ব্যক্তি সমাজ দেশ ও বিশ্ব পরিবর্তনশীল। প্রতিনিয়ত পরিবর্তন ঘটছে। কিন্তু সেই পরিবর্তনের পিছনে অবশ্যই কোন না কোন কার্যকারণ আছে। যার উপস্থিতিই পরিবর্তনের কারণ এ কথা ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন নেই। কারণ আজকের আলোচ্য বিষয় কার্যকারণ তত্ত্ব নয়। সংবাদপত্র বা সংবাদমাধ্যম কীভাবে পরিবর্তনের অনুষঙ্গ ও সেই পথের বাধাগুলোই আজকের প্রসঙ্গ। সংবাদমাধ্যম বা মিডিয়ার পরিসর এ আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির যুগে ব্যাপক। এখন আর কাগজের ছাপার অক্ষর বা সংবাত্রপত্রের পাতাই সংবাদমাধ্যমের সীমান্ত নয়।

গণমাধ্যম যার পরিসর সংবাদপত্র থেকে নিয়ে নাটক, চলচ্চিত্র যা কিছু সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের চক্রে বন্দি ছিলো, সেই বন্ধনও আজ আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে মুক্ত। সংবাদমাধ্যম ও গণমাধ্যম যাই বলি না কেন, ভিত্তি রচনা এবং আদর্শের আলোকে মানুষের মনন গঠন এবং কাক্সিক্ষত পরিবর্তনের লক্ষ্য অর্জনের এ হাতিয়ার এখন বহুমুখী। তাই একথায় বুঝাতে এ অনুষঙ্গের নতুন পরিভাষা মাল্টিমিডিয়া। যুগের সাথে তাল মিলাতে প্রত্যেকটি পত্রিকা অফিসই সমানতালে ছাপানো কাগজে ভিডিও, অডিও এর মতো মাধ্যমগুলোতে তৎপর। তারা নিজেদের তৈরি ওয়েজ পেজেই শুধু এ তৎপরতা সীমাবন্ধ রাখছে না। ফেসবুক, ইউটিউব, হোয়াটসঅ্যাপ, এক্সসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোও ব্যবহার করছে। যারা সত্যিকার অর্থেই নিজের বিশ্বাস ও আদর্শের আলো কিংবা অন্ধকার যাই বলি ছড়িয়ে দুনিয়াটা নিজেদের হাতের মুঠোয় রাখতে চায়, তারা শুধু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ে সন্তুষ্ট নয়। নিজস্ব মিডিয়াকেও এমনভাবে শক্তিশালী করতে অর্থ, মেধা, সময় ও শ্রম দিচ্ছে যেন সবাইকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।

তাই বলে, তারা অতি পুরোনা ও সেকেলে বলে কাগজে ছাপানো পত্রিকাগুলো দূরে সরিয়ে দিচ্ছে না। কারণ আধুনিক মনোবিজ্ঞান বলছে, ‘অডিও ভিডিওগুলো বা ভার্চুয়াল মাধ্যম সাময়িক উত্তেজনা তৈরি করে, হঠাৎ করেই নিস্প্রভ হয়ে পড়ে। অনেকটা আতশবাজি বা ফানুসের মতো। কিন্তু ছাপানো শব্দগুলোর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী। কারণ তারা মানুষের মননের রাজ্যে প্রথমে নিজের মতো করে একটি চিত্রকল্প তৈরি করে, সৃজনশীলতা বাড়ায়, তারপর ভাবায় এবং কাজের জন্য মাঠে নামায়। কিন্তু ভার্চুয়াল বিষয়গুলো সেই সুযোগ দেয় না। সচিত্র রূপেই শুধু নয়, সচল রূপে ধরা দিয়ে চিন্তার সুযোগ কেড়ে নেয়। ব্যক্তিকে কাজের জন্য মাঠে নামানোর আগেই চিত্রকল্পটি নিজেই মাঠে নেমে পড়ে। তাই অনেক ক্ষেত্রেই এ মাধ্যম সচেতনতা সৃষ্টি এবং দায়িত্বশীল মনন গঠনে কার্যকর ভূমিকা ও পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হয়। তাই তো কাগজে ছাপানো সংবাদমাধ্যম ও চিন্তার সংরক্ষণাগার বইগুলোকে আধুনিক সভ্য সমাজ নির্বাসনে পাঠানোর আয়োজনের বিরুদ্ধে সোচ্চার। তাই তারা ‘রিডিং রিট্রিট’কে উৎসাহিত করেন।

‘রিডিং রিট্রিট’ এবং ‘ডিজিটাল ডিটক্স’

ইউরো নিউজ ‘রিডিং রিট্রিট’ নিয়ে সম্প্রতি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করছে। এ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে,পর্যটন পরিষেবায় জায়গা করে নিয়েছে ‘রিডিং রিট্রিট’। ইউরোপে এ ধরনের পর্যটন জমজমাট হয়ে উঠেছে, যেখানে পাঠাভ্যাস হয়ে উঠেছে ঘোরাঘুরির উপলক্ষ। এখন অনেক ভ্রমণপিপাসুর কাছে মানসিক প্রশান্তির জন্য ছুটি কাটাতে তিনটি মজার উপাদনের একটি হলো ভালো বই। অন্য দুটি উপাদান হলো:- ১.প্রকৃতির সংলগ্ন হোটেল, ২. উষ্ণ রোদ।

বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু পছন্দের বইয়ের তালিকা ধরে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগই নেয়, রিডিং রিট্রিট মানে হলো একই রুচির মানুষের সঙ্গে পরিচয়, নিজের যত্নে সময় দেয়া এবং ডিজিটাল ডিটক্স উপভোগ করা।

‘ডিজিটাল ডিটক্স’ হলো,‘ স্মার্টফোন, কম্পিউটার, সোশ্যাল মিডিয়া ও অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইসগুলো একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে দূরে সরিয়ে রাখা। মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, এতে মানসিক চাপ কমে, মনোযোগ বাড়ে এবং বাস্তব জীবনের সামাজিক মিথস্ক্রিয়া ও সুস্থতার উপর ফোকাস করতে সাহায্য করে। এরমানে আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তি পুরোপুরি বর্জন নয়, বরং প্রযুক্তির সচেতন ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার নিশ্চিত করা। রিডিং রিট্রিট মানে শুধু বই পড়া নয়, নতুন জায়গায় সুসঙ্গে সময় কাটানোও।

সংবাদপত্র বা গণমাধ্যম নিয়ে আলোচনায় ‘রিডিং রিট্রিট’ এবং ‘ডিজিটাল ডিটক্স’ অনেকের কাছে অপ্রাসঙ্গিক মনে হলেও আসলে কিন্তু তা নয়। ইউরো নিউজের উল্লেখিত প্রতিবেদনেই এ বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে এভাবে,‘ ক্রিস্টোফারের (একজন পর্যটক) অভিজ্ঞতায়, পরিবেশ বদলালে অতিথিদের ব্যক্তিত্বের নতুন দিক বেরিয়ে আসে। তিনি বলেন, ‘ফ্রান্সে আমরা সিসিলিয়া রাবেসের “এভরিথিংস ফাইন” বইটি নিয়ে আলোচনা করছিলাম। এটি জাতি ও রাজনীতি নিয়ে দারুণ প্রাণবন্ত বিতর্ক তৈরি করেছিল।’ এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই রাজনীতি ও জাতির আদি-অন্ত দেখার সবচেয়ে বড় জানালা হলো সংবাদমাধ্যম বা পত্রপত্রিকা। ‘ডিজিটাল ডিটক্স’-এর প্রধান অনুষঙ্গ হলো ছাপানো সংবাদপত্র। কারণ এতে দায়িত্বশীলতা ও জবাবদীহীতার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে নিশ্চিত করা হয়।

