ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সহসভাপতি (ভিপি) আবু সাদিক কায়েম। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কথা বলেছেন দৈনিক সংগ্রামের সাথে।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ইবরাহীম খলিল।

দৈনিক সংগ্রাম : দৈনিক সংগ্রাম ৫১ বছর পূর্ণ করলো। নানা চড়াই-উৎরাই পার করে অর্ধশত বছর পার করেছে। দৈনিক সংগ্রামের অবদানকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করবেন।

আবু সাদিক কায়েম : দৈনিক সংগ্রাম ৫১ বছর ধরে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতায় এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে। সাংবাদিকতা আমরা যেভাবে চাই, একটা সঠিক তথা জাতির সামনে হাজির করা এবং সব সময় সত্যের ওপর অটল থাকা, সেটা আমরা দৈনিক সংগ্রামকে দেখতে পেয়েছি। দৈনিক সংগ্রামে যেমন নামের মধ্যে সংগ্রাম আছে তেমনি ৫১ বছর জুড়েই সংগ্রাম করতে হয়েছে এবং সবচেয়ে বেশি সংগ্রাম করতে হয়েছে গত ১৬ বছরে। বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী আমলে যে মিডিয়াগুলো সবচেয়ে বেশি ভিকটিম ছিল তার চেয়ে বেশি ভিকটিম ছিল সংগ্রাম। দৈনিক সংগ্রামের সম্পাদক থেকে শুরু করে সবার ওপর নির্যাতন করা হয়েছে। সংগ্রামের সম্পাদকের ওপর যে ফ্যাসিবাদী আচরণ করা হয়েছে তা পুরো জাতি এবং পুরো বিশ্বের মধ্যে খারাপ একটা নজির স্থাপিত হয়েছে। এই নির্যাতনের পরও আমরা দেখতে পেয়েছি বাংলাদেশে যারা এলিট সম্পাদক দাবি করে তারা এটাকে বৈধতা দিয়েছে। এসময় তারা নিরব ছিল। নিরব থাকার মাধ্যমে তারা এর বৈধতা দিয়েছে। এই যে ফ্যাসিবাদী আমলে সংগ্রামের ওপর একটি পত্রিকার মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ করা এবং অধিকার হরণ করার পরও দৈনিক সংগ্রাম বসে থাকেনি। প্রতিনিয়ত তার যাত্রা অব্যাহত রেখেছে। এই যাত্রায় যারা ছিল এবং আছে; বিশেষ করে স্টাফ থেকে শুরু করে পাঠক সবাইকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ডাকসুর পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। তারা দৈনিক সংগ্রামের ওপর আস্থা রেখেছে। আমরা আশা রাখবো দৈনিক সংগ্রাম তার বস্তুনিষ্ঠতা এবং সমাজের কাছে যেই আবেদন ধরে রেখে পাঠকের কাছে সত্য সংবাদটা পৌঁছে দেবে।

দৈনিক সংগ্রাম : ডাকসু নির্বাচনের কয়েক মাসের মধ্যে একটা আমুল পরিবর্তন দেখা গেল। সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, এখন ঢাবিতে কোনো গণরুম নেই, কোনো র‌্যাগিংয়ের খবর বের হয় না। এই যে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশটার আমুল পরিবর্তন হলো, তার পিছনে কীভাবে আপনারা কাজ করেছেন?

