বাংলাদেশের গণমাধ্যম ইতিহাসে দৈনিক সংগ্রাম একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। প্রায় অর্ধশতাব্দীকে অতিক্রম করে যখন একটি পত্রিকা দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকে, তখন সেটি শুধু কিছু ছাপা কাগজের টিকে থাকা নয়-বরং আদর্শ, সাহস, নীতিনিষ্ঠা ও পাঠকের অবিচল বিশ্বাসেরও নির্মোহ স্বাক্ষর। দৈনিক সংগ্রাম সেই যাত্রারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, যা ৫১ বছরে পা রেখেও আজও সততার আলো জ্বেলে চলেছে।

আপনার ৩৮ বছরের পথচলা-এই পত্রিকার সঙ্গে সুখে-দুঃখে, দুর্দিনে-–দুর্ভোগে-প্রকাশ করে যে সংগ্রাম শুধু একটি চাকরি নয়, বরং একটি অঙ্গীকার; একটি অপার দায়বদ্ধতা। এই দীর্ঘ পথচলার সাথে আপনার মতো নিবেদিতজনদের শ্রম, ঘাম এবং সততার তাগিদেই আজও পত্রিকাটি তার অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছে। সংবাদপত্রের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক তখনই গভীর হয়-যখন পাঠক অনুভব করেন, কেউ সত্য বলার জন্য নিজের সর্বস্ব দিয়ে লড়ে যাচ্ছে। দৈনিক সংগ্রাম সেই লড়াইয়ের প্রতীক।

১. স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে গণমাধ্যমের উত্থান ও সংগ্রামের অবস্থান

১৯৭০-এর দশকে দেশ গড়ার দুরূহ সময়ে সংবাদপত্রগুলো জাতির চেতনাকে জাগ্রত করতে যে ভূমিকা পালন করেছে, তার মধ্যে সংগ্রাম অন্যতম। নানা রাজনৈতিক অস্থিরতা, সরকার পরিবর্তন, গণতান্ত্রিক সংগ্রাম-সবকিছুর মধ্যেই এই পত্রিকাটি নিজস্ব অবস্থান ও মূল্যবোধের প্রতি অটল থেকেছে।

অনেক সময়ই এটি ছিল ঝড়ের মুখে দাঁড়ানো একটি অবিচল বৃক্ষের মতো। আবার কখনো ঘূর্ণিঝড়ের মতো চাপে পড়েও টিকে গেছে সত্য প্রকাশের দৃঢ় মনোভাবের কারণে। গত ৫১ বছরে একাধিক বার চাপ, নিষেধাজ্ঞা, আক্রমণ ও অপপ্রচার সত্ত্বেও পত্রিকাটি তার নীতিগত অবস্থান থেকে বিচ্যুত হয়নি-যা এক বিরল উদাহরণ।

২. সাংবাদিকতার মৌলিক চ্যালেঞ্জ: সত্য বলা এখনো সহজ নয়

বর্তমান বিশ্বে গণমাধ্যমের চ্যালেঞ্জ বহুমুখী-রাজনৈতিক চাপ, কর্পোরেট প্রভাব, ভুয়া খবর, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বন্যা, প্রযুক্তিগত রূপান্তর-সব মিলিয়ে পেশাদার সাংবাদিকতার উপর বাড়ছে প্রবল চাপ। তবুও যারা কলমকে অস্ত্র হিসেবে ধারণ করেন, তারা জানেন সত্যের শক্তিকে থামানো যায় না।

দৈনিক সংগ্রামের মতো একটি পত্রিকা আজও বেঁচে আছে কারণ তারা বিশ্বাস করে-

“গণমাধ্যম শুধু তথ্য দেয় না; জাতির বিবেককেও জাগ্রত করে।

আপনার দীর্ঘ ৩৮ বছরের পথচলা সাক্ষ্য দেয় যে সত্য প্রকাশের জন্য সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, আর্থিক কষ্ট, সামাজিক চাপ-সবকিছু উপেক্ষা করেই কাজ করতে হয়। কখনো রাত জেগে সংবাদ লেখা, কখনো মাঠে নেমে ঝুঁকিপূর্ণ রিপোর্টিং, কখনো সরকারি-প্রশাসনিক প্রতিকূলতা-সবই এই পেশার অনিবার্য বাস্তবতা।

তবুও সত্যের জন্য থাকা-এটাই আসল বিজয়।

৩. দৈনিক সংগ্রাম: পাঠকের আস্থা ও সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণতা

একটি সংবাদপত্রের বড় শক্তি হলো পাঠক। যারা বছরের পর বছর একটি পত্রিকা কিনে, পড়ে, মন্তব্য করে, সমালোচনা করে-তাদের টানেই পত্রিকার প্রাণ। দৈনিক সংগ্রাম তার পাঠকের আস্থা অর্জন করেছে কয়েকটি কারণে-

