মমতাময়ী মা
হাসান আলীম
সাহরী শেষে তাহাজ্জুদ ও ফজর আদায় করে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম,
কী এক আরাম ও বিষণ্নতায় আমার শরীর মন কোথায় উড়াল দিয়েছিল যেন-
এক রাতে দেখলাম তরঙ্গ বিক্ষুব্ধ সমুদ্রের মধ্যে আমার বদ্বীপ ভূখণ্ড
ভাসছে আবার জাহাজ হয়ে যাচ্ছে চণ্ড সমুদ্র স্রোতের তোড়ে -
আমি ভেসে ভেসে যাচ্ছি অজানা দিগন্তে।
আবার এক সুবেহ-সাদিকের সৌরভে আমার ঘরের মধ্যে দেখলাম
আমার জন্মদায়িনী মমতাময়ী মায়ের আনন্দ জোছনার রেশমি পরশ-
মা আমাকে ঘিরে বসে আছেন
মেহমানদারীর পবিত্র আয়োজনের আঞ্জাম দিতে-
কারা আসবেন, কোন মহল্লার স্বজনেরা!
মা তোমাকে অনেক অনেক দিন পর দেখলাম -
কতদিন পর এলে,
কোথায় কোন জগতে ছিলে তুমি?
আমার খুব খারাপ লাগে, তোমাকে ছাড়া জীবন কেমন যেন মরুভূমি, শূন্য শূন্য-
মা আমি কি তোমার নিকটে খুব তাড়াতাড়ি যাবো? তুমি কি আমার ঘরে থেকে যাবে!
মা, আমি তো এখন পিতৃ-মাতৃহীন এক নীরেট এতিম!
তোমার পায়ের তলদেশে আমাকে একটু আশ্রয় দেবে মমতাময়ী মা!
ঈদ আসে ঈদ যায়
আহসান হাবিব বুলবুল
ঈদ আসে ঈদ যায়
রঙ সুগন্ধি সাজসজ্জা কত না খুশি,
অথচ হযরত ওমর (রা.)
অঝরে কাঁদছেন- ‘প্রভু হে, আমার গুনাহ কি
মাফ হয়েছে! তবে কিসের খুশি।’
ঈদ আসে দেশে দেশে
ঈদ আসে না শুধু ফিলিস্তিনে,
সবুজ ঘাস হয় যাদের ইফতার!
তুমি তো মুমিন, যার উপমা একটি সুঠাম শরীর
এক হাত আঘাত পেলে আরেক হাত
নিরাময়ের পরশ বুলায়,
একটি দেহের মতই মুসলিম নিখিল।
আমরা তো কাঁদি না
ব্যথাতুর হৃদয়ে খুশির উপহার নিয়ে
হাজির হই না!
আজ ঈদ
ভেঙে ফেলো যত বিভেদের দেয়াল
ভেঙে ফেলো যত জালিমের জিঞ্জির।
মজলুমের পাশে গিয়ে দাঁড়াও
বুলাও হাত নিরাময়ের।
মনোরঙে ওড়ে যায়
এবি ছিদ্দিক
বুকের জমিনে ঘর বেঁধেছিলো
ভালোবাসার ওড়াউড়ি...
শতাব্দীর নকশা এঁকেছিলো নয়নে নয়নে
ঘাসফুল রঙ ছিল বেনারসির পাড়ে।
তবে কেহই ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা ছিলা না।
অদৃষ্ট মনোবেদনার কার্যকারণও জানা ছিল না।
মনের ব্যবসা জানাছিলো না...
ভুরুর নিচে যে ঝুলকালি থাকে তাও জানা ছিল না।
অথচ কতো সহজে ভুলে যায় দেহাতি আলাপন
সমাগত সন্ধ্যার চোখাচোখি।
বসত বসতির এতোটুকু আফসোসও থাকে না।
কেবল মনোরঙে ওড়ে যায় নতুন ঠিকানায়।
রচনা
নয়ন আহমেদ
একটি সকাল -এই বিষয়ে আমাকে রচনা লিখতে বলা হলো।
কাগজ আর কলম নিয়ে বসতেই সেখানে হাজির হলো-
একটা পুরোনো সূর্য
নিত্যদিনের ব্যবহার্য মলিন চিরুনি
তেলচিটচিটে বালিশ
আর ময়লা বিছানা
একটা পায়াভাঙা চেয়ার
মাকড়সার জালবোনা রান্নাঘর
তার পাশে কিছুটা এলোমেলো বাসনকোসন।
আমি কিছুই লিখতে পারলাম না।
মা ডাকলেন রুটি খেতে।
চা আছে একপেয়ালা।
জানালা দিয়ে তাকালাম বাইরে।
আমাদের বরবটির মাচানে কয়েকটা শালিক পোকামাকড় আহার করছে।
বোন তাড়া দিচ্ছে বাজারে যেতে হবে।
আমি যেন দেখলাম খাতাজুড়ে রোদ
আর সমস্ত ঘরদোর ও উঠোনে নাচানাচি করছে সকাল।
নারীর ঈদ
শাহানাজ শিউলী
নারী তোমার ঈদ কেমন যায় খবর কি তার রাখো?
