হুসনে মোবারক
চরিত্রলিপি:
জুবায়ের:
জুবায়েরের মা:
কথক:
ছাত্র/জনতা: ১০/১২ জন
প্রত্যক্ষদর্শী: ৩/৪ জন
জুবায়েরের বাবা:
জুবায়ের কুরআন তেলাওয়াত করতে করতে মঞ্চে প্রবেশ করে। অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী তেলাওয়াত। তেলাওয়াতের সুরে যেন কান্না ভেসে আসছে।
জুবায়েরের মা: কে কুরআন তেলাওয়াত করে? কে ওখানে? ফজরের ওয়াক্ত কি হইছে? জুবায়ের.. ও জুবায়ের...
কই যাস বাজান.. বাজান.. কই যাস.. ও জুবায়ের.. জুবায়ের..।
প্রত্যক্ষদর্শী: জুবায়ের.. জুবায়ের..। জুবায়ের তেলাওয়াত করেই যায়। সুরেলা সুমধুরকণ্ঠে তেলাওয়াত কখনও থামতে চায় না। এই তেলাওয়াত থামবার নয়। অনন্তকালের সুর মোহনা যেন আছড়ে পড়েছে সেই সুরে।
সুমধুর কুরআন তেলাওয়াতের সুরে ঘুম ভাঙলো সাহেরা খাতুনের। ফজরের ওয়াক্ত এখনও হয়নি। এত সকালে সাধারণত তিনি ঘুম থেকে ওঠেন না। ঠিক আজান হলেই ফজর পড়তে ওঠেন তিনি। কিন্তু আজকে মধ্যরাতেই মনমাতানো কুরআন তেলাওয়াতের সুর শুনে তিনি আর স্থির থাকতে পারলেন না। কোন এক মায়ায় তিনি ঘুম থেকে জেগে ওঠেন।
ও আরেকটা বিষয়। জুবায়ের। এই যে জুবায়ের জুবায়ের করে তিনি কাকে যেন ডেকে চলছেন- এই জুবায়েরটা কে? এইটা কি জানেন? জানেন জুবায়ের কে?
সে হলো হাফেজ জুবারের, হ্যাঁ, কুরআনের হাফেজ। পুরা কুরআন মুখস্থ। জুবায়ের হচ্ছে ওনার ছেলে। কুরআনের হাফেজ। গত ৫ আগস্ট তার নামের সাথে যোগ নতুন আরেকটি বিশেষণ- শহীদ! রাজধানীর খিলগাঁও চৌরাস্তা মোড়ের আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া মাখজানুল উলুম মাদরাসার ছাত্র ছিলেন জুবায়ের। ৫ আগস্ট হাসিনার পালানোর খবর শুনে উল্লসিত ছাত্রজনতা যখন রাজপথে নেমে এসছিলো, তখন হাফেজ জুবায়েরও তাদের সাথে যুক্ত হয়। তখন পুলিশ ও ছাত্রলীগ কর্মীরা গুলি নির্বিচারে গুলি চালায়। গুলিতে নিহত হন হাফেজ জুবায়ের। ঐ যে শুনতে পাচ্ছেন? মিছিলের শব্দ ভেসে আসে কানে-
: পালাইছেরে.. পালাইছে.. খুনি হাসিনা পালাইছে।
: খুন হয়েছে আমার ভাই, খুনি তোদের রক্ষা নাই
পুলিশের গুলিতে জুবায়েরসহ কয়েকজন আহত হয়। সবাই ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।
আবারও শোনা যায় কুরআন তেলাওয়াতের সুর...
প্রত্যক্ষদর্শী: এভাবেই জুবায়েরসহ অসংখ্য মানুষ গুলিবিদ্ধ হয় সেদিন।
সিপাহি বিদ্রোহ থেকে ২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে আলেম সমাজ ও মুসলমানরা ছিলেন প্রথম সারিতে। ব্রিটিশ বিরোধী লড়াইয়ে মুজাহিদ আলেমদের ফাঁসি, ভাষা আন্দোলন, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ও মুক্তিযুদ্ধে তাঁদের আত্মত্যাগ, ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু এক কুচক্রী মহল বারবার তাঁদের এ অবদানকে অস্বীকার করে। তাঁদের এই গৌরবময় ভূমিকা মুছে ফেলার অপচেষ্টা চালিয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী: ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানেও কওমি-আলীয়া মাদরাসার ছাত্র ও আলেম সমাজের ভূমিকা ছিল অনন্য। এই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে কিংবদন্তিতুল্য আখ্যান হয়ে বেঁচে থাকবে অনাগত দিনে। প্রায় দুই হাজার শহীদ এবং ৩০ হাজার আহত গাজি ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দেশে সৃষ্টি হয়েছে নতুন ইতিহাস।
ফ্যাসিবাদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে রাস্তায় নেমে আসা এসব আলেম ওলামা, মাদরাসা ছাত্র ও সাধারণ জনতার অনেকেই শহীদ হয়েছেন, অনেকে চোখ হারিয়ে অন্ধ হয়েছেন, অনেকে আহত হয়ে চিরতরে পঙ্গু হয়েছেন।
তেমনিই হাফেজ জুবায়ের ফ্যাসিস্ট সরকার বিরোধী আন্দোলনের একজন আলেম শহীদ। তার হৃদয়ে সংরক্ষিত আছে আল কুরআন।
