২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের জাতীয় বাজেট ছিল ৭ লক্ষ ৯৭ হাজার কোটি টাকা, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১৪.২০ শতাংশ। এতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ৫ লক্ষ ৪১ হাজার কোটি টাকা, অর্থাৎ জিডিপি ৯.৭০ শতাংশ। বাজেট ঘাটতির পরিমাণ ছিল ২ লক্ষ ৫৬ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপি ৪.৬০ শতাংশ। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লক্ষ ৬০ হাজার ৯০০ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে ৯৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এখানে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ছিল ৬.৭৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফিতির হার ছিল ৬.৫০ শতাংশ।
এর আগের অর্থবছর, অর্থাৎ ২০২৩-২৪ সালে জাতীয় বাজেটের আকার ছিল ৭ লক্ষ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা। সে বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ লক্ষ কোটি টাকা এবং বাজেট ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় ২ লক্ষ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৫.২০ শতাংশ। ওই অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লক্ষ ৫৫ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লক্ষ ৬ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। তখন জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধরা হয় ৭.৫০ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতির হার ছিল প্রায় ৬.০০ শতাংশ।
এই সামষ্টিক অর্থনৈতিক চিত্রের পেছনে লুকিয়ে থাকা কাঠামোগত দুর্বলতা ও শাসনসংকটের একটি বিস্তৃত ও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে প্রণীত শ্বেতপত্র কমিটির প্রতিবেদনে। ৩০ অধ্যায় ও প্রায় ৪০০ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনার শাসনামলের ১৫ বছরে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থ পাচার হয়েছে, যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় ২৮ লক্ষ কোটি টাকার সমপরিমাণ। এই অঙ্কটি গত ৫ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের সম্মিলিত আকারের চেয়েও বেশি। গড় হিসাবে প্রতিবছর প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার বা ১ লক্ষ ৮০ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, আলোচ্য সময়ে সবচেয়ে দুর্নীতি হয়েছে-ব্যাংকিং খাত, বিদ্যুৎ-জ্বালানি, উন্নয়ন প্রকল্প, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য খাতে। ২৯টি প্রকল্পের মধ্যে ৭টি বড় প্রকল্প পরীক্ষায় দেখা গেছে, প্রতিটিতে অতিরিক্ত ব্যয় ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি। ব্যয়ের প্রয়োজনীয়তা বিশ্লেষণ না করেই প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ৭০ শতাংশ বাড়ানো হয়। ফলে ২৯ টি প্রকল্পে মোট অতিরিক্ত ব্যয় হয় ৮৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তিনি আরো বলেন, প্রকল্প সমূহে প্রাথমিক ব্যয় ৭০ শতাংশ বাড়িয়ে চূড়ান্ত ব্যয় নির্ধারণ করা হয়। বিগত ১৫ বছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ৭ লক্ষ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে, যার প্রায় ৪০ শতাংশ অর্থ আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতির মাধ্যমে লুটপাট হয়েছে। এ সময়ে কর অব্যাহতির পরিমাণ ছিল দেশের মোট জিডিপির ৬ শতাংশ। এটি অর্ধেকে নামিয়ে আনা গেলে শিক্ষা বাজেট দ্বিগুণ এবং স্বাস্থ্য বাজেট তিনগুণ করা যেত। তাছাড়া বিদ্যুৎ উন্নয়নে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের বিপরীতে কমপক্ষে ৩ বিলিয়ন ডলার (৩০০ কোটি টাকা ) অবৈধ লেনদেন হয়। শুধুমাত্র রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে প্রায় ৬০ হাজার কোটি আত্নসাৎ ও অবৈধভাবে বিদেশে পাচার করেছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবার।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা যখন ক্ষমতা গ্রহণ করেন, তখন সরকারের ঋণ স্থিতি ছিল মাত্র ২ লক্ষ ৭৬ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। অন্যদিকে শেখ হাসিনা যখন দেশ থেকে পালায় তখন ঋণের স্থিতি ছিল ১৮ লক্ষ ৩৫ হাজার কোটি টাকা অর্থাৎ বিগত ১৫ বছর ঋণ বেড়েছে ১৫ লক্ষ ৫৮ হাজার ২০৬ কোটি টাকা যা মোট ঋণের ৮৫ শতাংশ। সিপিডির রিপোর্ট অনুযায়ী, বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে দেশের আর্থিক খাতে লুটপাট হওয়া ১১০টি বিশেষ ইস্যু নিয়ে তদন্ত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক ও আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা (বিএফআইইউ)। এসব ইস্যুর সাথে জড়িত অন্তত ৩৪৩ জন প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী। রিপোর্ট অনুযায়ী, ৫ আগস্ট থেকে অক্টোবর ২০২৪ পর্যন্ত তাদের হিসাবের ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা আটকানো সম্ভব হয়েছে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থার সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০০৮ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত এই ১৫ বছরে দেশের ব্যাংক খাত থেকে ছোট বড় অন্তত ২৪ টি অনিয়মের মাধ্যমে ৯২ হাজার ২৬১ কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে। অনিয়মএর মাধ্যমে বের করে নেয়া এই অর্থ ২০২৩-২০২৪ অর্থবছর বাজেটের ১২ শতাংশ বেশি। অথচ এইঅর্থে অনায়াসে বাজেট ঘাটতি মেটানো সম্ভব হতো। সিপিডি তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালে এস আলম গ্রুপের ৩০ হাজার কোটি টাকার ঋণ অনিয়মের ঘটনা ঘটে। রহমান এন্ড রাজিব, জানুয়ারি, ২০২৫ রিপোর্ট অনুযায়ী, এস আলম গ্রুপ ১০টি ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান হতে ২.২৫ ট্রিলিয়ন অর্থাৎ ২ লক্ষ ২৫ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। এক্সিম ব্যাংক-এর সাবেক চেয়ারম্যান জনাব নজরুল ইসলাম মজুমদার, ২৭ টি ব্যাংক হতে ৯৫০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। শেখ হাসিনা সরকারের আরেক প্রভাবশালী ব্যক্তি সালমান এফ রহমান বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান হতে ৫৭ হাজার কোটি টাকার আত্মসাৎ করেছে এর মধ্যে ৭ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে শেয়ার বাজার থেকে। তাছাড়া যুবক, ডেসটিনি, ইউনিপে-এর মতো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়েছে। ২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি হয়েছে। ২০১১ সালে সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক কেলেঙ্কারির মাধ্যমে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়। ২০১১-১২ সালে বেসিক ব্যাংকে ৪৫০০ কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতি হয়। আর এই লুটপাটে জড়িত ছিলেন বেসিক ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান আব্দুল হাই ওরফে বাচ্চু। ২০১০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত জনতা ব্যাংকে ঘটে ১০ হাজার কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতির ঘটনা। আর এসব কেলেঙ্কারির সাথে জড়িত ছিল ক্রিসেন্ট ও অ্যাননট্যাক্স গ্রুপ। ২০২১ সালে গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের প্রশান্ত কুমার (পিকে) হালদারের ১১ হাজার কোটি টাকার ঋণে অনিয়ম ঘটে। এসব দুর্নীতি ও লুটপাটের একটিরও দৃষ্টান্তমূলক বিচার হয়নি। এসব ঋণ আদায় ও পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা ও জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ভূমিকা অপ্রতুল। বরং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষ। ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের টাস্কফোর্স রিপোর্ট অনুযায়ী, শেখ হাসিনার আমলে অন্তত ২৩৪ কোটি মার্কিন ডলার দুর্নীতির মাধ্যমে বিদেশে পাচার হয়েছে, আর তারবোঝা বইতে হয়েছে জনগণকে।
বর্তমানে পাঁচটি দুর্বল ব্যাংক (ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন, এক্সিম ও সোশ্যাল ইসলামিক ব্যাংক) একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’ গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে । বিআরপিডি সার্কুলার নং-১২ তারিখ ৯ ডিসেম্বর ২০২৫-এ বলা হয়, ব্যাংকিং খাতে বর্তমান পরিস্থিতি এবং আর্থিক সক্ষমতা পর্যালোচনা accrued ev unrealized আয়ের ভিত্তিতে প্রণোধনা বা বোনাস প্রদান করা ব্যাংকের আর্থিক সুশাসন এবং সুদক্ষ ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। Provision shortfall রেখে, শ্রেণীকৃত/অবলোপনকৃত ঋণ আদায় অগ্রগতি ব্যতিরেকে Retailed earnings থেকে কোন প্রকার উৎসব বোনাস প্রদান করা যাবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক সার্কুলার আর্থিক শৃঙ্খলা ফেরানোর একটি প্রাথমিক উদ্যোগ। তবে অতীতের অনিয়মের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, দায়নির্ধারণ ও আইনি ব্যবস্থা ছাড়া শুধু প্রশাসনিক নির্দেশনার মাধ্যমে আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
তবে এসব সার্কুলার বিবেচনা করার আগে বাংলাদেশ ব্যাংক বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে আলোচিত ঋণজালিয়াতি সম্পর্কে সুস্পষ্ট নির্দেশনা, পরিকল্পনা ও সার্বিক সহযোগিতা থাকা জরুরি। যেহেতু এসব অনিয়ম রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে করা হয়েছে বলে রাষ্ট্র বা বাংলাদেশ ব্যাংক এসবের দায় এড়াতে পারেনা। শুধু এসব অজুহাতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সুযোগ-সুবিধা কর্তন করা অনুচিত বটে। তবে কোন কর্মকর্তা/কর্মচারী এসব অনিয়মের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত বলে প্রমাণ পাওয়া যায় তাদেরকে অবশ্যই শাস্তির আওতায় আনতে হবে। ব্যাংকিং খাত বর্তমানে গভীর সংকটে রয়েছে।
রাজনৈতিক প্রভাব ও ব্যাপক খেলাপি ঋণের কারণে এই খাতে তারল্য সংকট তৈরি হয়েছে, যা জনগণের আস্থা নষ্ট করেছে। তাই সবার আগে ব্যাংকগুলোর উচিত সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং নিজেদের প্রকৃত আর্থিক অবস্থার ভিত্তিতে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার পরিকল্পনা করা। দীর্ঘদিন ধরে অনেক ব্যাংক পরিচালক তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার করে বারবার ঋণ পুনঃতফসিল করেছেন, যাতে তারা খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত না হন। এ অবস্থা বন্ধ করতে পরিচালকদের ক্ষমতা সীমিত করা জরুরি।
এস. আলম পরিবার ব্যাংকিং খাতে পারিবারিক নিয়ন্ত্রণের একটি বড় উদাহরণ। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক ও তৎকালীন সরকারের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। আইন সংশোধনের মাধ্যমে একটি পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক পরিচালনায় আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, যা অযৌক্তিক। ভবিষ্যতে এমন পারিবারিকীকরণ ঠেকাতে আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে এবং পরিচালকদের মেয়াদ সীমিত করতে হবে। হাসিনা সরকারের সময় ব্যাংকগুলোর এই সংকট সবার জানা থাকলেও রাষ্ট্র তা রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকার পরিচালনা পর্ষদ পরিবর্তন করছে, যা ভালো উদ্যোগ হলেও যথেষ্ট নয়। সংকট কাটাতে ব্যাংক একীভূতকরণের পাশাপাশি মূলধন জোগানসহ আরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে এবং যারা এই সংকট সৃষ্টিতে জড়িত ছিলেন, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
ব্যাংকিং বা আর্থিক খাতে দুর্বল তদারকি, রাজনৈতিক প্রভাব এবং সুস্পষ্ট আইনগত কাঠামোর অভাবে এই খাতের স্থিতিশীলতা ও আমানতকারীদের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা থাকলেও তা এখনো যথেষ্ট কার্যকর নয়; ব্যাংকিংয়ের বিশেষ বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী কঠোর ও ধারাবাহিক নিয়ন্ত্রণ জরুরি হয়ে উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের ইসলামী ব্যাংক কোম্পানি আইন খসড়া একটি আশাব্যঞ্জক উদ্যোগ হলেও, এর দ্রুত ও কার্যকর বাস্তবায়ন ছাড়া সংকট কাটানো কঠিন। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো-রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হস্তক্ষেপ ব্যাংকগুলোর স্বাভাবিক ব্যবস্থাপনাকে বাধাগ্রস্ত করছে, যার ফলে তারল্য সংকট ও আস্থার অবনতি ঘটছে। পাশাপাশি দক্ষ ও নৈতিক মানবসম্পদের অভাব এই সংকটকে আরও গভীর করছে। তবুও ব্যাংকগুলো এখনো টিকে আছে মূলত আমানতকারীদের আস্থার ওপর ভর করে। এই আস্থা যদি ক্ষুন্ন হয়, তবে এর প্রভাব হবে মারাত্মক। তাই অবিলম্বে শক্ত আইনগত কাঠামো, জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতকে রক্ষা করা এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি। দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের মূল ভিত্তি হলো একটি শক্তিশালী ও সুশাসিত আর্থিক খাত। দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক খাত নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, খেলাপি ঋণ ও অর্থপাচারের ভারে জর্জরিত। এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, বিনিয়োগ পরিবেশ ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর। এই প্রেক্ষাপটে আর্থিক খাত সংস্কার এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি। আর্থিক খাত সংস্কারের প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো স্বাধীন ও কার্যকর কেন্দ্রীয় ব্যাংক। রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপের ফলে অনেকক্ষেত্রে ঋণবিতরণে স্বচ্ছতা নষ্ট হয়েছে, যা খেলাপি ঋণবৃদ্ধির অন্যতম কারণ। ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং ঋণ পুনঃতফসিল ও মওকুফের সংস্কৃতি বন্ধ করা জরুরি। ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদে দক্ষ, সৎ ও পেশাদার ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে দুর্বল ও সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোকে একীভূতকরণ বা পুনর্গঠনের মাধ্যমে খাতকে সুসংহত করা প্রয়োজন। টেকসই অর্থনীতি গড়তে হলে কেবল অবকাঠামো উন্নয়ন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন উৎপাদনমুখী ও কর্মসংস্থানভিত্তিক প্রবৃদ্ধি। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, কৃষি এবং উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে অর্থায়নের ব্যবস্থা করলে অর্থনীতি আরও গতিশীল হবে। পাশাপাশি কর ব্যবস্থায় ন্যায্যতা ও কর জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি না হলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। অর্থপাচার দেশের অর্থনীতির জন্য এক ভয়াবহ হুমকি। পাচার হওয়া অর্থ দেশের বিনিয়োগও উন্নয়ন থেকে ছিটকে পড়ে বিদেশে চলে যাচ্ছে। তাই মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, সন্দেহজনক লেনদেন নজরদারি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগ জোরদার করতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, আর্থিক খাত সংস্কার কোনো একক সিদ্ধান্তে সম্ভব নয়। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া, যেখানে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং নাগরিক সচেতনতা। সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে না পারলে এর বোঝা বহন করতে হবে আগামী প্রজন্মকেই।