সোলায়মান আহসান
শুধু মেঘ নয়, শরতের আকাশ থেকে ঝরেেছ বৃষ্টি। গতকাল একপশলা বৃষ্টি বেশ লেগেছিল। ক’দিনের তেতে ওঠা আবহাওয়া শীতল হয়ে আসে। রাতে বেশ আরামের ঘুম হয় রবিনের।
বাসায় এলে ঘুম অবাধ স্বাধীনতা পায় তার। তবে ফজরে ওঠে যাওয়ার অভ্যাসটা তার বদলে না। নামাজ শেষে এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানি খেয়ে টুপটাপ বৃষ্টি ঝরতে দেখে মন-মেজাজ বিগড়ে যায়। কথা ছিল বন্ধুদের সঙ্গে টাঙ্গাইলে মহেরা জমিদার বাড়ি দেখতে যাবে। দুপুরের লাঞ্চ সঙ্গেই থাকবে। সেখানে গিয়ে ঘুরে ফিরে এক সাথে বন্ধুরা জমিদাদর বাড়ির কোনো এক সুন্দর জায়গায় লাঞ্চ সারবে।
এখন এভাবে ছিচকাদুনে বৃষ্টি ঝরতে দেখে ওর ইচ্ছে করে দু’পা মেলে বসে কান্না জুড়ে দেয়। বৃষ্টির কোনো মা-বাপ নেই নাকি। থাকলে বলতাম, হে বৃষ্টির মাতা-পিতা, তোমার বাচ্চার কান্না থামাও। আমরা একটু বেড়াতে যাবো।
গত মাসের প্রথম থেকে গণ্ডগোল পাকিয়ে ওঠে ভার্সিটিতে। ভিসির করাপশন নিয়ে। শিক্ষক-শিক্ষিার্থীর একটা বড় অংশ ভিসির পদত্যাগ চেয়ে আন্দোলনে নামে। ধীরে ধীরে সেটা বড় আকার ধারণ করে। ক্লাস পরীক্ষা স্থগিতক ঘোষণা। হল ছেড়ে দেওয়ার নোটিশ। রবিন ঢাকার বাসায় চলেছে। সে রাজশাহী ভার্সিটিতে পড়ে। ঢাকা ভার্সিটিতে চান্স না পেয়েই তাকে পদ্মা পাড়ি দিতে হয়েছে। অবশ্য রাজশাহী তার ভালো লেগে গেছে। একটা নিরিবিলি পরিবেশ এখানে। একমাত্র ছেলে বাবা-মায়ের। একাকী বড়ো হয়েছে সে। নিরিবিলি তাকে টানে। রবিনেদের বাসা ঢাকার পল্লবীতে। এক সময় গাঁও গেরামের মতো ছিল। ছোটকালে দেখেছে। ভালো বাসাও ছিল না। এখন তা স্মাট শহর। নতুন ঢাকার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গড়ে ওঠছে বড় বড় শপিংমল, হাইরাইজড বিল্ডিং। রাস্তা প্রশস্ত হয়েছে দ্বিগুণ।
গত সপ্তাহে হুট করে ভার্সিটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রবিন বাসায় চলে আসে। কিন্তু প্রয়োজনীয় নোটস এবং বইগুলো ফেলে আসে। হঠাৎ হল বাকেট করার নোটিশ। সে ছিল বাইরে। হলে ফিরে এসে আর রুমে যেতে পারেনি। পুলিশ, র্যাব হল ঘিরে রেখেছে। কোনো ছাত্রকে ঢুকে কিছু আনতে দিচ্ছে না। বের হতে দিচ্ছে শুধু। এ রকম অভিজ্ঞতা ওর আগে হয়নি। একটা কিছু ঘটলে নানা ব্যানারে নেমে পড়ে ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষকরা। এর মধ্যে কোটা বিরোধী আন্দোলনের ব্যানারে একদল ছাত্র-ছাত্রী নেমে আসে। কোটা বিরোধী আন্দোলন ঢাকা ভার্সিটিতে শুরেু হয়েছে দেখেছে। মিছিল-টিছিল হচ্ছে। কোনো জোরদার নয়। রবিনের দৃষ্টিতে সেরকম মনে হয়। তবে রাজশাহীতে আঁচতেমন তখনও পৌঁছেনি।
