আগামী ১২ ফেরুয়ারি বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এখানে যেমন তিনশো আসনের পার্লামেন্ট মেম্বার নির্বাচিত হবে তেমনি হ্যাঁ কিংবা না ভোটের মাধ্যমে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পরিণতি নির্ধারিত হবে। এই প্রেক্ষাপটে জুলাই বিপ্লবের পরিণতির বিষয়টিও ব্যাপকভাবে গুরুত্ববহ। কেননা চব্বিশের জুলাই মানে নতুন এক ইতিহাস। প্রতিবাদ, আত্মত্যাগ আর ছাত্রজনতার বিজয়ের প্রতীক। ৩১ জুলাইয়ের ক্যালেন্ডারে ৩৬ জুলাই পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে নতুন তারিখ। ৩২ থেকে ৩৬ জুলাই শুধুমাত্র একটি নতুন তারিখের বালখিল্যতা ছিলো না, বরং এটি ছিলো আন্দোলনের একটি জেদি র্টানিং ডেট। আন্দোলনের শক্ত হাতে হাল ধরে বিজয়ে হাওয়ায় পাল উড়িয়ে দেবার ইস্পাত কঠিন সিদ্ধান্ত। এই স্রোত অন্যায়ের বিরুদ্ধে। সাম্য আর অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে। অস্ত্র ছিল না, ছিল সাহস; বিপ্লবী চেতনা আর ন্যায্যতার স্বপ্ন। এই জুলাই ছিল বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে আরেকটি কালো অধ্যায় মুছে ফেলার এক সংগ্রামী ঝড়। ন্যায্য অধিকার আদায়ের এক বজ্্রকঠিন আন্দোলন। বৈষম্যহীন ও সমতাভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যাশিত প্রতিশ্রুতি। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের খরস্রোতা ঢেউয়ে সর্বশ্রেণির গণমানুষের মুক্তির উচ্ছাসে এক কালবৈশাখী তাণ্ডব। জগদ্দল পাথরকে ভেঙে গুড়িয়ে দিয়ে নতুন স্বপ্নের সুখি বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে যাবার সাহসী তাণ্ডব। বৈরি বাতাসে লাগাম টানতে গিয়ে তাইতো শিক্ষার্থীদের কোমল আত্মার সাথে প্রাণ বিসর্জন দিতে হলো হাজারো মুক্তিকামী স্বপ্নবাজ মানুষকে। একটি বছর পেরিয়ে আজ পর্যালোচনার বিষয়, ইতিহাসের এই অধ্যায়ে কী পেয়েছে বাংলাদেশ, কতটা সফল হয়েছে বিপ্লবীরা!

ফ্যাসিবাদী দমননীতির বিরুদ্ধে রাজপথে এক কাতারে দাঁড়িয়েছিলো শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও শ্রমজীবী সর্বশ্রেণির মানুষ। শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সেই গণআন্দোলন শুধু কোটা সংস্কারের দাবিতে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ছিল দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, অবিচার, বৈষম্য ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে একটি সাহসী জাতির সম্মিলিত প্রতিরোধ। এই আন্দোলন ছিল তরুণ প্রজন্মের জাগরণ। যেখানে তারা চেয়েছিল জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা, ন্যায়বিচার, মর্যাদাপূর্ণ নাগরিক অধিকার এবং একটি মানবিক রাষ্ট্র। দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমেছিল, শুধুমাত্র বিবেকের তাড়নায়। কোনো রাজনৈতিক দলের নির্দেশে নয় বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করতেই তারা পথে দাঁড়িয়েছিল। এই আন্দোলনে অনেকেই রক্ত দিয়েছেন, হারিয়েছেন প্রিয়জন, কেউ পঙ্গু হয়েছেন, কেউ এখনো হাসপাতালের বিছানায়। এসব ত্যাগ শুধু ব্যক্তিগত নয়, একটি প্রজন্মের সম্মিলিত আত্মদানের প্রতিচ্ছবি। তারা থেমে যায়নি, ভয়ে পিছু হটেনি। বরং তারা প্রমাণ করেছে, যখন অধিকার হরণ হয়, তখনই প্রতিবাদের জন্ম হয়।

