ড. মোহাম্মদ আব্দুল হামিদ

গবেষক, ব্যাংকার

ঘুষ-দুর্নীতিমুক্ত ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির একটি আজাদী সোনার বাংলাদেশ গঠনের যে স্বপ্ন নিয়ে ২৪-এর যে বিপ্লব হয়েছিল; তা থেকে এখনো অনেক দূরে অবস্থান করছি আমরা। বিপ্লব পরবর্তী এতোটা দিন পরও ঘুষ দুর্নীতি নামক ব্যাধি সমাজে রয়েই গেছে আগের মতো। অথচ বিপ্লবের ফল হওয়ার কথা ছিল ঘুষ-দুর্নীতি মুক্ত বাংলাদেশ। একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে ২৪-এর বিপ্লবের পূর্ণ ফল ভোগ করতে হলে রাষ্ট্রের সকল কর্মে এই বিপ্লবের চেতনা ধারণ করার বিকল্প নেই।

আমরা সাদা চোখেই দেখতে পাই সমৃদ্ধি ও ইনসাফের দেশ গড়ার পেছনে যে সকল বাধা ও অন্তরায় রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম প্রধান হলো ঘুষ দুর্নীতি এবং বৈষম্য। এগুলো এখনো সামাজিক ব্যাধি হিসেবেই রয়ে গেছে। অফিস আদালত থেকে শুরু করে সবখানে এগুলোর রমরমা ব্যবসার মতোই চলছে। আর তিলে তিলে সমাজব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে।

ইসলামের দৃষ্টিতে দুর্নীতি ও ঘুষের মাধ্যমে সম্পদ লুণ্ঠন করা জঘন্যতম অপরাধ। মহাগ্রন্ত্র আল কুরআন এগুলোকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আর তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে খেয়ো না এবং মানুষের ধনসম্পদের কিছু অংশ জেনেবুঝে অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে বিচারকদের কাছে পেশ করো না।” ( সূরা আল বাকারা ১৮৮)। এ বিষয়ে আল্লাহ আরো বলেন যে, হে মুমিনগণ তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করো না। (সূরা আন নিসা আয়াত নম্বর-২৯)

হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে, আব্দুল্লাহ ইবনে আস (রা:) বলেন, রাসূল (স.) ঘুষদাতা ও গ্রহীতাকে অভিশাপ দিয়েছেন। (আবু দাউদ ৩৫৮০) সুতরাং ইসলামী শরীয়তে ঘুষদাতা ও গ্রহীতা উভয়ই সমান অপরাধী।

কিন্তু আমাদের সমাজের মানুষগুলো ঘুষ-দুর্নীতির কাজটি করতে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে পড়েছে। এর মাধ্যমে কে কত বেশি সম্পদ অর্জন করতে পারে সেই নেশায় মত্ত। ফ্যাসিস্ট হাসিনার শাসনের সতের বছরে যা হয়েছে তাতো ইতিহাস। সামাজিকব্যবস্থা, আর্থিকমূল্যবোধ ও নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে চরমভাবে ধ্বংস করেছে। আমরা দেখেছি একজন পিয়ন বা গাড়ি চালককে শত শত কোটি টাকার মালিক হতে। একজন মন্ত্রী বা এমপি বিদেশের মাটিতে শত শত ফ্ল্যাটের মালিকানা অর্জন করতে।

আমাদের বক্তব্য হলো — ’২৪-এর এই বিপ্লব ও গণঅভ্যুত্থানে কয়েক হাজার লোকের আত্মত্যাগ এবং হাজার হাজার লোকের পঙ্গুত্ববরণের মাধ্যমে যে আজাদী বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে নতুন সোনার বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়েছে তাকে তার চূড়ান্ত মাকসুদে মানজিলে নিয়ে যেতে হবে। একটি বৈষম্যহীন সমৃদ্ধশালী নৈতিকতা সম্পন্ন ও ইনসাফের সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এজন্য আমাদেরকে সমাজবিধ্বংসী ঘুষ, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি সমাজের প্রত্যেকটি স্তর থেকে বিতাড়িত করতে হবে। এ বিষয়ে ইসলামী শরীয়তের কিছু সুস্পষ্ট নির্দেশনা নিম্নে আলোচনা করা হলো

এক. সর্বদা আল্লাহর ভয় করা

আল্লাহর ভয় ও আখিরাতের শাস্তি সম্পর্কে সচেতন করার দ্বারা অপরাধ দমন করা যায়। দুনিয়ায় মানুষের চোখ ফাঁকি দেওয়া গেলেও আখিরাতে আল্লাহর দরবারে ফাঁকি দেওয়ার কোনো সুযোগই থাকবে না; বরং সব কর্মকাণ্ডের হিসাব দিতে হবে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘আজ আমি তাদের মুখে মোহর এঁটে দেব, তাদের হাত আমার সঙ্গে কথা বলবে এবং তাদের পা তাদের কৃতকর্মের সাক্ষ্য দেবে।’ (সুরা : ইয়াসিন, আয়াত : ৬৫)