রবিন মনে করে রাজশাহীতে পড়তে আসা যুক্তিসঙ্গত হয়েছে। একটু দূরে পড়াশোনা করা ছেলেদের বাবা-মায়ের কাছে কদর বাড়ে। যা সে প্রতিবার এসে অনুভবন করে। যে ক’দিন ঢাকার বাসায় থাকবে অবাধ স্বাধীনতা। অখণ্ড অবসর। বিস্তর ফূর্তি এলাউড। রবিন তো ফূর্তিই করতে চায়। তবে ইদানীং সে নিজেকে একটা সীমানায় বেঁধে ফেলেছে। বল্গাহীন ফূর্র্তি কার না। তাছাড়া ঢাকায় এলে নিজের পড়াশোনা এগিয়ে নেওয়া, পাশের বাসার ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের পড়া দেখিয়ে দেয়। তাছাড়া জ্ঞানার্জনের জন্য কিছু একটা বই পড়ে। পড়ায় নিজেকে নিবিষ্ট রাখে।
জানালার পর্দা সরিয়ে দেখে রবিন বাইরের পরিস্থিতি। এখন খুব বেশি জোর নেই বৃষ্টি ধারাতে। চিকন হয়ে বারিধারা ঝরছে। হয়তো অল্পক্ষণের জন্য বৃষ্টি থাকবে। শরতের বৃষ্টি তো, খুব দীর্ঘস্থায়ী হয় না। সকালের বিবিসি দেখে নাস্তা সেরে পিয়ালকে ফোন করে। পিয়াল স্কুল জীবনের বন্ধু।
-কী যাবি না?
-বৃষ্টি যেÑ
-আরে এই বৃষ্টিতে কাবু?
-কাবু না, এসব বৃষ্টি টিষ্টি আমার বাজে লাগেÑ বেড়ানোর মজাটা নষ্ট।
-বাজে কী. মজা, রেডি হয়ে নেÑ বী কুইক। আমি আসছি।
-কখন?
-এই তো পনেরো মিনিট বাদে।
-তোর পনেরো মিনিট-
-দেখিস, ঠিক পনেরো মিনিটের মধ্যে বান্দা হাজির।
ফোনটা সাইড টেবিলে রাখে রবিন। ভেবেছিল ছোট কাকার পাঠানো নতুন পাকিস্তানি কাবুলী ড্রেস পরবে। কিন্তু ওয়েদার নট এলাউ। প্যান্ট-শার্টই কাফি। ও ভালো কথা। এক ফ্লাক্স চা-য়ের কথা বলেছিল। মসলা দিয়ে লাল চা। পিয়ালের চা লাগে একটু পর পর। ওর বাসায় সকাল থেকে গ্যাস নেই চুলায়। আগুন জ¦লছে না। তাই পিয়ালের হুকুম।
মা, মা- ওমা... ডাকতে ডাকতে কিচেনে চলে আসে রবিন। দেখে মা একটা লাল মোরগের চামড়া ছাড়াতে কসরৎ করছেন। উদ্দেশ্য পরিষ্কার খিচুড়ির সঙ্গে মোরগের গোশত ভুনা। কিন্তু রবিনের হাতে সময় আছে মাত্র তেরো মিনিট।
-কী রে, তুই রেডি?
-জ¦ী মা। আমার হাতে সময় আছে বারো মিনিট। তোমার মোগর খাওয়া ভাগ্যে হবে না। খিচুড়ি দিলেই চলবে। ডিম আমলেট দিতে পারো। আচার দিয়ো। আর মসলা চা। লাল।
-সে কী, খিচুড়িতে মোগর হলে ভালো হতো না?
-মা, আমার হাতে সময় কম।
-আচ্ছা, ঠিক আছে চায়ের পানি এক চুলায় আর ডিম আরেক চুলায় পাঁচ মিনিটের মধ্যে করে দিচ্ছি।
রবিনের মায়ের রান্নায় সুখ্যাতি আছে। দ্রুত রান্না করেন তিনি। রবিন আশ্বাস্ত মায়ের কথায়।
-বেশি দেরি হবে না, সব কিছু আনছি।
রবিন মায়ের মুখের দিকে তাকায়। রান্না ঘরের উনুনের তাপে ফর্সা মুখ লাল হয়ে গেছে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। চিক চিক করছে। মায়া হয় মায়ের প্রতি। কিচেনে রাখা টিস্যু বক্স থেকে চট করে একটা টিস্যু টান দিয়ে বের করে। এগিয়ে যায় কপালের ঘাম মুছে দিতে।
না শাহানা মুখটা সরিয়ে নেয়। মুখে বলে- লাগবে নাÑ লাগবে না, কিন্তু রবিন মায়ের নিষেধ অমান্য করে জোর করে মুছে দেয়। মুখে বলেÑ মায়ের সেবা করে জান্নাত পেতে দেবে না?
