ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে, ১৮৬৮ সালে জাপানে একটা বড় পরিবর্তন এসেছিল। সেসময় দেশটা অনেক গোলমালে ভরা ছিল বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ, হানাহানি চলছিল। ঠিক তখনই ক্ষমতায় আসেন তরুণ সম্রাট মেইজি (তার আসল নাম মুৎসুহিতো)।

একদিন একটা ব্রিটিশ জাহাজ জাপানের উপকূলে এসে ভিড়ল, মালপত্র নিয়ে। সম্রাট দেখলেন, পশ্চিমারা কত উন্নত-তারা শিল্প তৈরি করে, জাহাজ বানিয়ে পণ্য পাঠাচ্ছে দূর-দূরান্তে। আর জাপানের লোকেরা? ছুরি-তলোয়ার নিয়ে পরস্পরের সঙ্গে লড়াই করছে। সম্রাট মেইজি জনগণকে বললেন, “আমরা কেন এটা পারব না? আমাদেরও তো মাথা আছে, শক্তি আছে। ঝগড়া ছেড়ে দাও, একসঙ্গে মিলে দেশগড়ি। ভালোবাসা দিয়ে একে অপরকে সাহায্য করি, উন্নয়নের কাজে লাগি।”

তিনি সব গোত্রপ্রধান ও নেতাদের ডেকে স্পষ্ট বলে দিলেন: “হানাহানি বন্ধ করো। সাত দিনের মধ্যে অস্ত্র জমা দাও। তারপর রাষ্ট্রের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ো-সেনাবাহিনীতে, পুলিশে, দেশ গঠন শুরু হলো” অবাক ব্যাপার, কথা শুনে সবাই মেনে নিল! যারা আগে লড়াই করত, তারাই হয়ে গেল দেশের রক্ষক ও নির্মাতা। এই সাহসী পদক্ষেপের ফলে মাত্র ৫০ বছরে জাপান একটা ছিন্নভিন্ন দেশ থেকে বিশ্বের শীর্ষ শিল্পোন্নত ও শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত হল। সম্রাট মেইজি নিজে দীর্ঘকাল দেশ চালিয়ে এই পরিবর্তন দেখে গেলেন।

আমাদের বাংলাদেশেও এমন একটা সুযোগ এসেছে। দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এক অবিস্মরণীয় দিন হয়ে উঠল। লাখ লাখ ছাত্র-জনতা রাস্তায় নেমে এসেছিল। ঢাকা ও আশপাশের এলাকা তাদের দখলে চলে গেল। উপায় না দেখে খুনি শেখ হাসিনা ও তার বোন রেহানা তাড়াহুড়ো করে হেলিকপ্টারে উঠে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলেন।

এটা ছিল আমাদের জন্য এক বিরল সুযোগ যেমন জাপানে মেইজি সম্রাটের সময় এসেছিল। আমরা যদি সাহস করে ঝগড়া-বিবাদ ছেড়ে, এক হয়ে দ্রুত সংস্কার করতাম, তাহলে হয়তো অল্প সময়েই দেশকে নতুন রূপ দিতে পারতাম। কিন্তু সেই সাহস আমরা দেখাতে পারিনি পুরোপুরি। তবু আশা আছে এই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা নিয়ে আমরা এগিয়ে যাব। একদিন বাংলাদেশও মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে, শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ হয়ে।

পাঁচ হাজার বছর আগে ফেরাউনের মতো পলাতক ফ্যাসিস্টের দুঃশাসন ধ্বংস হয়ে গেল গণঅভ্যুত্থানে। জাতীয় জীবনের কাঠামো ধ্বংসপ্রায় হলেও, সম্রাট মেইজির মতো দৃঢ় বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সুযোগ এসেছিল। অভাবিত শূন্যতায় ড. ইউনূসের মতো বিশ্বখ্যাত গ্রহণযোগ্য নেতা ডুবন্ত জাহাজের হাল ধরলেন, জাতি আবেগে আপ্লুত হলো। কিন্তু সহযোদ্ধা টিমের যথার্থ বাছাই না হওয়ায়, বিপ্লবী পথে সাহসী পদক্ষেপ নেওয়া গেল না। পলাতক শত্রুর অন্তর্ঘাত সত্ত্বেও সরকার টিকে আছে, রফতানি-রিজার্ভ বেড়েছে, অর্থনীতি গতিশীল। মধ্যযুগে ওলি-আউলিয়ার পরিশ্রমে বাংলা হয়েছিল শস্যভাণ্ডার, সুলতানি আমলে বিশ্বের সমৃদ্ধতম অঞ্চল।

ইলিয়াস শাহের স্বাধীনতা ঘোষণা, বারো ভূঁইয়া-সিরাজউদ্দৌলার বীরত্ব, ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ এ ইতিহাস অদম্য সাহসের গাঁথা, ব্রিটিশ-পাকিস্তানি শাসনকেও রুখে দিয়েছে বাঙালি। ফ্যাসিবাদের পতনের পরও একনায়কত্বের ছায়া কাটেনি পুরোপুরি, কিন্তু জুলাইয়োদ্ধাদের রক্তস্নাত পথে অগ্রযাত্রা অব্যাহত। ইনশা আল্লাহ, একদিন বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে অদম্য শক্তিতে, বিশ্ব চমকে উঠবে এই অদম্য বাংলাদেশ দেখে-কে রুখবে এর উত্থান? সাহসী ছাত্র-জনতার বিপ্লবী চেতনায় নতুন সোনার বাংলা গড়ে উঠবে অচিরেই।