ইসলামী ব্যাংকিং হলো ইসলামী শরী’আহ মোতাবেক পরিচালিত একটি আর্থিক ব্যবস্থা/ পদ্ধতি, যেখানে সুদ (Inter-est/Riba) নিষিদ্ধ। এটি কেবল সুদমুক্ত আর্থিক ব্যবস্থাই নয়; বরং এটি ন্যায়বিচার ও নৈতিক ব্যাংকিং পদ্ধতির মূলনীতিগুলো তার সকল কর্মকাণ্ডে পরিপালন করে থাকে। ইসলামী ব্যাংকিং ঝুঁকি ভাগাভাগি এবং সম্পদভিত্তিক অর্থনীতির সমন্বিত একটি মডেল। এই ব্যাংকিং-এ ঘারার (অনিশ্চয়তা), দরার (ক্ষতি) এবং মাইসির (জুয়া)-কেও অত্যন্ত কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আধুনিক পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, বৈশ্বিক আর্থিক সঙ্কট, অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা ইসলামী ব্যাংকিংয়ের প্রাসঙ্গিতাকে আরও যৌক্তিক ও বস্তুনিষ্ঠভাবে প্রমাণ করেছে। বিশ্বব্যাপী ইসলামী ব্যাংকিং পদ্ধতি সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের ছোট অংশ হলেও বিগত দশকে উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বাংলাদেশেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশে এই খাত দীর্ঘদিন ধরে দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এটি সরকারী হস্তক্ষেপ, রাজনৈতিক দখলদারিতা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, নীতি-অসঙ্গতি এবং কর্পোরেট গভর্ন্যান্স সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। এতদসত্ত্বেও ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর বিগত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে ইসলামী ব্যাংকিং এ দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে এর অবস্মরণীয় অবদান রেখেই চলছে। মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, অবকাঠামো তৈরি, শিল্পোন্নয়ন, জনকল্যাণসহ নানাবিদ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইসলামী ব্যাংকব্যবস্থা সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে নেতৃত্বের শীর্ষে অবস্থান করছে। বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে এবং দেশের আর্থিক ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠছে।

ইসলামী ব্যাংকিংয়ের বর্তমান বাস্তবতা: বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও বাংলাদেশের অবস্থান

২০২৫ সাল পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী ইসলামী ব্যাংকিং খাতে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে, যেখানে মোট সম্পদ প্রায় ৫.৪৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ৯.৩১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। যা এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে, তবে বাংলাদেশে কিছু চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও আমানত ও বিনিয়োগে প্রবৃদ্ধি বজায় আছে, যা বাজারের সম্প্রসারণ ও ডিজিটালাইজেশন দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। সামগ্রিক ইসলামী ফাইন্যান্স শিল্প (IFSI) ২০২৪ সালে প্রায় ১৪.৯% প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। ব্যাংকিং, সুকুক (Sukuk) এবং তাকাফুল (বীমা) ইত্যাদি বাজারের সম্প্রসারণ এই প্রবৃদ্ধির মূল কারণ। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল, বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার ডিজিটাল ব্যাংকিং ও ফিনটেক খাত এই প্রবৃদ্ধিতে নেতৃত্ব দিচ্ছে। মারাবাহা (Murabaha) ফাইন্যান্সিং খাত, বিশেষত SME ও ব্যক্তিগত ঋণে, ২০২৫-২০৩২ সাল পর্যন্ত দ্রুত বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। দেশজুড়ে পূর্ণ ইসলামী ব্যাংক, ইসলামী শাখা এবং ইসলামী উইন্ডোর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশের ইসলামী ব্যাংকিংয়ের আমানত ও বিনিয়োগ প্রায় ব্যাংকিং শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারিত্ব প্রদর্শন করছে এবং সময়ের সাথে এটি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইসলামী ব্যাংকগুলোতে আমানত ৪.৬৭ ট্রিলিয়ন টাকায় উন্নীত হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৭.৫২% বৃদ্ধি। আমানতের সাথে সামঞ্জস্য রেখে বিনিয়োগেও প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। কিছু আর্থিক কেলেঙ্কারি ও সুশাসনের অভাব নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও, সামগ্রিকভাবে খাতটি প্রসারিত হচ্ছে। বর্তমানে দেশে ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংক তাদের ১৬৮৬টি শাখা, ১০১১টি উপ-শাখা ও ৪,১৭২টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটের মাধ্যমে সেবা প্রদান করে যাচ্ছে। পাশাপাশি, ৩৩টি শাখা ও ৭৫০টি উইন্ডোর মাধ্যমে প্রায় ৩০টি কনেভনশনাল ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে (জুন/সেপ্টেম্বর, ২০২৪ পর্যন্ত)। ইসলামী ব্যাংকিং দেশের ব্যাংকিং খাতের মোট সম্পদের ২৩.৬৫ শতাংশ, আমানতের ২৬.২৩ শতাংশ এবং বিনিয়োগ এর ২৮.২৪ শতাংশ ধারণ করছে (মার্চ- ২০২৪ পর্যন্ত)।

বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের সঙ্কট ও চ্যালেঞ্জের গভীরতা

ইসলামী ব্যাংকিংয়ের প্রধান সঙ্কট কেবল আর্থিক নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক ও নৈতিকও বটে। অনেক ক্ষেত্রে শরী’আহ বোর্ড কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। শরী’আহ কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করার জন্য যে শক্তিশালী নজরদারি ব্যবস্থা থাকার প্রয়োজন, তা বাস্তবে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। বহিঃশরী’আহ অডিট এখনো সর্বজনীন ও বাধ্যতামূলক নয়, যার ফলে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাহ্যিক ও স্বাধীন শরী’আহ অডিটের অনুপস্থিতি শরী’আহ কমপ্লায়েন্সকে দুর্বল করেছে। পাশাপাশি ইসলামী ব্যাংকিংয়ের নামে প্রচলিত অনেক পণ্য কার্যত প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের অনুরূপ হয়ে পড়েছে যা গ্রাহকের আস্থা ক্ষুণ্ন করছে। আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো, প্রযুক্তি ও পণ্যের সীমাবদ্ধতা। ডিজিটাল ব্যাংকিং, ফিনটেক ও উদ্ভাবনী আর্থিক পণ্যে ইসলামী ব্যাংকগুলো এখনো তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে রয়েছে। ফলে তরুণ প্রজন্ম, স্টার্টআপ ও নতুন উদ্যোক্তাদের কাছে এই খাতের আকর্ষণ নিম্নগামী পরিলক্ষিত হচ্ছে।

ইসলামী ব্যাংকিংয়ের বর্তমান সঙ্কটকে যদি তাত্ত্বিকভাবে বিশ্লেষণ করা হয়, তবে এটি তিনটি স্তরে দৃশ্যমান নৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও নীতিগত। নৈতিক স্তরে সবচেয়ে বড় সঙ্কট হলো শরী’আহকে একটি আনুষ্ঠানিক সিল হিসেবে ব্যবহার করা, নৈতিক দায়বদ্ধতা হিসেবে নয়। শরী’আহ বোর্ড অনেক ক্ষেত্রে পরামর্শমূলক প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ থেকে রয়েছে, কার্যকর নজরদারি সংস্থায় রূপ নিতে পারেনি। প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে কর্পোরেট গভর্ন্যান্সের দুর্বলতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং জবাবদিহিতার অভাব ইসলামী ব্যাংকিংকে তার দর্শন থেকে বিচ্যুত করেছে। নীতিগত স্তরে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের জন্য স্বতন্ত্র ও সমন্বিত নিয়ন্ত্রক কাঠামোর অভাব এই সঙ্কটকে আরও গভীর করে তুলছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ইসলামী ব্যাংকিংয়ের জ্ঞানগত সীমাবদ্ধতা। ইসলামী ব্যাংকিং দীর্ঘদিন ধরে ফিকহি বৈধতার প্রশ্নে আবদ্ধ থেকেছে, কিন্তু অর্থনৈতিক দক্ষতা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও সামাজিক প্রভাবের দিকগুলো তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পেয়েছে। ফলে মুনাফাভিত্তিক ও ঝুঁকি-ভাগাভাগির প্রকৃত মডেল যেমন, মুদারাবা ও মুশারাকা প্রান্তিক হয়ে পড়েছে, আর মুরাবাহাভিত্তিক লেনদেন আধিপত্য বিস্তার করেছে। এতে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের রূপান্তরমূলক ক্ষমতা হারানোর পাশাপাশি অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য ম্লান হচ্ছে।

তবে উপর্যুক্ত সঙ্কটগুলো ইসলামী ব্যাংকিংয়ের জন্য একটি পুনর্বিবেচনার সুযোগ তৈরি করেছে। বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় নৈতিক অর্থনীতি, সামাজিক ন্যায়বিচার ও টেকসই উন্নয়ন নতুন করে আলোচিত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে ইসলামী ব্যাংকিং তার মৌলিক দর্শনে ফিরে গিয়ে নতুনভাবে নিজেকে সংজ্ঞায়িত করতে পারে। এর জন্য প্রয়োজন ইসলামী ব্যাংকিংকে শুধু একটি ধর্মীয় বিকল্প নয়, বরং এই অর্থব্যবস্থার ‘ন্যায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক মডেল’ কে সত্যিকার অর্থে পুনর্গঠন করা।

