পৃথিবীজুড়ে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে বার বার রুখে দাঁড়িয়েছে জনগণ। হয়েছে গণ-অভ্যুত্থান। তবে শেষ পর্যন্ত জনগণের আকাক্সক্ষা অনুযায়ি দিনবদল কি হয়েছে ? নাকি ভিন্ন কোনো চেহারায় শাসক আবার স্বৈরশাসক হয়েছে নতুন কোন নামে? ৯০ এ এরশাদ সরকার পতনের গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেয়া আওয়ামী লীগ চব্বিশে তার ভয়ানক রক্তপিপাসু ফ্যাসিস্ট চেহারাটা দেখালো। উপমহাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে সহিংস গণঅভ্যুথান হলো।
এই ভূখন্ডের ইতিহাসে তৃতীয় গণঅভ্যুথান এটি। ১৯৬৯ সালের ২৪শে জানুয়ারি অভ্যুথানে পুলিশের গুলীবর্ষণে প্রাণ হারান কিশোর মতিউর রহমান মল্লিকসহ চারজন। এরপর পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খান ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি আর প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন না। বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠন ও স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে একে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হয় এই গণআন্দোলনকে। এর পর স্বাধীন বাংলাদেশে সামরিক জান্তা এরশাদের দীর্ঘ ৯ বছরের শাসনাবসান ঘটে ১৯৯০ এর ৬ ডিসেম্বর। সে আন্দোলনে নুর হোসেন ডা. মিলনসহ প্রায় ৩৭০ জন জীবন দিয়েছিলেন, পঙ্গু-গুম হয়েছিলেন অসংখ্য মানুষ। হরতাল হয়েছিল প্রায় ১ বছর ৩২৮ দিন!
অবরোধ হয়েছিল ৭০ দিন। তবে এসব কিছু ছাপিয়ে ২০২৪ এর জুলাইয়ে দেশের সাধারণ জনগণের ওপর হেলিকপ্টারে গুলীবর্ষণ, ইন্টারনেট ব্লাক আউট, স্নাইপার দিয়ে প্রকাশ্য রাজপথে পাখির মত গুলী করে হত্যা করা। এমনকি ৩২ জন শিশু নিহত হওয়ার কথা জানিয়েছে ইউনিসেফ। এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে ৯ বছরেও এত মানুষ নিহত হননি, এবার যেটা হয়েছে মাত্র ১৫ দিনে। আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ইয়ামিন আনাসসহ ১৪০০’শর বেশি মানুষকে হত্যা করে শেষ পর্যন্ত পালিয়ে যায় পতিত হাসিনা সরকার।
রক্তাক্ত জুলাই আগষ্ট পেরিয়েছে দেড় বছরের বেশি সময়, কিন্তু রক্তঝরা থামেনি । ১৪ অক্টোবর ২০২৫ হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলাহয় অন্তর্বর্তী সরকারের ১৩ মাসে (সেপ্টেম্বর ২০২৪—সেপ্টেম্বর ২০২৫) দেশে রাজনৈতিক সহিংসতায় অন্তত ১৬০ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৮ হাজার ৫০ জন। শুধু বিএনপির অন্তঃকোন্দলে নিহত হয়েছেন ৮৫ জন। আহত হয়েছেন ৫ হাজার ১৭ জন। এর মধ্যে ৯ জুলাই ২০২৫ সন্ধ্যা ৬টার দিকে মিটফোর্ড হাসপাতালের ৩ নম্বর গেট সংলগ্ন রজনি ঘোষ লেনে পাকা রাস্তার ওপর একদল লোক ব্যবসায়ী লাল চাঁদ ওরফে সোহাগকে পাথর দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করে ও কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে রক্তপিপাসু হাসিনার খুন গুম বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের নেশায় যারা আসক্ত ছিলো তাদের অপরাধের ধরনটা পাল্টেছে ।
সর্বশেষ মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পরদিন ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর, শুক্রবার প্রায় দুপুর ২টা ২৫ মিনিটে। মসজিদ থেকে নির্বাচনী ক্যাম্পেইন থেকে ফেরার সময় রাজধানীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা পল্টনের বিজয়নগরের কালভার্ট এলাকায় ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা -৮ এর স্বতন্ত্র প্রার্থী শরীফ ওসমান বিন হাদী গুলীবিদ্ধ হন। মোটরসাইকেলে করে আসা হামলাকারীরা হাদীর মাথা লক্ষ্য করে গুলী চালায়। এর আগে হাদী ২০২৫ সালের নভেম্বরে জানিয়েছিলেন যে তিনি ফোনকল ও বার্তার মাধ্যমে মৃত্যু-হুমকি পাচ্ছেন। ওসমান বিন হাদীর হত্যাকান্ডের পর খুনিদের একজনকেও গ্রেফতার করতে না পারা এবং ধারাবাহিক এসব হত্যার ও খুনের ঘটনা নাগরিকদের নিরাপত্তাহীন করে তুলছে। আমাদের সবাইকে যেন অদৃশ্য ঘাতক তাড়া করে ফিরছে। ছাপ্পান্ন হাজার বর্মাইলের এই ভূখন্ডে মাত্র কিছুদিন আগে আমরা যারা একতাবদ্ধ হয়ে
রাষ্ট্রযন্ত্র ও শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অকুতোভয় হয়ে এগিয়েছি। তারা সবাই যেন এখন শত্রপক্ষের লক্ষবস্তুতে পরিনত। ঠিক কি কারনে কে কখন বেঘোরে প্রাণ হারাবো জানিনা। কারণ খুনি হাসিনা নিরদেশদাতা হিসেবে দীর্ঘ ১৫ বছররের বেশি সময়ে যে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চালিয়েছে, তার সকল অনুসঙ্গ আজো বিদ্যমান। আমরা এই রাষ্ট্রযন্ত্রের পুলিশ প্রশাসনসহ কাউকেই আর বিশ্বাস করতে পারছিনা। কারণ আমরা জানি চোরে চোরে মাসতুতোভাই। চোরতো চলে গেছে তাদের মাসতুতো ভাইদের দৌরাত্ব থামবে কিভাবে ?
এরইমাঝে নির্বাচন। তিউনিসিয়ায় ২০১০ সালে সরকার পতনের ৯ মাস পর ২০১১ সালের ২৩ অক্টোবর নতুন সংবিধান প্রণয়নের উদ্দেশ্যে সংবিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে ইসলামপন্থী এননাহদা পার্টি জয়লাভ করে। নতুন সংবিধান প্রণয়নে কাজ শুরু করে তারা। ২০১১ সালে মিশরে সরকার পতনের এক বছর চার মাস পর ২০১২ সালের ১৬-১৭ জুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে মুসলিম ব্রাদারহুড সমর্থিত প্রার্থী মোহাম্মদ মুরসি জয়ী হন। শ্রীলংকায় ২০২২ সালের ১৩ জুলাই প্রচণ্ড জন-আন্দোলনের চাপ সামলাতে না পেরে রাজাপাকসে পদত্যাগ করেন। শুধু তা-ই নয়, বাংলাদেশের সাবেক স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার মতো তিনিও বিদেশে পালিয়ে যান। রাজাপাকসের পদত্যাগের এক সপ্তাহের মধ্যে শ্রীলঙ্কার সংসদে ভোটাভুটির মাধ্যমে রণিল বিক্রমাসিংহে নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। সর্বশেষ নেপালে গণবিক্ষোভের তীব্রতায় সরকার চাপে পড়ে এবং ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫–এ প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেন। এরপর দেশে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হয়, যার নেতৃত্বে আসেন সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কি।
গত কয়েক বছরে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানের ঘটনাগুলো বিশ্লেষন করলে দেখা যায় এসব দেশে আন্দোলনের মূল কারণগুলো দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, বেকারত্ব, সামাজিক বৈষম্য সব দেশের ক্ষেত্রে প্রায় একই রকম। অথচ গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত সরকারগুলো অভ্যুত্থানের প্রাথমিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যগুলো বাস্তবায়নে প্রায় ব্যর্থ হয়েছে। এটি নির্দেশ করে যে আন্দোলনের প্রাথমিক নেতৃত্বে থাকা তরুণ প্রজন্ম শুরুতে রাষ্ট্র পরিবর্তনের তাগিদ তৈরি করলেও পরবর্তী সময়ে কিছু অভ্যন্তরীণ বা বহিরাগত শক্তি এগুলোকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে; অর্থাৎ আন্দোলনকে কার্যকরভাবে হাইজ্যাক করা হচ্ছে, যা গণ–আন্দোলনের প্রকৃত লক্ষ্য দুর্নীতিমুক্ত, স্বচ্ছ ও সমতাভিত্তিক রাষ্ট্রপুণ:গঠনে বাধা হয়ে দাড়াচ্ছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে অভ্যুত্থানের পরবর্তী পর্যায়ে তরুণ প্রজন্ম, নাগরিক সমাজ ও অন্যান্য অংশগ্রহণকারীর মধ্যে ঐক্য থাকা এরং এক অপরের প্রতি বিরূপ আচরণ করা থেকে বিরত থাকা অত্যন্ত জরুরি। একইসাথে ক্ষমতায় যাওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতা নয়। বরং জনআকাক্সক্ষার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়ার ক্ষেত্রে সকল রাজনেতিক দলকে ভ্যানগার্ড এর ভূমিকায় থাকা প্রয়োজন।
অভ্যুত্থানপরবর্তী সময় খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, অভ্যুত্থান যে শুধু ইতিবাচক রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে আসে, ব্যাপারটা সব সময় এমন নয়; বরং উল্টোটাও হতে পারে। এর সাম্প্রতিক উদাহরণ হলো লিবিয়া, সিরিয়া কিংবা মিসর। ইতিহাসের বিভিন্ন উদাহরণ থেকে স্পষ্ট, অভ্যুত্থান সংগঠিত করার চেয়ে অনেক সময় সেটাকে কাজে লাগিয়ে কাক্সিক্ষত পরিবর্তন আনা আরও কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ।
সে জন্য দেশের রাজনৈতিক শক্তি ও জনগণের সতর্ক থাকা অত্যন্ত জরুরি।