আবু সাদিক কায়েম : আমাদের একটা স্বপ্ন ছিল, আমাদের ক্যাম্পাসটা শিক্ষার্থীরা যেই প্রত্যাশা নিয়ে ক্যাম্পাসে আসে সেই প্রত্যাশার একটা ক্যাম্পাস বির্নিমাণ করা। সেটা করার জন্য আমরা সর্বাত্মকভাবে কাজগুলো অব্যাহত রেখেছি। ১০৪ বছরে ঢাবি ক্যাম্পাসে অনেকগুলো সমস্যা তৈরি হয়েছে। এছাড়া কৃত্রিমভাবে সংকট তৈরি করা হয়েছে। আমরা সেগুলো চিহ্নিত করেছি। সেগুলো সমাধানে কাজ করেছি। এখানে মৌলিক সংকট হলো আবাসন সমস্যা। আমরা চাই শিক্ষার্থীরা প্রথম বছর থেকে যেন সুন্দর একটা পড়ার টেবিল পায় এবং সুন্দর একটা রুম পায়। তা নিয়ে আমরা কাজ করছি। পাঁচটা হল নির্মাণের কাজ অচিরেই শুরু হবে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নারীদের সমস্যাগুলো দূর করা। স্বাস্থ্যের অনিরাপত্তা ছিল। বিশেষ করে মেডিকেল সেন্টারটা সবচেয়ে ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল সেটা আধুনিকায়ন করা হয়েছে। প্রায় তিন কোটি টাকার কাজ এখানে করা হয়েছে। হলগুলোতে মেডিকেল ক্যাম্প প্রতিষ্ঠা করেছি। যাতে ফ্রিতে মেডিকেল সেবা পেতে পারে। এছাড়া কেন্দ্রীয় মসজিদ ভঙ্গুর অবস্থা ছিল। সেটা সংস্কার করা হয়েছে। প্রত্যেকটা হলে মসজিদ রুমগুলো সংস্কার করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের খাবারের মান যেন ভালো থাকে, দাম যেন সুলভ থাকে, সেটা নিয়ে আমরা কাজ করছি। বিশ্ববিদ্যালয় যে একটি মাল্টি কালচারেল ইন্সটিটিউট সংস্কৃতি সাহিত্য শিল্প, সেটাকে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলে সুস্থ ধারার সংস্কৃতি বিনির্মাণে আমরা কাজ করছি। বিশেষ করে জুলাইয়ের যে আবেদন, শহীদদের যে প্রত্যাশা, সেই প্রত্যাশাগুলো বিভিন্ন সভা-সেমিনারে এবং বিভিন্ন প্রকাশনার মাধ্যমে আমরা ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করছি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের যে মূল কাজ এটাকে একটা পূর্ণাঙ্গ একাডেমিক ইনস্টিটিউট হিসেবে বিনির্মাণ করা। আমরা শিক্ষার মান বৃদ্ধি করার জন্য শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করা, শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় মেধার মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে আমরা কাজ করছি। গবেষণার বাজেট বৃদ্ধির জন্য বিশেষ করে গবেষকদের যেন প্রণোদনা দেওয়া হয় সেজন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের কাছে দাবি উত্থাপন করেছি। এর বাইরে বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্য ধর্মের শিক্ষার্থীরা আছে, তাদের যে অধিকার, চাওয়া-পাওয়া প্রত্যাশাগুলো পূরণ করার জন্য একসাথে কাজ করছি। এরপর নারী শিক্ষার্থীদের জন্য একটা নিরাপদ ক্যাম্পাস ও তারা যে সংকটগুলো ফেইস করে তা আমরা চিহ্নিত করছি। সব মিলিয়ে তাদের যে প্রত্যাশা এবং আকাক্সক্ষা ও স্বপ্নের ক্যাম্পাস তা বিনির্মাণ করার জন্য কাজ করছি। আমাদের স্বপ্ন হলোÑ আমরা এমন একটা স্ট্যান্ডার্ডে আমাদের ক্যাম্পাসকে নিয়ে যাবো, যেন ক্যাম্পাসকে আর কখনো পিছনে ফিরে আসতে না হয়। অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের জন্য পরিবহনগুলোকে আধুনিকায়ন করা এবং সঠিক সময় যেন পরিবহন পায়, সেই ব্যবস্থা করা। আমরা প্রতিনিয়ত শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করছি এবং তাদের পাশে থাকছি। শিক্ষার্থীরাও স্বতস্ফূর্তভাবে রেসপন্স করছে। আমরা এই বিশ্ববিদ্যালয়কে সারাবিশ্বে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো পজিসনে নিয়ে যেতে চাই।

দৈনিক সংগ্রাম : জুলাইয়োত্তর বাংলাদেশে শিক্ষা ব্যবস্থার আমুল পরিবর্তনের একটা দাবি আছে। আপনার পক্ষ থেকে কি সুপারিশ। আগামীর শিক্ষা ব্যবস্থাটা কিরকম হওয়া উচিত?