ঘুরে দাঁড়ানোর সন্ধিক্ষণ ও সম্ভাবনা

সব সঙ্কট সত্ত্বেও ইসলামী ব্যাংকিংয়ের ঘুরে দাঁড়ানোর বাস্তব ও অপার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ, এই খাতের মৌলিক দর্শন ঝুঁকি ভাগাভাগি, সম্পদভিত্তিক বিনিয়োগ ও নৈতিক অর্থনীতি আজকের বিশ্বে আরও প্রাসঙ্গিক। তবে এর জন্য প্রয়োজন গভীর নীতিগত সংস্কার। তাই নীতিগতভাবে প্রথম করণীয় হলো, ইসলামী ব্যাংকিংয়ের জন্য শক্তিশালী শরী’আহ গভর্ন্যান্স কাঠামো গড়ে তোলা, যেখানে স্বাধীন ও বাধ্যতামূলক বহিঃশরী’আহ অডিট থাকবে। ইসলামী ব্যাংকিংয়ের জন্য শক্তিশালী ও স্বতন্ত্র নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। স্বাধীন ও বাধ্যতামূলক বহিঃশরী’আহ অডিট চালু করে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, জ্ঞানভিত্তিক মানবসম্পদ ও গবেষণার ওপর জোর দিতে হবে, যাতে ইসলামী ব্যাংকিং কেবল ফিকহি নয়, অর্থনৈতিকভাবেও দক্ষ হয়ে উঠতে পারে।

তৃতীয়ত, পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় মেরিট, পেশাদারিত্ব ও নৈতিক নেতৃত্বকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

চতুর্থত, একই সঙ্গে প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন ও ইসলামী ফিনটেক, ডিজিটাল সেবা এবং গবেষণাভিত্তিক পণ্য উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। ইসলামী ফিনটেক ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকিংকে ভবিষ্যৎ অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

সুতরাং ইসলামী ব্যাংকিং আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, এটি হয় তার আদর্শে ফিরে গিয়ে নতুনভাবে আত্মপ্রকাশ করবে, নয়তো ধীরে ধীরে তার স্বাতন্ত্র্য হারাবে। তাই সঙ্কটই এখানে শেষ কথা নয়; বরং সঙ্কটের মধ্যেই রয়েছে পুনরুত্থানের সুযোগ। সুশাসন, নীতিগত সাহস ও নৈতিক দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা গেলে ইসলামী ব্যাংকিং আবারও আস্থার প্রতীক হয়ে উঠতে পারে শুধু মুসলিম সমাজের জন্য নয়, বরং সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও আরো শক্তিশালী হবে।

নীতিগত করণীয় ও সুপারিশসমালা মাকাসিদ আল-শরী’আহর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন

সমস্ত ব্যাংকিং কার্যক্রমে মাকাসিদ আল-শরী’আহ বাস্তবায়নের মাধ্যমে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন এবং দারিদ্র্য বিমোচনে আরও ব্যাপক ভূমিকা পালন করতে হবে। ইসলামী ব্যাংকের আমানত সংগ্রহ, বিনিয়োগ স্থাপন, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন, মালিক-কর্মচারী সম্পর্ক, গ্রাহক সেবা এবং শেয়ারহোল্ডার, পরিচালক এবং অন্যান্য সকল প্রাসঙ্গিক পক্ষের অধিকার ও কর্তব্য নির্ধারণ শরী’আহ’র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। বিনিয়োগ ক্ষেত্র নির্ধারণে অবশ্যই মানুষের মৌলিক চাহিদাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এই ক্ষেত্রে, প্রথম অগ্রাধিকার দেওয়া হবে ‘অত্যাবশ্যকীয় বিষয়গুলো (জরুরিয়াত)’, তারপরে ‘প্রয়োজনীয় কিন্তু অত্যাবশ্যক নয় (হাজিয়াত)’, এই চাহিদাগুলো যথাযথভাবে পূরণ করার পর, ‘সৌন্দর্যবর্ধক ও উন্নতমানের বিষয় (তাহসিনিয়াত)’-এ বিনিয়োগ করা যেতে পারে। সম্পদ বণ্টনের এই ইসলামী পদ্ধতিকে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের সর্বোত্তম গ্যারান্টি হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

ইসলামী ব্যাংকব্যবস্থার বিকৃতি রোধ এবং লেনদেনের ইসলামী নীতিমালার পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ

ইসলামী ব্যাংকব্যবস্থার সুফল নির্ভর করে এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের ওপর। তিক্ত হলেও সত্য যে, দেশে ইসলামী ব্যাংকিং সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে বিকৃতিও ঘটছে। এজন্য ‘slamization of the Islamic Banks’ -জাতীয় কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। যেমন, আল্লাহ তায়ালা ঈমানদার লোকদের উদ্দেশ্যেই বলেছেন, হে ঈমানদারগণ! তোমরা ঈমান আনো (আল-কুরআন, ৪: ১৩৬)। লেনদেনে শরঈ নীতিমালা অনুসরণ করা হলে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ঘটে এবং মানুষের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত হয়।

স্বতন্ত্র ও স্বাধীন নিয়ন্ত্রক কাঠামো

ইসলামী ব্যাংকিংয়ের জন্য শক্তিশালী, স্বাধীন ও স্বতন্ত্র নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। ইসলামী ব্যাংকগুলো যাতে সত্যিকার/বাস্তব/প্রকৃত শরী’আহ সম্মতির মাধ্যমে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে এবং মানবতার সামগ্রিক কল্যাণে কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা পালন করতে পারে তা নিশ্চিত করার জন্য শরী’আহ তত্ত্বাবধায়ক পরিষদ (SSC) প্রতিষ্ঠা ও শক্তিশালী করা উচিত। এর জন্য, এসএসসিকে সত্যিকার অর্থে স্বাধীন, শক্তিশালী এবং শক্তিশালী হতে হবে। ব্যাংকের গ্রাহক, বিনিয়োগকারী, শুভাকাক্সক্ষী এবং অংশীদারদের মৌলিক দাবি হলো সকল ব্যাংকিং কার্যক্রমে সম্পূর্ণ শরী’আহ সম্মতি নিশ্চিত করা। মাকাসিদ আল-শরী’আহর যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার জন্য শরী’আহ নিরীক্ষা এবং পরিদর্শনকে আরও কার্যকর করা প্রয়োজন। এই ক্ষেত্রে, অভ্যন্তরীণ শরী’আহ নিরীক্ষা-পরিদর্শনের পাশাপাশি, বহিরাগত শরী’আহ নিরীক্ষা-পরিদর্শনেরও ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। ব্যাংকিং এবং অর্থনীতি সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জনের জন্য এসএসসির সদস্যরা অর্থনীতি, অর্থ এবং ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞদের সাথে মতামত বিনিময় করতে পারেন। পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের মধ্যে মতামত বিনিময় কাম্য। বিভিন্ন অমীমাংসিত ব্যাংকিং সমস্যা নিয়ে নিয়মিত আলোচনার জন্য আইনি সদস্য এবং অর্থনীতি-অর্থ-ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞদের সাথে সংলাপের ব্যবস্থা করতে পারে। যা থেকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার শর’ঈ সমাধান বেরিয়ে আসতে পারে।

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতামূলক অভিজ্ঞ পরিচালনা পর্ষদ গঠন ও সার্বক্ষণিক তদারকি কার্যক্রম চালু রাখা

ব্যাংকিং সেবার বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্য ও সর্বক্ষেত্রে শরী’আহ পরিপালনের বাধ্যবাধকতার কারণে ইসলামী ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে সংস্কারকাজের পরিধি হবে প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলো থেকে বেশি। অতিরিক্ত কাজগুলো নির্ধারণে অতীত-বিদ্যমান ভালো চর্চাগুলো চিহ্নিত করার পাশাপাশি ইসলামী ব্যাংক ব্যবস্থার আন্তর্জাতিক মান নির্ধারক সংস্থাগুলোর ও অগ্রগামী দেশগুলোর বিধানগুলো বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে। এক্ষেত্রে নীতি-নির্ধারক পর্যায়ে করণীয়গুলো নিম্নরূপ:

১. ইসলামী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা পর্ষদের পরিচালককে ব্যক্তিগত জীবনে ইসলামী অনুশাসনের পূর্ণাঙ্গ অনুসারী হতে হবে।

২. পরিচালনা পর্ষদে যারা স্থান পাবেন তাদের শরী’আহ পরিপালন বিষয়ে সচেতনতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ইসলামী অর্থ ব্যবস্থার অন্যতম মান নির্ধারক ইসলামী ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস বোর্ড (আইএফএসবি) পরিচালনা পর্ষদের বহুবিধ দায়িত্ব নির্ধারণ করেছে। বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ সদস্যরা যেন সেসব দায়িত্ব বিষয়ে সচেতন থাকেন তা নিশ্চিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের যথাযথ ভূমিকা পালন প্রয়োজন। এক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেয়া উদ্যোগগুলো বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে। তাদের নির্দেশনায় পরিচালনা পর্ষদ সদস্যদের শরী’আহবিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধিতে নানাবিধ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যেগুলোয় পর্ষদ সদস্যরা অংশগ্রহণ করেন বয়স, অভিজ্ঞতা, সামাজিক মর্যাদা বা ধর্মীয় বিশ্বাসের বিবেচনা নির্বিশেষে।

৩. পরিচালনা পর্ষদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে যথাযথ শরী’আহ পরিপালন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা ও নিশ্চিত করা যে, ব্যাংকের যাবতীয় কার্যক্রম শরী’আহ নীতিমালা মেনে পরিচালিত হচ্ছে। এ দায়িত্ব পালনে তাদের একটি শক্তিশালী শরী’আহ গভর্ন্যান্স ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন এবং নিশ্চিত করা প্রয়োজন যে, ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় শরী’আহ নীতিমালা একীভূত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানজুড়ে শরী’আহ পরিপালনের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা ও কর্মীদের মধ্যে ইসলামী নৈতিক মূল্যবোধ স্থাপনের যথোপযুক্ত উদ্যোগ নেয়াটা তাদের দায়িত্ব।

