দুর্নীতি কথাটা এখন প্রায় সকলের মুখেই শোনা যায়। আমরা শুনতে পাই সব জায়গায় নাকি দুর্নীতি হচ্ছে। আরো শুনতে পাই শুধু আমাদের দেশে নয়, বিশ্বের সব দেশেই নাকি দুর্নীতি আছে। উন্নত দেশেও এবং অনুন্নত দেশেও দুর্নীতি আছে- কোথাও কম, কোথাও বেশি। আমার মনে তাই প্রশ্ন কেন এই দুর্নীতি? এই কেন’টার উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমি যা দেখতে পাচ্ছি, সে সম্পর্কেই কিছু লিখতে চেষ্টা করবো।

সব মানুষই তো ভালো হয়ে জন্ম নেয়। শৈশব-কৈশোর-যৌবন পেরিয়ে সংসার জীবনে পা দেয়। কেউ লেখাপড়া করে অর্ধশিক্ষিত, কেউ উচ্চ শিক্ষিত হয়, কেউ-বা অশিক্ষিতই থাকে। গ্রামেগঞ্জে অশিক্ষিত লোকদের মধ্যে সাধারণত কোনো দুর্নীতি দেখা যায় নাÑ যতসব দুর্নীতি তা নাকি সব শিক্ষিত লোকদের মধ্যেই দেখা যায়।

আমি ধরে নিলামÑ আমরা সব লোক ভালো। তাহলে দুর্নীতি কীভাবে আমাদের গ্রাস করলো?

অর্থনীতি শাস্ত্রে পড়েছিলাম, অর্থনীতিবিদদের একটি সূত্র Wants are unlimited, But the means to Satisfy wants are limited অর্থাৎ চাহিদার কোনো শেষ নেই, কিন্তু চাহিদা পূরণ করার উপায়-উপাদান সীমিত। যেমন, আমার পায়ে জুতা নেই, কোনো রকমে এক জোড়া স্পঞ্জের বা প্লাস্টিকের স্যান্ডেল কিনলাম। তারপর আবার মনে হয় এটা ভালো লাগছে না। মনে হবে অনেকের পায়ে চামড়ার স্যান্ডেল আছে, তাই আমারও চামড়ার স্যান্ডেল দরকার। চামড়ার স্যান্ডেল কেনার পর আবার এর চেয়ে ভালো চামড়া এবং ভালো ব্র্যান্ডের স্যান্ডেল না হলে ভালো লাগে না। এভাবে চাহিদা বাড়তেই থাকে। অর্থনীতিতে বড় পণ্ডিত ও অর্থনীতিবিদদের অনেক জ্ঞানগর্ভ সূত্র এবং বিভিন্ন বিষয়ে নিয়ে গবেষণা ও আলোচনা বই-পুস্তকে আছে। এগুলো এখানে আলোচনার বিষয় নয়।

সংসার জীবনে এসে হাটে, বাজারে, ঘরে, বাইরে, বাসে, ট্রেনে, স্টিমারে, ক্ষেতে, খামারে যা দেখতে পাচ্ছি তাই নিয়ে আমরা আলোচনা করছি। আমাদের চাহিদা যে খালি বেড়েই চলে তা সহজেই বুঝতে পারি। একটি চাহিদা পূরণ করার পরেও আরো যে বেশি পাবার আকাক্সক্ষা সেটাই আমাদের অসৎতার দিকে নিয়ে যায়। আর এর মূলে হলো ‘লোভ’ আর লালসা।

মানুষের শুধু পাওয়ার যে উদগ্র আকাক্সক্ষা, লোভ-লালসা তা তাকে অসৎ করে তুলে। যেনতেনভাবেই হোক না কেন, তার মনে এই বাসনা সব সময় তাকে প্রেরণা দেয় সম্পদ আহরণ করার, ভোগবিলাসে লিপ্ত হওয়ার তথা সুখের সাগরে ভাসার এবং জীবনকে ভোগ করার। তারা হালাল বা হারাম পথে সৎ বা অসৎ পথে উপার্জন অর্থাৎ ন্যায়-অন্যায়ের কোনো বাছবিচার করে না। সর্বোপরি নীতি-নৈতিকতার কোনো ধার ধারে না।

গ্রামেগঞ্জে সাধারণ অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত মানুষ যারা তাদের মধ্যে দুর্নীতির তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। যারা সমাজের উঁচুস্তরে এবং শিক্ষিত তাদের মধ্যেই দুর্নীতির লক্ষণ বেশি দেখা যায়। আবার ব্যক্তি এবং পদ-পদবি ও শ্রেণিভেদেও বিভিন্নরূপে দুর্নীতির প্রকাশ ঘটে। আগে থেকেই দুর্নীতি ছিল। তবে এখন সেটা প্রকট হয়ে উঠেছে। ইলেকট্রনিক, প্রিন্ট মিডিয়া এবং সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে সমাজ এবং প্রশাসনের সর্বস্তরে ভীষণভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে। সাধারণ থেকে অসাধারণ ব্যক্তি পর্যন্ত দুর্নীতির কদর্য্য কালিমায় ভয়াবহতভাবে কলংকিত হচ্ছে। সমাজের অধিকাংশ লোক শুধু মোটা ভাত, মোটা কাপড় পেলেই খুশি, কিন্তু যত সব দুর্নীতি দেখা যায় তার মধ্যে বেশি সংখ্যকই উঁচু বা শিক্ষিত শ্রেণির মধ্যে।

কবিগুরু দুঃখ করে বলেছেন,

“এ জীবনে হায় সেই বেশী চায়

আছে যার ভূরি ভূরি

রাজার হস্ত করে সমস্ত

কাঙালের ধন চুরি”

এ সব কিছুর মূলেই হলো লোভ। আবার ভিন্ন চিত্রও কখনো কখনো দেখা যায়। বছর দুই আগে বগুড়ায় এক রিকশাচালক তার রিকশায় ২০ লাখ টাকার একটি ব্যাগ পেয়েও তা নিজে আত্মসাৎ করার চেষ্টা করেননি। তিনি তার রিকশা আরোহী যিনি ভুলক্রমে তাঁর ব্যাগটি রিকশায় ফেলে গিয়েছিলেন, সেই রিকশা-আরোহী মালিককে খুঁজে বের করেছেন এবং পুলিশের সহযোগিতায় তাকে ২০ লাখ টাকা হস্তান্তর করেছেনÑ তিনি বলেছেন, আমার কোনো “লোভ” নেই। সততার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এর আগেও এ ধরনের রিকশাওয়ালা তথা গরিব লোকদের সততার দৃষ্টান্ত আমরা দেখেছি এবং দৃষ্টান্তের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছেÑ যাদের লোভ নেই লাখ লাখ টাকার থলি হাতে পাওয়ার পরেও তারা মালিককে খুঁজে বের করে তাকে ফেরত দিয়েছেন। এর মূলে হলো সততা এবং কোনো লোভ-লালসা না থাকা।

আমরা দেখতে পাই, “মানুষ কীভাবে একজন আরেকজনের চেয়ে বেশি পাবে এই প্রতিযোগিতায় নেমেছে এবং প্রাচুর্য ও অর্থ লাভের আশায় মত্ত হয়ে গেছে। ন্যায়-নীতির কোনো তোয়াক্কা না করে তিনি কী করে সম্পদশালী হবেন প্রাচুর্যের মালিক হবেন, অন্যজনের চেয়ে তিনি নিজে আরো বেশি এবং অধিক সম্পদ ও প্রাচুর্যের অধিকারী হবেন, এই চিন্তায় বিভোর হয়ে গেছেন। তার শুধু চাই আর চাই। একটা বাড়ি আছে আরো কয়েকটা বাড়ি চাই। রাজধানী ঢাকায় বাড়ি আছেÑ বিদেশে আমেরিকা, লন্ডন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া অথবা মালয়েশিয়ায় বাড়ি করতে হবে। এই প্রতিযোগিতাবিলাসী চিন্তায় তিনি যেভাবে পারেন, শুধু অর্থ লুটে নিচ্ছেন। শুধু ধনসম্পদ ও প্রাচুর্য নয়। পদ-পদবি এবং ক্ষমতার লোভ ও ব্যবহার মানুষকে বিভোর করে তোলে।

মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালা বলেন, “বেশি বেশি প্রাচুর্য লাভের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে গাফেল মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছে (এবং এ মোহ তোমরা ত্যাগ করবে না)। যতক্ষণ না তোমরা কবরে উপনীত হও। না (এ কাজ সংগত নয়)। শিগগিরই তোমরা জানতে পারবে, আবার বলছি না (এ কাজ সংগত নয়) সহসা তোমরা জানতে পারবে! সাবধান। যদি তোমাদের নিশ্চিত জ্ঞান থাকতো এ ধরনের আচরণের পরিণতি জানলে তোমরা এমনটি করতে না। তোমরা অবশ্যই দেখতে পাবে জাহিম (জ্বলন্ত আগুন) আবার বলছি, তোমরা অবশ্যই তা দেখতে পাবে চাক্ষুষ প্রত্যয়ে। সেই দিন তোমাদের নিকট এই সব নিয়ামত সম্পর্কে অবশ্যই জওয়াব চাওয়া হবে।” সূরা আততাকাসুর।

ইমাম বুখারী ও ইবনে জবীর হযরত উবাই ইবনে কাবের উদ্ধৃত করেছেনÑ নবী করিম (সা.) বলেছেন যে, “আদম সন্তান যদি দুই উপত্যকা ভর্তি সম্পদ পায়, তবুও সে তৃতীয় আরেকটি পেতে চাইবে। আদম সন্তানের পেট মাটি ছাড়া অন্য কোনো জিনিস দিয়ে ভরতে পারে না।” অন্য এক হাদীসে বলা হয়েছে, “যদি দুইটি স্বর্ণভরা উপত্যকা থাকে তবু আরেকটি স্বর্ণ ভরা উপত্যকা চাবে। তার মুখ মাটি ছাড়া অন্য কিছুতে ভরবে না।”

সম্পদ লাভের আশায় যারা মোহাচ্ছন্ন, বিভোর ও মত্ত হয়ে আছে এবং সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলছে, তাদের শিগগিরই অর্থাৎ মৃত্যুর পর কিয়ামাতের দিন বিচারের সম্মুখীন হতে হবে এবং তাদের জিজ্ঞাসা করা হবেÑ এ সম্পদ কীভাবে উপার্জন করেছে, কীভাবে ব্যয় করেছে। এদের জন্য ভয়াবহ আগুন এবং আজাবের কথা বলে সতর্ক করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, সৎভাবে উপার্জিত অর্থ অর্থাৎ আল্লাহর প্রতিটি নিয়ামত কীভাবে দুনিয়ার মানুষ ব্যবহার করেছে তাও বিচারের দিন আল্লাহ তায়ালা জিজ্ঞাসা করবেন এবং বিচার করবেন। এমনকি আল্লাহর দেয়া আলো, বাতাস, পানি, তাপ কীভাবে এসব নিয়ামত ব্যবহার করেছে তার হিসাবও দিতে হবে।

মানুষ এমন যে কবরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের লোভ-লালসা দূর হয় না। হাদীস শরীফে আছে, তুমি তোমার নিজের সম্পদ নিজের সম্পদ বলে যে দাবি কর তা তো প্রকৃতপক্ষে তোমার নয়। তুমি যা কিছু পরিধান করছো এবং খাচ্ছো, শুধু তাই তো তোমার। বাকি তো সব অন্যের।

আমি আপনি মরে যাওয়ার পর আমার আপনার বলে কোনো সম্পদ থাকে কি? মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পদ নিয়ে উত্তরাধিকারীদের মধ্যে কী অবস্থা দাঁড়ায়, তা আমার আপনার চারপাশে তাকালেই দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

