আবুল আসাদ

সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের দায়িত্বশীলতা- এ দুয়ের মধ্যে কোনটাকে আমরা বড় বলব? টমাস জেফারসন (সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট) ‘ Government without Newspaper ’ অবস্থার চাইতে ‘ Newspaper without Government -’কেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তার কথায় সরকার না থাকলেও সংবাদপত্র থাকা উচিত। জাতিসংঘের সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল কফি আনান এবং World press Freedom কমিটির চেয়ারম্যান জেমস এইচ ওটোয়ে জুনিয়র স্বাক্ষরকৃত (১৬ অক্টোবর, ১৯৯৮) ‘চার্টার ফর এ ফ্রি প্রেস’-এর প্রথম লাইনটি হলো ‘ A free press means a free people ’ এই চার্টারে সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণকারী প্রত্যক্ষ বা অপ্রত্যক্ষ সব ধরনের সেন্সরশীপকেই অগ্রহণযোগ্য বলা হয়েছে। শুধু অগ্রহণযোগ্য নয়, স্বাধীন সাংবাদিকতার প্রতিবন্ধক সব বাধাই দূর করার কথা বলেছে।

তাহলে সাংবাদিকের কলম কি সব দায় থেকে মুক্ত? দায় মানলে দায়িত্ববোধের সৃষ্টি হয়। এ দায়িত্ববোধ থেকে কি সাংবাদিকতাকে মুক্ত বলা যাবে? একজন চিন্তানায়ক আর্ল রাইনি বলেছেন, ‘ Freedom without Obligation is anarchy ’ অর্থাৎ স্বাধীনতা যদি দায়িত্বহীন হয়, তাহলে সেটা হবে অ্যানার্কি বা নৈরাজ্য। আমরা কি এই নৈরাজ্যের মুখোমুখি নই? এমন নৈরাজ্য কি আমাদের সাংবাদিকতায় আমরা দেখছি না? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণসংযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. গোলাম রহমান বলছেন, “সংবাদপত্র হচ্ছে সমাজের দর্পন। সমাজের ভালো-মন্দ, সংকট-সম্ভাবনা, বাত্যয়-ব্যাঞ্জনা সংবাদপত্রের পাতায় আমরা দেখতে চাই। কিন্তু সমাজের এ দর্পনে আমাদের সমাজ-চিত্র কতটুকু প্রতিফলিত হয়? অনেকেই তাই বলে থাকেন, আমাদের এ দর্পনটি ভাঙা-বিবর্ণ। ভাঙা আয়নায় তাই সমাজের সব প্রতিচ্ছবি ভাঙা ভাঙা দেখায়। ...কেন পাঠক একাধিক পত্রিকা পড়ে ... তথ্যের বিভ্রান্তিতে ঘুরপাক খাচ্ছে? ... সত্য সব সময় সত্য, যার কোনো আংশিক বাস্তবতা নেই। অর্ধ সত্য বলে কিছু নেই। অর্ধ সত্য মিথ্যারই নামান্তর এবং তা ভয়ঙ্কর।” (২৩ ডিসম্বের, ২০০৩, আইডিবি মিলনায়তনে সেমিনার) প্রবীণ সাংবাদিক সিরাজুর রহমান তার ‘সংবাদপত্রে নৈরাজ্য অবসানের জন্যে তদন্ত কমিশন প্রয়োজন’ প্রবন্ধে বলেন, “বিগত কিছু বছরে সাংবাদিকতার নামে বাংলাদেশে যা ঘটছে সেটা রীতিমতো এক কেলেঙ্কারি। তাতে দশের জনমত প্রতারিত ও বিভ্রান্ত হচ্ছে। সমাজজীবন তাতে বিষাক্ত হয়ে পড়ছে। দেশের ভেতরের এই বিকৃত ও বিষাক্ত সাংবাদিকতা অসদুদ্দেশ্য প্রণোদিতদের দ্বারা বিদেশেও সংক্রমতি হচ্ছে এবং তাতে বাংলাদেশের বৃহত্তর স্বার্থের ক্ষতি হচ্ছে।” (১২ ডিসেম্বর, ২০০২, ইনকিলাব)। আর আতাউস সামাদ আত্ম-স্বীকৃতির মতো করে বলছেন, “আমরা দায়সারা গোছের অথবা একপেশে তথ্য পরিবেশন করছি। তারফলে পাঠক, শ্রোতা দর্শকরা বিভ্রান্ত হচ্ছেন।...আমরা যথেষ্ট জোরে শোরে লিখছি না, আমরা তদন্তভিত্তিক প্রতিবেদন প্রকাশ করছি না, আমরা অনেক বিষয়েরই শেষ না দেখে ছেড়ে দিচ্ছি এবং তার চেয়েও বড় কথা, আমরা নাকি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তেমন কিছু লিখছি না।” (২৩ ডিসেম্বর, ২০০৩, আইডিবি হলের সেমিনার)। সাংবাদিক আতাউস সামাদ যে অভিযোগ তুলেছেন, তাতে তিনিসহ সব পত্রিকা মালিক থেকে শুরু করে পত্রিকার টপ টু বটম-এর সব সাংবাদিকই আমরা জড়িয়ে পড়ছি।