রবিন একমাত্র সন্তান বাবা-মায়ের। কোনো চাহিদা অপূর্ণ নেই। সামান্য ছোটখাটো আব্দার ও ফেলনা মনে করেন না। যখন যা বলে তখন তা রেডি। রবিনের কোনো কষ্ট নেই। অভাব নেই। শুধু অভাব তার কোনো ভাই-বোন নেই। এই শূন্যতা তার মনে আজকাল খুব প্রতিক্রিয়া করে না। তার কারণ সে এখন ছোট্টটি নেই। বড় হয়েছে। যে বয়সে ছেলেদের গণ্ডি পরিবার ছাড়েিয় বাইরের একটা নির্দিষ্ট সীমায় বৈধতা পায়। রবিন এখন সেই বয়সী। দু’বছর আগে ও এইচএসসি পাস করেছে। এখন ভার্সিটিতে পড়ছে। মেকিকেলে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে বিফল হয়। ঢাকা ভার্সিটিতে চান্স পায়নি। অবশেষে জীব রসায়নে চান্স পেয়েছে। অবশ্য এতে তার কোনো খেদ নেই। ডাক্তারি পেশা তার জন্য উপযুক্ত হতো না। কারণ সে একটু আবেগী টাইপের। কারো দুঃখ-কষ্ট দেখলে সহ্য করতে পারে না। জীবনটা এক ঘেয়েমি হয়ে পড়ে। রোগী আর রোগের প্রিয়জনকেন্দ্রিক। বাইরের জীবন সংকুচিত হয়ে পড়ে। তার সাবজেক্ট খারাপ না। রেজাল্ট ভালো করতে পারলে ভার্সিটির শিক্ষক হিসেবে থেকে যেতে পারবে। তারপর বিদেশ থেকে পিএইচডি করে নিতে পারলেই প্রফেসর, নির্বাক জীবন। তার মায়ের আশা ছিল তাদের ছেলে ডাক্তার হবে। একদিন যাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছেÑ ডাক্তার হতে পারেনি তাতে কি ডাক্তার বউ এনে তোমার শখ মিটিয়ে দেবো। জবাবে মা হেসে বলেছে, না ডাক্তার বউ আমার পছন্দ না সংসার রেখে রোগীর নাড়ি টিপে বেড়াবে। ডাক্তার বউ দিয়ে সংসার হয় না। আমার শারীরিক সমস্যার জন্য বাচ্চা নিতে পারিনি। ছেলের বউ দিয়ে সে শূন্যতা পূরণ করব।
-মা, তুমি এতোসব ভেবে রেখেছ, এসব তো অনেক পরের বিষয়। মানুষ তো আজকাল কে কখন আছে।
-কী যা-তা বলছিস! শাহনা আঙুল দিয়ে মুখ সামলা।
বাবার সাথে রবিনের তেমন কথাবার্তা হয় না। একটু কড়া মেজাজী লোক। সরকারি কলেজের ম্যাথ-এর প্রফেসর। শিক্ষক হিসেবে নামডাক আছে। ঝাঁকে ঝাঁকে ছাত্র-ছাত্রী আসে প্রাইভেট পড়তে। আগে বাসায় এসে পড়তো। ঝামেলা হয় বলে মায়ের পরামর্শে আরেকজনের সাথে কোচিং সেন্টার দিয়েছে। নূরুল স্যারের কোচিং। বাবার ব্যস্ততা কোচিং আর কলেজ নিয়ে। বাবার এ ব্যস্ততা সেই ছোট্টটি থেকে রবিন দেখে অভ্যস্ত। গা সওয়া হয়ে গেছে। গায়ের পড়ে বাবার সঙ্গে ঘেঁষতে যায় না। আত্মীয়-স্বজনের সাথেও বাবার খুব একটা মাখামাখি নেই। সবাই বিষয়টি মেনে নিয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, যে ব্যক্তি বাড়তি পরিশ্রম করে অন্ন এবং আনন্দের সব সাধ মিটাচ্ছে তার ব্যস্ততাকে সুনজরে না দেখে উপায় কী!
তাছাড়া এভাবে ছাত্র না পড়ালে রবিনদের মাথার ওপর নিজস্ব ছাদ হতে পারতো না। হোক তা একতলা। ফাউন্ডেশন পাঁচ তলার। বাকিটা রবিন করবে। ভার্সিটির অধ্যাপক হলে তা পারবে? তখন মায়ের ডাক্তার হওয়ার যুক্তিটা বেশ মনে বিঁধে। তাই বলে নিজের ইচ্ছেকে বলি দিয়ে?
রবিনকে বাবা প্রফেসর নূরুল আলম টিউশনি করে তিলে তিলে টাকা জমিয়ে ঢাকা শহরে আশ্রয়ের চিন্তা থেকে মুক্ত করে গেলেন। সেই বাবার প্রতি সে কৃতজ্ঞ থাকবে না অবশ্যই। অনেকদিন ভেবেছে বাবাকে সে বলবেÑ অনেক হয়েছে বাবা, এবার ক্ষান্তি দাও। শুধু কলেজটা নিয়ে কথা বলা হয়নি। বাবার কাছে ঘেঁষার মওকা পায়নি। শুধু দুই ঈদ ছাড়া বাবার সাথে পা মেলানো রবিনের হয় না।
রবিনের বার বার মনে হয় বাবা রোবট নাকি। এই বয়সে এতো খাটুনী তার কাছে অনায্য মনে হয়। আমরা জুলুম করছি বাবা নামের লোকটির ওপর। মানুষ চাইবে না নিজের ইচ্ছেয় দু’দণ্ড শুয়ে বসে আলসেমী করবে। গল্প করবে স্বজনদের সাথে। নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে খুঁজবে অতীত। অস্তিত্বহীন হয়ে পড়বে। চারদিকে কেউ নেই। একা। একাকীত্ব মানে নিজেকে খোঁজা। না, এই একুশ বছর বয়সে উপনীত রবিন বাবাকে কোনোদিন আলসেমী করতে দেখেনি। মাকে নিয়ে কখনো ছাদে চাঁদনি রাতে নিরিবিলি গল্প করতে, কিংবা শহর ছেড়ে কক্সবাজার, কুয়াকাটা, জাফলং এমন কোনো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে যেতে। মাকেও কখনো এসব নিয়ে বাবার সঙ্গে কোনো দিন মনমালিন্য চোটপাট করতে। দুটো বাড়তি পয়সা আসছে বলেই কি মা নির্লিপ্ত থাকেন? নাকি মায়ের কোনো স্বাদ-আহ্লাদ; মায়ের অবশ্য উইক পয়েন্ট আছে। নানা বেঁচে নেই। কোনো ভাই নেই। মা-খালা চার বোন। সবাই যার য্রা সংসারে। নানি একাকী থাকেন গ্রামে। গ্রামের পরিবেশে এমন কেউ একা থাকে না। নানিও একা থাকে না। মাঝে মধ্যে নানির এক খালাত ছোট বোন বিধবা, সে এসে কিছুদিন থাকে। আর নানি এখনও সুস্থ-স্বাভাবিক চলাফেরা করতে পারেন। মা কালেভদ্রে গিয়ে আসে। একদিনের জন্য।
বড় হয়ে রবিন জানতে পারে, গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করে এক দুঃস্থ মহিলা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে চাকরি নিয়েছিলেন। চাকরি বছর পাঁচেক করেছেন। রবিন স্কুলগামী হলে ছেড়ে দেন বাবার পরামর্শে। হয়তো তারা ভেবেছিলেন রবিনকে সময় দেওয়া দরকার। বাবা পারতেন না। মা-ও যদি না পারেন তাহলে রবিনের ক্ষতি হতে পারে।
আচ্ছা, এতোসব ভাবছে কেন আজ। বৃষ্টি ধরে এসেছে। জানালার পর্দা সরিয়ে দেখলোÑ মুখ গোমরা ঠিকই আছে। তাহলে বের হতে হয়। ওয়াড্রবের ভেতর দেখে জিন্স প্যান্ট আর সার্ট বের করে বিছানায় রাখে। ক্যাটসও রাখা দরোজার পাশে। এমন সময় মা হাত শাড়ির আঁচলে মুছতে মুছতে প্রবেশ করেন।
-রবিন তোর চা রেডি। খিছুড়ি ডিম ভাজা, আচার সব দেওয়া। ডাইনিং টেবিলে।
রবিন একটা কড়কড়ে এক হাজার টাকার নোট মায়ের হাত থেকে ছোঁ মেরে নিয়ে নাকের কাছে ধরে। মুখে চিৎকার করে বলে মা- নোটে বাবার ঘামের গন্ধ শুকে দেখো। শুকে দেখো। রবিন নোটটা মায়ের নাকের কাছে ধরে। শাহানা হেসে বলেÑ নতুন নোটে গন্ধ থাকে। ওটা বাংলাদেশের সকল মেহনতি মানুষের ঘামের গন্ধ বাবা।
-আচ্ছা মা, বাবাকে তুমি এতো পরিশ্রম করতে বারণ করতে পারো না।
-বারন করলেই শুনবে। বারণ করেছি। বলে পাঁচতলা কমপ্লিট করে ছেড়ে দেবে কোচিং। রবিনের যাতে কিছু না করতে হয়। শোন সন্ধ্যার আগে ফিরবি। কে কে যাচ্ছে তোর সাথে?
