বাংলাদেশের ইতিহাসে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের অংশগ্রহণের নজির আমরা দেখতে পাই। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন, ’৯০ -এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ, ’২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে এ দেশের নারী সমাজের অংশগ্রহণ ছিল প্রশংসনীয়। বাঙালি নারীদের ঘর থেকে বের হয়ে রাজপথে নেমে দাবিদাওয়া, অধিকার আদায়ের পেছনে ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
বাঙালি নারীরা নারী নির্যাতন বিরোধী আন্দোলন, ইভটিজিং বিরোধী আন্দোলন, এসিড নিক্ষেপের বিরুদ্ধে আন্দোলনে বারংবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সমান শিক্ষার অধিকার, সমান চাকরির অধিকার, সমান বেতন, খাদ্যের অধিকার নিয়েও নারীদের সোচ্চার দেখা যায়।
’২৪-এর গণআন্দোলনে শিক্ষার্থী, গৃহিনী, ডাক্তার, ব্যাংকার, গার্মেন্টস কর্মীসহ বিভিন্ন পেশার নারীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করে স্বৈরাচার হাসিনাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করে। গঠিত হয় কিছু নতুন রাজনৈতিক দল। নতুন দলগুলোয় নারীদের অংশগ্রহণ থাকলেও তার পরিমাণ খুবই সামান্য। এই অল্প সংখ্যক নারীর মধ্য থেকে আবার অর্ধেকের কম নেতৃত্বের পর্যায়ে এসেছে।
একে একে চারটি স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ছাত্রীদের উৎসাহিত করার জন্য বেশ কিছু সংরক্ষিত আসন রাখার পরেও সেখানেও নারীদের অংশগ্রহণ কম ছিল।
আমরা প্রতি বছরই দেখি সংসদে সংরক্ষিত আসন থাকার পরেও উক্ত আসনে নারী প্রতিনিধি খুঁজে বের করতে বেগ পেতে হয়। প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, রাজনৈতিক দলের প্রধান নারী থাকলেও এটি তৃণমূল পর্যন্ত নারীদের মাঝে প্রভাব ফেলতে পারে নি। এর অন্যতম কারণ রাজনীতিতে পরিবার প্রথা। দেখা যায় যে পরিবারে কেউ রাজনীতির সাথে জড়িত বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাদের ছেলে মেয়ে উত্তরাধিকার সূত্রে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করে।
বাংলাদেশের একটি কালচার খুব করে প্রতিষ্ঠিত। “তুমি মেয়ে মানুষ। পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে তোমার মতামত দেয়ার প্রয়োজন নেই। তুমি এসবের কী বুঝবে?” নারীদের যেখানে খুব সুক্ষ্মভাবে পরিবারের সিদ্ধান্ত থেকে দূরে রাখা হয় সেখানে তারা অবচেতন মনেই দেশ সম্পর্কে ভাবা থেকে দুরে থাকে।
আমাদের দেশে কোনো নারী যদি কর্মজীবী হয় তবুও তাকে বাইরের কাজের পাশাপাশি পরিবারের সকল দায়িত্ব পালন করতে হয়। স্বামীদের ঘরের কাজে সাহায্য করতে তেমন দেখা যায় না। চাকরি করা থেকে রাজনৈতিক জীবন আরও চ্যালেঞ্জিং। পরিবারের পূর্ণাঙ্গ সমর্থন না থাকলে এটি করা কষ্টসাধ্য হয়ে যায়। পরিবার, ব্যক্তিজীবনের পাশাপাশি দেশকে নিয়ে ভাবা তাই অনেক সময় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশ একটি কৃষি প্রধান দেশ। এদেশে নারীরাও কৃষি কাজ করে সমান তালে। কৃষকেরা মধ্যস্ত ব্যবসায়ীর জন্য বছরের পর বছর শোষিত হচ্ছে। যেখানে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাথমিক চাহিদা পূরণ করা যায় না সেখানে রাজনৈতিক অঙ্গণে ভূমিকা রাখা বিলাসিতা।
বাংলাদেশের নারীরা সব থেকে বেশি কাজ করে গার্মেন্টস সেক্টর এবং ইট ভাটায়। এ সেক্টরগুলোয় নারীদের ক্ষুদ্র গণ্ডিতে রাখা হয়। শ্রমের তুলনায় তাদের অতি নগন্য পারিশ্রমিক দেয়া হয়। এতে করে তারা দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে খুব বেশি অবদান রাখতে পারে না।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের কেবল শুধু গদবাধা মুখস্ত করা শেখায়। নিজ থেকে চিন্তা করার, নিজেকে নিয়ে ভাবার, নিজের অধিকার নিয়ে ভাবার, দেশ নিয়ে ভাবার জন্য যা প্রয়োজন সেগুলো পাঠ্যবইতে কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শেখানো হয় না। বরং একপ্রকার এসবের পেছনে সময় দিতে অনুৎসাহিত করা হয়।
গ্রাম এবং শহরের নারীদের মধ্যে আমরা বেশ কিছু বৈষম্য দেখতে পাই। শিক্ষা, অধিকার, বাক স্বাধীনতা, মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা থেকে গ্রামের নারীরা তুলনামূলক বঞ্চিত। জীবন মানকে সহজ করার জন্য নানান সুযোগ সুবিধা শহরের নারীরা বেশি পায়। এজন্য তৃণমূলের নারীদের বিশেষত গ্রাম বাংলার নারীদের রাজনীতি নিয়ে, দেশ নিয়ে ভাবার পরিবেশ তুলনামূলক কম তৈরি হয়।
বাংলাদেশে নারীদের সম্পদের তুলনায় ভোগ্যপণ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এর পাশাপাশি আছে চরিত্র হনন। কোনো নারী যখন সামনে আসে কোনো কাজ করার জন্য তাকে প্রতিনিয়ত চরিত্র হননের শিকার হতে হয়। বিভিন্ন ভাবে অপদস্ত করা হয়। সে যেই সেক্টরেই থাকুক না কেনো। রাজনীতিতে নারীদের না আসা এটিও গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণ।
আমাদের দেশে যারা নারী অধিকার নিয়ে কাজ করে তারা বেশিরভাগই সেকুলার চিন্তা চেতনার হয়ে থাকে। দেখা যায় তারা নারীর যেসব অধিকার কিংবা সংস্কার নিয়ে কথা বলে, কাজ করে যা অধিকাংশ নারীর চিন্তার সাথে যায় না। নারী সংস্কার কমিশন এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হতে পারে। সেকুলার নারীরা নারীর অধিকারকে নিজেদের মধ্যে কুক্ষিগত করে রাখায় তাদের বিরুদ্ধ মতের নারীরা তেমন কাজ করতে পারছে না।
এত সব বাধা পেরিয়ে নারীরা লেখক বা চিন্তক হয়ে উঠতে পারছে না। এসকল বাধা অতিক্রম করার জন্য রাষ্ট্রের ভূমিকা রাখা প্রয়োজন।
এত সংকট থাকার পরেও আমাদের জীবনে আশা যোগায় জুলাই আন্দোলনের পর গঠিত হওয়া রাজনৈতিক দল এবং ছাত্রসংসদগুলো। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যারাই বিজয়ী হয়ে আসুক না কেনো একটি নারীবান্ধব দেশ গঠনে তারা ভূমিকা রাখবে এটাই আমাদের চাওয়া।