৪. পর্ষদগুলোর অন্যতম আরেকটি দায়িত্ব হচ্ছে, ব্যাংকের যাবতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কার্যক্রমে শরী’আহ বিচ্যুতি ঝুঁকিকে গুরুত্ব দেয়ার নীতি প্রতিষ্ঠা করা এবং যেকোনো বিচ্যুতি চিহ্নিত করার ও অনতিবিলম্বে যথাযথ পর্যায়ে (যেমন শরী’আহ কমিটি, পর্ষদ বা বাংলাদেশ ব্যাংককে) অবহিত করার সুনির্দিষ্ট ও ভীতিহীন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে যে কর্মী পর্যায়ে শরী’আহ বিচ্যুতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও যথাযথ পর্যায়ে অবহিত করার কার্যকর কোনো ব্যবস্থা বিদ্যমান না থাকার ফলে সেসব বিষয় কেবল ব্যক্তিগত আলাপে বা সীমিত গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে, প্রতিকার-প্রতিরোধমূলক কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয় না। বিষয়টি যদি মালয়েশিয়ার সঙ্গে তুলনা করা যায়, সেখানে শরী’আহ বিচ্যুত হয়েছে এমন একটি সম্ভাবনা চিহ্নিত করার পর কতদিনের মধ্যে কী পদক্ষেপ কাকে নিতে হবে তার সুস্পষ্ট বিধান কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক দেয়া হয়েছে। এছাড়া শরী’আহ বিচ্যুতিতে জড়িত থাকলে বা বিচ্যুতির ঘটনা জেনেও যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে কঠোর শাস্তির বিধান আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে।

৫. যথাযথ যোগ্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে শরী’আহ কমিটি গঠন, শরী’আহ কমিটির সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন এবং এ লক্ষ্যে ম্যানেজমেন্টের নেয়া পদক্ষেপগুলোর পর্যাপ্ততা নিশ্চিত করাও পর্ষদের দায়িত্ব। একই সঙ্গে তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে শরী’আহ কমিটি সদস্যদের ক্রমাগত দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ, স্বাধীনতা ও যথাযথ সম্মানি নিশ্চিত করা। শরী’আহ কমিটির কার্যকারিতা নিশ্চিতে (বিশেষত শরী’আহ সেক্রেটারিয়েট, গবেষণা, নিয়ন্ত্রণ ও নিরীক্ষায়) যোগ্য ও পর্যাপ্ত লোকবল নিশ্চিত করাটাও পর্ষদের দায়িত্ব।

৬. শরী’আহ কমিটি সদস্যরা অর্পিত দায়িত্ব পালনে সক্রিয় ছিলেন কিনা ও কমিটির কার্যক্রমে কার্যকর অবদান রেখেছিলেন কিনা তা মূল্যায়নের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করাটা পর্ষদের অন্যতম একটি দায়িত্ব। অন্য অনেক দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক (যেমন মালয়েশিয়া, বাহরাইন, ওমান ও কুয়েত) এ বাধ্যবাধকতা আরোপ করলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের এমন কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকার ফলে কোনো ইসলামী ব্যাংক এ মূল্যায়ন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছে বলে শোনা যায়নি।

৭. অভ্যন্তরীণ শরী’আহ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার উপাদানগুলো সুপ্রতিষ্ঠিত করা ও শরী’আহ নিরীক্ষকদের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করা পর্ষদের দায়িত্ব। অতীতে শোনা গেছে যে বিচ্যুতি চিহ্নিত করার ফলে শরী’আহ নিরীক্ষক ওপরের পর্যায় থেকে চাপের সম্মুখীন হয়েছেন। এমনও শোনা গেছে যে শরী’আহ নিরীক্ষক ব্যাংকের ব্যবসায় কীভাবে ভূমিকা রেখেছেন সেটি গর্ব করে বলছেন, যা নিরীক্ষকের স্বাধীনতাকে প্রশ্নের সম্মুখীন করে ও দুর্বল শরী’আহ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ইঙ্গিত প্রদান করে।

৮. গুটিকয়েক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে সম্পদ কুক্ষিগত হওয়া, ঝুঁকিবণ্টন পদ্ধতির পরিবর্তে ঝুঁকি হস্তান্তর পদ্ধতির ব্যাপক চর্চা ও দায়ভিত্তিক অর্থ ব্যবস্থাকে আঁকড়ে ধরা শরী’আহর চূড়ান্ত উদ্দেশ্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।

সম্পদের সুষম বণ্টন ও বৈষম্যবিরোধী অর্থ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা শরী’আহর চূড়ান্ত উদ্দেশ্যের অন্তর্ভুক্ত। পর্ষদের সিদ্ধান্তগুলোয় এ চিন্তাধারা প্রতিফলিত হওয়াটা জরুরি। একই সঙ্গে ইসলামী অর্থব্যবস্থা ও ব্যাংকিং বিষয়ে সম্যক জ্ঞান অর্জন করাও পর্ষদ সদস্যদের দায়িত্ব। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতায় পর্ষদ সদস্যদের কাছ থেকে এমনটা প্রত্যাশা অবাস্তব বিবেচিত হয়ে আসছে। শোনা যায় যে পর্ষদ সদস্যদের সচেতনতা বৃদ্ধিতে অতীতে একাধিক উদ্যোগ নেয়া হলেও তাদের কাছ থেকে সাড়া মেলেনি। আশা করা যায় যে, নতুন বাংলাদেশে এমন অবস্থার পরিবর্তন হবে।

৯. ইসলামী ব্যাংকিং সেবা বিষয়ে গ্রাহকদের সচেতনতা বৃদ্ধিতেও উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশের ইসলামী ব্যাংকগুলোর ওয়েবসাইট ও অন্যান্য মাধ্যম থেকে বিভিন্ন সেবার বিস্তারিত বর্ণনা, শরী’আহ ভিত্তি, গ্রাহকের দায়িত্ব ও অধিকার ইত্যাদি বিষয়ে তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। দূর অতীত তথ্য প্রকাশের চেষ্টার একটা আভাস থাকলেও সময়ের সঙ্গে এ অবস্থার অবনতি হয়েছে।

১০. তথ্যের প্রাপ্যতা বিশেষভাবে প্রয়োজন আমানতকারীদের প্রেক্ষিতে, কারণ মূলত তাদের টাকাতেই ব্যাংক পরিচালিত হয়। ইসলামী ব্যাংকের আমানতের একটি অনন্য দিক হচ্ছে যে এর বড় অংশ আসে মুদারাবাহ চুক্তির ভিত্তিতে, যেখানে শরী’আহ দৃষ্টিতে আমানতকারীরা বিনিয়োগঝুঁকি বহন করেন ও বিনিয়োগের লাভের পরিমাণের ওপর সরাসরি নির্ভর করে আমানতকারীদের লাভের পরিমাণ। ফলে আমানতকারীদের প্রতি একটি ইসলামী ব্যাংকের দায়বদ্ধতা একটি প্রচলিত ধারার ব্যাংক থেকে বহুগুণ বেশি। অথচ বাংলাদেশের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে যে এ দায়বদ্ধতা পূরণে যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন তার যথেষ্ট ঘাটতি বিদ্যমান। আমানতকারীদের অর্থ ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগ, লাভ হিসাবনিকাশ ও বণ্টন ইত্যাদি বিষয়ে তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। অথচ গ্রাহকের আস্থা অর্জনে ও শরী’আহ অনুসরণের নিশ্চয়তা প্রদানের দৃষ্টিতে এ ধরনের তথ্যের প্রাপ্যতা জরুরি। আশা করা যায় যে নতুন বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকগুলোর পর্ষদগুলোর কার্যকরী ভূমিকায় আমানতকারীদের প্রতি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে।

১১. ইসলামী ব্যাংকগুলোর নতুন পর্ষদগুলোর এছাড়া পুনঃযাচাই করা প্রয়োজন যে, বিদ্যমান ইসলামী ব্যাংকিং সেবাগুলোর গঠন, নির্দেশিকা ও চুক্তিগুলো এবং যাকাত ও দাতব্য তহবিলের বণ্টন শরী’আহ কমিটির যথাযথ অনুমোদনের ভিত্তিতে হয়েছে কিনা? ভবিষ্যতে সিএসআর, যাকাত, কমপেনসেশন ও ডাউটফুল ইনকাম (সন্দেহজনক আয়)-এর খাতগুলোকে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে হিসবে করে তারপর একাউন্ট চূড়ান্ত করতে হবে। তা ফাইন্যান্সিয়াল স্টেটমেন্টে সুস্পষ্ট করে উল্লেখ করতে হবে। এ খাতগুলো থেকে প্রাপ্ত আয় শরী’আহ সুপারভাইজরী কমিটি/বোর্ড কর্তৃক নির্দেশিত সুনির্দিষ্ট খাতে ব্যয়-ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। এখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার বিষয়টি অতীব গুরুত্বের সাথে নিশ্চিত করতে হবে।

১২. শরী’আহ কমিটির সিদ্ধান্তগুলো আন্তর্জাতিক শরী’আহ মান অনুসরণ করে হয়েছে কিনা সেটিও পুনঃযাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পুনঃযাচাই করা প্রয়োজন যে ব্যাংকের প্রযুক্তি ব্যবস্থা শরী’আহ বিচ্যুতি প্রতিরোধে সক্ষম কিনা।

১৩. ইসলামী ব্যাংকিং সেবার বিষয়ে বহুজনের বহু অভিযোগ-আপত্তি-সন্দেহের পরিপ্রেক্ষিতে এ কাজগুলো জরুরি। গ্রাহকদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক শরী’আহ মানের বিপরীতে বহিঃশরী’আহ নিরীক্ষা ও বহিঃশরী’আহ রেটিং করার সম্ভাবনা পর্ষদগুলো বিবেচনায় নিতে পারে।