-পিয়ালের কথা তো আগেই বলেছি। জিহাদ আর মিঠু। ওরাও আমার স্কুলবন্ধু। তুমি সবাইকে চেন। একটা কাগজে ওদের নাম, টেলিফোন নম্বর লিখে দিয়েছি। এই নাও। একটা ওয়ালেট থেকে ভাঁজ করা এক টুকরো কাগজ এগিয়ে দেয় রবিন। এমন সময় রবিনের ফোন বেজে উঠলো। বিছানার ওপর থেকে হাতে নিয়ে দেখল মিঠুর ফোন।
-হ্যালো: বের হচ্ছি। ওরা মিঠুর গাড়িতেই যাবে। তাই হয়তো জানতে ফোন করেছে গাড়ি নিয়ে আসবে কি না।
-হ্যালো রবিন। একটা খারাপ খবর আছে। রংপুরে একজন ছাত্র মারা গেছে। ঢাবিতে গত রাতে ভীষণ গণ্ডগোল হয়েছে। সাধারণ ছাত্ররা সরকারি দলের ছাত্রদের হল থেকে বের করে দিয়েছে। মেয়েদের হলে কান্নাকাটি চুলোচুলি। কী করবি?
-ভাবছি। পিয়াল জিহাদের সাতে কথা বলে জানাচ্ছি। এতোদিন পর একটা বেড়ানোর প্রোগ্রাম করলোÑ খালি বাধা। প্রথমে বৃষ্টির বাগড়া। এখন ভার্সিটিতে গণ্ডগোল। এবারের ছাত্র বিক্ষোভ ভিন্ন ধরনের। দিন দিন বাড়ছে। বেসরকারি ভার্সিটির ছেলেরাও আন্দোলনে যোগ দিয়েছে। মেয়েরাও পিছিয়ে নেই।
এমন সময় রাজশাহী থেকে গজনফর ফোন দেয়। গজনফর পার্টি করা ছেলে। নেতা কিসিমের।
-হ্যালো। গজনফর। কী খবর?
-খবর খুব খারাপ। আমাদের ভার্সিটিতে পুলিশ র্যাবের দ্বারা ঘেরা। ভিসি স্যার আর কতিপয় টিচার মিলে প্রশাসনিক ভবনে মিটিং করছিলেন। ছাত্র-শিক্ষক ঘেরাও করে রেখেছে। দুই দফা ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া চলেছে। সাধারণ মানুষ ভার্সিটিতে ঢুকে পড়েছে।
এমন সময় পিয়ালের রিং বেজে উঠলো। গজনফরকে কেটে দিলো রবিন। পিয়ালের সাথে কথা বলবে।
-হ্যালো পিয়াল কি খবর?
-খবর ভালো না। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেলরে। রংপুরে একজন মারা গেছে। আমাদের ভার্সিটিতে গণ্ডগোল চলছে। ঢাবির অবস্থা বিস্ফোরণোন্মুখ। শাহবাগে হাজার হাজার ছাত্র সমবেত হয়েছে।
-তাহলে কী করবি? পত্রিকা দেখেছিস?.