জুলাইয়ের সেই অগ্নিঝরা সময়ে কাটানো হয়েছে কত নির্ঘুম রাত। সকালের শুভ্রতার সাথেই আন্দোলনে অংশগ্রহণের দৃঢ়চেতা মনোবল। প্রবল সাহসিকতা, বীরত্ব আর তীব্র প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের এক উত্তাল ঢেউ। আবু সাঈদের প্রসারিত দুই বাহু ছড়িয়ে পড়েছে বিপ্লবীদের শরীরে। ‘ভাই, পানি লাগবে পানি’ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের প্রেমময়ী আত্মত্যাগী আহ্বান আবর্তিত হয়েছে বাংলাদেশের প্রতিটি জনপদে। তাইতো অগ্নিঝরা প্রতিরোধের কণ্ঠস্বর- ‘ জেগেছে রে জেগেছে ছাত্রসমাজ জেগেছে, লেগেছে রে লেগেছে, রক্তে আগুন লেগেছে!’

এ কথা সত্য যে, বৈষম্যবিরোধী বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সর্বশ্রেণি-পেশার মানুষের জনগণের অংশগ্রহণের ফলেই সফল হয়েছে জুলাই বিপ্লবে। এ বিপ্লবে যেসব পিতা-মাতা তাদের সন্তান হারিয়েছেন, তারা এখনো আশায় বুক বেঁধে আছেন বৈষম্যহীন ন্যায্যতার নতুন এক বাংলাদেশের প্রত্যাশায়। কিন্তু জুলাই বিপ্লবে সমর্থন দিয়ে মাঠে থাকা রাজনৈতিক দলগুলো এখন স্বার্থের জালে আটকা পড়ে নিজেদের মধ্যে বিভেদে লিপ্ত। এমনকি যারা জুলাই বিপ্লবের সামনে বা আড়াল থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তারাও এখন নিজেদের মধ্যে সাফল্যের কৃতিত্ব ভাগাভাগি নিয়ে ব্যস্ত। অথচ এখনো জুলাই গণহত্যার বিচার হয়নি! খুন, ধর্ষণ কিংবা চাঁদাবাজিসহ পেশি শক্তির বড়াই থামেনি। ফিরে আসেনি ন্যায্যতা, বাস্তবায়ন হয়নি জুলাইয়ের স্বপ্নসনদ।

সংগ্রামীরা জুলাইকে বিপ্লব হিসেবে নিয়েছিলাম। ফলে আমাদের প্রত্যাশার ব্যারোমিটার অনেক উঁচুতে। বিপ্লবের কাছে অনেক বড় চাওয়া থাকে। প্রতিষ্ঠিত হয় বিপ্লবী সরকার। বিপ্লবের পর সমাজ থেকে শুরু করে বহু জায়গার খোলনলচেই পাল্টে যায়। সংবিধানের বাধ্যবাধকতা থাকে না। কার্যকারিতার তালিকায় থাকে ‘যেখানেই সংকট, সেখানেই পরিবর্তন।’ ‘যেখানেই বৈরিতা, সেখানেই নতুন আইন।’ কিন্তু তা হয়নি। জুলাইকে গস্খহণ করা হয়েছে গণঅভ্যুত্থান হিসেবে। ফলে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার মধ্যে এগিয়ে যেতে হচ্ছে। ইচ্ছে করলেই সংগ্রামীদের প্রত্যাশা বাস্তবায়ন সম্ভব করতে পারছেন না কতৃপক্ষ।