১৪. অনতিবিলম্বে আন্তর্জাতিক মানের পরিপ্রেক্ষিতে ইসলামী ব্যাংকিং বিষয়ে একটি নীতিমালা প্রণয়ন প্রয়োজন। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক ২০০৯ সালে জারীকৃত একটি নির্দেশিকা বলবৎ আছে। বর্তমান আন্তর্জাতিক মান থেকে নির্দেশিকাটি যোজন যোজন দূরে। শরী’আহভিত্তিক সেবার বর্ণনা, শরী’আহ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, নিরীক্ষা ব্যবস্থা, হিসাবরক্ষণ ও আর্থিক বিবরণী প্রস্তুত, সব বিষয়ে সংশোধন আনা জরুরি প্রয়োজন।

১৫. ইসলামী ব্যাংকগুলো নিয়ে যে আস্থা ও বিশ্বাসহীনতার সঙ্কট বিদ্যমান তা দূরীকরণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। ইসলামী ব্যাংকগুলোর শুধু দাবি করা যথেষ্ট না যে তারা শরী’আহ পরিপালন করে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে। শরী’আহ পরিপালন নিশ্চিত করার পাশাপাশি এ বিষয়ে নিশ্চয়তা প্রদান করাও তাদের দায়িত্ব। কাজটি তারা করতে পারে তাদের শরী’আহ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা দেয়ার মাধ্যমে ও তাদের শরী’আহভিত্তিক সিদ্ধান্তগুলোর ভিত্তি প্রকাশ করার মাধ্যমে। এর বাইরে বহিঃশরী’আহ নিরীক্ষা ও বহিঃশরী’আহ রেটিং ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন হবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত, যার অনুপস্থিতিতে ইসলামী ব্যাংকগুলো স্বউদ্যোগেও এগুলো করিয়ে নিতে পারে। ওমান, পাকিস্তান, কুয়েত ও বাহরাইন এরই মধ্যে বহিঃশরী’আহ নিরীক্ষা ব্যবস্থা ইসলামী ব্যাংকগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক করেছে। এদেশগুলোর অভিজ্ঞতা পরিচালনা পর্ষদ কাজে লাগাতে পারেন।

শক্তিশালী ও জবাবদিহিতামূলক শরী’আহ সুপারভাইজরি কমিটি’ গঠন

পুরোপুরি শরী’আহভিত্তিক ব্যাংক পরিচালনা করতে হলে ব্যাংকের বিভিন্ন বিষয়ে শরী’আহ স্ট্যান্ডার্ড রক্ষা করা অপরিহার্য। Accounting and Auditing organization for Islamic Financial Institutions

(AAOIFI) শরী’আহভিত্তিক ব্যাংকগুলো পরিচালনার জন্য বিভিন্ন বিষয়ে বেশ কিছু স্ট্যান্ডার্ড প্রণয়ন করেছে। যেগুলো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। অনেকগুলো রাষ্ট্রের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের রেগুলেটরি বডি যেমন, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, দুবাই এই স্ট্যান্ডার্ডগুলো গ্রহণ করে নিয়েছে। এছাড়াও পৃথিবীর বহুদেশ AAOIFI এর স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী তাদের ইসলামী ব্যাংকিং ও ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বাংলাদেশের ইসলামী ব্যাংকগুলো AAOIFI ও কর্তৃক প্রণীত বিভিন্ন স্ট্যান্ডার্ডের কিছু কিছু অংশ জ্ঞাতসারে কিংবা অজ্ঞাতসারে মেনে চললেও শরী’আহ সংক্রান্ত স্ট্যান্ডার্ড মানার ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান অসন্তোষজনক। এর কারণ সম্ভবত এটাই যে, এ সম্পর্কে উক্ত ব্যাংকগুলোর কর্তৃপক্ষের জানার অভাব রয়েছে। অথচ এ কথা তো সর্বজনস্বীকৃত যে, যে কোন ইসলামী ব্যাংকের প্রাণশক্তি হলো তার শরী’আহ্ সুপারভাইজর কমিটি/বোর্ড (এসএসসি)। এসএসসি এর গঠন, ক্ষমতায়ন, তত্ত্বাবধান, নীতিমালা প্রণয়ন, যথাযোগ্য সদস্য মনোনয়ন ইত্যাদি ক্ষেত্রে মান রক্ষা করতে না পারলে যেমনি প্রশ্ন দেখা দেবে শরী’আহ কমিটি/বোর্ড সম্পর্কে তেমনি প্রশ্ন দেখা দিবে ব্যাংকের শরী’আহ পরিপালন নিয়ে। এমনকি এমতাবস্থায় ব্যাংকের আয়ের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠাও অস্বাভাবিক নয়। অতএব, একটি পূর্ণাঙ্গ, শক্তিশালী এবং জবাবদিহিমূলক “শরিয়া তত্ত্বাবধান কমিটি (SSC)” পুনর্গঠন করতে হবে।

পূর্ণাঙ্গ ও স্বতন্ত্র ‘ইসলামী ব্যাংকিং অ্যাক্ট/আইন’ প্রণয়ন করা

দেশে ইসলামী ব্যাংকগুলো পরিচালিত হচ্ছে নভেম্বর ২০০৯ সালে জারি করা বাংলাদেশ ব্যাংকের ইসলামী ব্যাংকিং গাইডলাইন বলে, যা এখন সেকেলে বিবেচিত হচ্ছে। ইতোপূর্বে বহুবার ইসলামী ব্যাংকিং আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু শেষপর্যন্ত উদ্যোগগুলো আলোর মুখ দেখেনি। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে ‘ইসলামি ব্যাংক-কোম্পানি আইন, ২০২৪ এর খসড়া’ নামে খসড়া ইসলামী ব্যাংকিং আইন-২০২৪ প্রস্তুত করা হয়েছে। কিন্তু এতেও অসঙ্গতি পরিলক্ষিত হয়েছে। প্রচলিত ব্যাংকের অধীনে পরিচালিত উইন্ডো ও শাখাভিত্তিক ইসলামী ব্যাংকিং সেবা বন্ধের কথা বলা হয়েছে এ খসড়া আইনে, যা অনেকের মতে ইসলামী ব্যাংকব্যবস্থা প্রসারের পথে প্রতিবন্ধকতা। বৈশ্বিক ইসলামী ব্যাংকিং প্র্যাকটিসের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ইসলামী ব্যাংকখাত শক্তিশালী আইনি কাঠামো দিতে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকিং আইন প্রণয়ন করতে হবে।

সুশাসন ও জবাবদিহিতা শক্তিশালীকরণ

ব্যাংক পরিচালনায় স্বচ্ছ, পেশাদার ও মেরিটভিত্তিক নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে হবে। ইসলামী ব্যাংকগুলোর সাধারণ কার্যক্রম, সম্পদের মান বা ব্যবস্থাপনা নীতি সম্পর্কে প্রচলিত ব্যাংক এবং রেটিং এজেন্সিগুলোর দৃষ্টিতে অনেক সন্দেহ রয়েছে। এই বাধা দূর করতে হবে। তাই, ইসলামী ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি, পণ্য এবং তাদের সাথে সম্পর্কিত ঝুঁকি সম্পর্কে আরও স্বচ্ছ হওয়া উচিত। বর্তমানে, রেটিং এজেন্সিগুলো সম্পদের মান নিয়ে যথাযথভাবে উদ্বিগ্ন।

উদাহরণস্বরূপ, ব্যালেন্স শিটে প্রতিটি বিনিয়োগ পণ্যের শিরোনামের অধীনে মোট বকেয়া পরিমাণ দেখানো হয়। কিন্তু ব্যাংকের বিনিয়োগ পোর্টফোলিওর সম্পূর্ণ বিবরণের অভাব রয়েছে। এই সীমাবদ্ধতাগুলো দূর করা উচিত। স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা ইসলামী অর্থায়নের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। কুরআন লেনদেনের সময় ধাপে ধাপে অনুসরণীয় প্রক্রিয়া প্রদানে স্বচ্ছতার উপর জোর দেয়। জড়িত পক্ষগুলোর মধ্যে অবিচার এড়াতে অ্যাকাউন্টিংয়ের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে এবং জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেওয়া হয়েছে।

প্রশিক্ষণ, কর্মশালা এবং মতবিনিময় সভা আয়োজন

ইসলামী ব্যাংকগুলোতে কার্যকর এবং প্রকৃত ইসলামী ব্যাংকিং বাস্তবায়নের জন্য, ব্যাংকের বিভিন্ন স্তরে নিম্নলিখিত প্রশিক্ষণ, কর্মশালা এবং মতামত বিনিময় পরিচালনা করা অপরিহার্য:

১. পরিচালনা পর্ষদ:

(ক) ব্যাংকে ব্যাপক শরী’আহ সম্মতি নিশ্চিত করার জন্য, বছরের বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে এবং প্রয়োজন অনুসারে পরিচালনা পর্ষদ এবং শরী’আহ তত্ত্বাবধায়ক কাউন্সিলের সাথে নির্দিষ্ট সংখ্যক সভা, মতামত বিনিময় এবং বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করা উচিত। ফলস্বরূপ, বোর্ড এবং এসএসসির মধ্যে দূরত্ব হ্রাস পাবে। বোর্ড সদস্যরা যদি এই সভাগুলোতে শরী’আহর বিভিন্ন বিষয় এবং বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে আলোচনা করেন, তাহলে শরী’আহ সম্মতি অনেক সহজ এবং স্বাভাবিক হয়ে উঠবে। তাদের বিভিন্ন ভুল ধারণা দূর হবে। অতিরিক্ত চাপ এবং লক্ষ্যমাত্রা দেওয়ার বোর্ডের প্রবণতা হ্রাস পাবে।

(খ) পরিচালনা পর্ষদের বিভিন্ন সদস্যদের মধ্যে শরী’আহ সম্পর্কে ভুল ধারণা দূর করতে এবং শরী’আহ সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জনের জন্য, তাদের জন্য প্রশিক্ষণ কর্মশালা এবং বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচির আয়োজন করা উচিত। তাদেরকে ইসলামী ব্যাংকিং সম্পর্কে বিস্তারিত, সঠিক এবং স্বচ্ছ ধারণা দেওয়া উচিত। ইসলামী ব্যাংকের বিভিন্ন মেজাজ এবং পদ্ধতি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় ধারণা দেওয়া উচিত।

২. শরী’আহ তত্ত্বাবধায়ক পরিষদ (SSC) এর সক্রিয় ও কার্যকর ভূমিকা:

শরী’আহ সুপারভাইজরি কাউন্সিলের সক্রিয় ও কার্যকর ভূমিকা পালনের জন্য নিম্নলিখিত উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত:

(ক) “সার্চ কমিটির” মাধ্যমে নির্দেশিকা অনুসারে শরী’আহ সুপারভাইজরি কাউন্সিলের সদস্যদের নিয়োগ করা উচিত। (খ) ব্যাংকে শতভাগ শরী’আহ সম্মতি নিশ্চিত করার জন্য, বছরের বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে এবং প্রয়োজন বিবেচনা করে SSC সদস্যদের জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যক সভা, মতামত বিনিময় এবং সমস্যা-ভিত্তিক আলোচনা করা উচিত। ফলস্বরূপ, শরী’আহ সম্পর্কিত তাদের জ্ঞান সমৃদ্ধ হবে এবং ইসলামী ব্যাংকিং শিল্প উপকৃত হবে।

(গ) SSC সদস্যদের জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মশালা এবং উন্নয়ন কর্মসূচি আয়োজন করা উচিত। নতুন পণ্য উন্নয়নের জন্য এই ধরনের কর্মসূচি অত্যন্ত কার্যকর বলে বিবেচিত হতে পারে। ব্যাংকে শরী’আহ সম্পর্কিত বিভিন্ন বিদ্যমান সমস্যা সমাধানের জন্য এই ধরনের কর্মসূচির বিকল্প নেই।

(ঘ) এসএসসি সদস্যদের কর্মক্ষমতা মূল্যায়ন করা উচিত। সভায় গৃহীত ভূমিকা বিবেচনা করে, ভবিষ্যতে তারা যাতে কাউন্সিলে থাকে তা নিশ্চিত করা উচিত।

(ঙ) বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য তাদের দায়িত্ব দেওয়া উচিত।

(চ) কর্মক্ষমতা বিবেচনা করে এবং অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ, এসএসসির সেরা কর্মক্ষমদের পুরস্কৃত করার ব্যবস্থা করা উচিত।

নীতি-ভিত্তিক প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও জ্ঞানভিত্তিক দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে কার্যকর প্রশাসন নিশ্চিত করা। দক্ষ, নৈতিক ও পেশাদার নেতৃত্ব নিশ্চিত করা । ইসলামী ব্যাংকিং সম্পর্কিত গবেষণা, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা কর্মসূচি শক্তিশালী করতে হবে, যাতে মানবসম্পদ গড়ে ওঠে।

পণ্যের উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন

বিশ্বায়নের এই যুগে, ব্যবসা ও বাণিজ্যের ধরণ এবং পদ্ধতি ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে। পরিবর্তিত ব্যবসায়িক চাহিদা পূরণের জন্য, আধুনিক ইসলামী ব্যাংকিং পণ্য উদ্ভাবন করা প্রয়োজন। বিশেষ করে, গ্রাহকদের নগদ চাহিদা পূরণের জন্য, তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিপূর্ণ এবং সহজে ব্যবহারযোগ্য বিনিয়োগ পণ্য প্রবর্তন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর জন্য, নিবিড় গবেষণা প্রয়োজন। বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং সম্পর্কে প্রয়োজনীয় গবেষণার অভাব রয়েছে। অতএব, ইসলামী ব্যাংকগুলো ব্যক্তিগতভাবে বা যৌথভাবে গবেষণার উদ্যোগ নিতে পারে। বেশি বৈচিত্র্যপূর্ণ শরী’আহসম্মত পণ্য, যেমন ইসলামী ফিনটেক, ডিজিটাল ব্যাংকিং, আইজারা/মুরাবাহা উন্নত লেনদেন ইত্যাদি চালু করতে হবে। ইসলামিক ফিনটেক কোম্পানির উন্নয়ন ও প্রযুক্তি গ্রহণে সহায়তা প্রদান করা উচিত। অনলাইন ব্যবসা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের জন্য নির্দেশিকা প্রণয়ন করা। ভার্চুয়াল ব্যাংকিং সম্পর্কিত নির্দেশিকা প্রণয়ন করা প্রয়োজন।

নতুন পণ্য উন্নয়নের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। অথচ এ ধরনের প্রকল্পে পণ্য দেয়া যেতে পারে। প্রচলিত পণ্যগুলোর সংস্কার প্রয়োজন যাতে এগুলো শরী’আহসম্মত কাঠামোর অধীনে সমসাময়িক পরিবেশের সাথে মানিয়ে চলতে পারে। সঠিক গ্রাহকের জন্য সঠিক পণ্যটি লক্ষীভূত করা গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশের ২৫-৩৫ শতাংশ আমানত সংগ্রহ এবং সম্পদ সঞ্চালন হয় ইসলামিক ফিন্যান্সিয়াল প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে। যেহেতু দেশের আর্থিক ব্যবস্থার মধ্যে বড় একটা অংশ ইসলামী ব্যাংকিং বা ফিন্যান্সিয়াল পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছে, সেক্ষেত্রে এখানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরো আন্তরিকতার সঙ্গে গুরুত্ব দেয়ার সুযোগ ও প্রয়োজন দুটোই রয়েছে। তবে জাতীয় অর্থনীতিতে ইসলামী ফিন্যান্সের অবদান নিয়ে এখনো মানসম্মত কোনো গবেষণা খুব একটা চোখে পড়ে না, যার কারণে অর্থনীতিবিদদের কাছে এ বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্যও নেই। তাই রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির অগ্রিম গতি-প্রকৃতি ও প্রয়োজনীয়তা অনুধাবনের জন্য বিগত কয়েক দশকে বাংলাদেশের জিডিপিসহ সার্বিক অর্থনীতিতে ইসলামী ব্যাংক ও অন্যান্য ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবদান, সম্ভাবনা এবং নানা অভ্যন্তরীণ ও বহির্জাগতিক প্রতিবন্ধকতাগুলো নিয়ে বিস্তর গবেষণার বিকল্প নেই।

বিনিয়োগ ব্যবস্থার মান, পদ্ধতি ও প্রক্রিয়ার উন্নয়ন

শরী’আহর বাধ্যবাধকতা এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চাহিদা পূরণের জন্য, ইসলামী ব্যাংকগুলো মান, পদ্ধতি এবং প্রক্রিয়া প্রস্তুত করে তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে অগ্রগতি অর্জন করেছে। এই উন্নয়নগুলো ইসলামী ব্যাংকগুলোকে এমন একটি অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছে যেখানে তারা সিন্ডিকেটের প্রয়োজন ছাড়াই সম্পূর্ণ লেনদেন পরিচালনা করতে পারে। এটি আলোচনার প্রক্রিয়াকে সহজ করবে এবং লেনদেনের খরচ কমাবে। তদুপরি, তাদের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রত্যাশিত প্রকাশ এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মান গ্রহণ করা উচিত। একবিংশ শতাব্দীর আর্থিক বাজারে সম্মানজনক অবস্থান অর্জন এবং সঠিকভাবে প্রতিযোগিতা করার জন্য, ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে ইসলামী পদ্ধতিতে কিছু ঐতিহ্যবাহী অর্থায়নের কাজ করার উপায় উদ্ভাবন করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কৌশল, বিপণনযোগ্য সিকিউরিটিজ, পছন্দসই এবং ফিউচার বাজার ইত্যাদি উদ্ভাবন। ইসলামী ব্যাংকগুলোর দক্ষ কার্যকারিতার জন্য, একটি সমৃদ্ধ আর্থিক বাজার গড়ে তোলাও প্রয়োজন, যেখানে ইসলামী শরী’আহর আলোকে গ্রহণযোগ্য সিকিউরিটিজ ছাড়াও, বিভিন্ন ধরনের সুকুক, অংশগ্রহণের মেয়াদী সার্টিফিকেট ইত্যাদিও লেনদেন করা হবে। সম্প্রতি, সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশন সুকুক সম্পর্কিত একটি প্রস্তাব তৈরি করেছে, যার সাথে একটি আইনি কাঠামোও তৈরি করা হয়েছে, যা এর প্রবর্তনের মাধ্যমে একটি নতুন প্রবণতা উন্মোচিত করেছে, কিন্তু প্রত্যাশিত ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে না। অতএব, এটিকে জনপ্রিয় এবং সহজলভ্য করার জন্য, আইনি কাঠামোর জটিলতাগুলো দূর করা উচিত এবং এটি এমনভাবে সাজানো উচিত যা বিশ্ব বাজারের সাথে তাল মিলিয়ে চলে।

ইসলামী ব্যাংকিং-এর আসল সৌন্দর্য্য বিকাশে অংশীদারিত্বমূলক বিনিয়োগ বৃদ্ধি

The true alternative to the interest is profit and loss sharing (PLS) based on Musharakah and Mudarabah. অর্থাৎ, সুদের প্রকৃত বিকল্প হচ্ছে মুদারাবা ও মুশারাকার ভিত্তিতে লাভ-লোকসানে অংশীদারিত্বমূলক ব্যবসা। যদিও ক্রয়-বিক্রয় বা ইজারা পদ্ধতিও সম্পূর্ণ শরী’আহসম্মত বিনিয়োগ পদ্ধতি। তবে এসব পদ্ধতি প্রচলিত ধারার ব্যাংকিং প্রোডাক্ট-এর সঙ্গে অনেকাংশে মিলে যায় বলে সাধারণ লোকদের মধ্যে ইসলামী ব্যাংকিং-এর সৌন্দর্য প্রকাশিত হয় না। বাংলাদেশের ইসলামী ব্যাংকসমূহ যেহেতু এখন একটি মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছে তাই ইসলামী ব্যাংকিং-এর প্রকৃত সৌন্দর্য লাভ-লোকসানে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে অর্থায়নের পরিমাণ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন (Maulana Jus- tice Muhammad Taqi Usmani, The Historic Judgment on Interest Given by the Supreme Court of Pakistan, 2002; https://www.albal- agh.net/Islamic_economics/riba_ judgement.pdf)

সহযোগী সংযোগ প্রতিষ্ঠান (Supportive Linkage Institutions) প্রতিষ্ঠা

দেশের আর্থ-সামাজিক অধিকতর ভূমিকা পালনের জন্য ইসলামী ব্যাংক ব্যবস্থার সফল বাস্তবায়ন আবশ্যক। মানবতার কল্যাণে ইসলামী ব্যাংকিং-এর সফল বাস্তবায়নের জন্য সহযোগী প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন। এ প্রসঙ্গে এম কবির হাসান এবং এম মুজাহিদুল ইসলাম-এর উদ্ধৃতি প্রণিধানযোগ্য:

In order to function properly, any system should be embedded with link institutions. It has to depend on a number of link institutions and so is the case with banking. For identifzing suitable projects, Islamic Banks can profitably draw the services of economists, lawyers, insurance companies, management consultants, auditors and so on. They also need research and training forums in order to promoting entrepreneurship amongst their clients (M. Kabir Hasan & M. Muzahidul Islam, Islamic Banking Movement in Bangladesh, Daily Sangram, P. 56, 21st Anniversary of IBBL Issue.)

অধ্যাপক শরীফ হোসেন বলেন, বর্তমান দুনিয়ায় ব্যাংক চালাতে হলে অনেক ধরনের সহযোগী প্রতিষ্ঠান থাকা জরুরি হয়ে পড়ে। যেমন, বীমা, অডিট, সুপারভাইজিং এজেন্ট, কালেকশন এজেন্ট, রেটিং প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি।

ইসলামী কমন মার্কেট প্রতিষ্ঠা করা

মুসলিম দেশসমূহের মধ্যে পারস্পরিক অর্থনৈতিক ও ব্যাংকিং সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সম্প্রতি বিভিন্ন Seminar, Symposium-a Islamic Common Market প্রতিষ্ঠার দাবি জোরদার হচ্ছে। মুসলিম দেশসমূহ উদ্যোগী হলে অদূর ভবিষ্যতে Islamic Common Market প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা উজ্জ্বল। Islamic Common Market সৃষ্টি হলে ইসলামী ব্যাংকসমূহের কার্যকারিতা বেড়ে যাবে এবং সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যাবে।

বিশ্বব্যাপী ইসলামী ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা

Globalization- এর যুগে ব্যাংকিং কার্যক্রম একটি ভূখণ্ড কিংবা দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কিন্তু বিশ্বের সকল দেশে ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু না থাকায় আমদানি ও রপ্তানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ইসলামী ব্যাংকগুলো সুদী ব্যাংকের সঙ্গে লেনদেনে বাধ্য হয়। বর্তমানে এ সমস্যা দূর হতে চলেছে। কেননা, চীন ও ইউরোপের দেশসমূহে ইসলামী ব্যাংকিং চালু হতে যাচ্ছে। এমনকি সিঙ্গাপুরের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর তাদের দেশকে ইসলামী আর্থিক সেবার কেন্দ্রে পরিণত করার মতামত ব্যক্ত করেছেন। আন্তর্জাতিক ইসলামী ব্যাংকিং Network- এ প্রবেশ করতে পারলে বাংলাদেশের ইসলামী ব্যাংকগুলো বৈদেশিক বাণিজ্যে কার্যকরী ভূমিকা নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে।

Financial Instrument উদ্ভাবন

একবিংশ শতাব্দীর অর্থবাজারে একটা সম্মানজনক অবস্থান অর্জন ও যথাযথভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হলে ইসলামী ব্যাংকিংব্যবস্থাকে অবশ্যই সনাতন ফাইন্যান্সিং-এর কিছু কিছু কাজ ইসলামী পদ্ধতিতেই করার উপায় উদ্ভাবন করতে হবে। এসবের মধ্যে রয়েছে-ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার কৌশল উদ্ভাবন, বাজারজাতযোগ্য সিকিউরিটিপত্র, পছন্দনীয় ও ফিউচার মার্কেট ইত্যাদি। ইসলামী ব্যাংকগুলোর দক্ষ কার্যকারিতার জন্য একটি সুখী-সমৃদ্ধ ফাইন্যান্সিয়াল বাজারও গড়ে তোলা প্রয়োজন, যে বাজারে ইসলামী শরী’আহর আলোকে গ্রহণযোগ্য সিকিউরিটি ছাড়াও বিভিন্ন রকমের সুকুক, পার্টিসিপেশন টার্ম সার্টিফিকেট ইত্যাদিও লেনদেন হবে। সম্প্রতি সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশন সুকুকসংক্রান্ত প্রস্তাবনা আইনি কাঠামোসহ প্রণয়ন করেছে, যা চালুর মাধ্যমে নতুন ধারা উন্মোচিত হলেও আশানুরুপ ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে না। তাই একে জনপ্রিয় ও সহজলভ্য করতে আইনি কাঠামোর জটিলতাসমূহ দূর করে বিশ্ববাজারের সাথে তাল মিলিয়ে চলার মতো করে সাজাতে হবে।

ইসলামী ব্যাংক ও অর্থায়ন খাতের জন্য স্বতন্ত্র টাস্কফোর্স গঠন করা

গ্রাহকদের আস্থা ও সাধারণ মানুষের ভালোবাসার কারণে বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং খাত দ্রুত প্রসার লাভ করেছে। রেগুলেটরি কর্তৃপক্ষের যথাযথ সমর্থন ও সহযোগিতার অভাবে এ খাত বার বার ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। এ খাতের টেকসই উন্নয়ন ও শক্তিশালী রেগুলেটরি কাঠোমোর জন্য ব্যাংকখাত, ক্যাপিটাল মার্কেট, বীমাখাত এবং সংশ্লিষ্ট রেগুলেটরদের মাঝে সমন্বয় থাকা জরুরি। এ প্রেক্ষিতে ইসলামী ব্যাংক ও আর্থিক খাতে টেকসই উন্নয়ন ও রেগুলেটরি কাঠামো সুসংহত করতে সংশ্লিষ্ট রেগুলেটর ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে স্বতন্ত্র টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে। এ টাস্কফোর্স ইসলামী ব্যাংকিং ইন্ডাস্ট্রিকে সার্বক্ষণিক মনিটরিং-এর আওতায় রাখবে। অর্থনীতি ও ইসলামী অর্থনীতি বিষয়ক এবং এ সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞদের দ্বারা অর্থমন্ত্রণালয়ের অধীনে শক্তিশালী স্বাধীন টীম এ টাস্কফোর্সের টীমে কার্যক্রম পরিচালনা করবে।

মানব সম্পদ উন্নয়ন: Islamic Man (ব্যাংকার/গ্রাহক/উদ্যোক্তা) তৈরির পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন

দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে পরিপূর্ণ সুফল পেতে হলে ইসলামী ব্যাংকব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের নৈতিকতার পূর্ণাঙ্গ অনুসারী হওয়া প্রয়োজন। ইসলামী ব্যাংক পরিচালনার জন্য রেডিমেড ইসলামী লোক পাওয়া যায় না। তাই Islamic Man তৈরির জন্য পরিকল্পিতভাবে ইসলামী ব্যাংকিং জনশক্তিকে প্রশিক্ষণদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। Internal Control System এর মূলে থাকতে হবে Islamic Man । বাংলাদেশ ব্যাংক-এর সাবেক জেনারেল ম্যানেজার আব্দুল আউয়াল সরকার এক নিবন্ধে গ্রাহকদের পরিকল্পিতভাবে Islamic Man|- এ পরিণত করার উদ্যোগ হিসেবে। Entrepreneurship Development Institute (EDI) প্রতিষ্ঠার পরামর্শ দিয়েছেন। অন্যদিকে অসৎ ব্যবসায়ীদের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে সমাজকে মুক্ত করে মানবতার কল্যাণ সাধনের জন্য ইসলামী উদ্যোক্তা তৈরির কর্মসূচি হাতে নিতে হবে। আলেমদেরকে আর্থিকভাবে এগিয়ে নেওয়ার জন্য উলামা ক্লাস্টার বা উলামা ফিন্যান্সিং স্কিম চালু করা যেতে পারে।

ইসলামী ব্যাংকগুলোর কার্যক্রমে অভিন্নতা, সমন্বয়, আন্তঃব্যাংক সহযোগিতা এবং অভিজ্ঞতা বিনিময় প্রয়োজন:

দেশে ইসলামী ব্যাংকগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এবং অসহযোগিতা বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি করে। অতএব, প্রচলিত ব্যাংকগুলোর বিপরীতে জনকল্যাণ অর্জনের জন্য ইসলামী ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য নিম্নলিখিত উদ্যোগগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে:

১. একটি অভিন্ন হিসাব ব্যবস্থা অনুসরণ করা। এই ক্ষেত্রে, AAOIFI দ্বারা বিকশিত একীভূত হিসাব ব্যবস্থা বিশ্বের অনেক দেশে অনুসরণ করা হচ্ছে। এটি বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকগুলোর জন্যও একটি মানদণ্ড হতে পারে।

২. যৌথ প্রকল্পগুলো চিহ্নিত করা এবং অংশগ্রহণ করা।

৩. বিভিন্ন অমীমাংসিত সমস্যার শরী’আহ সমাধানের জন্য মতামত বিনিময়।

৪. ইসলামী ব্যাংকগুলোর মধ্যে ইসলামী আন্তঃব্যাংক তহবিল বাজার (IIFM) শক্তিশালী করা।

৫. আন্তঃব্যাংক বিশেষজ্ঞদের বিনিময়। ইসলামী ব্যাংকগুলোর সাফল্যের জন্য, তাদের পারস্পরিক কার্যক্রমে সমন্বয় অর্জন করা যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, একই এলাকায় একাধিক ইসলামী ব্যাংক শাখা খোলা এবং অকেজো প্রতিযোগিতার পরিবর্তে সমন্বয় এবং বোঝাপড়ার মাধ্যমে কাজ করে, ইসলামী ব্যাংকগুলো আরও বেশি এলাকাকে তাদের নেটওয়ার্কের আওতায় আনতে পারে। এটি অবাঞ্ছিত প্রতিযোগিতা এড়াবে এবং বৃহত্তর উন্নয়ন ও কল্যাণ নিশ্চিত করবে।

তারল্য ব্যবস্থাপনার উপকরণ বৃদ্ধি

অপরিপক্বতার কারণে ইসলামী ব্যাংকগুলোর তারল্য ব্যবস্থাপনায় সীমিত উপকরণ রয়েছে। আর এ সীমাবদ্ধতা বাজারে প্রবেশের প্রচেষ্টায় বাঁধা সৃষ্টি করছে।

তারল্য ব্যবস্থাপনা এমন এক বন্দোবস্তের সাথে সম্পর্কিত যা যখন যেকোনও নির্ধারিত পরিমাণের অর্থ লভ্য করে তোলে। আবশ্যিকভাবেই এটা একটি সম্পদ, দায়বদ্ধতা ব্যবধান নামক ব্যবস্থাপনাগত সমস্যা। প্রতিনিধিত্বকারী একটি ইসলামী ব্যাংকের খতিয়ানপত্রের উপরি-পর্যালোচনা থেকে উন্মোচিত হয় যে, শেয়ারহোল্ডারদের তহবিল থেকে একটি অংশ, তাদের দায়বদ্ধতা প্রাধান্যপূর্ণভাবে স্বল্পমেয়াদি অথবা চলতি হিসাবের খতিয়ান। এ কারণে শেয়ারহোল্ডারের তহবিলের অতিরিক্ত কোনও বিনিয়োগ, যা সম্পদ আকারে বিনিয়োগ করা হয়েছে এবং খুব স্বল্পমেয়াদে পরিপক্বতা অর্জন করেছে; এদেরকে বেমানান হিসেবে বিবেচনা করা হবে। সুনির্দিষ্টভাবে এ উপাদানটি ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে ওই নেতিবাচক মনোভাবে বিদ্যমান রয়েছে ইসলামী ব্যাংকগুলোর আর্থিক শক্তি সম্পর্কে নিম্নমানের মূল্যায়নে। এরই ফলশ্রুতিতে আন্তর্জাতিক মান নির্ধারণী সংস্থাগুলোও নিম্নমান দিচ্ছে। তারল্য সমস্যা শুধু বিশেষভাবে ইসলামী ব্যাংকের জন্য প্রযোজ্য নয়। প্রচলিত ব্যাংকগুলোও মাঝে-মধ্যে এ সমস্যায় পড়ে। তবে তারা সহজেই এর সুরাহা করতে পারে আন্তঃব্যাংক অর্থবাজার থেকে ঋণগ্রহণ করে। প্রচলিত বাজারের সমান আকারে, মাত্রায় ইসলামী আন্তঃব্যাংক বাজারের সীমাবদ্ধতা ইসলামী ব্যাংকগুলোকে অসমর্থ করে তোলে আমানতকারীদের আমানত ওঠানোর অপ্রত্যাশিত দাবি পূরণ করতে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা এ সমস্যাটি কাটিয়ে ওঠে অধিক তারল্য সম্পদ সংরক্ষণের মাধ্যমে। প্রচলিত ব্যাংকগুলোর চেয়ে ইসলামী ব্যাংকগুলো অধিক তারল্য সম্পদ সংরক্ষণ করে। ইসলামী ব্যাংকগুলো তারল্য সম্পদ বিনিয়োগ করে পণ্য মুরাবাহাতে। এক্ষেত্রে সমঝোতাটি হয়- যে যখন প্রয়োজন হবে তখনই তারা অল্প কিছু খরচ করে নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই মুরাবাহা বাতিল করে দিয়ে তারল্য ফিরে পাবে। এটা করা হয় সংস্থার সমঝোতার ভিত্তিতে অথবা ব্যাঘাত সৃষ্টির ধারা অনুসারে।

সমস্যাটির কার্যকরী সমাধানে প্রাতিষ্ঠানিক উন্নতিকরণ এবং স্বল্প তারল্য উপকরণ উভয় প্রকারে অগ্রগতি অর্জন করতে হবে। কার্যকর পুঁজিবাজার ছাড়া ইসলামী ব্যাংকগুলোর অর্থায়ন সত্যিকার অর্থে বৃদ্ধি পাবে না। সেকেন্ডারি মার্কেট উন্নত করার জন্য বাজারের প্রয়োজন তারল্য ও মূল্যে স্বচ্ছতা। ইসলামী ব্যাংকগুলোর মধ্যে এবং তাদের ও তাদের প্রচলিত প্রতিপক্ষের মধ্যে অধিক সহযোগিতা প্রত্যাশিত। প্রচলিত ব্যাংকগুলো নগদ অর্থের উৎস হিসেবে সাধারণত সরকারি সিকিউরিটিসমূহ হাতে রাখে এবং দূরদর্শী খতিয়ানপত্র ব্যবস্থাপনা, বিধি-বিধান ও মান নির্ধারণী সংস্থার চাহিদাও পূরণ করে। ঋণ বাজারের বিকল্প কিছু দিতে ইসলামী ব্যাংকগুলোকে অবশ্যই টেকসই ও তারল্য বাজার প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং একই সময়ে কার্যকরী অর্থ ব্যবস্থাপনা উপকরণ দিতে হবে।

অনাদায়ী বিনিয়োগ আদায়ে আইনগত ও কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা

অনাদায়ী বিনিয়োগ আদায়ে দ্রুত মামলার নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করতে হবে। ঋণখেলাপিদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। প্রয়োজনে তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে তা দিয়ে ব্যাংকের দায় ও পাওনা সমন্বয় করতে হবে। বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা এবং সামাজিকভাবেও চাপ প্রয়োগ করতে হবে। কোনো রাজনৈতিক আশ্রয়ে খেলাপিরা সহায়তা না পায় সেদিকে নজর রাখতে হবে। বিভিন্ন মিডিয়ায় ইচ্ছাকৃত বিনিয়োগ খেলাপিদের তথ্য প্রকাশ করে সামাজিকভাবে হেয় করতে হবে। তাদেরকে আইনের আওতায় আনতে বিদ্যমান আইনি কাঠামোতে পরিবর্তন আনতে হবে। ঋণখেলাপী সংস্কৃতি দূর করতে আরো কঠোর পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। যেমন, এক্ষেত্রে সামাজিক বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত বিষয়াবলি হলো-

ক. তাদেরকে সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে।

খ. তাদের জানাযা বয়কট করতে হবে অথবা সীমিত আকারে জানাযার ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে মানুষ জানে যে সে ঋণখেলাপী। যেমনটি রাসূল (সা.) করতেন।

গ. তাদের সাথে সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ না হওয়া। যেমন, বিয়ে-সাদি।

ঘ. তাদের বিভিন্ন সামাজিক প্রোগ্রামকে বয়কট করতে হবে। যেমন, মুসলমানীর খাওয়া, কোনো বিশেষ উপলক্ষে দাওয়াত ইত্যাদি।

ঙ. তাদের বাসা-বাড়ির সামনে বড় সাইনবোর্ডে লিখতে হবে ‘এটি ঋণখেলাপীর বাড়ি’। প্রয়োজনে ঋণ সংক্রান্ত বিস্তারিত উল্লেখ করা যেতে পারে।

চ. তাদের ঋণখেলাপীর বিষয়টি সুনির্দিষ্ট এলাকা ও টেরিটরিতে মাইকিং করে জানিয়ে দিতে হবে।

ছ. তাদের বিরুদ্ধে পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুন লাগাতে হবে।

জ. সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের ঋণখেলাপীর বিষয়টি ব্যাপকহারে প্রচার করতে হবে।

ঝ. তাদের ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান, বাসা-বাড়ি ও অফিসের সামনে মানববন্ধন, অবরোধ ও ঘেরাও কর্মসূচি দেয়া যেতে পারে।

ঞ. তাদের আত্মীয়-স্বজনদের কাছে তাদের ঋণখেলাপীর বিষয়টি অবহিত করতে হবে।

আমার কাছে মনে হয়, এ পদক্ষেপগুলো টনিক হিসেবে কাজ করবে।

রাজনৈতিক প্রভাব মুক্ত রাখা

যেহেতু ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা গতানুগতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, তাই এখানে ব্যাংকিং দক্ষতার পাশাপাশি নৈতিক প্রশিক্ষণ ও ইসলামী ব্যাংকিং এর প্রতি পূর্ণ আনুগত্যশীল ও বিশ্বাসীরা ছাড়া এর পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখা খুবই দুরূহ। সেটি ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদ থেকে শুরু করে ব্যাংকের একজন প্রহরীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কারণ এখানে পেশাসংশ্লিষ্ট বৈষয়িক সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি ব্যক্তির মধ্যে ইসলামী মূল্যবোধ লালন ও নিজের মধ্যে প্রয়োগের মাধ্যমে পরকালীন প্রতিদান প্রাপ্তির বিষয়টিও ব্যাংকিং সফলতার পেছনে অন্যতম ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে। সেক্ষেত্রে ইসলামী ব্যাংক খাতকে গতানুগতিক ব্যাংকের মতো করে পরিচালিত করলে এখানে দিন দিন আরো ঝুঁকি বাড়ার শঙ্কাই প্রবল। এক্ষেত্রে ইসলামী ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছ ও গতিশীল ব্যাংকগুলোকে যতটা রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রভাবমুক্ত রাখা যাবে ততই সার্বিক অর্থনীতির জন্য কল্যাণকর হবে।

