ড. ইমদাদুল হক হেলালী

ঈদুল ফিতর ইসলামি সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান একটি ধর্মীয় উৎসব। পবিত্র মাহে রমযানে মাসব্যাপী রোজাব্রত পালন করার পর শাওয়ালের এক তারিখে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদ্যাপিত হয়। মুসলিম উম্মাহর জন্য ধর্মীয় ও সাংস্কৃতির দিক দিয়ে ঈদুল ফিতর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এদিনটির গুরুত্ব, মর্যাদা ও কার্যাবলি সম্পর্কে ইসলামে রয়েছে সুবিস্তৃত নির্দেশনা।

মুসলিম জাতির বাৎসরিক দু’টি প্রধান ধর্মীয় উৎসব রয়েছে। তা হলো ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা। এ প্রসঙ্গে আনাস রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. মদিনায় আগমন করে দেখলেন, মদিনাবাসীরা দু’টি ঈদ পালন করছে। তা দেখে তিনি বললেন, (জাহিলিয়াতে) তোমাদের দু’টি দিন ছিল; যাতে তোমরা খেলাধূলা করতে। এখন ঐ দিনের পরিবর্তে আল্লাহ তোমাদেরকে দু’টি উত্তম দিন প্রদান করেছেন; ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আজহার দিন। (সুনান আবূ দাঊদ, ১১৩৬; সুনান আন-নাসাঈ, ১৫৫৬)

পবিত্র ঈদুল ফিতর উদ্যাপনের রীতিনীতি ও পদ্ধতি সম্পর্কে ইসলামি শরিয়াতের নির্দেশনা বিদ্যমান। ঈদের দিন নতুন পোশাক পরিধান করা মুসলিম সংস্কৃতি। উভয় ঈদ উদ্যাপনে সুন্দর পোশাক পরিধান করার প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে। তবে ইসলামি শরিয়াহ অনুমোদন করে না এমন পোশাক পরিধান করা যাবে না। আবদুল্লাহ ইব্নু উমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, বাজারে বিক্রি হচ্ছিল এমন একটি রেশমী জুব্বা নিয়ে উমর রা. নবি সা. এর কাছে এসে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি এটি কিনে নিন। ঈদের সময় এবং (বিভিন্ন রাষ্ট্রের ও গোত্রের) প্রতিনিধি দলের সংগে সাক্ষাতকালে এটি দিয়ে নিজেকে সজ্জিত করবেন। তখন নবি সা. তাকে বললেন, এটি তো তার পোশাক, যার (আখিরাতে) কল্যাণের কোন অংশ নেই। এ ঘটনার পর উমর রা. আল্লাহর যত দিন ইচ্ছা ততদিন অতিবহিত করলেন (অর্থাৎ আরো কিছু দিন অতিবাহিত হলো)। তারপর নবি সা. তাঁর নিকট একটি রেশমী জুব্বা পাঠালেন, উমর রা. তা গ্রহণ করেন এবং সেটি নিয়ে নবি সা. এর কাছে এসে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি তো বলেছিলেন, এটা তার পোশাক যার (আখিরাতে) কল্যাণের কোন অংশ নাই। অথচ আপনি এ জ্ব্বুা আমার নিকট পাঠিয়েছেন। তখন নবি সা. তাকে বললেন, তুমি এটি বিক্রি করে দাও এবং বিক্রয়লব্ধ অর্থে তোমার প্রয়োজন মিটাও। (সহিহ আল-বুখারি, ৯৪৮)