সংস্কার, বিচার এবং জননিরাপত্তার বিষয়টি এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি। না পেরেছে সংগ্রামীরা। না পেরেছে ইন্টেরিম গভর্নমেন্ট। রাজনৈতিক দলগুলো এ বিষয়ে কতটা সহযোগিতা করছে সেটাও বিবেচ্য বিষয় হিসেবে গ্রহণ করতেই হবে। ক্ষমতার দোলাচালে তারাও পার পেতে চাচ্ছেন যেনোভাবে। ফলে নির্বাচন হয়ে উঠেছে মূখ্য বিষয়। আন্দোলনে যারা নেমেছে, তাদের প্রত্যেকেরই তো রাজনৈতিক এজেন্ডা ছিল। সেসব এজেন্ডা যে বের হয়ে আসছে, এটা খুবই স্বাভাবিক। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় যারা ক্ষমতায় আসতে চায়, তাদের কথা বাদই দিলাম; যারা গণতন্ত্রকে পছন্দ করে না, তারাও এখন কথা বলতে শুরু করেছে। তারাও এখন গণতন্ত্রের নামে নির্বাচন ইস্যুকেই প্রধান বিষয় হিসেবে দেখছেন।

এই বিপ্লবকে ঘিরে প্রায় দুই হাজারের বেশি মতো মামলা হয়েছে। জীবন দিয়েছে প্রায় দুই হাজার মানুষ। জাতিসংঘের রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। অথচ বিচারিক প্রক্রিয়ার কোনো উন্নতি এখনো খুব বেশি দৃশ্যমান হয়নি। আন্দোলনে অসংখ্য শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন।

এ ছাড়াও একটি বড় অংশ আছেন রিকশাওয়ালা, পোশাককর্মীসহ নানা শ্রেণিপেশার খেটেখাওয়া মানুষ। তাদের অনেকেই সঠিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তাদের অনেকেই এখনো ট্রমায় ভুগছেন। অথচ তাঁদের সকলের দায়িত্ব নিয়ে তেমন কেউ কাজ করছেন না। অণ্যদিকে ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচার বাহ্যিকভাবে সরে গেলেও তাদের অনুসারী প্রেত্মারা এখনো সজাগ। তারা বিভিন্ন দলে ঢুকে পড়ছে। নতুন দলের মিটিংয়ে বক্তব্য শেষে পুরোনো শ্লোগান এখনো উচ্চারণ করেন অজান্তেই। ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচারের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত থেকে অন্যায়কারী সকল ব্যক্তির বিচারের ব্যবস্থা ত্বরান্বিত করা দরকার।

প্রথমত, আমাদের নতুন প্রজন্ম একটি বিপ্লব সংগঠিত করেছে। আমরাও সাথে ছিলাম। পরবর্তীতে এখানে অনেক ভুলত্রুটি এবং নৈতিক বিচ্যুতিও ঘটেছে। কেউ কেউ অনৈতিকভাবে ফায়দা লোটার চেষ্টাও করেছেন। এতো কিছুর পরেও, অন্তত সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের যে মানসিক উত্তরণ ঘটেছে সেটাও কম অর্জন নয়। মানসিক বিপ্লবটি ছিল সবচেয়ে বড় অর্জন। মানুষ বুঝতে শিখেছে যে পরিবর্তন সম্ভব। শুধু দরকার সংগঠিত শক্তি, সৎ নেতৃত্ব আর অটল মনোবল। নির্যাতিত জনগণের মুখে ফিরে এসেছে প্রতিবাদের ভাষা। ফ্যাসিবাদের পতন একটি বড় সফলতা। এটি অনেক বড় ব্যাপার। এখন আমরা ক্রমাগত যতগুলো ভালো নির্বাচন করে যেতে পারি, ততই আমাদের গণতন্ত্র পরিগঠিত হতে থাকবে। এখন প্রয়োজন ঐকমত্য। এখন প্রয়োজন দেশ গড়ার সুদৃঢ় সংকল্প। তরুণ প্রজন্ম রাজনীতির প্রতি আগ্রহী হয়েছে, দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে। এটি ছিল একটি চেতনার জাগরণ। এই ইতিবাচক দৃষ্টিভংগিকে পরিকল্পিত উপায়ে উত্তম খাতে প্রবাহিত করার সময় এখনো শেষ হয়ে যায়নি। এর জন্য রাজনৈতিক দলসহ দেশপ্রেমিক সকল নাগরিকে সচেতনতা দরকার, দরকার উন্নত পরিকল্পনার ভিত্তিতে কর্মপন্থা নির্ণয় করা।