দায়িত্বশীলতা ও জবাবদীহীতা

দেশের একটি বড় মিডিয়া হাউজের অন লাইন বিভাগের প্রধান ছাপানো পত্রিকা, ডিজিটাল মিডিয়া এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তিনের তুলনা করে বলেছেন, দায়িত্বশীলতা ও জবাবদীহীতার কারণে এখনো সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য মাধ্যম পত্রিকা। তিনি একটি উদাহরণ দিয়েছেন এভাবে,‘ অভিনেতা এ টি এম শামসুজ্জামান মারা গেছেন ২০২১ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি। এর আগে অন্তত ছয়বার তাকে মেরে ফেলেছিল সোশ্যাল মিডিয়া, যাকে আমরা বলি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। বাংলাদেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় ফেসবুক। সেখানে লেখালেখি করা খুব সহজ। সম্পাদনার কোনো দরকারই নেই। গুজব বা শোনা কথার ওপর ভিত্তি করে মৃত্যুর খবর লিখে দিলেই হলো। কিছুক্ষণ পরে যদি জানাও যায় যে খবরটি সঠিক নয়, মুছে দিলেই হবে। এমন বিলাসিতা প্রিন্ট মিডিয়া বা ছাপা পত্রিকায় চলে না। ছাপার অক্ষরে একবার পত্রিকা প্রকাশ হয়ে গেলে সেই সংবাদ মুছে ফেলার কোনো সুযোগ নেই। লাখ লাখ পাঠকের কাছ থেকে সেই পত্রিকা ফিরিয়ে আনারও উপায় নেই। ছাপা পত্রিকার প্রধান কাজ হচ্ছে সঠিক সংবাদটি প্রকাশ করা। এ জন্য প্রকাশের আগেই সব দিক পরীক্ষা করে দেখতে হয়। একাধিক উৎস থেকে নিশ্চিত হতে হয় যে সংবাদটি সঠিক কি না। সাংবাদিকতার নিয়ম মেনে তৈরি করতে হয় লেখা। এ কাজের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয় প্রশিক্ষিত সংবাদকর্মী। তাই বলে একজন লিখলেই তা বসিয়ে ছাপাখানায় পাঠানো হয় না। একাধিক হাতে সম্পাদনা ছাপা পত্রিকার নিয়মিত কাজেরই অংশ। সুতরাং প্রতিদিন ছাপা পত্রিকায় যে সংবাদটি পাওয়া যায়, সেটি অন্য মাধ্যমে পরিবেশিত খবরের চেয়ে অনেক বেশি সঠিক ও বিশ্বাসযোগ্য।’

কিন্তু দুঃখজনক হলেও আমাদের এ বাংলাদেশের হাতেগোনা কয়েকটি পত্রিকা ছাড়া অধিকাংশ পত্রিকা ও তার সাংবাদিকরা জাতির জন্য নয়, ‘খড় ও ভুষির বিনিময়ে’ মালিকের পাহারাদারের ভূমিকা পালন করতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে পেশায় নিষ্ঠাবানরা অনেক ক্ষেত্রেই অবহেলিত ও বঞ্চিত। কারণ তারা ঐ উল্লেখিত কাজে তেমন ‘পাহারাদার’ হিসেবে যোগ্য নন। একাজে কলমে শক্তিমানদের চেয়ে বিশেষ লেবেল লাগিয়ে ‘সাংবাদিকদের রুটি-রুজির পাহারাদারের মোড়কে’ মালিকের স্বার্থ রক্ষার যোগ্যতা অর্জন করলে খুব সহজে বড় চেয়ারে বসা যায়। এভাবেই সাংবাদিক ,সংবাদপত্র এককথায় মিডিয়াগুলো দেশে ফ্যাসিবাদের চাষির ভূমিকা পালনে করে আসছে।

তাই দেশে গণতন্ত্র বিকাশের সহায়ক রাষ্ট্রের এ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গটি স্বাধীনতার অর্ধ শতাব্দী পরও পঙ্গুত্ব কাটিয়ে উঠতে পারেনি। কাটিয়ে উঠার লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। কিন্তুু কেন কে এরজন্য দায়ী অনুসন্ধান করলে ঐ কথিত পাহারাদার ও চাষিদের ভূমিকার কালো অধ্যায় প্রকাশ্যে আসে। কিন্তু কার সাধ্য আছে তাদের প্রতিরোধের দেয়াল ভাঙবে?