-রাখ তোর পত্রিকা। সব সরকারের দালালি করে। প্রকৃত ঘটনা বর্ণনা করে না। রংপুরের ঘটনা চেপে গেছে। রাজশাহীতে নাকি ছাত্র-শিক্ষক অবস্থান প্রত্যাহার করেছে?
-বাদ দে পত্রিকার খবরÑ এখন আমরা কী করব? বেড়ানোর প্রোগ্রাম।
-তুই রাখ, মিঠুকে ফোন দিচ্ছি আমি। মিঠুর আব্বু পুলিশ অফিসার। ওর কাছে খবর থাকবে।
-হ্যালো মিঠু!
-বলছি রবিন। মিঠু চিবাতে চিবাতে কথা বলে।
-কী অবস্থা?
-ভালো মনে হচ্ছে না। রংপুরে লাশ পড়েছে। সারাদেশ গরম হবে। ঢাবিতে গণ্ডগোল চলছে। রাতে বেশ গণ্ডগোল হয়েছে।
-কী করবো তাহলে আমরা?
-আমি মনে করি কোথাও যাওয়া ঠিক হবে না।
-আমারও মনটা খারাপ হয়ে গেছে। মন খারাপ নিয়ে ভালো লাগবে না। রবিন বলল।
-তাহলে? শ্যুটিং প্যাকআপ?
-জিহাদ পিয়াল কী বলে দেখ। মিঠু বলল।
পরে মিলিত সিদ্ধান্ত হলো ওরা টাঙ্গাইল যাবে না। শাহবাগ। ছাত্র বিক্ষোভে অংশগ্রহণ করবে। ঢাবির ছাত্ররা বলল তারা শাহবাগে মিলিত হচ্ছে সেখানে দলে দলে ছাত্র-ছাত্রীরা সমবেত হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা অবরোধ কর্মসূচি দিয়েছে। ট্রেন-বাস-গাড়ি, রিকশা চলবে না।
-মিঠু এক কাজ কর তোর গাড়িটা নিয়ে আয়Ñ চারবন্ধু মিলে শাহবাগ যাই।
-মাথা কারাপ? অবরোধের মধ্যে গাড়ি? মিঠু বলল।
-তাহলে পদযুগল ভরশা? রবিন বলল হেসে।
তারপর ওরা একে একে জড়ো হলো শাহবাগ মোড়ে। হাজার হাজার শিক্ষার্থী সমবেত। স্লোগান চলছে মুহুর্মুহু আপোষ না সংগ্রাম? সংগ্রাম সংগ্রাম। কোটা না মেধা/মেধা মেধা। দালালি না রাজপথ/রাজপথ রাজপথ। ছাত্রসমাজ গড়ে দেশ/মেধাবীদের বাংলাদেশ। কোটা প্রথা নিপাত যাক/মেধাবীরা মুক্তি পাক।
স্লোগানে স্লোগানে মুখর শাহবাগ। যতো সময় গড়াচ্ছে তত শাহবাগে শিক্ষার্থী সাধারণ মানুষের জমায়েত বাড়ছে। দিনের আলো নিভে আসে। রাস্তার বাতিগুলো জ¦লে উঠেছে। স্ট্রীট লাইটে দেখা যাচ্ছে আলো-আঁধারিতে প্রতিবাদী মুখগুলো। এমন সময় রবিনের প্যান্টের পকেটে রাখা মোবাইল ফোন বেজে উঠে। বের করে দেখ মা রিং করেছে। শাহবাগে আসার খবর ছিল কিন্তু সন্ধ্যার আগেই বাসায় ফেরার কথা। রবিন ছোট্ট করে মাকে বলল, আসছি মা।
পাঠক! রবিনের বাসায় ফেরা সেদিন হয়নি। সায়েন্স ল্যাবের কাছে এলে প্রচণ্ড বিস্ফোরণে একটা বোমা এসে রবিনের গায়ে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে লুটিয়ে পড়ে রবিন। সঙ্গে থাকা বন্ধুরা ঢাকা মেডিকেলে এনে ভর্তি করে। ব্যাগ ব্যাগ রক্ত দিয়েও রবিনকে বাঁচানো যায়নি।
পরদিন বিকালে রবিন বাবা নূরল আলম মা শাহানাকে শোকের এক অথৈ সাগরে ডুবিয়ে চম্পট দেয়।