অথচ দুনিয়ায় আমরা দেখি ধন-সম্পদের লোভ লালসা, যশ, প্রতিপত্তি এবং ক্ষমতার লোভ মানুষকে এমনভাবে বিভোর ও মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছে, এত গাফেল হয়ে গেছে যে, দুনিয়ার বৈষয়িক স্বার্থ এবং ভোগের চেয়ে মহৎ কোনো জিনিস সম্পর্কে মুহূর্তের জন্যও চিন্তা করে না। মৃত্যু যখন শিয়রে আসে তার আগ পর্যন্ত অর্থাৎ হুঁশ থাকা পর্যন্ত যেন দুনিয়াটা তাকে আঁকড়ে ধরে থাকে।

তাই আমরা যদি মনে রাখি যে, আমরা হালাল পথে যা উপার্জন করছি এবং যা ভোগ করছি, তার হিসাব আল্লাহ তায়ালার কাছে দিতে হবে এবং অন্যায়ভাবে অসৎ উপায়ে যা উপার্জন করছি, তার হিসাবও আল্লাহর কাছে দিতে হবে। শুধু তাই নয়, আল্লাহ তায়ালা যে সব নিয়ামত বিনামূল্যে আমাদের বাঁচার জন্য দান করেছেন যেমন আলো, বাতাস, পানি ও তাপ ইত্যাদি তারও হিসাব পেশ করতে হবে। তাহলে লোভ সহজে আমাদের স্পর্শ করতে পারবে না।

হযরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন, তোমরা তাদের দিকে দৃষ্টি দাও যারা তোমাদের থেকে নিম্নস্তরে এবং তাদের দিকে দৃষ্টি দিও না যারা তোমাদের থেকে উচ্চস্তরে। আর আল্লাহর অনুগ্রহকে তুচ্ছ না করাই তোমাদের জন্য অধিকতর মঙ্গল। (মুসলিম শরীফ)।

হযরত আবু হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেনÑ তোমরা তাদের দিকে দৃষ্টি দাও যারা নৈতিকতার দিক থেকে তোমাদের অপেক্ষা উত্তম এবং তাদের দিকে দৃষ্টি দিও না যারা তোমাদের থেকে নিম্নস্তরে রয়েছে। (মুসলিম শরীফ)।

উপরোল্লিখিত দুটি হাদিস থেকে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, “ধন-সম্পদ বিষয়ে তুমি চিন্তা করবে তোমার নিচে যারা আছে তাদের নিয়ে, আর নীতি-নৈতিকতা সম্পর্কে চিন্তা করবে তোমার ওপরে যারা আছে তাদেরকে নিয়ে।”

যেমন আমি চিন্তা করবো আমার তো থাকার ঘর আছে, আমি ভাত মাছ খাচ্ছি অথচ এ দুনিয়ায় এমন লোক আছে আমার আশপাশে, এমনকি নিজের পরিবারের মধ্যে, আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে অনেকেই আছে যাদের খাবার নেই ও থাকার ভালো ঘর নেই। ধরুন আমি পোলাও, বিরিয়ানী, গোশ্ত খাচ্ছি আর আমার এক ভাই বাড়িতে আলুভর্তা কিংবা ডাল-ভাত খাচ্ছে। কেউ কেউ তাও পাচ্ছে না।

অন্যদিকে আমার নীতি-নৈতিকতা কত নিচে। আমি একজনর মুসলিম অথচ ঠিক সময়মতো নামায পড়তে পারি না, মসজিদে যেতে পারি না। আল্লাহ তায়ালার হুকুম-আহকাম ঠিকমতো মানতে পারি না, অথচ আমার ওপরে কত মজবুত নীতি-নৈতিকতাসম্পন্ন সৎ মানুষ আছেনÑ তারা জীবনের সব কাজ আল্লাহর হুকুম এবং রাসূলে করিম (সা.) পূর্ণ তরীকা অনুযায়ী পালন করছেন। শুধু তাই নয়, কোনো কোনো অমুসলিমগণও কত সৎভাবে কাজ করে এবং নীতি-নৈতিকতার সাথে তাদের জীবনযাপন করে। এই সকল হাদীস এবং ঘটনাবলি যদি সর্বদা মনে রাখি এবং সে অনুযায়ী কাজ করি তাহলে লোভ-লালসার মৃত্যু ঘটবে।

কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার তার কবিতায় লিখেছেনÑ

একদা ছিল না ‘জুতো’ চরণ যুগলে,

দহিল হৃদয়বন, সেই ক্ষোভানলে।

ধীরে ধীরে চুপি চুপি দুঃখাকুল মনে,

গেলাম ভজনালয়ে ভজন কারণে।

দেখি তথা একজন পদ নাই তার,

অমনি ‘জুতোর’ খেদ ঘুচিল আমার।

পরের অভাব মনে করিলে চিন্তন,

আপন অভাব ক্ষোভ রহে কতক্ষণ?

কবি বলেন, প্রতিদিন উপসানালয়ে গিয়ে তার মনে দুঃখ জাগে যে তার চরণযুগলে অর্থাৎ দু’পায়ে জুতা নেই। কিন্তু একদিন তিনি দেখতে পান এক ব্যক্তির পা-ই নেই। এ দৃশ্য দেখে তার দুঃখ ঘুচে গেলো। তাই লোভ লালসা থেকে বাঁচতে হলে আমাকে আপনাকে সকলকেই চিন্তা করতে হবে যে, আমরা যে অবস্থাতেই থাকি না কেন, আমাদের চেয়ে লক্ষ কোটি মানুষ আছে যারা আমাদের মতো খেতে পারছে না। আর আমরা কত ভালো আছি এবং সুখে আছি। অপরের দুঃখ-কষ্ট, অভাব ও দুর্দশা নিয়ে চিন্তা করলে নিজের মনের দুঃখ-কষ্ট কমে যায়- অধিক সম্পদ পাওয়ার লোভ-লালসাও থাকে না। সেই সাথে এটাও মনে রাখতে হবে, যে অসৎ উপায়ে সম্পদ অর্জন করছিÑ তার হিসাব একদিন (শেষ বিচারে দিন) আল্লাহর কাছে দিতে হবে। সেদিন কিন্তু রক্ষা নেই। অসৎ এবং অন্যায়কারী ব্যক্তিদের জন্য জাহান্নামের আগুন অপেক্ষা করছে। আর নীতি-নৈতিকতা এবং ঈমানের দিক থেকে আমার চেয়ে কত উঁচুস্তরে আছে তাদের সাথে কোনো তুলনাই হয় না। তাই আমার সেই উঁচু মানে পৌঁছতে হবে, এই আত্মসমালোচনা এবং অন্তর্দৃষ্টি অবশ্যই খারাপ কাজ এবং লোভ-লালসা ও দুর্নীতি থেকে আমাকে দূরে রাখবে।

দুনিয়ার প্রতি অতিমাত্রায় ভালোবাসা এবং সম্পদ অর্জনের যে অগাধ লোভ-লালসা এবং অপরের সাথে বেশি বেশি পাওয়ার প্রতিযোগিতা যে মানুষের জীবনকে তার নীতি-নৈতিকতা মূল্যবোধ থেকে কতদূরে এবং কত নিচে নিয়ে যেতে পারে, এ বিষয়ে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সম্পদের লোভে এবং ভোগবিলাসে লিপ্ত হওয়ার মোহে তিনি তার নৈতিক চেতনা হারিয়ে ফেলেছেন। জাগতিক সম্পদ অর্জনের লক্ষ্যে সে বিভোর। তাই আল্লাহ তায়ালা তাকে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, তোমাদের এসব সম্পদ অর্জন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। আর সঠিক ও সত্য এবং ন্যায় উত্তর দিতে ব্যর্থ হলে জাহান্নাম তাদের জন্য অনিবার্য।

তাই আমাদের সকলের সাবধান হওয়া দরকার। কেবলমাত্র সৎ উপায়ে, ন্যায় পথে উপার্জন করবো। যাই পাই, তা নিয়েই খুশি থাকবো। মনে রাখতে হবেÑ আমার আপনার অন্যায়ের ভাগিদার কিয়ামতের দিন অন্য কেউ হবে নাÑ সন্তান-সন্তুতি-স্ত্রী কেউ না। অন্যায়, অপরাধ এবং দুনীতি করলে তার জন্য আমাকে আপনাকেই জ্বলন্ত আগুনের সাজা ভোগ করতে হবে।

আল্লাহ বলেন, ‘হে নবী! বলে দাও, যদি তোমাদের পিতা, তোমাদের পুত্র, তোমাদের স্ত্রীরা ও তোমাদের আত্মীয়-স্বজন, তোমাদের সেই ধন সম্পদ যাহা তোমরা উপার্জন করেছো, সেই ব্যবসা বাণিজ্য যাহা (২৮-এর পাতায় দেখুন)

ভোগ-বিলাস ও লোভ-লালসাই দুর্নীতির মূল কারণ মন্দা হওয়াকে তোমরা ভয় কর। আর তোমাদের ঘরবাড়ি যাহা তোমরা খুবই ভালোবাসÑ তোমাদের নিকট আল্লাহ ও তার রাসূল এবং আল্লাহর পথে চেষ্টা সাধনা ছাড়া অধিক প্রিয় হয়, তাহলে অপেক্ষা কর আল্লাহর চূড়ান্ত ফয়সালা আসা পর্যন্ত। আল্লাহ সত্যত্যাগী লোকদের সৎপথ প্রদর্শন করেন না।’ সূরা আততাওবা : ২৪।

জেনে রাখো, তোমাদের ধন-সম্পদ এবং সন্তান-সন্তুতি একটি পরীক্ষা। আর বড় পুরস্কার মূলত আল্লাহর কাছেই রয়েছে। সূরা আনফাল : ২৮।

আমরা সাধারণ মানুষ সমাজের চারদিকে যখন তাকাই, যখন পত্রিকা পড়ি, টেলিভিশন দেখি, তখন বিবেকের কাছে প্রশ্ন জাগে এসব কি দেখি, কি শুনি! দুর্নীতি নাকি রন্ধ্রে রন্ধ্রে। এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে নাকি দুর্নীতি নেই। শুধু তাই নয়, সমাজে আরো বহুবিধ ঘটনা ঘটছে, ব্যভিচার, শিশু হত্যা, অন্যায়, অনাচার, অবিচার, মেধাবী ছাত্র পিটিয়ে হত্যা, মানুষ হত্যা, ছাত্র শিক্ষক নির্যাতন, শিশু ধর্ষণ, বয়স্ক নারী ধর্ষণ, মানুষ গড়ার আঙিনা এবং গবেষণাগার বলে খ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় দুনীতি ও অসন্তোষ, শ্রদ্ধেয় শিক্ষককে প্রহার ও পুকুরে ডুবানোÑ কিশোর গ্যাং-এর আবির্ভাব, মাদকতার গ্রাস, ক্যাসিনোর বিস্তার আরো কত কিই না ঘটছে। এছাড়াও ফলমূল থেকে শুরু করে প্রায় সকল খাদ্যে ভেজাল, নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য অধিক মুনাফা লাভের আশায় গুদামজাত করে রাখা, গুজব এবং সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পেঁয়াজ, লবণ, চালের মূল্য বৃদ্ধি, মানি লন্ডারিং, বিদেশে অর্থ পাচার, ব্যাংক ঋণ খেলাপি, শেয়ারবাজার ধ্বংস আরো কত শত খবর পড়ে এবং দেখে আমরা চরমভাবে উদ্বিগ্ন এবং অস্বস্তিবোধ করি। প্রাণঘাতি কোভিড-১৯ বা করোনা মহামারীকবলিত হওয়ার সময়েও স্বাস্থ্য বিভাগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতির খবর পত্র-পত্রিকায় পড়ে এবং টেলিভিশনে দেখে আমরা স্তম্ভিত এবং হতাশ হয়েছি। প্রশাসন থেকে শুরু করে সমাজ ও রাষ্ট্রের কর্ণধার পর্যন্ত যা শুনছি এবং যা দেখছি তাতে হতভম্ব এবং বাকরুদ্ধ হয়ে যাই। ছেলে মেয়েরাও প্রশ্ন করেÑ কিন্তু কোনো উত্তর দিতে পারি না। নিশ্চুপ হয়ে থাকি। শুধু ভাবি যারা এরূপ করছেন তারাও তো মানুষের দুর্দশা এবং অন্যায়টা কী তা বোঝেন। তাদের তো ছেলে-মেয়ে, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব আছে, দেশ প্রেম আছে। তাহলে তারা এগুলো করে কেন? আল্লাহ বলেন, “আমি তো বহু জিন ও মানুষকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি। তাদের হৃদয় আছে, কিন্তু উহার সাহায্যে তারা চিন্তা-ভাবনা করে না, তাদের চক্ষু আছে কিন্তু তা দ্বারা তারা দেখে না, তাদের কান আছেÑ তবে তা দিয়ে তারা শুনতে পায় না। তারা আসলে জন্তু-জানোয়ারের ন্যায় বরং তা থেকেও অধিক বিভ্রান্ত, উহারাই চরম গাফিলতির মধ্যে নিমজ্জিত।” সূরা আরাফ : ১৮৯।

আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন, “যে লোক ধন-সম্পদ সঞ্চয় করেছে এবং তা গুনে গুনে রেখেছে, সে মনে করে তার ধন-সম্পদ চিরকাল তার নিকট থাকবে। কখনোই নয়, সেই ব্যক্তিতো চূর্ণ-বিচূর্ণকারী স্থানে নিক্ষিপ্ত হবে। তুমি কি জান সেই চূর্ণ-বিচূর্ণকারী স্থানটি কি? আল্লাহর আগুন, প্রচণ্ডভাবে উত্তপ্ত-উৎক্ষিপ্ত, যা অন্তর পর্যন্ত পৌঁছাবে। উহা তাদের ওপর ঢেকে বন্ধ করে দেয়া হবে। (এমতাবস্থায় যে তারা) উঁচু উঁচু স্তম্ভে পরিবেষ্টিত হবে।” (সূরা আলহুমাযাহ : ২-৯)।

এ দুনিয়ায় দুর্নীতি, অন্যায় ও অসৎ এবং অপকর্মের জন্য পরকালে যে ভয়াবহ আযাবের সতর্কবাণী আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, তা থেকে বাঁচার চিন্তা নিয়ে এই দুনিয়ায় জীবনের প্রত্যেকটি কাজ যদি সৎভাবে আল্লাহর নির্দেশ মতো নীতি-নৈতিকতার সাথে সম্পন্ন করি তাহলে অবশ্যই আমরা একটি কল্যাণকর শান্তিময় সমাজ লাভ করবো, ইনশাআল্লাহ। সদা-সর্বদা মনে জাগরুক রাখতে হবে, বিশ্বজাহানের মালিক ও স্রষ্টা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার অমোঘ বাণীÑ ‘আখিরাতের তুলনায় পার্থিব ও জাগতিক জীবনের ভোগের উপকরণ অতি তুচ্ছ।’ সূরা আত-তওবা : ৩৮।

আসুন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা প্রদত্ত জ্ঞান অন্তকরণে ধারণ করেÑ সঠিক, সুস্থ, ন্যায়নিষ্ঠ ও যথার্থভাবে এই দুনিয়ায় সহজ-সরল ও সৎ জীবনযাপন করি।

আল্লাহ আমাদেরকে সৎপথে চলার তৌফিক দান করুন এবং অসততা ও সকল প্রকার অন্যায়-অনাচার এবং বেশি বেশি পাওয়ার লোভ লালসা থেকে দূরে থাকার, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ, দেশ গড়ার তৌফিক দান করুন। আমীন।