ঘন কুয়াশার ঘোর কাটিয়ে সূর্য কিরণে উদ্ভাসিত জনপদের মতো আমরা উল্লাসিত উচ্চকিত। একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস, প্রাণভরে বাতাস থেকে অক্সিজেন গ্রহণ। আবার কখনো বা মনে হয় এই বুঝি বর্গী এল, হাসিনার পুলিশ বাহিনী এল। দেয়ালেরও কান আছে। আমাদের সংবাদ দিয়ে দিবে এখনই। রাব্বুল আলামিনের কোটি কোটি শুকরিয়া নত মস্তকে, যিনি এই জালিমদের কবল থেকে বাংলার জনপদকে মুক্ত করেছেন!

মুক্তির ইতিহাস : স্বদেশী- বিদেশী স্বৈরশাসক গোলামীর জিঞ্জির পরাতে ব্যস্ত বারে বারে। তাই মুক্তির সংগ্রামও চলে অবিরত।

এক, বখতিয়ার খিলজির বঙ্গ বিজয়ের (১২০৩) মধ্য দিয়ে এদেশের জনতা প্রথম লাভ করে বহুত্ববাদের বন্দনা থেকে মুক্তির স্বাদ। তখন থেকে মানুষ নিজেকে মানুষ ভাবতে শিখলো। তার আগে তারা সেন রাজাদের ব্রাহ্মণ্যবাদী প্রথার সাম্প্রদায়িকতা, পরমত বিদ্বেষ আর অত্যাচারে জর্জরিত ছিল।

দুই, বাংলার স্বাধীনতা হারিয়ে ২০০ বছর ছিল ব্রিটিশ বেনিয়ার অধীন। সাত সমুদ্র তের নদীর ওপার থেকে শাসন করতো তারা। আর আমরা তা মেনে নিতাম। কিন্তু মুক্তির আগুন কখনো নিভে না। হৃদয়ে ধিকি ধিকি জ্বলতেই থাকে। তার প্রকাশ ১৭৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ, ১৭৬৩ সালের কৃষক বিদ্রোহ, ১৭৭০ ফকির বিদ্রোহ, তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা (১৭৩১)এবং সাইয়েদ আহমদ বেরলবির বালাকোট যুদ্ধ ও শাহাদাত বরণ (১৭৩৫)। এ বিদ্রোহগুলো এমন ছিল যার প্রভাব পরবর্তী শতাব্দি কাল পর্যন্ত দৃশ্যমান।

তিন, বিংশ শতাব্দীর শুরুতে স্বাধীনতা আন্দোলন এবং ৪৭ এর দেশ বিভাগ ও আজাদী লাভ। কিন্তু ভারতীয় রাজনীতিবিদদের কূট কৌশলে আজও কাশ্মীরে রক্ত ঝরছে। আর বাংলাকে দুই ভাগ করে স্থায়ী সমস্যা তৈরি করে রেখে গেছে তারা।

চার, সাম্য মৈত্রীর স্লোগান নিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠন হলেও অচিরেই এ স্লোগান ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। পাকিস্তানের দুই অংশে হাজার মাইলের ব্যবধানের মত শাসক শ্রেণীর মধ্যকার দূরত্ব ছিল আরো বেশি। তারা ভৌগলিক জাতীয়তার অন্ধ আবেগে পরিচালিত হতে লাগলো। তাদের চরিত্রকর্মে ইসলাম অনুপস্থিত ছিল। তাই জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা সাইয়েদ মওদুদী (রহ.) বলেছিলেন, ‘যারা পাকিস্তান আন্দোলন করছেন, তারা পাকিস্তান রক্ষা করতে পারবে না’। পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে বিভেদ, বঞ্চনা দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে জন্ম দিল অসন্তোষ। ১৯৭০ এর নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ রায় দিল শেখ মুজিবুর রহমানের দল আওয়ামী লীগকে। আর পশ্চিম পাকিস্তানে ভুট্টোর পিপলস পার্টিকে। কিন্তু তৎকালীন সামরিক শাসক এটা মেনে নিতে গড়িমশি করে। ফলে পূর্ব পাকিস্তানে শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। ৭১ এর ২৫ শে মার্চ এর কাল রাতে নিরীহ জনতার উপর পাকিস্তান আর্মি ঝাঁপিয়ে পড়ে। দিশাহীন জাতি তখন মহাবিপদে। মেজর জিয়া স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। শুরু হয় যুদ্ধ। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলার সূর্যোদয় ঘটে। গেরিলা যোদ্ধাদের আক্রমণে পাকিস্তান বাহিনী যখন দিশেহারা, তখন ভারত ঝোপ বুঝে কোপ মারলো। শুরু হলো ভারতীয় বাহিনীর বিমান হামলা। এক মাস পার না হতেই পাক বাহিনী নিজেকে গুটিয়ে নিল। ভারতীয় বাহিনীর জেনারেল অরোরা এবং পাকবাহিনীর জেনারেল নিয়াজির চুক্তি স্বাক্ষর হল। কিন্তু মুক্তিকামী জনতার প্রধান মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল ওসমানীকে কোন পাত্তাই দেওয়া হলো না। তাকে নিয়াজির আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে আসতে দেওয়া হয়নি।