দ্বিতীয়ত, জুলাই বিপ্লবের পরে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের মতো নেতৃত্ব আবশ্যিক ছিল। আন্তর্জাতিক এবং সে সময়ের অভ্যন্তরীণ গ্রহণযোগ্যতা তাঁকে ছাড়া সম্ভব হতো না। তবে গণঅভ্যুত্থানের সরকার হবার কারণে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতায় আটকে গেছেন তারাও। ফলে ফ্যাসিবাদী স্বার্থ আদায়ে নানামুখি নাটক প্রতিরোধ করা গেলেও সমূলে উৎপাটন করা যায়নি। তবে আশার দিক হচ্ছে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার এইসব প্রক্রিয়া শুরু করেছে। ইতোমধ্যে গঠিত হয়েছে এনসিপিসহ নতুন কয়েকটি রাজনৈতিক দল, যারা রাজনীতির ভাষা ও চরিত্র বদলে দেওয়ার অঙ্গীকার নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি, গণঅভ্যুত্থান সফল করার পর দু’চারটি পদস্খলন ছাড়া এখন পর্যন্ত প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছে রাজনৈতিক দল। গণতন্ত্রের সৌন্দর্যই হলো ভিন্নমতের সহাবস্থান। কেউ সংস্কারের পক্ষে, কেউ বিপক্ষে- এটাই স্বাভাবিক। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কখনোই দমনীয় নয়। আর সেই সত্য মেনেই ভবিষ্যতের পথে এগোতে হবে। আমরা আর কখনো চাই না, কেউ গুম হোক, রাজপথে গুলিবিদ্ধ হোক, কিংবা ভিন্নমতের অপরাধে ভীতসন্ত্রস্ত জীবন যাপন করুক।

তৃতীয়ত, গণতন্ত্রের প্রথম ধাপ নির্বাচন। সেই প্রতিষ্ঠানটিকে নষ্ট করেছিলো পতিত স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদীরা। ক্ষমতা রক্ষার জন্য গুম, খুন, আয়নাঘর, হামলা, মামলা এবং সর্বোপরি সকলের মুখে তালা ঝুলিয়ে কথা বলার অধিকারটুকুও খর্ব করা হয়েছিলো। এখন অন্তত কথা বলা শিখেছে এদেশের মানুষ। প্রতিবাদের ভাষা পেয়েছে, সাহস পেয়েছে। যে কোনো অপকর্ম সচিত্রভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছেড়ে দেবার মতো বুকের বল তৈরি হয়েছে। ক্ষমতায় যারাই আসুক, পতিত ফ্যাসিবাদী সরকারের মতো অপ্রতিরোধ্য গতিতে অন্যায় করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারবে না। একটি প্রতিবাদী প্রেসার গ্রুপ সাহসের সাথে দাঁড়ানোর মতো সাহস তৈরি করতে পেরেছে। জনগণও দাঁড়িয়ে যাবার সক্ষমতা ফিরে পেয়েছে। রাজনৈতিক বর্ণচোরাদের মুখোশ উন্মোচন হয়েছে। জুলাই বিপ্লব দেখিয়ে দিয়েছে, ক্ষমতার জন্য যেসব দল ও নেতৃত্ব বারবার জনগণকে ব্যবহার করেছে, তারা আসলে জনগণের নয়, নিজের ক্ষমতা ধরে রাখার জন্যই মাঠে নামে। এই উপলব্ধি আগামী দিনের রাজনীতিকে অনেক বেশি সচেতন করবে। সামনের দিনে ক্ষমতার মসনদে টিকে থাকতে হলে সরকারকে যেমন জনবান্ধব হতে হবে তেমনি রাজনৈতিক দলগুলোকেও সচেুনতার সাথে কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে যেতে যাওয়ার দক্ষতা ও সাহস সঞ্চার করতে হবে।

চতুর্থত, দুর্নীতি বা কিংবা যে কোন ধরনের সহিংসতার পুনরুত্থান দমাতে হলে একটি শক্ত সরকার দরকার। সরকার শক্ত হয়, যখন তার পেছনে জনসমর্থন থাকে। নির্বাচন জনসমর্থনের একটি পথ। তাই আমি অবশ্যই নির্বাচনের পক্ষে। নির্বাচন দিয়েই আমাদের এগোতে হবে; কিন্তু সবকিছু নির্বাচনসর্বস্ব মনে করলে খুব বেশি লাভ হবে না। এ জন্য সংস্কার খুব জরুরি। সংস্কার নিয়ে এখনো কাটেনি ধুম্রজাল। এখন প্রশ্ন হতে পারে, আমরা কি সংস্কার চাই? রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ঐকমত্য কমিশন বসছে। এ আলোচনা মোটের ওপর নিষ্ফল হতে দেখছি। ঐকমত্য কমিশন এখনো ঐকমত্যে নিয়ে আসতে পারেননি সকল রাজনৈতিক দলগুলোকে। কারণ, সংবিধান সংস্কারসহ ছয়টি কমিশনের রিপোর্টে আমরা খুব বেশি আশাবাদী হতে পারিনি। সরকার যেন স্বৈরাচারী হয়ে না উঠতে পারে সে জন্য জনগণের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। এ পন্থা শুধু সংসদ নির্বাচনে বা স্থানীয় সরকারে নয়, সর্বত্রই প্রয়োজন। অথচ প্রশাসনিক সংস্কার থেকে শুরু করে রাজনৈতিক সংস্কারেও এখনো ইতিবাচক কোন সফলতা দৃষ্টিগোচর হয়নি। সবকিছুর পরও সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী থাকা, ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন, হাইকোর্টের বেঞ্চ জেলায় যাওয়ার মতো কিছু বিষয়ে কছিুটা ইতিবাচক দৃষ্টিভংগীর প্রতিফলন ঘটেছে বলে মনে হচ্ছে।

নির্বাচনী সংস্কারের দাবি এখন জনগণের মুখে মুখে। রাষ্ট্রযন্ত্রে গোঁড়ামি, প্রশাসনে দুর্নীতির করাল গ্রাস ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি এখনো আগের মতোই বহাল। এখনও দমনপীড়ন চলছে, মিথ্যা মামলা দিয়ে বিরোধীদের দমনের চেষ্টা অব্যাহত। অর্থনৈতিক বৈষম্য বেড়েছে, দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন উর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে। বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জুলাই গণহত্যার আন্তর্জাতিক মানের বিচার নিশ্চিতকরণ। ‘জুলাই সনদ’ প্রণয়ন, যা ভবিষ্যতে ফ্যাসিবাদ প্রতিরোধে রূপরেখা দেবে। প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক সংস্কার এবং দ্রুত একটি গ্রহণযোগ্য, অংশগ্রহণমূলক জাতীয় নির্বাচন।

পঞ্চমত, জুলাই বিপ্লব বিশাল এক পালাবদল ও বাঁকবদলের নাম। এই একটি বছর ছিল শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি জগতের মুখোশ উন্মোচনের ও প্রকৃত মানুষ চেনারও। ইতোমধ্যে জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশের শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনে সুস্পষ্ট বিভাজন সৃষ্টি হয়। পতিত স্বৈরাচারের সুবিধাভোগীরা ইতোমধ্যে জুলাই বিপ্লবকে সুকৌশলে পুরোপুরিভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের মধ্যে একটা বড় অংশ বিদেশে অবস্থান করছে। তারা বিদেশের মাটিতে বসে নিশ্চিন্তে পিঠ বাঁচিয়ে উল্টোপাল্টা কথাবার্তা লিখছেন। তারা জুলাই আন্দোলনের ছাত্র-জনতাকে ‘সন্ত্রাসী’, ‘শিবির কর্মী’, ‘জঙ্গি’ ইত্যাদি আখ্যা দিয়েই চলেছেন এখনো। তাদের বক্তব্যে মনে হয় ফ্যাসিবাদের পতন যেনো ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’, ‘স্বাধীনতা’ ও ‘গণতন্ত্র’ ধ্বংসের ফাঁদ। চোখের সামনে ছাত্র-জনতার লাশ দেখেও, আয়নাঘরের ভয়াবহতা দেখেও সেই প্রতিবন্ধী লেখক-বুদ্ধিজীবীরা জুলাই বিপ্লবের গণহত্যার বিষয়ে একটি লাইনও জনগণের পক্ষে লেখেননি। তাদের সবচেয়ে বড় সাপোর্ট এসেছে কতিপয় ভারতীয় মিডিয়ার ভুয়া খবরা-খবর। ভারতীয় কিছু মিডিয়া রীতিমতো কোমর বেঁধে বাংলাদেশকে ‘জঙ্গি রাষ্ট্র’ প্রমাণ করতে মিথ্যা ও বানোয়াট খবর পরিবেশন করেছে।

পরিশেষে বলতেই হয়, একটি বছর পার হয়ে গেছে। এখনো অনেক মায়ের কান্না থামেনি, অনেক বাবার চোখে এখনো ঝরছে আগুন। সফলতা ও ব্যর্থতার দোলাচালে তবুও বলতেই হয়, জুলাই বিপ্লব আমাদের মনে করিয়ে দেয় সত্য, সাহস ও চেতনার কণ্ঠ কখনো দমিয়ে রাখা যায় না। এই বিপ্লব শুধু অতীতের নয়, এটি ভবিষ্যতের জন্যও বার্তা বয়ে আনে। এই চেতনা হোক আগামী দিনের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের অনুপ্রেরণা। তরুণদের বিশ্বাস, বলিষ্ঠ কণ্ঠ ও বিবেকী অবস্থানই বদলে দিতে পারে একটি জাতির ভবিষ্যৎ। আগামী সংসদ হচ্ছে মানুষের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের সংসদ। সেজন্যই এই সংসদ কিন্তু সংবিধান সংস্কার পরিষদেরও নির্বাচন। এটি একইসাথে যেমন জাতীয় সংসদ নির্বাচন, তেমনি সংবিধান সংস্কার পরিষদের নির্বাচন। যে জুলাই জাতীয় সনদ তৈরি হয়েছে তার ভিত্তিতে আগামী সংসদে আমাদের সংবিধান সংস্কার হবে। তার ভিত্তিতে বাংলাদেশ পরিচালিত হবে। সেই গুরুত্বপূর্ণ একটি সংসদে সবাই যেন ভোট দিতে পারে সেই পরিবেশ রক্ষা করা; আমরা যেন একটা সুস্থ ও শান্তিপূর্ণ প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে জনগণের ভোটে যারাই নির্বাচিত হোক, তারা সংসদে গিয়ে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তাদের জন্য কাজ করতে পারে- সেই বাস্তবতা তৈরি করা আমাদের মূল লক্ষ্য। জুলাই বিপ্লব আমাদের ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশ দিয়েছে। এখন দরকার স্বৈরাচারী আমলের চিন্তাভাবনা, পশ্চাৎপদ মানসিকতা, অন্য দেশের মুখাপেক্ষী মনোভাব, ক্ষমতার তোষণ, পদপদবি ও পুরস্কারের লোভ থেকে দায়িত্বশীলতার দিকে এগিয়ে যাওয়া। বাংলা একাডেমি থেকে শুরু করে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার প্রিন্ট, ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াসহ প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীন দেশপ্রেমিক ও জনবান্ধব চিন্তাধারায় কাজ করতে হবে। জুলাই বিপ্লবের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশের নেতৃত্ব নির্বাচন করতে হবে। সত্যিকার অর্থে, ন্যায্যতার ভিত্তিতে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষে বাংলাদেশী সংস্কৃতি, শিল্প ও জীবনাচারের ভিত্তিতে সাংস্কৃতিক বিপ্লব ও শিল্পসংস্কার এখন সময়ের দাবি।