খাদ্য মানুষের শরীরকে সুস্থ, সবল, কর্মক্ষম ও উৎফুল্ল রাখে। যে কোন উৎসব বাস্তবায়নের জন্য শারীরিক সুস্থতা ও সক্ষমতা প্রয়োজন। তাই কোন উৎসবের দিন প্রারম্ভে কিছু খাওয়া উচিত। কারণ, ক্ষুধার্ত অবস্থায় কোন উৎসব সুন্দর ও পরিপাটিভাবে উদ্যাপন করা সম্ভব হয় না। ঈদুল ফিতরের দিন ঈদগাহের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার আগে কিছু আহার করা সুন্নাত (রাসূলুল্লাহ সা.-এর সংস্কৃতি)। বিশ্বনবি সা. ঈদুল ফিতরের দিন বের হওয়ার আগে কিছু আহার করতেন। এ প্রসঙ্গে আনাস ইবনু মালিক রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সা. ঈদুল ফিতরের দিন কিছু খেজুর না খেয়ে বের হতেন না। অপর এক রিওয়ায়াতে আনাস রা. নবি সা. থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি তা বেজোড় সংখ্যক খেতেন। (সহিহ আল-বুখারি, ৯৫৩)

ঈদের দিন মুসলিম উম্মাহর খুশির দিন। এ দিনে ইসলামি শরিয়াহর দৃষ্টিকোণ থেকে দোষণীয় নয় এমন আনন্দ অনুষ্ঠান করা যায়েজ। বর্তমান বিশ্বে বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর বিভিন্ন ধমীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করা হয়। ইসলাম পূর্ব ও ইসলামের আগমনের পরেও এ রেওয়াজ চালু ছিল। বিশেষ করে রাসূলুল্লাহ সা.-এর আগমন ও তাঁর নুবূওয়াতের সমকালীন আরব সমাজে সংগীত ও কবিতা চর্চার একটি চরম উৎকর্ষতার সময় অতিক্রম করছিল। রাসূলুল্লাহ সা.-এর যুগে ইসলামি শরিয়াহ বহির্ভূত নয় এমন সংগীত পরিবেশন করা ও কবিতা পাঠ করা প্রসঙ্গে হাদিসে এসেছে, আয়িশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবি সা. আমার কাছে এলেন তখন আমার নিকট দু’টি মেয়ে বু’আস যুদ্ধ সংক্রান্ত কবিতা আবৃত্তি করছিল। তিনি বিছানায় শুয়ে পড়লেন এবং চেহারা অন্যদিকে ফিরিয়ে রাখলেন। এ সময় আবূ বকর রা. এলেন, তিনি আমাকে ধমক দিয়ে বললেন, শয়তানি বাদ্যযন্ত্র (দফ্) বাজানো হচ্ছে নবি সা. এর কাছে। তখন রাসূলুল্লাহ সা. তার দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন, তাদের ছেড়ে দাও। তারপর তিনি যখন অন্য দিকে ফিরলেন তখন আমি তাদের ইঙ্গিত করলাম এবং তারা বের হয়ে গেল। আর ঈদের দিন সুদানীরা বর্শা ও ঢালের দ্বারা খেলা করত। আমি নিজে (একবার) রাসূলুল্লাহ সা. এর কছে আরজ করেছিলাম অথবা তিনি নিজেই বলেছিলেন, তুমি কি তাদের খেলা দেখতে চাও? আমি বললাম, হ্যাঁ, তারপর তিনি আমাকে তাঁর পিছনে এমনভাবে দাঁড় করিয়ে দিলেন যে, আমার গাল ছিল তার গালের সাথে লাগান। তিনি তাদের বললেন, তোমরা যা করতে ছিলে তা করতে থাক, হে বনু আরফিদা।

পরিশেষে আমি যখন ক্লান্ত হয়ে পড়লাম, তখন তিনি আমাকে বললেন, তোমার কি দেখা শেষ হয়েছে? আমি বললাম, হ্যাঁ, তিনি বললেন, তা হলে চলে যাও। (সহিহ আল-বুখারি, ৯৪৯-৯৫০)

অন্য এক হাদিসে আয়িশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, (একদিন আমার ঘরে) আবূ বকর রা. এলেন তখন আমার নিকট আনসার দু’টি মেয়ে বু’আস যুদ্ধের দিন আনসারিগণ পরস্পর যা বলেছিলেন সে সম্পর্কে কবিতা আবৃত্তি করছিল। তিনি বলেন, তারা কোন পেশাগত গায়িকা ছিল না। আবূ বকর রা. বললেন, রাসূলুল্লাহ সা. এর ঘরে শয়তানি বাদ্যযন্ত্র। আর এটি ছিল ঈদের দিন। তখন রাসূলুল্লাহ সা. বললেন, হে আবূ বকর! প্রত্যেক জাতির জন্যই আনন্দ উৎসব রয়েছে আর এ হলো আমাদের আনন্দ। (সহিহ আল-বুখারি, ৯৫২)

এ প্রসঙ্গে আরেকটি বর্ণনা, আয়িশা রা. বলেন, ঈদের দিন রাসূলুল্লাহ সা. আমার নিকট এলেন। সেই সময় আমার কাছে দুটি কিশোরী ’দফ’ বাজিয়ে বুআস (যুদ্ধের বীরত্বের) গীত গাচ্ছিল। অবশ্য তারা গায়িকা ছিল না। তা দেখে রাসূলুল্লাহ সা. নিজ চেহারা ফিরিয়ে নিলেন। অতঃপর তিনি কাপড় ঢাকা দিয়ে বিছানায় শুয়ে গেলেন। ইত্যবসরে আবূ বকর রা. প্রবেশ করলেন এবং আমাকে ধমক দিয়ে বললেন, শয়তানের সুর আল্লাহর রসূলের কাছে? (এ কথা শুনে) রাসূলুল্লাহ সা. নিজ চেহারা খুলে আবূ বকরের দিকে ঘুরে বললেন, ওদেরকে ছেড়ে দাও, হে আবূ বকর! আজ তো ঈদের দিন। প্রত্যেক জাতির ঈদ আছে। আর আজ হলো আমাদের ঈদ। অতঃপর তিনি একটু অন্যমনস্ক হলে আমি তাদেরকে চলে যেতে ইঙ্গিত করলাম। তখন তারা বেরিয়ে গেল। (সহিহ্ আল-বুখারি, ৯৪৯; সহিহ মুসলিম, ২১০২)

ঈদের দিন মুসলিম উম্মাহর মধ্যে পরিস্পরিক সম্পর্কের সেতুবন্ধনের দিন। এজন্য ঈদের দিনে ঈদগাহে যাওয়ার সময় যে রাস্তা দিয়ে যাওয়া হয় ফেরার সময় যে রাস্তা পরিবর্তন করে অন্য রাস্তা দিয়ে আসার নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। এ বাহ্যিক কারণ হলো, উভয় রাস্তার লোকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ, ঈদের শুভেচ্ছা জ্ঞাপন ও খোঁজ খবর নেওয়া সহজ হয়। এতে সকলকে পবিত্র ঈদের খুশিতে অংশীদার করার সুযোগ হয় এবং পারস্পরিক সুসম্পর্ক, ভালোবাসা, ভ্রাতৃত্ব ও সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এ প্রসঙ্গে জাবির রা. হতে বর্ণিত, নবি সা. ঈদের দিনে রাস্তা পরিবর্তন করতেন। অর্থাৎ এক রাস্তা দিয়ে যেতেন আর অন্য রাস্তা দিয়ে ফিরতেন। (সহিহ আল-বুখারি, ৯৮৬)

ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করা মুসলিম সংস্কৃতির অন্যতম অনুসঙ্গ। যুবাইর ইবনু নুফাইর রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সা.-এর সাহাবিগণ ঈদের দিন পরস্পর সাক্ষাৎ হলে বলতেন ‘তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম’ অর্থাৎ আল্লাহ আমার ও আপনার পক্ষ থেকে (যাবতীয় ভাল কাজ) কবুল করুক। (ফাতহুল কাদির, ২/৫১৭)