এর ফল হল ধারণার চেয়েও ভয়াবহ। পাকবাহিনীর সমর্পিত অস্ত্র, ট্যাংক, গোলাবারদ সবই ট্রাক ভর্তি করে ভারতে পাচার হতে লাগলো। নবম সেক্টর কমান্ডার মেজর জলিল প্রতিবাদ করায় তাকে এরেস্ট করা হলো। তখনো বিজয়ের এক মাসও পূর্ণ হয়নি। এবার বুঝা গেল ভারত তার স্বার্থেই মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা করেছে। এর দুটো কারণ:

১. শত্রু রাষ্ট্র পাকিস্তানকে বিভক্ত এবং দুর্বল করা।

২. পাকিস্তানের পূর্বাংশের উপর আধিপত্য বিস্তার।

মুক্তিযুদ্ধের নেতা কে ?

এটা অবিসংবাদিত যে, মুক্তি সংগ্রাম শুরু হয় মেজর জিয়ার আহ্বানে। এখানে নির্দিষ্ট কোন সংগঠক এবং নেতৃত্ব ছিল না। শেখ মুজিবুর রহমান পাক বাহিনীর হাতে বন্দী হবার পর তার পক্ষ থেকে কোন আওয়ামী নেতা দাঁড়ায়নি, যুদ্ধও শুরু করেননি। বরং তারা নিজেদের গা বাঁচিয়ে ভারতে পালিয়ে গিয়ে আয়েশী জীবন যাপন করেন। ধীরে ধীরে মুক্তিযোদ্ধারা সংগঠিত হয় এবং জেনারেল ওসমানীর নেতৃত্বে যুদ্ধ পরিচালিত হয়।

স্বাধীনতার পর শেখ মুজিব পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেন। ভারতের প্রেসক্রিপশনে নিজের নিরাপত্তার জন্য গঠন করেন রক্ষী বাহিনী। তার সাড়ে তিন বছরের শাসনকাল হত্যা, গুম, অত্যাচার এবং রাজনৈতিক দমন পীড়ন ও বাকশাল কায়েমের মাধ্যমে বাক স্বাধীনতা রোধের ইতিহাস। শুরু হয় দুর্ভিক্ষ। চরম অরাজক পরিস্থিতির একপর্যায়ে শেখ মুজিব স্বপরিবারে নিহত হন।

৭১—-২৪

৫৪ বছরে কি পেলাম? শেখ মুজিবের সাড়ে তিন বছরের শাসনকাল এক কালো রাত্রি। মুজিব কন্যা হাসিনার ১৬ বছরের শাসন তারই বর্ধিত ভয়াবহ চিত্র। দুর্নীতি, লুটপাট, খুন, গুম, নির্যাতন, সাইবার মামলা করে সমালোচনার সব পথ বন্ধ করে দেয়। ইসলামের অনুসারীরা আন্তর্জাতিক প্রোপাগান্ডায় জঙ্গি উপাধি লাভ করে। ইসলামপন্থী সংগঠন জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের উপর কঠোর অত্যাচার চলে। তাদেরকে হত্যা, নির্যাতন, বাড়িঘর লুট, অগ্নিসংযোগ, কোন অপরাধ বলেই গণ্য হতো না।