সেদিনের গুলিতে শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন ওখানে। হাফেজ মোহাম্মদ জুবায়ের আহত হলে তাকে দ্রুত খিদমাহ হাসপাতালে নিয়ে যায় ছাত্ররা। এরপর তাকে মুগদা সরকারি হাসপাতলে রেফার করেন চিকিৎসকরা। চিকিৎসারত অবস্থায় ৭টা ২৯ মিনিটে হাফেজ জুবায়ের শাহাদাত বরণ করেন।
আবারও মিছিল।
শুনতে পাচ্ছেন? কুরআনের সুর আর মিছিল যেন মিলিয়ে যাচ্ছে একই সাথে।
কী ঘটেছিলো সেদিন। হাসিনার জুলুম থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করতে সেও নেমেছিলো ঢাকার রাজপথে। আল কুরআনের এ হাফেজ মুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশে শ্বাস নেয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু খুব বেশীক্ষণ নয়। মাত্র কয়েক ঘন্টা। সারা দেশ যখন হাসিনা মুক্ত বিজয়ের আনন্দে উচ্ছল, রাজপথে জনতার ঢল। দিনের সূর্য তখন ঢলে পড়েছে পশ্চিম আকাশে। ঘড়ির কাঁটায় বিকাল পৌনে ছয়টা। খিলগাঁও চৌরাস্তা মোড়ে সাধারণ শিক্ষার্থীর সাথে বিজয় মিছিলে শামিল হয়েছিলেন ২০২৪ স্বাধীনতা সংগ্রামী হাফেজ মোহম্মদ জুবায়ের আহমাদ।
হাসিনার দোসররা তখনও হিংস্র আর আগ্রাসী। অস্ত্র হাতে পালিয়ে যেতে যেতে উন্মাদের মতো বিজয় মিছিলে গুলি করে পুলিশ, ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা। গুলিতে শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন।
শাহাদাতবরণ করেন খুরআনের হাফেজ মোহাম্মদ জুবায়ের আহমাদ। সন্তানকে হারান বাবা কামাল উদ্দিন।
জুবায়েরের মা-বাবার বুক জুড়ে এখন শুধু শূন্যতা। তবে দেশের জন্য এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামে তাদের পুত্র শাহাদাতবরণ করায় তারা গর্বিত। শহীদের পিতা কামাল উদ্দিন নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের চিহ্নিত করে তার সন্তানের হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেছেন।
প্রত্যক্ষদর্শী: প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান এ শিক্ষার্থীদের ওপর গুলিবর্ষণে এ সময় অংশ নিয়েছেন পুলিশের যুগ্ম কমিশনার ডিএমপি সুদ্বীপ কুমার চক্রবর্তী, মো. সাইদুর রহমান আজাদ (এএসপি ডিবি), খিলগাঁও থানার ওসি সালাহউদ্দিন মিয়া, খিলগাঁও থানার এস আই যথাক্রমে সুদ্বীপ কুমার বিশ্বাস, বদরুল আলামীন, বাবুল, সোহেল রানা,আবু জাহিদ তুহিন, আশরাফুল ইসলাম, শামীম, শিহাব হোসেন, মোহাম্মদ তারেক নাজির, মো. মোজাম্মেল হোসেন, মো. জামাল হোসেন, মনিষ ঘোষ, ওবায়দুর রহমান, আবদুল রহমান, আরসেল তালুকদার, শিহান রহমান শোভন, রবিউল হোসেন, নিজামউদ্দীন, মফিজ, সেলিম হোসেন, ওয়াদুদ তালুকদার, কামালসহ শেখ হাসিনার দোসররা। মুক্ত স্বাধীন এ বাংলাদেশে ঘাতকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি সময়ের দাবি, এ দাবি পূরণে ব্যর্থ হলে হাসিনার মতো নতুন নতুন ফ্যাসিবাদী শক্তি আবার মাথাচাড়া দিবে।
(আবারও শোনা যায় কুরআনের সুর। কুরআন তেলাওয়াত করতে করতে সামনে আসে জুবায়েরের বাবা- বুকফাটা কষ্ট আর বেদনা নিয়ে কুরআন তেলাওয়াত-)
জুবায়েরের বাবা: ..ঐযে আমার জুবায়ের! উড়ে যায়.. উড়ে যায়.. পাখি হয়ে.. জান্নাতের পাখি.. জান্নাতের সবুজ পাখি.. । দেখতে পাচ্ছ না ? তোমরা কেউ দেখতে পাচ্ছ না? আমি দেখতে পাচ্ছি।
জুবায়েরের বন্ধু: চাচা, আমাদের জুবায়ের জান্নাতী চাচা!
জুবায়েরের মা: কে কুরআন পড়ে.. কে ওখানে.. আমার জুবায়ের কই? জুবায়ের.. জুবায়ের..। জুবায়ের আয় বাবা! আয়। আমিতো তোর তেলাওয়াত শুনতে চাই। মিষ্টি তেলওয়াত । আসবি নি বাবা। এই যে থালায় ভাত নিয়া মা অপেক্ষা করতাছি। আমি কি তোরে আর নিজ হাতে একবেলা ভাত খাওয়াইতে পারমু না। এক লোকমা ভাত। আমি তোরে নিজ হাতে এক লোকমা ভাত খাওয়াইতে চাই বাবা.. আয় বাবা.. আয়..।
লেখক: নাট্য ও চলচ্চিত্রকর্মী।
সভাপতি, বাংলাদেশ শর্টফিল্ম সোসাইটি।