ঈদের দিন মুসলিম সমাজের ধনী-দরিদ্র, ছোট-বড়, সাদা-কালো সবার জন্য আনন্দের দিন। বিশেষত সমাজের দারিদ্র্যশ্রেণির লোকেরা যাতে ঈদের আনন্দ যথাযথভাবে উপভোগ করতে পারে, এজন্য সাহিবে নিসাবের উপর সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব। আবূ সাঈদ খুদরি রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. যখন আমাদের মাঝে ছিলেন, তখন আমরা ফিতরার সাদাকাহ প্রত্যেক ছোট ও বড়, স্বাধীন ও ক্রীতদাসের পক্ষ থেকে এক সা’ খাদ্য; এক সা’ পনির, এক সা’ যব, এক সা’ খেজুর অথবা এক সা’ কিসমিস আদায় দিতাম।

এভাবেই আমরা সাদাকাহ আদায় দিতাম; অতঃপর একদা মু‘আবিয়া ইবনু আবূ সুফিয়ান হজ্জ অথবা উমরাহ করতে এসে (মদিনায়) এলেন। সেই সময় তিনি মিম্বরে খুতবাহ দেওয়ার সময় লোকেদের উদ্দেশ্যে যে সব কথা বলেছিলেন, তার মধ্যে একটি কথা ছিল এই যে, আমি মনে করি শামের অর্ধ সা’ (উৎকৃষ্ট) গম এক সা’ খেজুরের সমতুল্য।

ফলে লোকেরা তাঁর এ মত গ্রহণ করে নিল। আবূ সাঈদ রা. বলেন, কিন্তু আমি ততটা পরিমাণ খাদ্যই আজীবন আদায় দিতে থাকব, যতটা পরিমাণ আমি পূর্বে (রাসূলুল্লাহ সা.-এর যুগে) আদায় দিতাম। (সহিহ্ আল-বুখারি, ১৫০৮, সহিহ্ মুসলিম, ২৩৩১, সুনান আবূ দাঊদ, ১৬১৬)।

উপর্যুক্ত হাদিসে সাদাকাতুল ফিতরের পরিমাণের আলোকে আমাদের দেশে বহুল উৎপাদিত ধান ও গমের উক্ত পরিমাণের মূল্যের উপর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অধীন ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রতিবছর ঈদুল ফিতরের সময় পণ্যের বাজার মূল্যের আলোকে সাদাকাতুল ফিতরের জন্য টাকার পরিমাণ নির্ধারণ করে দেওয়া হয়।

পবিত্র ঈদুল ফিতরের ফযিলত ও মর্যাদা সম্পর্কে উবাই ইবনু কা’ব রা. থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, যখন ঈদুল ফিতরের দিন আসে, ফেরেশতারা রাস্তার মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করতে থাকেন, হে মুসলমানগণ! তোমরা এক মহান প্রভুর দিকে অগ্রসর হও, যিনি কল্যাণ দান করেন এবং তার বিপরীতে মহাপুরস্কার দান করেন। তোমাদেরকে রাতে ইবাদতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, তোমরা তা পালন করেছ; দিনে রোজা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, তোমরা তা রেখেছ; তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের আনুগত্য করেছ। অতএব তোমরা তোমাদের পুরস্কার গ্রহণ কর। অতঃপর যখন তারা ঈদের নামাজ আদায় করে, তখন একজন ঘোষণাকারী বলেনÑ শোনো! নিশ্চয়ই তোমাদের রব তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। সুতরাং তোমরা সৎপথপ্রাপ্ত হয়ে নিজ নিজ গৃহে ফিরে যাও।

এটি পুরস্কারের দিন, আর আকাশে এ দিনকে ‘ইয়াওমুল জায়িযা’ (পুরস্কারের দিন) বলা হয়। (আল-মু’জামুল আওসাত, ১৫৯)

পরিশেষ বলা যায়, ঈদুল ফিতর মুসলিম উম্মাহর জন্য বাৎসরিক একটি ধর্মীয় একটি উৎসব। এ দিনটি ধর্মীয় ও মুসলিম সংস্কৃতির দিক দিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাসম্পন্ন একটি দিন। প্রত্যেক মুসলিমকে এ দিনটি ইসলামি শরিয়াহর আলোকে ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সাথে পরিপালন করা উচিত।

লেখক : ইসলামিক স্কলার ও রিসার্চ ফেলো।