পাঠ্য পুস্তকে সমকামিতা, ট্রান্স জেন্ডার প্রভৃতির উপস্থাপন নৈতিকতা হীনতার প্রবল স্রোত সৃষ্টি করে। সর্বশেষে পাঠ্য পুস্তক থেকে জ্ঞানচর্চার বিষয়গুলো উঠিয়ে দিয়ে মেধাহীন, পরনির্ভরশীল জাতি তৈরির অপপ্রয়াস চালানো হয়।

এই নৈরাজ্যের মধ্যে জেগে ওঠে জেন-জি। তারা সাহসী, প্রতিবাদমুখর। গড়ে ওঠে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন। জেগে ওঠে জনতা। ট্যাংক -লরির গুলি, আকাশ থেকে মর্টার সেল কোন কিছুই প্রতিবাদী জনতাকে থামাতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত স্বৈরাচারী তার জান নিয়ে পালায়। দুনিয়ার কোন দেশে এমন পালানো দৃশ্যমান নয়। স্বৈরাচারের দলীয় ক্যাডার, মন্ত্রিপরিষদ, মসজিদের খতিবসহ সবাই পলাতক। এমনকি অত্যাচারী পুলিশ এবং সেনা কর্মকর্তারা পর্যন্ত।

আমাদের চ্যালেঞ্জসমূহ

১. স্বৈরাচারের অনুগত প্রশাসন

দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে স্বৈরাচার তার অনুগত লোকদের দিয়ে প্রশাসন গড়ে নিয়েছে। শাসক পালালো। কিন্তু তার ছায়া সঙ্গীরা তো রয়ে গেল। যারা প্রশাসনের আনাচে-কানাচে শিকড় গেড়ে বসেছে। প্রতিটা পদে তারা জনগণকে অসহযোগিতা করছে।

২. পুলিশ ও সেনাবাহিনীর যে অংশ স্বেচ্ছায় জনতার উপর হামলা করে জীবন নিয়েছে তারাও এখনো বহাল তবীয়তে আছে। এটা মুক্তি কামী জনতার জন্য অশনি সংকেত।

৩. পুলিশ ও সেনাবাহিনীর যে অংশ খুন, গুম, হত্যা নির্যাতনে জড়িত ছিল তারাও এখনো জায়গামতোই আছে।

৪. স্বৈরাচারের সুবিধা ভোগী ও সহযোগী ব্যবসায়ী, আমলা, সামরিক কর্মকর্তা, পুলিশ কর্মকর্তা ইত্যাদি। তারা জুলাই যোদ্ধাদের গোপন শত্রু, মূর্তিমান আতঙ্ক। জুলাই যোদ্ধা ওসমান হাদীর হত্যাকারীকে এখন পর্যন্ত চিহ্নিত করা এবং ধরা সম্ভব হয়নি শুধু এই শ্রেণীর লোকদের কারণে।

৫. ওইসব বুদ্ধিজীবী, যারা তাদের বিবেককে স্বৈরাচারের কাছে বন্ধক দিয়েছে। তারা কিছুদিন চুপ থাকলেও এখন স্বৈরাচারের পক্ষে কথা বলা শুরু করেছে।

৬. স্বৈরাচারের প্রতি অন্ধ আবেগ সম্পন্ন বিবেকহীন ব্যক্তিবর্গ এবং অপরাধ জগতের বাসিন্দা যারা আইনশৃঙ্খলার অবনতিতে অবৈধ কাজের সুযোগ লাভ করে।

এরা হলো ফ্যাসাদ সৃষ্টিকারী। এদেরকে কঠোর হাতে দমন করা জরুরী।

৭. ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা র ও ইসরাইলী গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের এজেন্ট। ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে সব পর্যায়েই মিশে আছে।