সবার খুশির মাঝে তুমি নিজের ছবি আঁকো।
ঘুম থেকে তাই সবার আগে নিজেই ভোরে ওঠো,
সবার খাবার করতে জোগাড় রান্নাঘরে ছোটো।
ঘামে ভেজা আঁচল নিয়ে খাটো বিরামহীন
অতিথিদের আপ্যায়নে কাটে তোমার দিন।
সাজটা তোমার হয় না সাজা ঐ সময়ের টানে,
তবুও তোমার মলিন মুখে স্বর্গ-আভা আনে।
শাড়ির ভাঁজে লুকিয়ে রাখো নিজের গহন দুখ”:
রান্না করে মজার খাবার পাও বিলিয়ে “সুখ”।
স্বপ্ন ছেড়ার পাতায় পাতায় পূর্ণ তোমার কাজ,
আত্মদানে সুখ সাজিয়ে সাজো মনের সাজ।
কোরমা, পোলাও, সেমাই রেঁধে ছড়াও কত ঘ্রাণ
তোমার হাতের মায়ার টানে পাই যে ঈদের প্রাণ।
নারী মানেই ঈদ আনন্দের রংতুলির ওই তুলি,
তোমার খবর নিতে যেন আমরা না কেউ ভুলি।
মিথ্যে প্রণয়
বিল্লাল মাহমুদ মানিক
আমার ভেতরে তুমি নিত্য বসবাসরত, ভীষণ অস্থির;
প্রকাশ্যে চুপচাপ, স্থির, শান্ত পুকুরের জল।
কবিতার পঙক্তিতে তুমি উজ্জ্বল, শব্দকল্পধ্রুম;
দেখা হলে নিরবতা, স্পর্শিনী লজ্জাবতীর পাতা।
যতটা ভালোবাসি পুরোটাই জমাটবদ্ধ, বরফের স্তূপ;
হৃদয়ের অলিগলি ষোলোআনা তোমার দখলে।
তোমার ভেতরে আমি খণ্ডবিখণ্ড, আবছায়া আলো;
বাহিরে ধুমধাম, ছলনার বর্ণিল শাড়িতে জড়ানো।
যতটা ভালোবাসো তারচেয়ে বেশি স্বার্থের সমুদ্র,
উত্তাল ঢেউ, ক্ষণস্থায়ী ফেণার বিমোহিত কারুকাজ।
অবুঝ বালক আমি, বিনাবাক্যে মানি পরাজয়;
সুখের যাতনা বুকে, তোমাতেই সীমাবদ্ধ মিথ্যে প্রণয়।
অপেক্ষার অগ্নিগিরি
অপু সুলতান
এই অন্তহীন অপেক্ষা
কোনোদিন শেষ হবার নয়,
হয়তো দেখা হবে,
হয়তো দেখা হবে না।
উত্তপ্ত মরুভূমি অনিবার্য
বৃষ্টির স্পর্শ পাবে,
জলের ধারায় সিক্ত হবে।
অথচ আমার এই শ্যামল অরণ্য
বর্ষাহীনতায় পুড়ে যাবে,
দাবানল ছড়িয়ে পড়বে
পত্রে পত্রে, শাখায় শাখায়।
অলিন্দে অলিন্দে ঘুমন্ত অগ্নিগিরি
জেগে উঠবে তীব্র বিস্ফোরণে,
লাভার নহর বয়ে যাবে
শিরা উপশিরায়।
অগ্নিগিরি ঘুমিয়ে গেলে
আমি পরিণত হব কঠিন শিলায়।
সেদিন অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশের
সমস্ত হিমশৈলী আমার বুকের ওপর
চাপা দিলেও অনুভূতি জাগবে না,
অগ্নিপাতে উদ্ভূত কঠিন শিলাও গলবে না।
শুধু তোমাকে না দেখার অতৃপ্ত হাহাকার
থেকে যাবে এই কঠিন শিলার
ভাঁজে ভাঁজে, কণায় কণায়।