ড. সাইয়েদ মুজতবা আহমাদ খান

আমরা যখন কিশোর বয়সে পৌঁছেছিলাম তখন ছিলো দেশ ভাগের পরের অনেক বছর পরবর্তী সময়কাল। অর্থাৎ বাংলাদেশের স্বাধীনতার বেশ কবছর পূর্বের একটা সময়। সে সময় আমরা ছোটরা কেউ রোজা রাখতাম আবার ছেড়েও দিতাম। তবে নিয়মিত সেহেরী খেতে ভারী মজা অনুভব করতাম। দীর্ঘ এক মাসের সিয়াম সাধনার শেষের দিকে আসতো শবে কদরের মহিমান্বিত রাত্রি। সেদিন সাতাইশা অর্থাৎ শবে কদরের নামায পড়ার সময় ঘনিয়ে আসতো - সেদিনটা খুবই উৎসবমুখর অবস্থার সৃষ্টি হতো। আমরা ছোটরা দলবেধে- পুকুরের শানবাঁধানো ঘাটে জড়ো হতাম সুগন্ধি সাবান সহ কাপড় চোপর নিয়ে। হল্লা করে সবাই মিলে গোসল করবার যে উৎসব হতো তা আজ চোখেই পড়ে না। কেননা সেই শান বাঁধানো ঘাটে সবাই মিলে হল্লা করে সুঘ্রাণযুক্ত সাবান মেখে গোসলের চিত্র আর চোখেই পড়ে না। এখন পুকুরে গোসলের সে সুযোগ তেমন নেই বললেই চলে। কারণ প্রায় প্রত্যেকের বাড়িঘর হয়েছে পাকা দালান-কোঠায়। যেখানে রয়েছে সুসজ্জিত ওয়াশ রুমের সুন্দর ব্যবস্থা। আর চার দেয়ালের মধ্যে সমবেত হয়ে গোসলের সুযোগ আর হচ্ছে না এ কালে। উৎসবমুখর পরিবেশের টিকিও দেখা যায় না আজকাল।

আবার সেকালে-পুরো রমজান শেষে ঈদুল ফিতরের আনন্দ উপভোগ করবার যে ব্যবস্থা হতো-তাও আজ আর সম্ভব হচ্ছে না। কারণ আগের দিনে- অর্থাৎ সেকালে নতুন জামা কাপড় কিংবা পাজামা পাঞ্জাবী কেনার তেমন ধুম পড়তো না, কেননা সেকালে পুরানো জামা কাপড় ইস্তিরি করতে ঢালাই লোহার ইস্তিরি কয়লার আগুনে গরম করে পুরানো জামা কাপড় ইস্তিরি করা হতো. এমনকি ভাতের ফেন দিয়ে মার দেয়া হতো জামা কাপড়ে। কিন্তু একালে কি আর ও সবের আর প্রয়োজন আছে? নেই, কারণ প্রতি বছর প্রতি ঈদে নতুন নতুন নকশা করা পাঞ্জাবী কেনার যে হিড়িক পড়ে তাকি সেকালে ছিলো? ছিলো না।

পুরনো জামা কাপড় ইস্তিরি করে ঈদ উদযাপন করা হতো। এবং সেসব আয়োজনে যে আনন্দ পাওয়া যেতো, সে আনন্দ আজ আর সৃষ্টি হয় না মনে-প্রাণে। শুধু রেওয়াজই পালন করা হয়, ঈদের পূত-পবিত্র স্বর্গীয় আনন্দ আর আমাদের একালের ঈদুল ফিতরের অনুষ্ঠানে বাটি চালান দিয়েও পাওয়া যায় না। শুধু আনুষ্ঠানিকতাই সার- ঈদুল ফিতরের উৎসব অনুষ্ঠানে সে প্রাণ ফিরে আসে না। ঈদ এখন প্রাণহীন একটি অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে বললে অত্যুক্তি হবার নয়। নামীদামী পাজামা পাঞ্জাবী পড়লেই যে আনন্দ সৃষ্টি হওয়ার কথা- তা যেন মরীচিকা বৎ হয়ে যাচ্ছে।

