ইতিহাস সাক্ষী, যখনই এদেশের আকাশ অন্যায়ের কালো মেঘে ঢাকা পড়েছে, তখনই তরুণ প্রজন্ম বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছে। জুলাইয়ের তপ্ত দুপুরে রাজপথে ঝরা রক্ত যেমন আমাদের শোকাতুর করেছে, তেমনি শিখিয়েছে এক নতুন ভোরের স্বপ্ন দেখতে। চব্বিশের এই মহাবিপ্লব কেবল একটি ক্ষমতার পরিবর্তন ছিল না, এটি ছিল রাষ্ট্র মেরামতের এক ঐতিহাসিক অঙ্গীকার। আজ তারুণ্য এমন এক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখে যেখানে প্রতিষ্ঠিত হবে নাগরিক মর্যাদা ও সুশাসন। বিশেষ করে শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করা এখন সময়ের দাবি।

শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও কর্মমুখী শিক্ষা

আমাদের রাষ্ট্রীয় সংস্কারের প্রধান ভিত্তি হওয়া উচিত শিক্ষা। কারণ একটি রাষ্ট্রের মূল হলো জনগণ। জনগণের দায়িত্বই হলো রাষ্ট্রকে আধুনিকভাবে গড়ে তোলা। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও আমরা সেই ব্রিটিশ আমলের কেরানি তৈরির শিক্ষাব্যবস্থা বয়ে বেড়াচ্ছি। আমাদের বর্তমান পদ্ধতি মূলত ‘মুখস্থনির্ভর’, যা শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতাকে গলাটিপে হত্যা করে। পরীক্ষার খাতায় তথ্যের পুনরাবৃত্তি করাকে আমরা মেধা বলে ভুল করছি। আগামীর বাংলাদেশে আমরা এমন এক শিক্ষাব্যবস্থা চাই যা শিক্ষার্থীকে কেবল পাঠ্যবইয়ের পৃষ্ঠা মুখস্থ করতে শেখাবে না, বরং তাকে জীবনমুখী ও দক্ষ করে তুলবে। মান্ধাতা আমলের এই জরাজীর্ণ পদ্ধতি ভেঙে হাতে-কলমে শিক্ষা, বিশ্লেষণধর্মী চিন্তা এবং প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক কারিকুলাম প্রবর্তন করতে হবে। আজকের গ্লোবাল ভিলেজে ফিনল্যান্ড বা জাপানের মতো দেশগুলো যখন মুখস্থবিদ্যার বদলে সৃজনশীল চিন্তা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতাকে প্রাধান্য দিয়ে বিশ্বসেরা উদ্ভাবক তৈরি করছে, আমরা তখনো মান্ধাতা আমলের কাগুজে তথ্যের বোঝা টেনে চলছি। আমাদের লক্ষ্য ফিনল্যান্ডকে অন্ধ অনুকরণ করা নয়, বরং আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির ভিত্তিতে একটি আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা। আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের যে ধৈর্য ও মেধা রয়েছে, তাকে মুখস্থবিদ্যার যাঁতাকলে নষ্ট না করে আধুনিক প্রযুক্তিমুখী করা গেলে এদেশেই অসংখ্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং বাংলাদেশেই বড় বড় টেক ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠবে। আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর ও উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমেই একটি রাষ্ট্রের জনগণ তার দেশকে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের (Industry 4.0) সাথে তাল মিলিয়ে চালাতে পারবে। যার ফলে বিদেশী টেক কোম্পানী বাংলাদেশে ব্যবসার আগ্রহ দেখাবে এবং আমরা এদেশকেই দক্ষিণ এশিয়ার ‘সিলিকন ভ্যালি’ হিসেবে গড়ে তুলতে পারব।

