১৯৯৮ সাল। আমি তখন বরিশাল সরকারি বিএম কলেজে অনার্সে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। সাংস্কৃতিক সংগঠন থেকে নির্দেশনা এলো ঢাকায় সাংবাদিকতার ট্রেনিং হবে, সেখানে আপনাকে অংশগ্রহণ করতে হবে। আমি যেহেতু ১৯৯৫ সাল থেকেই নিজের মতো করে লেখালেখি শুরু করেছি- সেজন্যই হয়তো আমাকে এই লেখালেখি বিষয়ক কর্মশালার জন্য সিলেক্ট করা হয়েছে। কর্মশালার স্থান নির্ধারণ করা হলো দৈনিক সংগ্রাম কার্যালয়ের চতুর্থ তলায় অবস্থিত ‘আল ফালাহ মিলনায়তন’। সেই ট্রেনিং উপলক্ষেই আমার প্রথম আল ফালাহ মিলনায়তনে যাওয়া। ডেলিগেট ফি নিয়ে শুরু হলো দুদিনের ট্রেনিং। থাকা খাওয়া সব সেখানেই।

কর্মশালাটির আয়োজন করে সাংবাদিকদের একটি সংগঠন। কর্মশালা শেষে আমাদেরকে যে সনদপত্র দেয়া হয়েছিলো সেখানে লেখা আছে ‘জার্নালিজম রিসার্চ ইনস্টিটিউট’। সেটিই ছিলো আমার সাংবাদিকতা পেশার প্রথম সনদ। যা এখনো আমার কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। এরপর ২৭ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে সরকারি বেসরকারি মিলিয়ে অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠান থেকে পেশাগত বিভিন্ন প্রশিক্ষণ পেলেও প্রথম ট্রেনিংয়ের সেই স্মৃতি কখনো ভুলে যাওয়ার নয়।

ওই ট্রেনিংয়ে বাংলাদেশে সাংবাদিকতার ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করেন- বিশিষ্ট লেখক ও ইতিহাসবিদ এবং ইসলামী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল মান্নান, নিউজের উৎস, সংবাদ কাঠামো, মাঠ পর্যায়ে সাংবাদিকতা, সরেজমিন রিপোর্টিং, সাক্ষাৎকার গ্রহণের কৌশল ইত্যাদি বিষয়ে সেশন পরিচালনা করেন অভিজ্ঞ সিনিয়র সাংবাদিকবৃন্দ। যাদের মধ্যে ছিলেন দৈনিক সংগ্রামের সম্পাদক আবুল আসাদ, তৎকালীন চিফ রিপোর্টার সালাহউদ্দিন বাবর, বিশেষ প্রতিবেদক (তখন পার্লামেন্ট বিট কভার করতেন তিনি, বর্তমানে দৈনিক সংগ্রামের সম্পাদক) আযম মীর শাহীদুল আহসান, দৈনিক ইনকিলাবের অর্থনৈতিক বিটের প্রধান মাসুমুর রহমান খলিলী, কলামিস্ট মোবায়েদুর রহমান, মানবজমিনের ক্রাইম বিটের তৎকালীন প্রধান ফকরুল আলম কাঞ্চন, আযহার মাহমুদ, ক্রীড়া রিপোর্টিং বিষয়ে আলোচনা করেন মোহাম্মদ মূসা প্রমুখ।

প্রত্যেকের আলোচনাই ছিলো তথ্যবহুল এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পরিপূর্ণ অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ। সেই দুদিনের কর্মশালা ছিলো আমার সাংবাদিকতা পেশায় আসার মূল প্রেরণা। যদিও আলোচকরা তাদের আলোচনার মাঝে সাংবাদিকতা পেশার নানা সংকট, ঝুঁকি ও কষ্টের জীবনযাপন বিষয়ে আলোকপাত করতেন- সেসব জেনে-বুঝে-শুনে-তবুও আমার কাছে সাংবাদিকতা পেশাকে খুবই সম্মানের এবং গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। যে কারণে নানা প্রতিকূলতার মাঝে দীর্ঘ ২৭ বছরেও ছেড়ে যেতে পারিনি এই পেশা- হয়তো ছাড়তে পারবোনা কখনো।

এই কর্মশালার সকল আলোচকই ছিলেন অত্যন্ত চমৎকার। তবে একজনকে ‘সাংবাদিকতার আইডল’ হিসেবে আমার মনে গেঁথে যায়। তিনি হলেন- জনাব সালাহউদ্দিন বাবর। তিনি এতটাই প্রাণবন্ত এবং সরস আলোচনা করতেন যে, সকলেই তার কথায় মুগ্ধ হয়ে যেতেন। বাংলার পাশাপাশি অনর্গল ইংরেজি বলতে পারা এই মানুষটি আমার চেয়েও প্রতিষ্ঠিত অনেক সাংবাদিকের ‘গুরু’ হিসেবে পরিচিত।