শক্তিশালী বিশ্বস্ত গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এদেরকে চিহ্নিতকরণ এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার।

বিপ্লব কারা করেছে

১. ১০ থেকে ২৪ বছর বয়সী ছাত্রছাত্রী। এরা আবেগ এবং বিবেক তাড়িত। এদের নেতৃত্ব দিয়েছে ২৫ থেকে ৩২ বছর বয়সী যারা।

২. শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া মানুষ ।

৩. শিক্ষক, কর্মজীবী, পেশাজীবী, মাঝারি ব্যবসায়ী।

৪. ১০ থেকে ৫০ বছর বয়সী নারী।

৫. অনলাইন একটিভিস্ট, ইউটিউবার এবং বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশীরা। তাদের সমর্থন এবং প্রচারণা আগুনে ঘি ঢালার কাজ করেছে।

৬. বালক-বৃদ্ধ এবং সর্বস্তরের জনতা।

২৪ এর আন্দোলন সফল করার পিছনে ভাষাগত দক্ষতা অনেক কাজ দিয়েছে। শব্দ চয়ন, সময়োপযোগী ঘোষণা, জনগণের আবেগ বুঝে সফট এবং হার্ড কর্মসূচি গ্রহণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। প্রতিটি বিষয়ই এক একটি স্ফুলিঙ্গের কাজ করেছে। এতে মানুষের সক্ষমতার মাত্রাও অনেক বেড়েছে।

এ পর্যায়ে আমরা ইতিহাসের একটি ঘটনার দিকে নজর দিতে পারি। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনে তবুক অভিযান একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এতে কমুছ দুর্গ ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী। এ দুর্গ বিজয়ে বারবার চেষ্টার পর ব্যর্থ হয়ে একদিন রসূল সাঃ হযরত আলী রাযিআল্লাহু আনহুকে দায়িত্ব দেন। হযরত আলী (রা) আল্লাহু আকবার বলে যে লোহার গেটটা একাই ধরে ছুড়ে ফেলেছিলেন। যুদ্ধের পরে সেই গেট ৪০ ব্যক্তি মিলিতভাবে উঠানোর চেষ্টা করেও সফল হতে পারেননি। এটাই সত্যের পথে সংগ্রামীদের অলৌকিকত্ব।

এখন করণীয় কি : এখন আর যুদ্ধ নেই। আছে ব্যথা, বেদনা, ক্ষতের অনুভূতি, আছে নিজেদের চিন্তা চেতনার মতানৈক্য। তাই জুলাই যোদ্ধাদের মধ্যে এত বিভক্তি!

যে বিষয়গুলোর ঐক্যে আমরা সব পার্থক্য ভুলে এক হয়ে দাঁড়িয়েছি। সেগুলোকে সামনে আনতে হবে। আমরা চেয়েছি বৈষম্যহীন, ইনসাফ পূর্ণ সমাজ। দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি থাকবে না। ধর্মীয় লোকদের ওপর নিপীড়ন হবে না। কেউ কাউকে অপমান করবে না, ছোট করবে না। এক কথায় চাপমুক্ত পরিবেশে সবাই স্বাধীনভাবে চলতে পারবে। সুদ, ঘুষ, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন। এই চাওয়ার ভিত্তিতেই আমরা এক হয়েছিলাম। তাহলে এখন ভিন্নতা কেন?

ভিন্নতার কারণ:

১. সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি:

নিজের মতবাদ, চিন্তাকে বড় করে দেখা।জাতীয় ঐক্যকে ভুলে যাওয়া।

২. প্রলোভন:

স্বৈরাচারের পালিত বড় চাঁদাবাজ তো নেই। কাজেই ছোট চাঁদাবাজ হতে অসুবিধা কোথায়? অর্থাৎ অন্যের দেখাদেখি নিজেরও কিছু খারাপ অভ্যাস রপ্ত করা। এ যেন বনি ইসরাইল জাতির ইতিহাসকে মনে করিয়ে দেয়।