দুর্নীতি দূরীকরণ ও মেধাভিত্তিক নিয়োগ

একটি জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার জন্য দুর্নীতিই যথেষ্ট। আমাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে যাওয়া এই দুর্নীতির বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলা এখন সময়ের দাবি। আমরা এমন এক ব্যবস্থা চাই যেখানে কেবল যোগ্যতাই হবে নিয়োগের একমাত্র মাপকাঠি। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোনো রাজনৈতিক প্রভাব বা স্বজনপ্রীতি নয়, বরং মেধার সর্বোচ্চ মূল্যায়ন করতে হবে। মেধার অবমূল্যায়ন করে যখন অযোগ্যদের উচ্চপদে বসানো হয়, তখন পুরো প্রশাসন স্থবির হয়ে পড়ে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে একটি বৈষম্যহীন কর্মপরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। তবেই দেশ থেকে বেকারত্ব দূর হবে এবং রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি স্তরে দক্ষ ও সৎ জনবল নিশ্চিত হবে।

বিচার বিভাগ ও আইনের শাসন: একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচার বিভাগ ছাড়া কোনো দেশ উন্নত হতে পারে না। ‘আইনের শাসন’ যেন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং প্রতিটি নাগরিক যেন নির্ভয়ে ন্যায়বিচার পাওয়ার নিশ্চয়তা পায়। আইনের প্রয়োগ হতে হবে দল-মতের ঊর্ধ্বে। একটি প্রবাদ আছে, ‘Justice delayed is justice denied’-অর্থাৎ বিচার পেতে দেরি হওয়া মানেই ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়া। আগামীর বাংলাদেশে আমরা মামলার দীর্ঘসূত্রতা কমাতে ডিজিটাল জুডিশিয়ারি এবং বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধির মাধ্যমে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে চাই। অপরাধীদের কেবল নামমাত্র বিচার নয়, বরং দৃষ্টান্তমূলক কঠোর শাস্তি এবং সুনির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে রায় প্রদান নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে দুর্নীতি মামলা, ধর্ষণ ও খুনের মতো ঘৃণ্য অপরাধের ক্ষেত্রে বিচারিক দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীদের সাহস বাড়িয়ে দেয়। তাই দ্রুততম সময়ে মামলার নিষ্পত্তি ও রায় কার্যকর করার মাধ্যমেই সমাজে ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

সুস্থ ও ইতিবাচক ধারার রাজনীতি

একটি দেশের সার্বিক উন্নয়নের চাবিকাঠি হলো সেই দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি। আমাদের দীর্ঘদিনের জরাজীর্ণ রাজনৈতিক কাঠামো থেকে পেশিশক্তি, পরিবারতন্ত্র এবং প্রতিহিংসার রাজনীতি চিরতরে বিদায় করা এখন সময়ের দাবি। আগামীর বাংলাদেশে প্রতিহিংসার রাজনীতির বেড়াজাল ভেঙে যোগ্য ও শিক্ষিত তরুণদের নেতৃত্বে আসার সুযোগ তৈরি করতে হবে। তরুণ প্রজন্মের সাহসী নেতৃত্বই পারে রাজনীতিকে কলুষমুক্ত করে জনকল্যাণমুখী করতে।

আমরা এমন এক রাজনৈতিক পরিবেশ চাই, যেখানে দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হবে এবং জনকল্যাণই হবে রাজনীতির একমাত্র লক্ষ্য। রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য যেন ক্ষমতা দখল না হয়ে মানুষের সেবা করা হয়, তবেই চব্বিশের বিপ্লবের প্রকৃত উদ্দেশ্য সফল হবে।

পেছনের জরাজীর্ণতাকে পেছনে ফেলে একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ জয়ে আমরা ঐক্যবদ্ধ হবো, ইনশাআল্লাহ। আমাদের স্বপ্ন এবং শ্রমের সমন্বয়ে বাংলাদেশ হয়ে উঠবে বিশ্বের বুকে এক আদর্শ, ইনসাফভিত্তিক এবং প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক স্মার্ট রাষ্ট্র।