আমি ছিলাম সেই কর্মশালার সবচেয়ে কনিষ্ঠ সদস্য। বরিশাল অঞ্চলের কোন বিষয় আলোচনার প্রসঙ্গক্রমে আসলে আমাকে প্রশ্ন করা হতো। যেমন- দক্ষিণাঞ্চলে ধানকাটার মৌসুমে চরাঞ্চলে লাঠিয়ালদের উৎপাত, নদী ভাঙন, বালাম চাল, আমড়া, পেয়ারা, নৌ-দুর্ঘটনা ইত্যাদি বিষয়। আলোচনার সুবিধার্থে তখন আমার কাছে এসব বিষয়ে সরেজমিন অভিজ্ঞতা জানতে চাওয়া হতো। দেখলাম- ঢাকায় বসেও তারা আমার চেয়ে এসব বিষয়ে অনেক বেশি খবর রাখেন।

বাবর ভাই সেই কর্মশালা থেকে বরিশাল অঞ্চল ভিত্তিক কিছু অ্যাসাইনমেন্ট আমাকে বুঝিয়ে দিলেন। আমি যেন পরবর্তীতে এসব বিষয়ে কাজ করি। দিনভর কর্মশালায় অংশগ্রহণ শেষে রাতে আমরা দৈনিক সংগ্রাম অফিসে কর্মরত সাংবাদিকদের কাজ ও পত্রিকার মেকআপ করার দৃশ্য সরাসরি দেখতাম। আমি বাবর ভাইয়ের কাছাকাছি বসে তার কাজ করার দৃশ্য উপভোগ করতাম। তিনি কাজের ফাঁকে ফাঁকে আমাকে নানা উপদেশ দিতেন। দৈনিক সংগ্রামের সাথে এমন নিবিড়ভাবে জড়িয়ে থাকলেও আমার কখনো এই পত্রিকায় কাজ করা হয়নি।

ঢাকার সেই কর্মশালা থেকে ফিরে আমি বরিশালের স্থানীয় দৈনিক দক্ষিণাঞ্চল পত্রিকায় স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে যোগ দেই। তখন মনে পড়ে বাবর ভাইয়ের দেয়া সেই অ্যাসাইনমেন্টগুলোর কথা। আমি বেশ কয়েকটি অ্যাসাইনমেন্ট রিপোর্ট লিখে দৈনিক দক্ষিণাঞ্চল পত্রিকায় প্রকাশ করি। সেইসব রিপোর্টের কাটিংসহ কয়েকটি পত্রিকা এবং একটি চিঠি লিখে কুরিয়ারের মাধ্যমে বাবর ভাইয়ের কর্মস্থল দৈনিক সংগ্রামের ঠিকানায় পাঠাই। তিনি এই চিঠি এবং পত্রিকার পাতায় আমার বাইলাইন লেখা দেখে খুবই খুশি হন এবং আমাকে আরো উৎসাহ দিয়ে ফিরতি চিঠি লিখেন। এভাবেই তার অনুপ্রেরণায় এগিয়ে চলে আমার সাংবাদিকতা।

২০০৪ সালে তিনি দৈনিক সংগ্রাম ছেড়ে দৈনিক নয়া দিগন্তে নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে যোগদান করলে আমিও দৈনিক নয়া দিগন্তের বরিশাল ব্যুরোর স্টাফ রিপোর্টার পদে যোগদান করি। কয়েকবছর পরে এই পত্রিকার ব্যুরো চিফ হিসেবে পদোন্নতি পাই।

শুধু আমি নই, আমার চেয়ে অনেক অভিজ্ঞ ও প্রতিষ্ঠিত শত শত সাংবাদিকের গুরু হচ্ছেন শ্রদ্ধেয় সালাহউদ্দিন বাবর ও দৈনিক সংগ্রাম। ‘বাংলাদেশে এমন মিডিয়া হাউজ কম আছে যেখানে দৈনিক সংগ্রামের রিক্রুট নেই’। এই প্রতিষ্ঠানটি বিগত ৫৫ বছরে নানা প্রতিকূল পরিবেশের মাঝেও টিকে থাকার নিরন্তর সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। দৈনিক সংগ্রামের সবচেয়ে বড় অর্জন হচ্ছে শত শত সাংবাদিক তৈরি করা।

এই বিষয়টি দৈনিক সংগ্রামের সবচেয়ে বড় অ্যাসেট হিসেবে আমার কাছে বিবেচিত। দৈনিক সংগ্রাম হয়তো নানা সীমাবদ্ধতার কারণে নিজের হাউজে তৈরি করা জনবল ধরে রাখতে পারেন না, এখানকার সাংবাদিকরা নিজ মেধার বিকাশ ঘটিয়ে হাউজ বদল করে চলে যান অন্যকোনো মিডিয়া হাউজে। কিন্তু যে আঁতুড়ঘরের শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা তারা দৈনিক সংগ্রাম থেকে নিয়ে যান- তার রেশ থেকে যায় আজীবন।