দুই. হারাম উপার্জন বর্জন করা

রাসুলুল্লাহ (সা.) হারাম উপার্জনের প্রতি উম্মতকে নিরুৎসাহ করেছেন। এ ব্যাপারে আবু বকর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, হারাম দ্বারা বর্ধিত দেহ জান্নাতে প্রবেশ করবে না। (মেশকাত )

তিন. হালাল-হারাম সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করা

ঘুষ, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি দমন বা সর্বপ্রকার অপরাধ দমনের মূলনীতি হিসেবে ইসলাম হালাল-হারাম তথা পবিত্র-অপবিত্রের মধ্যে পার্থক্য করে দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে ঈমানদাররা! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস কোরো না। শুধু তোমাদের পরস্পরের সম্মতিক্রমে যে ব্যবসা করা হয় তা বৈধ। আর তোমরা নিজেদের কাউকে হত্যা কোরো না। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তোমাদের প্রতি দয়ালু।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ২৯)

চার. পরকালের পুরস্কারে উদ্বুদ্ধ করা

এসকল অপকর্ম, অনৈতিক ও দুর্নীতিযুক্ত কাজ থেকে বেঁচে থেকে ভালো ও কল্যাণকর কাজ করলে পরকালে যে সব পুরস্কারের কথা বলা আছে তা সকলকে জানাতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যে পুরুষ বা নারী ঈমানের সঙ্গে নেক আমল করে তারাই জান্নাতে প্রবেশ করবে। সেখানে তাদের বেহিসাবে রিজিক দেওয়া হবে।’ (সুরা : মুমিন, আয়াত : ৪০)

পাঁচ. রাষ্ট্রে সুদ-ঘুষ নিষিদ্ধ করা

একটি স্বনির্ভর ও সমৃদ্ধশালী দেশ গড়তে হলে দুর্নীতি নির্মূল করতে হবে। এজন্য সমাজ থেকে সুদ, ঘুষ ও দুর্নীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। সমাজ থেকে দুর্নীতি প্রতিরোধে রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘুষদাতা ও গ্রহীতার প্রতি অভিশাপ দিয়েছেন। হজরত জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) সুদখোর, সুদদাতা, সুদের দলিল লেখক এবং সুদের দুই সাক্ষীর ওপর অভিশাপ করেছেন। (সুনানে ইবনে মাজাহ)

ছয়. নিয়োগপ্রক্রিয়ায় সততা

দেশে দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো অযোগ্য ও অসৎ ব্যক্তিদের অসদুপায়ে চাকরি, নিয়োগ, বদলী ও পদোন্নতি প্রদান। কর্মকর্তাদের কাছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পবিত্র আমানত। এ ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.) এই দায়িত্ব আমানত হিসেবে সাব্যস্ত করে বলেছেন, আমানত নষ্ট হতে থাকলে তোমরা কিয়ামতের প্রতীক্ষায় থেকো। আবু হুরায়রা (রা.) বলেছেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! কিভাবে আমানত নষ্ট হবে? তিনি বলেন, যখন অযোগ্য, অদক্ষ ব্যক্তিদের কোনো কাজের দায়িত্ব দেওয়া হবে, তখন তোমরা কিয়ামতের প্রতীক্ষায় থেকো।’ (সহিহ বুখারি )

সাত. অধীনদের মধ্যে সুষম বেতন-ভাতা প্রদান

দুর্নীতির একটি কারণ এটা হতে পারে যে, রাষ্ট্রের অধীন বা কর্মচারীদের সীমিত বেতন-ভাতা নির্ধারণ করা। এ ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিখ্যাত উক্তি হলো, তারা (শ্রমিক ও কর্মচারী) তোমাদের ভাই। আল্লাহ তাদের তোমাদের অধীন করেছেন। কারো ভাই তার অধীনে থাকলে তার উচিত নিজে যা খাবে তাকে তাই খাওয়াবে।

নিজে যা পরবে তাকেও তাই পরতে দেবে, তাকে দিয়ে এমন কোনো কাজ করাবে না, যা তার সাধ্যের বাইরে। কোনোভাবে তার ওপর আরোপিত বোঝা বেশি হয়ে গেলে নিজেও তাকে সে কাজে সহায়তা করবে। (সহিহ বুখারি)

আট. সমাজের সবাই সচেতন করতে হবে নাগরিক সচেতনতা ও সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমেও দুর্নীতি দমনের উদ্যোগ নিয়েছে ইসলাম। কোথাও কোনো প্রকারের দুর্নীতি বা অপকর্ম হতে দেখলে সাধ্যমতো তা প্রতিরোধ করতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যখন কোনো অন্যায় হতে দেখে, সে যেন সম্ভব হলে তা হাত দিয়ে রুখে দেয়। আর তা সম্ভব না হলে প্রতিবাদী ভাষা দিয়ে যেন তা প্রতিহত করে। আর তা-ও না পারলে সে যেন ওই অপকর্মকে হৃদয় দিয়ে বন্ধ করার পরিকল্পনা করে (মনে মনে ঘৃণা করে), এটি দুর্বল ঈমানের পরিচায়ক।’ (জামে তিরমিজি)।