২০২৪-এর ৩৬ জুলাই বিপ্লবের পর রাষ্ট্র সংস্কারের কমিটিগুলোর মতো গণমাধ্যম সংস্কার নামে একটি কমিটিও গঠিত হয়েছে। তারা সুপারিশ জমা দিয়েছে।

কিন্তু ফলাফল একটি বড় সাইজের অশ্বডিম্ব।

বড় সাইজের অশ্বডিম্ব কাহিনী

গণমাধ্যমকে স্বাধীন, শক্তিশালী ও বস্তুনিষ্ঠ করতে প্রয়োজনীয় সংস্কার প্রস্তাব করার লক্ষ্যে গত ২০২৪-এর ১৮ নভেম্বর গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন গঠন করেছিল সরকার। গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদের নেতৃত্বে কমিশনের সদস্য হিসেবে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গীতি আরা নাসরীন, অ্যাটকোর সভাপতি অঞ্জন চৌধুরী, বাংলাদেশ টেলিভিশনের অবসরপ্রাপ্ত উপমহাপরিচালক কামরুন নেসা হাসান, দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের সম্পাদক ও সম্পাদক পরিষদের প্রতিনিধি শামসুল হক জাহিদ, নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) সচিব আখতার হোসেন খান, জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমেদ, যমুনা টেলিভিশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টারের ট্রাস্টি ফাহিম আহমেদ, মিডিয়া সাপোর্ট নেটওয়ার্কের আহ্বায়ক সাংবাদিক জিমি আমির, দ্য ডেইলি স্টারের বগুড়া প্রতিনিধি মোস্তফা সবুজ, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের উপসম্পাদক টিটু দত্ত গুপ্ত এবং শিক্ষার্থী প্রতিনিধি আবদুল্লাহ আল মামুন। ওপরে সম্মানীদের কয়জন ৩৬ জুলাই বিপ্লবের চেতনাধারণ করেন, তা লেখায় উল্লেখ করার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না এবং সঙ্গতও নয়। কারণ পাঠকরা নামগুলো দেখে নিজেরাই সিদ্ধান্ত নেয়ার মতো যোগ্য।

অবশ্য কমিশন নির্ধারিত সময় ২০২৫-এর ৩১ মার্চের আগেই তাদের সুপারিশ জমা দিয়ে যোগ্যতা, দক্ষতা ও আন্তরিকতার পরিচয় দিয়েছে। গত ২২ মার্চ শনিবার দুপুরে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদসহ অন্য সদস্যরা তাদের প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দিয়েছেন।

কিন্তু এ কমিশনের কোন সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি- একজন সংবাদকর্মী হিসেবে লেখক তা প্রত্যক্ষ করেছেন। গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর একটি অনুষ্ঠানে কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ নিজেও স্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমরা ১০০টিরও বেশি সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছিলাম। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, সরকারের পক্ষ থেকে একটি প্রস্তাবও গ্রহণ বা বাস্তবায়ন করা হয়নি। গণমাধ্যম সংস্কারের পথে আমলাতান্ত্রিক বাধা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবকেই প্রধান অন্তরায়। সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে সহযোগিতা করার জন্য গেজেট বিজ্ঞপ্তি থাকা সত্ত্বেও সরকারি দপ্তরগুলো থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে কমিশনকে বারবার বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে। গোপনীয়তার অজুহাত দেখিয়ে কমিশনের প্রতিবেদনের কিছু অংশ প্রকাশে বাধা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে টেলিভিশন লাইসেন্স কীভাবে দেওয়া হয়েছিল, সে সংক্রান্ত তথ্যও অন্তর্ভুক্ত ছিল। সাংবাদিক সুরক্ষা আইনের খসড়া প্রস্তুত করার পরও সরকার কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা ছাড়াই তা বাদ দিয়েছে ।

কামাল আহমেদ মনে করেন,সরকার একটি স্থায়ী ও স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। এর পরিবর্তে বিদ্যমান প্রেস কাউন্সিলকে পুনর্গঠন করা হয়েছে, যাকে তিনি ‘অকার্যকর’ এবং ‘সরকারের ওপর নির্ভরশীল’ বলে অভিহিত করেন।

কামাল আহমেদ আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, নির্বাচনের আগে সাংবাদিকরা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছেন। যেহেতু সুপারিশকৃত কোনো সংস্কারই বাস্তবায়ন করা হয়নি, তাই সাংবাদিকদের ওপর কোনো হামলা হলে তার দায় সরকারকেই নিতে হবে। তিনি সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আগামী দুই মাসের মধ্যে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু দিন তো ফুরিয়ে যাচ্ছে।

এখন প্রশ্ন হলো,সাংবাদিক সমাজ বিশেষ করে সাংবাদিকদের রুটি-রুজির পাহারাদার সংগঠনগুলো কী করছে। তারা একের পর এর ওয়েজ বোর্ডের জন্য সংগ্রাম করেন, কিন্তু বিদ্যামান ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়নে নিজেদের প্রতিষ্ঠাগুলোতেই আগ্রহ দেখান না, কোন ব্যাখ্যার তোয়াক্কা করেন না। কারণ..। তাই অশ্বডিম্ব ফুটে কোন বাচ্চাও বের হয় না। শুধু দিন চলে যায়।

সংস্কারের সুযোগ এখনো আছে

কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ মনে করেন,‘সংস্কারের সুযোগ এখনো আছে, তবে তা দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।’

সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে এতে সন্দেহ নেই, কিন্তু বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাধবে কে? কোথাও তো কেউ নেই। সবাই ব্যস্ত নিজের পকেট ভরতে। সাংবাদিক ও সংবাদকর্মীদের স্বাধীনভাবে কাজ করার অধিকার এবং সৃজনশীলতা বিকাশে আর্থিক নিরাপত্তা অপরিহার্য এ কথা স্বীকার করেন সবাই। কিন্তু অর্থ আসবে কোথা থেকে, এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে সবাই বিজ্ঞাপনের বাজার দিকে তাকায়। বিজ্ঞাপনের বড় উৎস ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং সরকার। সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণ করে ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর (ডিএফপি)। এ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগের প্রমাণ পেয়েছে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন। রাজনৈতিক কুপ্রভাব ও মাস্তানি মুক্ত নয় বিজ্ঞাপনের বাজার। অনেক পত্রিকা আছে যারা শুধু বিজ্ঞাপনের নামে লুট-পাট, এমন কি চাঁদাবজি করছে। শক্তির জোরে পত্রিকা, টিভি ও রেডিও সব প্রতিষ্ঠানের মালিক একজনই, আবার প্রতিটির জন্যই তার বিজ্ঞাপন চাই। অন্যরা পেলো কি না পেলো তাতে তার কিছু এসে যায় না।

এ সমস্যার সমাধানে কমিশন সুপারিশ করেছে, ‘ওয়ান হাউজ, ওয়ান মিডিয়ার’। কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ বলেন, “একই হাউজ থেকে একাধিক টেলিভিশন চ্যানেল একই ধরনের খবর প্রচার করছে। একই হাউজ থেকে একই ধরনের পত্রিকা একাধিক খবর প্রচার করছে। একই ভাষায় মতামত বা বিশ্লেষণ লেখা হচ্ছে।

একই ধরনের লেখা কাগজ কেন কিনবে পাঠক, সেই পত্রিকা থেকে কি পাচ্ছে পাঠক। এটি হচ্ছে বাজারের স্বচ্ছ প্রক্রিয়াকে বিভ্রান্ত করার কৌশল। যাদের মালিকানায় একাধিক টেলিভিশন কিংবা পত্রিকা আছে তারা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নেবেন কোন প্রতিষ্ঠানটি রাখবেন। হয় মালিকানা বিক্রি করে দেবেন না হলে একাধিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করবেন।” এ সুপারিশ বাস্তবায়নে সরকারের কোন উদ্যোগ নেই। তারা হয় তো বলবেন, এতে মিডিয়া হাউজ বন্ধ হবে, সাংবাদিকরা বেকার হবেন। কিন্তু বন্ধ না করেও সমাধান সম্ভব, মালিকানা পরিবর্তনের মাধ্যমে।

অনলাইন ও টিভি টেলিভিশনগুলোতে কর্তার ইচ্ছাই শেষ কথা কোন নীতিমালা নেই। এক্ষেত্রে কমিশনের উল্লেখ্যযোগ্য সুপারিশগুলোর মধ্যে ছিলো: ১. অনলাইন পোর্টাল নিবন্ধনের নীতিমালা হালনাগাদ করা এবং এর আলোকে নিবন্ধন প্রদানের দায়িত্ব ও ক্ষমতা যেহেতু বিগত সরকারের প্রস্তাবিত সম্প্রচার কমিশনের ওপর ন্যস্ত ছিল, সেহেতু তা গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন প্রস্তাবিত স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশনের ওপর অর্পণ করা সমীচীন। ২. গত দশকে যেসব অনলাইনের নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে, তা যেহেতু কোনো স্বচ্ছ ও সুনির্দিষ্ট নীতির অধীনে হয়নি বরং সরকারের স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে সম্পাদিত হয়েছে, সেহেতু সেগুলো পর্যালোচনা প্রয়োজন। এ পর্যালোচনার দায়িত্ব স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশনের ওপর ন্যস্ত করা সমীচীন। ৩. অনলাইন পোর্টাল নিবন্ধনের জন্য একাধিক নিরাপত্তা সংস্থার যে তদন্ত ব্যবস্থা রয়েছে, তার অবসান প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সংবাদপত্রের ডিক্লারেশনের জন্য বিদ্যমান পুলিশের তদন্ত ব্যবস্থাই যথেষ্ট গণ্য করা যায়। ৪. অনলাইন পোর্টালগুলো নিবন্ধন পাওয়ার পর তার বার্ষিক নবায়ন পদ্ধতি বাতিল করা হোক। ৫. অনলাইন নীতিমালায় আইপিটিভি ও অনলাইন পোর্টালে সংবাদ বুলেটিন সম্প্রচার করা যাবে না- এমন নিষেধাজ্ঞা বাতিল করা উচিত। ৬. অনলাইন পোর্টালে সুনির্দিষ্ট নীতিমালার ভিত্তিতে স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতার আলোকে সরকারি বিজ্ঞাপনের ব্যবস্থা করতে হবে। ৭. অনলাইন পোর্টালের জন্য ট্রেড লাইসেন্সের ফি সাধারণ ট্রেড লাইসেন্সের ফির কয়েক গুণ। এটি সংবাদমাধ্যমকে নিরুৎসাহিত করার নীতি। এর অবসান হওয়া উচিত।

শেষ কথা হলো, সংষ্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে সাংবাদিকদেরই এগিয়ে আসতে হবে। তবেই পেশার নিরাপত্তা ও সাংবাদিক এবং সংবাদমাধ্যমের মর্যাদা বাড়বে। এ মহান পেশার নামে যারা মাস্তানি ও চাঁদাবাজি করছেন, তাদের দৌরাত্ম্য দূর হবে। ৩৬ জুলাইয়ের চেতনার আলোকে প্রত্যয়দীপ্ত মহান ব্যক্তিত্বের উজ্জ্বল আলোয় উদ্ভাসিত হবে দেশের গণমাধ্যম অঙ্গন। দৈনিক সংগ্রামের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতেই এই আমাদের প্রত্যাশা।