আবু সাদিক কায়েম : শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আমরা শুরুতেই আমাদের দাবি উপস্থাপন করেছি। আমরা ৩১ দফা প্রস্তাবনা শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে দিয়েছি। আমরা বলেছি শিক্ষায় বাজেট সবচেয়ে বেশি দিতে হবে। জাতিকে সর্বোচ্চ শিখরে নিয়ে যেতে চাই, সারাবিশ্বকে নেতৃত্ব দিতে চাই তাহলে অবশ্যই শিক্ষায় বাজেট বাড়াতে হবে। নৈতিকতা সম্পন্ন শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়ন করা, সেটা সবচেয়ে বেশি জরুরি। ইতোমধ্যে আমরা বলেছি। আন্দোলন সংগ্রাম অব্যাহত রাখবো। বিশেষ করে মাদরাসা শিক্ষার্থীদের বঞ্চিত করা হয়, পরিচয়ের কারণে শিক্ষার্থীদের বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে। বিভিন্ন মিডিয়ামের শিক্ষার মাধ্যমে বঞ্চিত করা হয়। আমরা চাই একটি সমন্বিত শিক্ষা ব্যবস্থা। যেখানে সবার অধিকার ও নৈতিকতা থাকবে।

দৈনিক সংগ্রাম : জুলাই আন্দোলনে আপনার স্মৃতিকথা থাকুক দৈনিক সংগ্রামের পাঠকদের জন্য।

আবু সাদিক কায়েম : জুলাই বিপ্লবে এই দেশের মুক্তিকামী ছাত্র-জনতা সবাই এক বিন্দুতে মিলিত হয়েছিল। আমরা সবাই মজলুম ছিলাম। আমরা জালেম হাসিনার বিরুদ্ধে লড়াই করেছি। আমাদের শহীদরা আমাদের রাস্তা দেখিয়েছে। তাদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে আমরা ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ পেয়েছি। বিপ্লবের শুরু থেকে নীতি নির্ধারণ এবং মাঠপর্যায়ের সমন্বয়ে আমি যুক্ত ছিলাম। যখন কঠিন মুহূর্তগুলো ছিল; তখন আল্লাহর কাছে দাঁড়িয়ে সাহায্য চেয়েছি, জায়নামাজে সেজদায়। আল্লাহ তায়াল প্রত্যেকটা জায়গা আমাদের সাহায্য করেছেন। বিজয়টা আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে। আমরা মানুষ হিসেবে চেষ্টা করেছি। আল্লাহ মজলুমদের দোয়া কবুল করেছেন। আমাদের অসংখ্য ভাইবোনরা শহীদ হয়েছে, হাজার হাজার ভাইবোন পঙ্গু হয়েছে। এই আর্তনাদ দীর্ঘ দিনের গুম-খুনের শিকার পরিবারগুলোর আর্তনাদ আল্লাহ কবুল করেছেন। আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য পেয়ে বিজয় এসেছে। এখানে কোন ব্যক্তিগত ক্যারিশমা বা কারো একক দলীয় না। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে সরাসরি একটা সাহায্য। আল্লাহর কাছে সাহায্য চেয়েছি। তিনি বিজয় দিয়েছেন। এবং আল্লাহ তায়ালা আমাদের পূর্ণাঙ্গ বিজয় দেবেন, ইনশাআল্লাহ।

দৈনিক সংগ্রাম : দৈনিক সংগ্রামের পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ীদের জন্য আপনার বার্তা কি?

আবু সাদিক কায়েম : দৈনিক সংগ্রামের জন্য আমার বার্তা থাকবে একবিংশ শতাব্দিতে সংবাদপত্রের যে কোয়ালিটি থাকা দরকার, সেই কোয়ালিটির জায়গাতে তারা নজর দেবে। বিশেষ করে দেশের চার কোটি তরুণ যে ধরনের সংবাদ পছন্দ করে, বৈচিত্র্যময় সংবাদকে ফোকাসে রাখবে, মানের জায়গাতে নজর দেবে একইসাথে কলাম, সাহিত্য এসব জায়গায় আরও বেশি কোয়ালিটির প্রতি নজর দেবে। পাঠকের প্রত্যাশা পূরণ করবে। পাঠকরাও বিগত সময়ে যেভাবে সমর্থন দিয়ে গেছে একইভাবে আরও বেশি সমর্থন দিয়ে দেশব্যাপী দৈনিক সংগ্রামকে ছড়িয়ে দেবে।

দৈনিক সংগ্রাম : কৃতজ্ঞতা দৈনিক সংগ্রামের পক্ষ থেকে।

আবু সাদিক কায়েম : দৈনিক সংগ্রামকে ধন্যবাদ।