ইসলামী ব্যাংকিং সম্পর্কে ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরির জন্য সমন্বিত প্রচেষ্টা

ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ সুবিধা অর্জন করা সম্ভব নয় যদি এটি সীমিত সংখ্যক মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। অতএব, ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বিপুল সংখ্যক মানুষকে সম্পৃক্ত করার জন্য একটি ব্যাপক জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, সুদের পার্থিব ও ধর্মীয় কুফল, ইসলামী ব্যাংকিং এবং সুদভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য, জনকল্যাণের জন্য গৃহীত ইসলামী ব্যাংকগুলোর বিভিন্ন কর্মসূচি এবং পরিকল্পনা এবং বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার মানুষের জন্য উপযুক্ত ইসলামী ব্যাংকিং পণ্যগুলোর সাথে জনগণকে পরিচিত করার জন্য সভা, সেমিনার, সমাবেশ, সিম্পোজিয়ামের আয়োজন; এই বিষয়ে পুস্তিকা, হ্যান্ডবিল, লিফলেট, লিফলেট ইত্যাদি প্রকাশনার ব্যাপক বিতরণ। আমানতকারী এবং বিনিয়োগ গ্রাহকদের শ্রেণি অনুসারে বিভিন্ন ধরনের ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রাম আয়োজন করা যেতে পারে। ড. আহমদ এল-নাগগারের মতে, ইসলামী ব্যাংকিংয়ের সাফল্যের জন্য মনোভাব, প্রেরণা এবং আকাক্সক্ষার মতো সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবর্তন প্রয়োজন।

“Ethical Risk Rating System (ERRS)’’ চালু করা উচিত

সততা, নৈতিকতা, সততা বৃদ্ধি এবং বজায় রাখার জন্য দদনৈতিক ঝুঁকি নির্ধারণ ব্যবস্থা (ERRS) চালু করা উচিত। এখান থেকে সঠিক তথ্য সংগ্রহ করা উচিত।

“Internal Shar`ah Risk Rating System (ISRRS) ’’ চালু করা

ইসলামী ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে দদইন্টারনাল শরিয়াহ রিস্ক রেটিং সিস্টেম (ISRRS)’’ চালু করা উচিত। তাহলে জানা যাবে যে শরীয়াহ মেনে চলার ক্ষেত্রে কোন ব্যাংক কোন অবস্থানে আছে।

ইসলামী অর্থনীতি ও ব্যাংকিং উন্নয়নে অর্থায়ন

ইসলামী ব্যাংকগুলোকে শরী’আহ সম্পর্কিত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পেশাদার ডিগ্রি অর্জনের জন্য বৃত্তি এবং অর্থায়ন করা। যেমন, CIPA, CPSS ইত্যাদি। শরী’আহ-সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক মানের দ্বিমাসিক/ত্রৈমাসিক জার্নাল প্রকাশ করা উচিত। ইসলামী ব্যাংকিং এবং শরী’আহ-সম্পর্কিত বিষয়গুলো বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য এই খাতে বৃত্তির ব্যবস্থা করা। ইসলামী অর্থনীতি, অর্থায়ন এবং ব্যাংকিং সম্পর্কিত গবেষণা নিবন্ধ এবং প্রবন্ধ প্রকাশের জন্য অর্থায়ন প্রদান করা।

ইসলামী ব্যাংকিং বিষয়ক ট্রেনিং কোর্স চালু

ইতোমধ্যে ইসলামী ব্যাংকসমূহের ট্রেনিং একাডেমির পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক ট্রেনিং একাডেমি, AAOIFI Gi এবং এক্সপার্ট একাডেমিসহ আরো বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান বার্ষিক পরিকল্পনার মাধ্যমে ব্যাংকিং ইন্ডাস্ট্রির জনশক্তিকে ইসলামী ব্যাংকিংয়ে পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নিয়মিত ওয়ার্কশপ, গবেষণা প্রকল্প ও প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম চালু করেছে। আমাদের দেশে ইসলামী অর্থনীতি ও ব্যাংকিং-এর সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের জন্য AAOIFI Gi এর এডুকেশন পার্টনার হিসেবে CSAA, CPD, Certified Islamic Professional Accountant (CIPA), Certified Shariah Expert (CSE), Certified ShariÕah Auditor (CSA), CPFAS (Financial Accounting Standards) and CPSS (Shariah Standards) প্রফেশনাল কোর্সগুলো পরিপূর্ণরূপে চালু করতে বিভিন্ন একাডেমিক প্রতিষ্ঠান, সংস্থা, ফোরাম ও ইনস্টিটিউশনকে এগিয়ে আসতে হবে। এ কোর্সগুলো সহজলভ্য করতে ইসলামী ব্যাংকগুলোকে অর্থায়ন করতে হবে এবং বৃত্তিমূলক কর্মসূচি চালু করতে হবে।

অন্যান্য প্রমোশনাল কার্যক্রম

(ক) সৎ নির্বাহী/কর্মকর্তাদের উৎসাহিত/পুরস্কৃত করা: কিছু সৎ ব্যাংক নির্বাহী ও কর্মকর্তা অনিয়ম, জালিয়াতি এবং শরী’আহ লঙ্ঘন প্রতিরোধে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন যার কারণে তারা বিভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকার হন। এই পরিস্থিতিতে, তাদের অনুপ্রেরণা বৃদ্ধির জন্য, প্রয়োজনে তাদের পুরস্কৃত করা উচিত এবং ব্যাংক ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ পদে আনা উচিত।

(খ) শাখাপ্রধান/ব্যবস্থাপক/উপশাখার দায়িত্বে/ভারপ্রাপ্ত/ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপনা/বিভাগীয় প্রধান/জোনাল প্রধান/বিভাগীয় প্রধানের ACR মূল্যায়ন অধস্তন নির্বাহী/কর্মকর্তা/কর্মচারী দ্বারা করা হবে - এই পদ্ধতি চালু করা উচিত: জনবল/কর্মকর্তা/নির্বাহী/ব্যবস্থাপনার মধ্যে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য, ইসলামী ব্যাংকগুলোকে অধস্তন নির্বাহী/কর্মকর্তা/কর্মচারীদের দ্বারা ব্যাংকের বিভিন্ন স্তরের উচ্চ/ঊর্ধ্বতন নির্বাহী/কর্মকর্তাদের অঈজ মূল্যায়ন অবিলম্বে শুরু করতে হবে। ফলস্বরূপ, শরীয়ত লঙ্ঘনের জন্য অধস্তনদের উপর উচ্চতর কর্তৃপক্ষের অবৈধ চাপ এবং অন্যায্য দাবি অনেকাংশে হ্রাস পাবে। এই উদ্দেশ্যে ACR-তে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ নম্বর রাখা উচিত।

(গ) ACR দ্বারা প্রাপ্ত নম্বর সংশ্লিষ্ট নির্বাহী/কর্মকর্তা/কর্মচারীকে অবহিত করা উচিত (প্রয়োজনে): ACR তে, অনেক সময়, নির্বাহী/কর্মকর্তা/কর্মচারীরা নির্দিষ্ট নম্বরের চেয়ে কম নম্বর পান। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানেন না কেন তিনি কোন বিভাগে কম নম্বর পেয়েছেন? অতএব, সেই নির্দিষ্ট বিভাগে উন্নতি এবং সমন্বয় করার জন্য, প্রয়োজনে অঈজ দ্বারা প্রাপ্ত নম্বরগুলো সংশ্লিষ্ট নির্বাহী/কর্মকর্তা/কর্মচারীকে অবহিত করা উচিত। ফলস্বরূপ, তার যে দুর্বলতা রয়েছে তা দূর হবে এবং ভবিষ্যতে তিনি এই বিষয়ে সতর্ক থাকবেন। অন্যথায়, তিনি বারবার একই ভুল করবেন এবং বছরের পর বছর ACR তে কম নম্বর পাবেন।

এটি করার ফলে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং ব্যাংক উভয়েরই ক্ষতি হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। উন্নত বিশ্বে এই অনুশীলনটি করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, অস্ট্রেলিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইত্যাদি।

সুতরাং ইসলামী ব্যাংকিং বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প ব্যাংকিং মডেল হিসেবে বিবেচিত হলেও বর্তমানে এটি বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, খাতটি ক্রমবিকাশ লাভ করলেও শাসন কাঠামো, শরী’আহ প্রতিপালন, পণ্য বৈচিত্র্য ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার মতো বিষয়ে নীতিগত কোর্স সংশোধন অত্যাবশ্যক। উপরন্তু, উন্নয়নের জন্য সক্রিয় গবেষণা, পেশাদার ব্যবস্থাপনা ও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো প্রয়োজন, যা ইসলামী ব্যাংকিংকে আরও স্থিতিশীল, স্বচ্ছ ও টেকসই করবে। তাই বলা যায়, ইসলামী ব্যাংকিং আজ এক নীতি-ভিত্তিক “সন্ধিক্ষণে” দাঁড়িয়ে।

এটি যদি আদর্শ, প্রতিষ্ঠান এবং নীতির পুনর্গঠন করে আত্মসমালোচনা ও সংস্কারের পথ গ্রহণ করে, তবে কেবল টিকে থাকবে না, বরং আধুনিক অর্থনীতিতে নৈতিক বিকল্প হিসেবেও তার অপ্রতিরোধ্য অবস্থানকে আরো সুসংহত করবে। অন্যথায়, এটি এক প্রান্তিক ব্যতিক্রম হিসেবে পরিণত হতে পারে।

নীতিগত সিদ্ধান্ত, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন—এই তিনটি ভিত্তি ইসলামী ব্যাংকিংয়ের পুনরুত্থান নিশ্চিত করবে। এজন্য দরকার দ্রুত নীতিগত যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তার সময়োপযোগী যথাযথ বাস্তবায়ন।