সংবাদপত্রের স্বাধীনতার এই অপব্যবহার, আমাদের এই দায়িত্বহীনতার দায় কার? সাংবাদিকরা এর জন্যে দায়ী হলে, তা দেখার দায়িত্ব মালিকদের, সরকার এবং তার আইনের দায়িত্ব আছে কিছুটা। তবে সাংবাদিকদের বিচ্যুতি আছে অবশ্যই, কিন্তু কতটা? সাংবাদিকরা স্বাধীন সাংবাদিকতার অধিকার কতটা ভোগ করতে পারেন? এ অধিকার সংবাদপত্র ও সংবাদমাধ্যমের মালিকরা তাদের কতটা দেন? যা ইচ্ছে তাই করার অধিকারী সরকারের কালো হাতের থাবা থেকে তারা কতটা মুক্ত? ক্ষমতাধর রাজনীতিকরা, টাকার কুমির কালোটাকার মালিকরা সাংবাদিকদেরকে তাদের নীতির উপর কতটা স্থির থাকতে দেন? এ বিষয়টি নিয়ে কিছু কথা বলেছেন বহুদর্শী সাংবাদিক এবিএম মূসা। লিখেছেন,... আমাদের ফ্রি প্রেসের মুক্ত সাংবাদিকতার অধিকারটি কার কাছ থেকে আদায় করতে হবে তা পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে না। বুঝতে হলে সংবাদপত্রের সাংবাদিক, মালিক বা সম্পাদকের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত হতে হবে। যেমন, টেলিভিশনের মালিক যদি সরকার হয় এবং মালিকের ইচ্ছায় যদি মাধ্যমটি পরিচালিত হয়, তাহলে (সাংবাদিকদের) স্বাধীনতার প্রশ্ন উঠবে কেন? যদি সংবাদ প্রকাশের জন্যে সংবাদপত্রের মালিক আপস করেন, তবে স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হয়েছে বলা অনুচিত হবে না কি?” (৪ জুন, ২০০৩, প্রথম আলো) এবিএম মূসার এ কথার মধ্যে বেদনাসিক্ত ক্ষোভ আছে, সে সাথে রয়েছে বাস্তবতার আর্তচিৎকার। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা যদি হয় মালিকদের স্বাধীনতা এবং মালিকরা যদি সে স্বাধীনতাকে তার নানাবিধ ব্যবসায়ের পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করেন, তখন সাংবাদিকদের কলম স্বার্থোদ্ধারের অস্ত্র হিসেবেই ব্যবহৃত হয়। এখানে আবার সেই সাংবাদিক সিরাজুর রহমানের কাছে আসতে হচ্ছে। তিনি মালিকদের মানসিকতা বিষয়ে লিখেছেন, “মিডিয়া পরিচালকদের (মালিকদের) জনসেবার, রাজনীতিকে প্রভাবিত করার, নিছক মুনাফা করার উদ্দেশ্যে থাকতে পারে। নাইলে তিনি অর্থ কিংবা উদ্যম বিনিয়োগ করবেন না।” এই শ্রেণির মালিকদের কাছে নীতিকথার কোনো মূল্য নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেশ ও জাতি আজ ‘সংবাদ’ নামক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণার শিকার। তবে এটা শুধু আমাদের দেশে নয়, গোটা বিশ্বকেই, বলা যায় গ্রাস করেছে একশ্রেণির সংবাদপত্র মালিকদের উদ্দেশ্যমূলক ‘নিউজ বিজিনেস’। Baias নামক গ্রন্থে সাংবাদিক বার্নার্ড গোল্ডবার্গ মার্কিন সাংবাদিকতার কালো দিকের প্রতি ইঙ্গিত করে একে ‘News Mafia’ বলে উল্লেখ করেছেন।

অবশ্যই বলা যায়, আমাদের সাংবাদিকতা, সাংবাদিকদের স্বাধীনতা ও ‘News Mafia’র আরও কুৎসিত আগ্রাসনের শিকার।

আমাদের সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের এই ‘News Mafia’র হাত থেকে রক্ষা করবে কে? কিভাবে তাদের দায়িত্বশীল হবার পথ উন্মুক্ত, কিভাবে তাদের স্বাধীনতা রক্ষা হবে?

জাতিসংঘের ‘চার্টার্ড ফর এ ফ্রি প্রেস’ সাংবাদিকদের জন্য দশটি ‘ Code of ethics’ নির্দিষ্ট করেছে। আমি মনে করি, সংবাদপত্র ও মিডিয়া মালিক এবং সরকারের আচরণ সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের প্রতি কেমন হবে সেটা সুনির্দিষ্ট করে সাংবাদিকদের দশ দফার ডাবল ‘বিশ দফা’ কোড অব ইথিকস’ তাদের জন্যে তৈরি করা উচিত।

আর আমাদের সরকার নানা বিষয়ে সংস্কার ও সংশোধন লক্ষ্যে অর্ধ ডজনেরও বেশি কমিশন গঠন করেছেন, সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের স্বাধীনতার প্রশ্নসহ তাদের উপর কৃত জুলুম-নীপিড়ন এবং তাদের দুর্গতি-দুরবস্থার চিত্র দিনের আলোতে আনা ও তার প্রতিকারের জন্যে সাংবাদিক সিরাজুর রহমান প্রস্তাবিত ‘সংবাদপত্রের নৈরাজ্য অবসানের জন্য কমিশন’-এর ন্যায় কোনো কমিশন গঠন নিশ্চয় অনুচিত হবে না।