আল্লাহ তা’য়ালা মুজেজার মাধ্যমে তাদেরকে লোহিত সাগর শুকিয়ে পার করিয়েছিলেন। পাথর থেকে ঝর্ণা প্রবাহিত করে, আকাশ থেকে মান্না সালওয়া নাযিল করে তাদের খাদ্যের ব্যবস্থা করেছেন। মেঘমালার ছায়া দিয়েছেন। কিন্তু মূসা আলাইহিস সালাম যখন তুর পাহাড়ে গেলেন আল্লাহর ডাকে,তখন তারা বাছুর পূজা শুরু করে দিল। তারা দীর্ঘকাল ফেরাউন জাতির মধ্যে থেকে মূর্তি পূজা দেখেছিল ।এজন্য তাদের অন্তরেও মূর্তি পূজা শিকড় গেড়ে বসে। শেষ পর্যন্ত আল্লাহতালা তাদের উপর কঠোর নির্দেশ জারি করলেন,তোমরা তওবা করো এবং নিজেই নিজের গো পূজারী আত্মীয়কে হত্যা করো। (সূরা বাকারা-৫৪)।

নিজেদের সাথে লোভ লালসাকে দমন করতে না পারলে জুলাই বিপ্লব ব্যর্থ হতে বাধ্য। এই জন্য কঠোরভাবে এই লোভীদের তওবা করা উচিত।

৩. দুর্নীতিবাজ প্রশাসন:

ময়লা দিয়ে ময়লা দূর করা যায় না দুর্নীতি দূর করা জুলাই ঐক্যের দাবি। সে দুর্নীতিতে তো নিজেকে জড়ানো যাবে না। জুলাই ঐক্যের ছাত্র প্রতিনিধিরা প্রশাসনে যেয়ে সে মান রক্ষা করতে পারেননি। এখন তওবা করে নতুন করে শপথবদ্ধ হওয়া উচিত।

৪. প্রশাসনিক দুষ্ট চক্র:

প্রশাসনের সর্বস্তরে স্বৈরাচারী মন মানসিকতা ও সুবিধাবাদী শ্রেণী বিদ্যমান। তারা স্বৈরাচারকে ফিরিয়ে আনা ও অসৎ লোকদের বসানোর কাজ করে। নিজেদের আখের গোছানো এবং অতীতের কর্মকান্ডের শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য চেষ্টা করে ।প্রশাসনকে ঢেলে সাজানোর জন্য জুলাই বিপ্লবীদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। দুর্নীতির মূলোচ্ছেদের জন্য প্রয়োজন শাস্তি ও ক্ষমার ব্যবস্থা রাখা।

৫. গুম,খুন, হত্যাকাণ্ডের বিচার:

সকল প্রকার নাগরিক অধিকার হরণ করে স্বৈরাচার যে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল-তার আশু এবং ন্যায় সঙ্গত বিচার জনগণের প্রত্যাশা। একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এ বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। বিচারের দীর্ঘ সূত্রিতা বিচারহীনতারই নামান্তর।

৬. বিপ্লবীদের মূল্যায়ন না করা:

জুলাই বিপ্লবীদের যথাযথ সম্মান, মর্যাদা,চিকিৎসা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে। অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত বাংলার গৌরবময় স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

৭. অন্ধ আবেগ:

জনগণের একটা অংশ সর্বদা বিবেকহীন হয়ে স্বৈরাচারকে ফিরিয়ে আনার স্বপ্নে বিভোর। তারা সন্ত্রাসীদেরকে সাপোর্ট দেয় এবং আশ্রয় দেয়। এরা ফেতনা সৃষ্টির সহায়ক শক্তি।

পবিত্র কোরআনের ভাষায়-’ আল ফিতনাতু আসাদ্দু মিনাল ক্কাতলি।’-ফিতনা সৃষ্টি হত্যার চেয়েও মারাত্মক অপরাধ। এদেরকে কোন ক্রমেই ছাড় দেওয়া যাবে না। প্রয়োজনে সংশোধন কেন্দ্রে পাঠাতে হবে।

৮. বিপ্লবের সুযোগ সন্ধানী:

অনেকে ঘর পোড়া থেকে আলু পোড়ার স্বাদ নিতে চায়। এই সুবিধাবাদীর সংখ্যা কম নয়। এদের নৈতিক বোধ সৃষ্টির জন্য প্রশিক্ষণ দরকার।। ক্ষেত্র বিশেষে অনেকে ফেঁসেও যাবে।

৯. নারী বিপ্লবীদের মূল্যায়ন না করা:

এটা আমাদের জাতির দুর্ভাগ্য। মা এবং বোনের জাতকে আমরা যথাযথ মূল্যায়ন করি না। কিন্তু প্রয়োজনে তাদের ব্যবহার করি, উপকার নেই। আমাদের দুটো হাত রয়েছে। একটা একটু বেশি শক্তিশালী। আর একটা দুর্বল হলেও দুটো হাতই কাজের সময় প্রয়োজন হয়। সুতরাং নারী বিপ্লবীদের সম্মান, মর্যাদা, নিরাপত্তা প্রদান আমাদের বিপ্লবেরই অন্যতম দাবি।

বিপ্লব পরবর্তী করণীয়

এক. শান্তি ও স্থিতি প্রতিষ্ঠা

শান্তি ও স্থিতির জন্য সামাজিক নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা দরকার।’দুষ্টের দমন ও শিষ্টের লালন’-

কথাটা কাগজে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রয়োগ করতে হবে। নারী, শিশু, বৃদ্ধ, বিধবা, অসহায়, নির্যাতিত, প্রত্যেকের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে হবে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্যাতক নয়, অসহায়ের সহায়কে পরিণত করতে হবে।

এছাড়া তরুণদের মধ্য থেকে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গড়ে তুলতে হবে।

দুই. বিনিয়োগ বৃদ্ধি

দেশীয় শিল্পের বিকাশ, উদ্যোক্তা বৃদ্ধি এবং বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হবে। নতজানু নয়, সমতার ভিত্তিতে পররাষ্ট্র নীতি পরিচালনা করতে হবে।

তিন. কর্মসংস্থান সৃষ্টি

১৮ কোটি মানুষের ৩৬ কোটি হাত রয়েছে। এগুলোকে কর্মীর হাতে পরিণত করতে হবে। নারীদের পরিবারকে অবহেলা না করে তাদের উপযোগী কাজ এবং কর্মপরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।

চার. শিক্ষা ক্ষেত্রে পরিবর্তন

শতভাগ জনগণকে শিক্ষিত করার লক্ষ্যে প্রাথমিক শিক্ষা চালু করতে হবে। মসজিদ কেন্দ্রিক বয়স্ক এবং শিশু শিক্ষা অধিক ফল বয়ে আনতে পারে।

প্রাথমিক শিক্ষায় মাতৃভাষা শিক্ষার পাশাপাশি নিজের ইতিহাস ঐতিহ্য এবং স্রষ্টার সাথে সম্পর্কের জ্ঞান অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

পাঁচ. কৃষি খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদ কাজে লাগানো।

বাংলাদেশের প্রতি ইঞ্চি জমি আল্লাহর অপার দানে ভরপুর। প্রতিটি জমি উর্বরতায় সমৃদ্ধ। এতে উপযোগী ফসল ফলানো, খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান ও উত্তোলন এবং সামুদ্রিক সম্পদকে কাজে লাগিয়ে সমৃদ্ধ জনপদ গড়া সম্ভব।

শেষ কথা

দেশ স্বৈরাচারমুক্ত হয়েছে কিন্তু তার দোসরমুক্ত হয়নি। সব ধরনের ষড়যন্ত্র অব্যাহত গতিতেই চলছে। এর মোকাবেলায় ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তা এবং একতা দরকার। সাবধানতার বিকল্প নেই। জুলাই বিপ্লবীদের পরস্পরের মধ্যে অনাস্থা সৃষ্টি, কাদা ছোড়াছুড়ি আর দলাদলিতে শয়তান সবচেয়ে সক্রিয়। এই ফাঁদে পা না দিয়ে আমরা সবাই জাতি গঠনে এগিয়ে যাব। কারণ জাতির প্রত্যাশা পূরণে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ!