমার একটা করে বুবু আছে তো, তাই।
মেসে আব্বার জন্য এক চিলতে কামরা। একটি তক্তপোশ আধাআধিরও বেশি স্থান জুড়ে পাতা আছে। বিছানা বিচ্ছিরি রকম ময়লা। বালিশ তেল চিটচিটে। তক্তপোশের একপাশে আব্বার ট্রাংকটা বেশ বড়োসড়োই। ট্রাংকের সাইজের তুলনায় অতি ছোট মাস্টার তালা ঝুলছে। আব্বার কাপড়-চোপড়ও প্রায় গোটা বিছানায় ছড়ানো। মেঝে জুড়ে সিগারেট-বিড়ির টুকরো।
ঘরে পা রাখতেই আম্মা আঁতকে উঠলেন: এই দোযখে আপনি থাকেন? থাকতে পারেন?
আব্বা কাঁচমাচু হয়ে বললেন: সবাই তো থাকছে। কোন অসুবিধা হয় না।
আম্মা সব গুছিয়ে তুললেন। আব্বা অসহায় ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইলেন। দেখতে দেখতে কামরার চেহারা বদলে গেল।
আমি মামাকে ধরলাম: মামা, আমাকে শহর দেখান।
মামা হেসে বললেন: এটাই তো শহর, দেখার আছে কি? তুই নিজেই তো এখন শহর হয়ে উঠেছিস।
আব্বা ডাকলেন: এখানে শুনে যা রনজু।
কাছে গেলে আমার হাতে সন্দেশ ধরিয়ে দিলেন। সন্দেশে কামড় দিতে দিতে বললাম: মা, মামার সাথে টাউন দেখতে যাই?
আম্মা বললেন: আজ জিরিয়ে নে। কাল যাবি।
বাইরে হঠাৎ অনেক মানুষজনের চিৎকার কলরব, কোলাহল ভেসে এলো। তাড়াতাড়ি বাইরে এসে দেখি, রাস্তা ধরে বহু লোক যাচ্ছে। তাদের হাতগুলো চিৎকারের সাথে সাথে মুষ্টিবদ্ধ হচ্ছে, আন্দোলিত হচ্ছে। সে আমার পরম অভিজ্ঞতা। শুনতে পেলাম ওরা বলছে: রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। শহীদের রক্ত বৃথা যেতে দেব না।
আমারও ইচ্ছে করল ছুটে ওদের সাথে মিশে যেতে। ওদের সাথেই কণ্ঠ মিলিয়ে আওয়াজ তুলি, শ্লোগান দিই। ওরা সরকারের বিরুদ্ধে যে সরকার আমাদের মুখের ভাষা কেড়ে নিতে চায়- ভাবতেই রক্ত টগবগিয়ে উঠল। আমার চোখে তখন ভাসছে: গাঁয়ের মাতব্বর মিনহাজ মণ্ডল মুখ থুবড়ে পড়ে যাচ্ছে।
রাতের খাওয়া-দাওয়ার পর আম্মা, আব্বা আর আমি আব্বার কামরায় একই তক্তপোশের উপর পাশাপাশি শুলাম। মামা পাশের কামরায় আব্বার কোন কলিগের সাথে ডাবলিং করতে চলে গেলেন।
শেষরাতের দিকে আমার ঘুম ভেঙে গেল। টের পেলাম আব্বা-আম্মা তখনো জেগে। শুয়ে শুয়ে তাঁরা নিজেদের মধ্যে গল্প করছেন।
আব্বা জিজ্ঞেস করলেন: তোমাকে টাউনে আসার বুদ্ধিটা দিল কে?
: টাউনে গোলমাল হচ্ছে। আপনি একলা এখানে, আমি বাড়িতে চুপচাপ বসে থাকতে পারি?
: দেখলে তো আমি কোন রকমের গোলমালে নাই। আমার কিছুই হয় নাই। পরশুদিন তাহলে ফিরে যাও।
আম্মা কিছুক্ষণ চুপ রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন: না। ভেবে দেখলাম, ছেলে-মেয়েদেরকে মানুষ করতে হবে। লেখাপড়া শেখাতে হবে। রনজু বড় হচ্ছে। গাঁয়ে ভোঁতা মেরে আর কতদিন বসে থাকবে? মেয়েদুটোরও ব্যবস্থা করতে হবে। ওদেরকেও শহরে রেখে পড়াতে চাই।
: চাইলেই কি পারা যায়! কত টাকার খরচা, হিসাব করেছ? ভেবেছ?
: অতো ভাবাভাবি বুঝি না। দেখবেন, পথ একটা বেরিয়েই যাবে।
আব্বার গম্ভীর কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম: আচ্ছা, দেখছি।
বকুলতলার মোড় পেরিয়ে
পর্ব ২]
রাহেলা বেগম:
বেলা যায় যায় রে
১.
রনজুর আব্বাকে সবসময় দেখে এসেছি এরকম।
রনজুর আব্বাকে কখন থেকে দেখছি?- সেই ছোটবেলা থেকে।
আমার বাবা ছ’আনি জমিদারীতে নায়েবি করতেন। পোটলে ছিল তাঁর বসতবাড়ি, জমিজমা। কিন্তু পোটলে তাঁর আর টিকে থাকা হয়ে ওঠে নাই। তখন আমি খুবই ছোট। কোন ঘটনাই আমার মনে থাকার কথা নয়। দাদা, বাবা, ফুপুদের কাছে তখনকার গল্প শুনেছি। সেবারে আচানক ভূমিকম্প হয়েছিল। এই ভূমিকম্পেই আমাদের সব জমিজমা বিলীন হয়ে যায় সদ্য জেগে ওঠা নতুন বিলের গহ্বরে। রাক্ষুসে বিলটাকে সহ্য করতে পারেননি আমার বাবা-দাদা। জমি যা অবশিষ্ট ছিল, আর ভিটেবাড়ি সব বিক্রি করে তাঁরা পোটল গ্রাম ছেড়ে চলে আসেন পাখিমারা গ্রামে। এখানে এসেই বাবা পেয়ে যান ছ’আনি জমিদারীর নায়েবি চাকরিটা।
এ গাঁয়ের বড় জোতদার ছিল তরফদাররা। আমাদের নতুন বাড়ির বারবাড়িতে দাঁড়ালে ক্ষেত-জমি পেরিয়ে দেখা যেত তরফদারদের চকচকে বড় বাড়ি। আমরা ভাইবোনরা খেলতে যেতাম ওবাড়িতে, ওবাড়ির ছেলেমেয়েরা আসত আমাদের বাড়ি। তরফদারদের আওতায় জোতজমিতে বসবাসের কারণে বাবা ছিলেন তরফদারদের এক নাম্বার প্রজা। সম্মানী প্রজাও বটে। বাবার সাথে তরফদারদের কারো যখনই দেখা হতো, তখন দেখতাম তাঁরা বাবার সাথে শ্রদ্ধার সাথে কথা বলছেন।
বছরে একবার পুণ্যাহ হতো তরফদার বাড়িতে। বাবা ধবধবে সাদা পায়জামা ও পাঞ্জাবি পরতেন। তাঁর হাত ধরে আমি তরফদার বাড়িতে আসতাম। তখন তরফদার বাড়িতে এলাহি কান্ড। রনজুর আব্বার বয়স তখন বারো বা চৌদ্দ। ধূতি আর সার্ট পরনে। মাথায় পাগড়ি। রতন তরফদারের বড় নাতি বলে তিনিই ঘট বহন করতেন। তরফদার বাড়ি তখন সাজেগোজে ঝকঝকে তকতকে। কাছারি ঘরে ফরাশ পাতা। তার উপর এসে বসত প্রজারা। কাগজপত্তর নিয়ে বসতেন রতন তরফদার আর তাঁর সাত ছেলে। তাঁরা বসতেন উঁচু বেদীতে। সুসজ্জিত বেদীর উপর সারিবদ্ধ সিংহাসন-সদৃশ চেয়ারে। স্বাভাবিক ভাবেই রতন তরফদারের চেয়ারটা ছিল জমকালো। বেদীটা ছিল প্রজাদের থেকে বেশ তফাতে।
ওদিকে বড় ঘরের সদ্য-নিকনো মেঝেতে প্রমাণ সাইজের লোহার সিন্দুক। সিঁদুর মাখানো সিন্দুকটার মাথায় কাজলের টিপ।
ঘট নিয়ে আসতেন রনজুর বাবা। তখন তাঁকে দেখার মতো ছিল। ঠিক যেন শিব ঠাকুর। প্রজারা একে একে তাদের খাজনা রাখত সেই ঘটে। ঘট ভরে গেলে নতুন ঘট আসত।
এইদিকে বারবাড়ির এক কোনায় গরু জবাই রান্নাবান্না হচ্ছে। পুরো তরফদার বাড়িতে মহাউৎসবের আমেজ।
আমি অবশ্য অতো ধৈর্য নিয়ে কাছারি ঘরে চুপটি মেরে বসে থাকতে পারতাম না। সিঁদুর মাখানো সিন্দুকটিই আমাকে টানত বেশি করে। চলে আসতাম বড় ঘরে। সেই ঘরে এক পাশে বিশাল পালঙ্কের উপর বসে থাকতেন ধবধবে সাদা শাড়ি পরা বড় বৌ; রতন তরফদারের বড় বৌ। তাঁর আঁচলে বাঁধা চাবির গোছা। রতন তরফদারের আরো দুই বৌ ব্যস্ত থাকতেন রান্নাবান্না গৃহস্থালি কাজ-কর্মের তত্ত্ব-তালাশে, তদারকিতে।
বড় বৌয়ের বয়স হয়েছে। বুড়িই বলা যায়। মাথার চুলগুলো আধ-পাকা। আমি ঘরে ঢুকতেই ডেকে আমাকে তাঁর পাশে বসাতেন। তাঁর পাশেই রেকাবিতে রাখা নলেন গুড়ের সন্দেশ নিয়ে আমার হাতে গুঁজে দিতেন।
এরকম এক উৎসবে বুড়ির পাশেই বসেছিলাম। রনজুর দাদা কী একটা খুঁজতে এ ঘরে এসেছিলেন। দেখতে পেয়েই তাঁকে কাছে ডাকলেন বড় বৌ: রেয়াজ, এদিকে একটু আয়।
রেয়াজ তরফদার তাঁর মায়ের সামনে এসে দাঁড়ালেন। বড় বৌ বললেন: সবকিছু থেকে তুই এমন পালিয়ে পালিয়ে বেড়াস কেন?
রেয়াজ তরফদার মাথা চুলকে বললেন: আসলে মা আমি তোমার অন্য ছেলেদের মতোন জোতদার-জমিদার হয়ে উঠতে পারি নাই।
: আমি তোকে ওদের মতো লাঠিবাজ হতে বলি নাই। কিন্তু তুই তোর নিজের বাড়িতে অমন চোর-চোর ভাব নিয়ে থাকিস কেন?
রেয়াজ তরফদার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন: নিজের বাড়িটাও যে আমার কাছে অচেনা পরের বাড়ি বলে মনে হয়!
: অই বখাটে বাউলা দলের সাথে তুই মিশবি না। ওদের সাথে মিশে মিশে তুইও আউলা-বাউলা হয়ে উঠছিস।
রেয়াজ তরফদার মাথা নিচু করে সুবোধ বালকের মতো শান্ত গলায় বললেন: আচ্ছা মা, মিশবো না।
চলেই যাচ্ছিলেন, বড় বৌ ফের ডেকে তাঁকে ফিরালেন। বললেন: তোকে যে কথাটা বলছিলাম, আহসানউদ্দীন নায়েব সাহেবের এই মেয়েটি খুবই লক্ষ্মী। একে তোর বড় ব্যাটা মোশারফের সাথে বিয়ে দিবি। আমার পছন্দ। তাই তোকেই অছিয়ত করে গেলাম।
: আচ্ছা মা।
বলেই চলে গেলেন রেয়াজ তরফদার। আমি বুড়িকে ভেঙচি কেটে বললাম: আমার বয়েই গেছে তরফদার বাড়ির বৌ হতে! আপনার নাতবৌ সাজতে। যান না, আপনি নিজেই বিয়ে করুনগে আপনার গোমড়ামুখো নাতিকে।
বুড়ি বেজায় আমোদ পেলেন। এক গাল হেসে বললেন: ওলো, ঐ কম্মো কী বাদ আছে! কবেই না ওর সাথে আমার নিকাহ হয়েছে! দুই সতীনে আমার আর পোষাচ্ছে না। আমার আরো একখান সতীন চাই।
বুড়ির রেকাবি থেকে নলেন গুড়ের সবগুলো সন্দেশ তুলে নিয়ে বুড়িকে ভেঙচি কেটে আমি পালালাম।
এরপরেই ওঁকে মানে রনজুর আব্বাকে দেখলে আমার লজ্জা হতো। নিজেকে আড়াল করে ফেলতাম।
রতন তরফদার এলাকার ডাকসাঁইটে জোতদার। তিন বৌয়ের ঘরে তাঁর সাত ছেলে। বড় ছেলে রেয়াজ তরফদার ছিলেন কিছুটা ক্ষ্যাপাটে স্বভাবের। মাঝে-মধ্যেই উধাও হয়ে যেতেন। দূর দূর গাঁয়ে ঘুরে বেড়াতেন বলে শুনেছি। সাত গাঁয়ের সবাই তাঁকে এক ডাকে চিনে। তিনি কখনো জোতদারি প্রতাপ দেখাননি। তাঁর অন্য ভাইদের মতো কারো ঘর ভেঙ্গে অন্য কারো বৌ ভাগিয়ে নিয়ে আসেননি। কারো বাস্তুভিটায় ঘুঘু চড়াননি। কেবল এই গাঁ ঐ গাঁ ঘুরে বেড়ান। এর ওর সাথে গল্প-গাছা জমিয়ে বসেন। হয়তো স্বল্প পরিচিত কাউকে বলেই বসলেন: ভাইসাব, আজ সাঁঝের বেলায় আপনার ঘরে দাওয়াত নিলাম।
এমন একজন লোককে ঘরে বেঁধে সংসার করা শেখাতে এসেছিলেন আমার শাশুড়ি। শ্বশুর রেয়াজ তরফদারের মতোই আমার শাশুড়িরও খ্যাতি ছিল এলাকার সেরা সুন্দরীদের একজন হিসেবে। তাঁর আরো গুণ রয়েছে, প্রকাশ পেল ক্রমে ক্রমে। তাঁর মুখের দাপটে তাঁর সামনাসামনি কেউ রা’ করতে পারে না। বাউন্ডুলে রেয়াজ তরফদার তাঁর নিজেরই গৃহকোণে হিমসিম খেতে লাগলেন। ঘ
রের কোণে বসে থাকতে থাকতে তিনি বাতে আক্রান্ত হলেন। বাতে এমন শোচনীয় অবস্থা হতে আমি আর কাউকে দেখি নাই। তাঁর হাতের আঙ্গুলগুলো বেঁকে গেল। হাঁটতে গেলে টলে ওঠেন। পরে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে গেলেও একইরকম টলটলায়মান অবস্থা। প্রায় সময়ই বিছানায় শুয়ে থাকেন। শুয়ে শুয়েই জানালার ফাঁক দিয়ে এক ফালি আকাশ দেখেন।
ঘরের সাথে লাগোয়া কাঁঠাল গাছের পাতাগুলোর সাথে মৃদুমন্দ বাতাসের কানাকানির ধ্বনি শোনেন, পাতার কাঁপন দেখেন। বিছানা নেয়ার খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর চুলে পাক ধরল। রেয়াজ তরফদার অতি-তাড়াতাড়ি বুড়িয়ে গেলেন।
২.
আমি বেড়ে উঠছি। এটা টের পেলাম অসভ্য তমিজের চাউনি থেকে। তমিজ তরফদার বাড়ির আশ্রিত। ওদের গরু-মোষগুলো চড়ায়। মোষের মতোই তার গায়ের রঙ। মোষের পিঠে চড়েই ঘুরে বেড়ায়। ওর মোষে দাবড়ে ছোটা আমার ভালো লাগত। আর ছিল ওর গানের গলা। গানও শুনতে ভালোই লাগত। আমাকে দেখতে পেলেই ওর ময়লা দাঁতগুলো বেরিয়ে পড়ত। কুতকুতে চোখ মেলে দেখত আমাকে। ওর এই বিচ্ছিরি স্বভাব দুচোখে দেখতে পারতাম না। সুযোগ জুটলেই সে আমার সাথে গাল-গল্প জমানোর চেষ্টা করত ‘সুন্দরী কইন্যাগো’ ডেকে। আমি ওকে মুড়ো ঝাঁটা দেখিয়ে দিতাম।
আমি সহজে রনজুর আব্বার সামনে পড়তাম না। দৈবাৎ যদি ওনার সামনে পড়ে যেতাম, কেন জানি লজ্জায় আমার চোখ-মুখ লাল হয়ে উঠত। আমার মুখে আর কোন কথাই জুটত না। একদিন তো তিনি আমার অবস্থা দেখে বলেই বসলেন: ছ্যামড়িটা আবার এতো লাজুক-লতা হলো কবে থেকে?
শুনে তো আমার কান গরম হয়ে যায়। পালিয়ে বাঁচি।
আমাদের বাড়ির পশ্চিমে আমার প্রিয় সই সুলতানাদের বাড়ি। ওদের বাড়ি যেতে হলে মাঝখানে একটা জঙ্গল পেরিয়ে যেতে হয়। জঙ্গলকে আমরা বলি আড়া। এই আড়া নাকি একসময় বেশ বড়োসড়ো ছিল। কখনো কখনো নাকি গারো পাহাড় থেকে বাঘ-টাঘ নেমে এসে এই আড়ায় আশ্রয় নিত। আমি অবশ্য এমন জৌলুসময় বাঘ-লুকনো আড়া দেখি নাই। এটা এখন ছোটোখাটো জংলা ঝোপের মতো। তবুও এর পাশ দিয়ে এখনো যেতে ভূতুড়ে ভয়ে গা ছমছম করে ওঠে, বুকে কাঁপন জাগে।
একদিন যাচ্ছিলাম সুলতানাদের বাড়ি। আড়ার ভিতর দিয়ে হাঁটছি আনমনে। এসময় পথ আগলে দাঁড়ায় কালো মোষ। মোষের পিঠে বসে আছে তমিজ। দাঁত বিজলে হাসছে। আড়ার ভিতর এক চিলতে হাঁটার পথ। পাশ কেটে যাওয়ার উপায় নেই। ফিরতি পথ ধরব কিনা ভাবছি। এসময়ই মোষের পিঠ থেকে লাফিয়ে নামল তমিজ। ঠিক আমার সামনে। ওর বত্রিশটা দাঁতই বেরিয়ে পড়েছে। আমার হাত ধরল খপ করে।
ধমকে বললাম: ছাড় হারামজাদা।
কালো মুখে ময়লা দাঁতগুলোও যেন ঝিলিক খাচ্ছে। বলল: আরেকটু গাইল পার।
: আমি চেঁচাব কিন্তু।
: চেঁচাইলে তুমারই বদনাম।
আচমকা ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নিয়ে দমাদম দুটো কিল বসিয়ে দিলাম। তারপর ফিরতি পথে ছুটতে লাগলাম। আর তমিজ আড়া কাঁপিয়ে হাসতে লাগল।
বাড়ির কাছেই বটগাছ তলায় প্রাইমারি স্কুল। দুদিনের বদলি মাস্টারি নিয়ে এলেন রনজুর আব্বা। তখন তাঁর নাকের নিচে গোঁফ গজাচ্ছে। ছাত্রী হিসেবে আমি খারাপ নই। পড়াশোনায় আগ্রহও সেই ছোটকাল থেকে। কিন্তু তিনি কোন প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলেই আমি জবাব দিতে পারিনা। কেন জানি খুব শরম লাগে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওড়নায় মুখ ঢেকে ফিকফিক হাসি।
কিন্তু লোকটা যেন কেমন। এতটুকু লাজ-লজ্জা নেই। গম্ভীর গলায় আমাকে হাত পাততে বলেন। তারপর গুনে গুনে পাঁচটা বেত। মায়া-মমতা বলতে কিচ্ছু নেই। আমার হাত লাল হয়ে ওঠে। মুখ ব্যথায় ও লজ্জায় নীল হয়ে যায়। চোখ ছাপিয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় পানি পড়ে।
একদিন বিকেলে আমাদের বাড়িতে এলেন রেয়াজ তরফদার। তখন তিনি বাতের ব্যারামে অচল হতে ধরেছেন। হাতের আঙ্গুলগুলো বেঁকে গিয়েছে। হাঁটাহাঁটি করেন ধীর-লয়ে। খানিকটা টলোমলো পা ফেলেন।
বাবা বসেছিলেন বারবাড়িতে সারি সারি আমগাছের তলায়। আমি একলা একলা এক্কা-দোক্কা খেলছিলাম। রেয়াজ তরফদারকে দেখতে পেয়েই আমাদের বছরমারি কামলা একটা চেয়ার এনে বাবার পাশে রাখল। তিনি বসলেন। বসে বসেই নির্ণিমেষ তাকিয়ে রইলেন আমার দিকে।
বাবা জিজ্ঞেস করলেন: কেমন আছেন তরফদার ভাই?
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে রেয়াজ তরফদার বললেন: এখন আমার চলে যাওয়ার বেলা।
আমি খেলছি, কিন্তু কান খাড়া রয়েছে দুজনের আলাপের দিকে।
রেয়াজ তরফদার এবার আমাকে ডাকলেন। কাছে যেতেই আমার পিঠে হাত রাখলেন। বললেন: এই সোনামণি মা-জননীকে ঘরে তুলেই আমার বিদায়ের পালা।
লজ্জায় আমার মাথা আনত। পায়ের বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে মাটি খুঁড়ছি। আর ওদিকে বাবা মিটিমিটি হাসছেন।
৩.
তরফদার বাড়ির বৌ হয়ে যখন এলাম, তখনকার আমার শ্বশুরবাড়ির অবস্থা পড়োপড়ো। শ্বশুর খুবই অসুস্থ। রনজুর বাবা তখনো ছাত্র। শেরপুরের এক স্কুলে ক্লাস টেনের ছাত্র। আমি পড়তাম বাড়ির পাশেই গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে। ক্লাস ফাইভে পড়াকালেই বিয়ে, তাই পড়াশুনো আর এগুলো না। আমার দেবর লেখাপড়া তেমন করেনি, বন্ধুদের সাথে আড্ডায় সময় কাটায়। আমার শাশুড়ি ফর্সা ও সুন্দরী যেমন, তেমনই মুখরা। তিনি পাড়া বয়ে ঝগড়া করে বেড়াতেই পছন্দ করেন। এরমধ্যেই চার-চারটে হৃষ্টপুষ্ট হালের বলদ পর পর মরে গেল। সংসার প্রায় উচ্ছন্নে। রনজুর আব্বা নিজে সাইকেলে শেরপুরের স্কুলে যাওয়া-আসা করেন। মাঝে মাঝে স্কুল-ফাঁকিও পড়ে যায়। তিনিই এরমধ্যে যতটুকু পারেন, হাল-আবাদ জমি-জিরেতের তত্ত্ব-তালাশি করেন, সংসারের ঠেকা দেয়ার চেষ্টা করেন। তরফদার বাড়িতে আমার প্রথম রাতেই রনজুর আব্বা আমাকে বললেন: এই যে নরম-সরম মেয়ে, এসে পড়েছ ভাঙ্গা সংসারে, এখানে কান্নাকাটির সময়ই পাবে না। শক্ত হাতে হাল যদি না ধরতে পার, তাহলে তুমিও ভাসবে, আমরাও ভাসব। সংসারটাই ভেসে যাবে।
শাশুড়ি কিন্তু আমাকে মেনে নিতে পারলেন না। আমার মতো এমন কালো মেয়ে রাজপুত্রের মতো তাঁর ছেলের কানি আঙ্গুলেরও যুগ্যি নয়। উঠতে বসতে তিনি আমাকে সেইটাই বারবার জানিয়ে দিতে লাগলেন। আর দেবর তালেব আমাকে পাত্তাই দিল না। সে আজ পর্যন্ত আমাকে ভাবী বলে ডাকেনি। আমি তার কাছে নায়েবের ব্যাটি। স্বামীকেও যে খুব কাছে পেয়েছি, এমনটা নয়। তাঁর সান্নিধ্য পেয়েছি কমই। শেরপুর স্কুল থেকে তিনি এন্ট্রাস দিলেন। এরপর বছর খানেক বাড়িতে থেকে ইউনিয়ন বোর্ডের কেরানীগিরি করেছেন। তারপর সরকারি চাকরি নিয়ে ফুলছরি, ফুলপুর, নেত্রকোণা হয়ে জামালপুর শহরে পোস্টিং।
তরফদার বাড়িতে আমার সাকুল্য ভরসা আমার শ্বশুর। তিনি ছায়া হয়ে আমাকে আগলে রাখলেন, সান্ত্বনা দিলেন, সংসারধর্ম পালনে উৎসাহ যুগালেন। তাঁর উৎসাহ ও স্নেহমায়াতেই আমি এই সংসারের জন্য খাটা-খাটনি করেছি প্রাণপণ। আস্তে আস্তে সংসারের শ্রী ফুটতে লাগল। রনজুর আব্বা আর আমার পরিশ্রমে শ্বশুরের দোয়ায় তরফদার বাড়ির সবচাইতে সম্পন্ন গৃহস্থ হয়ে উঠলেন রেয়াজ তরফদার।
ভাবী ডেকে ডেকে পাড়া তোলপাড় করত তমিজ। আমার শ্বশুর তাকে ভিটার জমি দিয়েছিলেন। তার কাজ-কম্মো তেমন নাই। চুরি-ছ্যাঁচড়ামিই তার পেশা।
আমার শাশুড়ি নিজে দেখে-শুনে তাঁর ছোট ছেলে তালেবকে বিয়ে করালেন এক সুন্দরী মেয়ের সাথে। এরপর থেকে তাঁর কাছে আমার কদর আরো কমে গেল। তালেবের বৌ পায়ের উপর পা তুলে পালঙ্কে যখন বসে থাকে, তখন আমি কোলে আর পিঠে বাচ্চা নিয়ে সংসারের পাহাড় সমান কাজ করে যাই মুখ বুঁজে। দেখে-শুনে ক্ষ্যাপে যায় তমিজ। শাশুড়িকে বলে: তুমাগোর দেলে কুনো অহম নাই। কচি মাইয়াডারে ঘরত আননের পর থাইক্যাই তুমরা যে অত্যেচারডা শুরু করছ, দেইখো চাচী, তার ফল তুমরা হাতেনাতে পাইবা।
শাশুড়ি মুখ ঝামটা দিয়ে বলেন: তর অতো পীরিতি ক্যান?
হঠাৎ করেই শাশুড়ি একদিন আমার উপর চড়াও হলেন। পাড়ার কোথায় কার সাথে কী নিয়ে ঝগড়া করে এসেছেন, তাঁর মন-মর্জির ঠিক-ঠিকানা নাই, বাড়িতে ফিরেই সামনে আমাকে পেলেন। অমনি শুরু হলো গুষ্ঠি তুলে গালাগাল। আমি কখনোই তাঁর কোন কথারই বাদ-প্রতিবাদ করিনা। কিন্তু সেদিন বিনা দোষে অকারণ গালাগাল শুনে নিজেকে ঠিক রাখতে পারলাম না। মুখ ফুটে বেরিয়ে গেল: এই ডাইনি বুড়ির কবল থেকে করে যে রেহাই পাবো!
: কি? আমি ডাইনি বুড়ি?
খড়মের ঘা পড়ল আমার পিঠে। এসময় হা-হা করে ছুটে এলো তমিজ। দুজনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বলল: বিনা দুষে অকারণ ভাবীরে গাইল পারতাছো ক্যান?
আমি ঘরে ঢুকে পড়ে বিছানায় উপুড় হয়ে অবরুদ্ধ আবেগে কাঁদছি। ঐদিকে শাশুড়ির ঝাল পড়েছে তমিজের উপর: পীরিতের রস বাড়ছে! অতোই যদি রস, নিয়ে যা না তোর বাড়িতে।
শেষ-মেষ শ্বশুর এসে ঠেকালেন।
রাতে বিছানায় উপুড় হয়েই পড়ে আছি। সারাদিন নাওয়া-খাওয়া হয়নি। পাশের কামরা থেকে শাশুড়ি ও শ্বশুরের কথাবার্তা আলাপ শুনতে পাচ্ছি।
শ্বশুর বললেন: তোমার তো অম্লের দোষ। না খেয়ে শুয়ে থাকলে আমাদেরই সাত ঝামেলা।
শাশুড়ি মুখ ঝামটা দিয়ে উঠলেন: হ্যাঁ, বসে বসে খালি গিলি। বাড়ির বড় বৌ সারাদিন না খয়ে আছে, সেদিকে কারো হুঁশ আছে?
: তুমি ওকে খড়ম পিটাতে গেলে কেন?
: আমার ছেলের বৌ, আমিই মারব। ও আমার চোখের দুষমণ। পোড়ারমুখি খালি আমার গালি-গালাজই শোনে, সাত গাঁ ঘুরে ঘুরে যে ওর সুনাম-কীত্তন করিÑ ঐগুলো বুঝি কিছুই না? থাক, বুড়ি হয়েছি, না খেয়ে খেয়েই মরব।
আমি আর শুয়ে থাকতে পারি নাই। ভাত-তরকারি বেড়ে নিয়ে গিয়েছি তাঁর কাছে। আমার হাত ধরে তিনি হামলে কেঁদে উঠলেন।
আমার শাশুড়িই আমাকে জামালপুর শহরে আসার বুদ্ধি দেন। চুপি চুপি বলেন: তোর মতো আহাম্মক আর একটিও দেখি নাই। এই গৈ-গেরামে থেকে বনজু দিন দিন পচছে। ওকে লেখাপড়া শিখাবি না? মেয়েগুলোকে ভালো ঘরে-বরে বিয়ে দিতে হবে না?
যেদিন জামালপুর টাউনে আসার জন্য গোছগাছ করি, সেদিন তিনি আমার গলা জড়িয়ে ধরলেন। অকূল কান্নায় ডুকরে ডুকরে বললেন: এখানে আমার তত্ত্ব-তালাশ নেওয়ার জন্য আর কেউ রইল না!
এর মধ্যেই শ্বশুর বিগত হয়েছেন। শাশুড়িকে এতো করে বুঝালাম আমাদের সাথে আসতে, কিছুতেই সম্মত হলেন না। শ্বশুরের গোর ছেড়ে তিনি আর কোথাও নড়বেন না।
রনজু:
খেলা মেলা কতো বেলা
১.
আমাদের শহরে থাকাই পাকাপাকি হয়ে গেল। নাজির মৃধার বাসা ভাড়া করা হলো মাসিক পনেরো টাকায়। আম্মা কদিনের জন্য বাড়িতে গেলেন সব গোছগাছ করতে।
নতুন বাসায় আব্বা আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন: রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতন গড়েছিলেন। তোদেরকে নিয়ে আমিও শান্তিনিকেতন গড়ব।
পিঠাপিঠি কয়েকটি ভাড়ার বাসা নাজির মৃধার। স্বল্প পরিসর। পার্টিশন দিয়ে বৈঠকখানা ও থাকার ঘর বানানো হয়েছে। আর আছে আলাদা আলাদা রান্নাঘর, পায়খানা, পাতকূঁয়া।
বৈঠকখানায় চৌকি পেতে আমার ঘুমনোর ব্যবস্থা। থাকার ঘরে চৌকি পাতা হয়েছে দুইটি। একটিতে থাকেন আব্বা-আম্মা, অন্যটিতে লিলি-মণি; আমার ছোট দুই বোন।
আমি তখন সাইকেলে জোর প্যাডেল মেরে পুরো শহর টহল দিয়ে বেড়াই। সাইকেলটা উপহার পেয়েছি নানাজানের কাছ থেকে। প্যাডেলে আমার পা পড়ে কি পড়ে না। সাইকেলের চলন্ত অবস্থাতেই পায়ের পাতা টানটান করে বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে ঠেলা দিই প্যাডেলে।
সাইকেলটা এসেছে অবশ্য আরো পরে। এর আগে বাসার সামনের ডোবাটা ছাড়া শহরের আর কিছু চিনিনা আমি। ভালো করে পরিচয় হয় নাই পড়শিদের সাথেও। রেজা, মহসিন, মাসুদÑ এদের কাউকেই চিনিনা। মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে ওদেরকে খেলতে দেখেছি সারা বিকেল। সাহস করে নিজের থেকে ভিড়িনি ওদের দলে।
একদিন ডোবার পানিতে কাগজের নৌকা ভাসিয়ে তামাশা দেখছিলাম। একটা ছেলে এসে পাশে দাঁড়াল। বলল: হেহ্! গাঁইয়া ভূত! তুমি বুঝি মোশাররফ সাহেবের ছেলে?
মাথা নাড়লাম কিছুটা সঙ্কোচে, কিছুটা বিরক্তিতে।
: অইটা তোমাদের বাসা না?
মাথা নাড়লাম।
: কথা বলতে পারো না? নাম কি তোমার?
: রনজু।
: আমার নাম রেজা। গভর্নমেন্ট স্কুলে ক্লাস থ্রিতে পড়ি। তুমি?
আমাদের গ্রামের স্কুলে ক্লাস টুতে পড়তে পড়তে চলে এসেছি এখানে। এখনো ভর্তি হইনি কোথাও। আমার পড়াশুনোর দৌড় একটা সমবয়সী ছেলেকে জানাতে সঙ্কোচ হলো। ভাবে-ভঙ্গিতে জানালাম, আমিও শীগগির এমনই কোন ক্লাসের ছাত্র হতে যাচ্ছি।
রেজা বলল: তোমাদের পাশের বাসাতেই থাকি। ঐ মাঠটাতে আমরা খেলাধুলা করি। খেলতে যাবি? ফুটবল খেলতে পারিস?
আচমকা তুই-তোকার শুনে মেজাজ খিঁচড়ে গেল। খানিকটা ভড়কেও গেলাম। মুখ গোমড়া করে বললাম: না। এখানে আমার কাজ আছে।
রেজা শুনল না। টেনে এনে দাঁড় করিয়ে দিল মাঠের মাঝখানে। ফুটবলে সেই আমার প্রথম কিক দেয়া। আমার কিক দেওয়ার ভাব-সাব দেখে পাড়ার ছেলেরা তো হেসেই খুন। শেষমেষ ওদের কাছে আমি নিজেই ফুটবল খেলার আনন্দ হয়ে গেলাম।
দেখতে দেখতে জড়িয়ে গেলাম খেলার মাঠে। ওদের মতো আমিও মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে দু’হাত তুলে লাফালাফি করতে জানলাম। চলতি বলকে রেফারির চোখের আড়ালে হাত দিয়ে টুক করে থামিয়ে গোলপোস্টে কিক করা শিখলাম।
রেজার সাথেই আমার বেশি সখ্যতা। আরো জুটল মাসুদ, মহসিন। চারজন মিলে শহরের রাস্তা-গলি ঘুরে ঘুরে বেড়াই। কোনদিন পাথালিয়ার দিকে হাঁটতে হাঁটতে খোশ-গল্প করি। বাসায় ফিরতে ফিরতে কখনো সন্ধ্যা গড়িয়ে যায়। দেরি করে বাসায় ফেরায় আম্মা বকাঝকা করেন। তাঁর এসব বকা কে গায়ে মাখে! পাথালিয়ার রাস্তা হাঁটতে হাঁটতেই সিগারেট খাওয়া শিখলাম। প্রথম যেদিন সিগারেটের ধূঁয়া ছাড়তে শিখি, সেদিন মা বা অন্য কারো কাছাকাছি দাঁড়িয়ে মাথা তুলে কথা বলতে সাহস হয় নাই। গন্ধটা যদি টের পেয়ে যান! সবাইকে আড়াল করে পানি মুখে নিয়ে বেশ কয়েকবার কুলকুচা করেছি। তবু মনে হয়েছে, সিগারেট পোড়ার বিশ্রী গন্ধটা লেগে রয়েছে আমার মুখে।
আম্মা একদিন আমার সার্টের পকেট থেকে বের করে আনলেন দুটি বিড়ি। আমি তখন লিলি-মণিদের সাথে গল্প করছিলাম। শহরে কোথায় কি দেখেছি তাই নিয়ে কথাবার্তা চলছিল। আম্মা আমাদের আড্ডার মাঝে এসে আমাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করলেন: রনজু, তুই বিড়ি খাস?
আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। আম্মা টের পেলেন কি করে? আমার মুখ থেকে কি বিড়ির গন্ধ বেরুচ্ছে? বুঝে উঠতেই পারছি না, আম্মা কী করে টের পেলেন আমার বিড়ি খাওয়া! ভিতরে ভিতরে ঘামছি। তবু সাহস করে বললাম: না তো!
গলার স্বরটা কিন্তু কেঁপেই গেল। আম্মা তাঁর হাতের বিড়িদুটো দেখিয়ে বললেন: এসব তোর সার্টের পকেটে এলো কি করে?
আচমকাই আমার মুখ থেকে মিথ্যে বেরিয়ে এলো: ওহো, আব্বা সকালে বিড়ি কিনতে দিয়েছিলেন, তাঁকে দেয়ার কথা একদম মনে নেই।
মুখের ভাব দেখেই বুঝলাম, আম্মা বিশ্বাস করেছেন। বিশ্বাস করাটাই তাঁর স্বভাব।
বুঝতে পারতাম, শহরে আমরা চলে আসাতে আমাদের স্বচ্ছলতায় টান পড়েছে। আব্বা যা কামাই করেন তা দিয়ে কুলিয়ে উঠতে পারছেন না কোন দিক দিয়েই। এজন্য তিনি সব দোষ আম্মার কাঁধেই চাপিয়ে দেন। এই নিয়েই দুজনের কথা কাটাকাটি।
আম্মা চেষ্টা করতেন যথাসম্ভব কম খরচে সংসার চালাতে। উঠোনে আনাজাদির গাছ লাগিয়ে টুকটাক খরচের সাশ্রয় করার চেষ্টা করতেন।
২.
এক দুপুর বেলা। আব্বা কাছারিতে। আমরা ঘুমিয়ে আছি ঘরে। আম্মা হয়তো কাঁথা সেলাই করছিলেন। বাসার বদ্ধ দরজায় ক্রমাগত কড়া নাড়া। আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। সদর দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এসে দেখি এক পীরালী মস্তান। গেরুয়া পরনে। জটাধরা মাথার চুল লালচে। গলায় রুদ্রাক্ষের মালা। হাতে ত্রিশূল আর তসবিহ। বড় বড় চোখদুটো দোযখের আগুনের মতো গণগণে লাল। হয়তো গাঁজা টেনে টেনে চোখদুটোর এই অবস্থা।
আমি তখন শহুরে কায়দা-কানুন রপ্ত করছি। গলার স্বর মোটা করে ভারিক্কি চালে বললাম: কি চাই?
মস্তান ধমকে উঠল: তোর বাবাকে। যা, পাঠিয়ে দে।
শহরে ছেলেধরার গল্প শুনেছি অনেক। আম্মা ওদের ব্যাপারে সাবধান করে দিয়েছেন বারবার। মস্তানকে দেখে আমার মনে সেই ভয়টাই জেগে উঠল। দরজার এপাশে সরে এসে ভয়ে ভয়ে বললাম: আব্বা তো বাসায় নেই। আপিশে গিয়েছেন।
তেলে-বেগুনে যেন জ্বলে উঠল মস্তান। ধমকের স্বরেই বলল: খ্যাতা পুড়ি তোর আব্বার। তোর মাকে পাঠিয়ে দে।
আম্মা এরমধ্যেই এসে দাঁড়িয়েছিলেন দরজার আড়ালে। তাঁকে দেখে মস্তানের কণ্ঠস্বর মাখনের মতো নরম হয়ে গেল। গলায় কাঁপা কাঁপা আওয়াজ তুলে বলল: তুই! তুই এসেছিস মা! আহ!
চোখদুটো তার আবেশে যেন বুঁজে এলো। আরো ঘন আবেগে মাখো মাখো গলায় বলল: অহো-হো! কী পয়মন্ত! কী সৌভাগ্যবতী! কে বলে লক্ষ্মী বহু দূরে? সাক্ষাৎ লক্ষ্মী যে দাঁড়িয়ে আছে এখানে। আমার সম্মুখে।
কথা বলার সময় তার চোখদুটো বন্ধই ছিল। এবার চোখ খুলল। মুখভঙ্গিটা এখন কাঁদো কাঁদো হয়ে উঠল। বলল: কিন্তু মা, তোর চাঁদপনা মুখখানা এমন ভার হয়ে থাকে কেন? তোর মনে এতো দুঃখ কেন? এতো ভাবনাই বা কিসের? আহারে! তোর কী কষ্ট! সংসারে অভাব! সবসময় একটা অভাব-অভাব ভাব থাকে! হাতে টাকা-পয়সা ধরে রাখতে পারিস না! বোকা মা আমার, এসব নিয়ে এতো দুশ্চিন্তা করলে চলে? তোর কোন চিন্তা