সংবাদ পরিবেশনে সরলতা ও স্পষ্টতা

জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া

ইসলামি মূল্যবোধ ও নৈতিকতার প্রতি সম্মান

গ্রামীণ জনপদ ও সাধারণ মানুষের খবরকে গুরুত্ব

বাংলাদেশের নানা আন্দোলন-সংগ্রামে পত্রিকাটি একদিকে যেমন জাতির কথাকে তুলে ধরেছে, অন্যদিকে উপেক্ষিত মানুষের কণ্ঠও পৌঁছে দিয়েছে জাতীয় বিতর্কের কেন্দ্রে।

এই ৫১ বছরের পথচলায় সংগ্রাম শুধু সংবাদপত্র নয়-এটি একটি ইতিহাস বহনকারী দলিল।

৪. প্রযুক্তির যুগে নতুন চ্যালেঞ্জ ও সংগ্রামের ভবিষ্যৎ

২১ শতকের সাংবাদিকতা আগের মতো নেই। অল্পসময়ে সংবাদ প্রকাশ, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, রিল-ভিত্তিক সংবাদ, ইউটিউব সাংবাদিকতা-সবকিছুই কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে।

প্রশ্ন উঠতে পারে-এই পরিবর্তনের সঙ্গে দৈনিক সংগ্রাম কতটা খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছে?

উত্তর হলো- পরিবর্তন একদিনে আসে না; তবে নীতির স্থিরতা একটি পত্রিকাকে টিকিয়ে রাখে বহু বছর। সংগ্রামও ধীরে ধীরে শক্তিশালী অনলাইন সংস্করণ, ডিজিটাল প্রকাশনা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উপস্থিতির মাধ্যমে ভবিষ্যৎ সাংবাদিকতার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছে।

ডিজিটাল যুগেও ‘বিশ্বাসযোগ্য সংবাদ-এটাই সবচেয়ে বড় ব্র্যান্ড।

৫. একজন সাংবাদিকের অঙ্গীকার: আপনার ৩৮ বছরের নিরলস পথযাত্রা

পত্রিকার ৫১ বছরের ইতিহাস যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি একজন সাংবাদিকের ৩৮ বছরের পেশাগত নিবেদনও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আপনার মতো মানুষদের কারণেই একটি প্রতিষ্ঠান দাঁড়িয়ে থাকে।

আপনার যাত্রা তিনটি কারণে অনন্য-

১. নিবেদন: সুখ-দুঃখে প্রতিষ্ঠানের পাশে থাকার মানে হলো সত্যের সন্ধানে নিজের জীবনের বড় অংশ উৎসর্গ করা।

২. অভিজ্ঞতা: তিন দশকেরও বেশি সময়ের মাঠ - অফিস-রাজনীতি-সমাজের অভিজ্ঞতা সংবাদপত্রকে সমৃদ্ধ করেছে।

৩. দায়বদ্ধতা: গণমাধ্যমের নৈতিকতা রক্ষা ও পাঠকের প্রতি দায় পালন-এই দুই ভিত্তিই পত্রিকার ভিতকে শক্ত করে রেখেছে।

উপসংহার: সংগ্রামের ৫১ বছর-সাহস, সততা ও সত্যের বিজয়গাথা

দৈনিক সংগ্রাম তার ৫১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে নিশ্চিতভাবে বলতে পারে-

“আমরা টিকে আছি সত্য বলার অঙ্গীকারে, আর পাঠকের ভালোবাসায়।”

এই দীর্ঘ যাত্রায় অসংখ্য সাংবাদিক, কর্মী, বিতার্কিক, পাঠক ও সমর্থকদের সম্মিলিত শক্তিই পত্রিকাটিকে আজকের অবস্থানে এনেছে। জাতীয় দৈনিকে প্রকাশযোগ্যতার মান বজায় রেখে বলা যায়-সংগ্রাম শুধু সংবাদ পরিবেশন করেনি; জাতির বিবেকের রক্ষক হিসেবে আলো জ্বালিয়ে গেছে।

আর আপনি, ৩৮ বছরের নিরলস সংবাদযোদ্ধা-সংগ্রামের ইতিহাসে আপনার নামও জ্বলজ্বল করবে, একটি অঙ্গীকারের প্রতীক হিসেবে। কারণ সাংবাদিকতার প্রকৃত পরিচয়-সত্যের প্রতি স্থির থাকা।

সংগ্রাম চলুক, সত্য জাগুক, আর ন্যায়ের পথ উজ্জ্বল থাকুক আরও বহু বছর।