ঈদুল ফিতরের আনন্দ এখন অন্যদিকে মোড় নিয়েছে- রমজান শেষ তো শুরু হয় অশ্লীল পর্ণগ্রাফির মহা উৎসব। সেখানে দেশী বিদেশী চল”িত্রের ধূমধাম প্রদর্শনি শুরু হয়ে যায় এবং নগ্ন অর্ধ নগ্ন ছায়া ছবির সয়লাবে যুব চরিত্র ধংসের মহা তোলপাড় অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ এক মাসের সিয়াম সাধনার মাধ্যমে যে তাকওয়া এবং ধর্মীয় একটা স্বর্র্র্র্র্গীয় পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিলো তা-নিমিশেই মুখ থুবড়ে পড়ে যায়। পুরো রমজানে গড়ে ওঠা একটা শান্ত নিবিড় পরিবেশের চিহ্ন আর ঈদের পরে সমাজ সংসারে পরিলক্ষিত হয় না।

ঈদে আনন্দ সৃষ্টি না হওয়া এবং রমজানের শিক্ষা যে ধরে রাখা যায় না তার বহুবিধ কারণের মধ্যে প্রধান যেটা সেটা হচ্ছে- আমাদের বর্তমান সমাজ ও রাষ্ট্র হচ্ছে কুৎষিত একটি পুঁজিবাদী সমাজ ও রাষ্ট্র। সে সমাজ ও রাষ্ট্রের সকল কল কবজা পরিচালিত হয় সুদ ভিত্তিক অর্থ ব্যবস্থার দ্বারা। সুতরাং যে সমাজও রাষ্ট্র চলে সুদের টাকায়- সেখানে স্বর্গীয় আনন্দ থাক বহু দূরে- আল্লাহর গজব যে নাজিল হয় না এটাইতো বেশি। স্বর্গীয় পরিবেশ সেখানে সৃষ্টি হবে কি কারণে ? যে সুদের রয়েছে বাহাত্তর প্রকারের পাপ- আর সেখানে এতো পাপকে মাপ করবে কে? স্বর্গীয় পরিস্থিতি তৈরী হবে কেন? কি কারণে ? সেকালে সুদের এতো বাড়াবাড়ি ছিলো না। সেজন্য আনন্দ সৃষ্টি হতো মানুষের মনে প্রাণে। এ কালে সুদ ছাড়া, দুনম্বরী ছাড়া ব্যবসা বাণিজ্য চলে না। সিন্ডিকেট ছাড়া কোন্ কর্মটা চলে বলুন দেখি হলফ করে!

সমাজ রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে সূদ-ঘুষ ঢুকে গেছে, শান্তি স্বস্তি আসবে কোত্থেকে? ঈদ তাই আর আগের মতো মানুষকে আনন্দ খুশি উপহার দেয়ার সামর্থ রাখে না। গোড়ায় গলদ থাকলে, সরিষার মধ্যে ভুত ঢুকে গেলে, আসমান থেকে কিছুই আর আসে না. শুধু হাহাকার আর দরিদ্র প্রপীড়িত মানুষের ক্রন্দন ধ্বনিই শুধু শোনা যায়।

অবৈধ আয়, অবৈধ কর্মকান্ড দ্বারা যে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালিত হয়- সে সমাজ ও রাষ্ট্র হতে সুখশান্তি আর আনন্দ পালিয়ে যেতে বাধ্য। শুধু জৌলুস ও রং ঢং বৃদ্ধি পেলেও মানুষের জীবনে সুখ শান্তি এবং আনন্দের লেশ মাত্রও আর অবশিষ্ট থাকে না। থাকতে পারে না।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক