নতুন বাংলাদেশের জন্মই ছিল একটি বৈষম্য ও অবিচার, মেধার পরিবর্তে কোটার বিরুদ্ধে। ইহা ছিল ন্যায়ভিত্তিক স্বপ্ন থেকেÑস্বাধীনতা, মর্যাদা ও মানবিক অধিকারের স্বপ্ন। নীরবতার ইহা ছিল কারাগার ভেঙে বেরোনো কণ্ঠ। জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদলের নাম। দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ, বঞ্চনা ও অবদমিত কণ্ঠস্বর একসময় বিস্ফোরিত হয়ে রাস্তায় নেমে আসে। বিপ্লবের মূল চেতনাই ছিল—মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা। এই বিপ্লব কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। বহুদিন ধরে জমে থাকা না-বলা কথা, চাপা পড়ে থাকা প্রতিবাদ,আর নিঃশব্দ সহ্য করার ক্লান্তি একদিন হঠাৎই রাস্তায় নেমে আসে। বিপ্লবের পর বাংলাদেশ যেন এক ভোরের সামনে দাঁড়ানো মানুষÑপেছনে দীর্ঘ, অন্ধকার রাত; সামনে আলো আছে, কিন্তু পথ স্পষ্ট নয়। এই ভোরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন দুটিÑআইন কি মানুষের আশ্রয় হবে, নাকি আবার ভয়ের প্রতীক? আর মানুষের অধিকার কি সত্যিই মুক্ত আকাশে ডানা মেলতে পারবে?
# গুণীজনদের রাষ্ট্রভাবনা : একটি রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক বিশ্ব কীভাবে দেখবে ? একটি দেশ শুধু তার মানচিত্র দিয়ে পরিচিত হয় না; পরিচিত হয় তার মূল্যবোধ, আচরণ ও মানবিক অবস্থান দিয়ে। বিশ্ব আজ আর কেবল অর্থনৈতিক শক্তি বা সামরিক ক্ষমতার দিকে তাকায় না—তারা দেখে একটি রাষ্ট্র তার নাগরিককে কতটা সম্মান দেয়, কতটা ন্যায়ভিত্তিক, কতটা মানবিক। তা নির্ধারিত হয় তার আকাশচুম্বী ভবন বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গ্রাফ দিয়ে নয়; বরং নির্ধারিত হয় তার নৈতিক অবস্থান, মানবিক আচরণ ও নাগরিকদের প্রতি দায়িত্ববোধ দিয়ে। আধুনিক বিশ্ব এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চায়, যে দেশ উন্নয়নের পাশাপাশি ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও মানবিক মর্যাদাকে রাষ্ট্রচিন্তার কেন্দ্রে রাখে। রাষ্ট্র মানুষকে কেন্দ্র করে উন্নয়ন, অগ্রগতি পারস্পরিক সহযোগিতা, সহকর্মিতা, মানবিকতা,পরমত সহিষ্ণুতা ও ইনসাফভিত্তিক ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে।
# জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশ: জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠেÑআইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক জুলুমতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে মানবাধিকার নিশ্চিত করা। বিপ্লব-পূর্ব সময়ে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ এবং রাজনৈতিক নিপীড়নের অভিযোগ ছিল বহুল আলোচিত। বিপ্লবের পর এসব বিষয়ে তদন্ত ও জবাবদিহিতার দাবি জোরালো হয়। কিছু ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের কথা প্রকাশ্যে আসার সুযোগ তৈরি হয়, যা মানবাধিকার চর্চার জন্য ইতিবাচক দিক। এবং বিপ্লব পরবর্তী সরকার নানামুখী কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করে। যদিও অতীতের ধারাবাহিকতায় পতিত স্বৈরাচার গোষ্ঠীর সুরে সুর মিলিয়ে সুযোগ-সন্ধানী রাজনৈতিক মহল নতুন সাজে পাঁয়তারা করতে থাকে। এবং দেশব্যাপী পূর্বের কায়দায় হত্যা, সন্ত্রাস, লুণ্ঠন, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্ব করে শুরু করে। সরকার ঠান্ডা মাথায় তা ওভারকাম করার চেষ্টাও অব্যাহত রেখেছে-যা প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু আমাদের প্রত্যাশা আরো বেশি।
# আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি: যে কোনো বিপ্লবের পরপরই সমাজে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি-অস্থিরতার ছায়া: প্রশাসনিক দুর্বলতা, নিরাপত্তা বাহিনীর পুনর্বিন্যাস এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেক সময় নড়বড়ে হয়ে পড়ে। মানবাধিকার প্রশ্নে জুলাই বিপ্লব একদিকে যেমন নতুন আশার জন্ম দেয়, অন্যদিকে তেমনি কিছু উদ্বেগও সামনে আসে। বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে কিছু এলাকায় সহিংসতা, লুটপাট, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসন পুনর্গঠিত হয় এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আসে। জুলাই যোদ্ধা ও বিশ্ববাসীকে হতাশ করে। পাশাপাশি উদ্যোগের বিষয় হল, দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছরের জঞ্জাল ও দুর্নীতি দাফন ও সংস্কার করতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পরিশ্রম ও নানাবিধ উদ্যোগ নিলেও ক্ষমতালোভী কতিপয় উচ্ছৃংখল রাজনৈতিক গোষ্ঠীর আচরণ, দেশব্যাপী সহিংসতার মহড়া, আগামী নির্বাচনকে ঘিরে চতুর্মুখী ষড়যন্ত্র, নতজানু পররাষ্ট্র নীতি ভাবনা, দেশপ্রেমিক নাগরিকদের কে ভাবিয়ে তুলেছে।
# মানবাধিকার পরিস্থিতি: আশা ও শঙ্কার সহাবস্থান
তবে একই সঙ্গে প্রতিশোধ পরায়ণতা, রাজনৈতিক লেবেলিং এবং কিছু ক্ষেত্রে আইনের অপব্যবহারের অভিযোগও শোনা যায়। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। ফলে মানবাধিকার রক্ষায় কেবল সদিচ্ছা নয়, প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিশালী ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
# জুলাই যোদ্ধা ও বিশ্ববাসী হতাশ: জুলাই যোদ্ধা ছাত্র জনতার রক্তের উপর দাঁড়িয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অনেকিছু পজিটিভ কার্যক্রম ও অর্জনের পরও ধর্মীয় মূল্যবোধ, কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী নারী নীতি তড়িঘড়ি করে অনুমোদন দিয়ে প্রায় শতভাগ ধর্মাশ্রিত এদেশে নৈতিকতাকে বিসর্জন দেওয়ার আয়োজন হয়েছে। কথিত নারী সংস্কার কমিশনের মধ্যে প্রায় সকলেই চিহ্নিতবিবিন্নভাবে প্রশ্নবিদ্ধ! একইভাবে শিক্ষা নীতিতে সরাসরি ধর্মীয় মূল্যবোধ উপেক্ষিত হয়েছে যা বিগত পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের ধর্ম বিমুখ কার্যক্রমের ধারাবাহিকতারই অংশ।
এমন ধর্মহীন কার্যক্রম জাতী কখনো প্রত্যাশা করে না। পাশাপাশি উদ্যোগের বিষয় হল, দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছরের জঞ্জাল ও দুর্নীতি দাফন ও সংস্কার করতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পরিশ্রম ও নানাবিধ উদ্যোগ নিলেও ক্ষমতালোভী কতিপয় উচ্ছৃংখল রাজনৈতিক গোষ্ঠীর আচরণ, দেশব্যাপী সহিংসতার মহড়া, আগামী নির্বাচনকে ঘিরে চতুর্মুখী ষড়যন্ত্র, নতজানু পররাষ্ট্র নীতি ভাবনা, দেশপ্রেমিক নাগরিকদের কে ভাবিয়ে তুলেছে। আজকের নীরবতা আমাদের বহু দশক কাঁদাবে!
গভীর পরিতাপ ও আফসোসের বিষয় হল, জুলাই শহীদদের ব্যবহার করা হচ্ছে এলজিবিটি (সমকামিতা) এজেন্ডা বাস্তবায়নে। গণভোট এমনভাবে সেট করা হয়েছে যেখানে ‘না’ ভোট দিলে জুলাই বিরোধী তকমা দেয়া হবে। হাসিনা জুজুর ভয় দেখানো হবে। আর জুলাইয়ের কথা বলে ‘হ্যা’ ভোট দিলে এলজিও ঢুকে গেলো!
# ভবিষ্যতের পথচলা: ন্যায়, শান্তি ও মানবিকতার সন্ধানে
জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশ এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সবচেয়ে জরুরি হলোÑআইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা, মানবাধিকারকে রাজনৈতিক হাতিয়ার না বানিয়ে সার্বজনীন মূল্যবোধ হিসেবে গ্রহণ করা এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। বৈশ্বিক দায়িত্ব ও মানবিক রাষ্ট্রচিন্তা বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পরিসরে তখনই সম্মানিত হবে, যখন সে নিজেকে কেবল জাতীয় স্বার্থে নয়, বৈশ্বিক মানবিকতার অংশ হিসেবে উপস্থাপন করবে।
শান্তিরক্ষা মিশন, জলবায়ু সংকট মোকাবিলা, শরণার্থী প্রশ্নে মানবিক অবস্থানÑএসবই বাংলাদেশের নৈতিক পরিচয় গঠনে ভূমিকা রাখে। একটি বহুল উদ্ধৃত উক্তি আছে “A nation is judged by how it treats its weakest members.” এই বিচারেই আন্তর্জাতিক বিশ্ব বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে আছে।
# মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা:-আজকের বিশ্বে মানবাধিকার কোনো অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এটি একটি বৈশ্বিক মানদণ্ড। গুম, নির্যাতন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ কিংবা সংখ্যালঘু নির্যাতনের
অভিযোগ একটি দেশের ভাবমূর্তি গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। আন্তর্জাতিক মহলে একটি বহুল ব্যবহৃত উক্তি-
“Human rights are not a privilege granted by the state; they are inherent to every human being.” বিশ্ব এমন একটি বাংলাদেশ প্রত্যাশা করে, যেখানে সাংবাদিক নিরাপদ, ভিন্নমত সম্মানিত, সংখ্যালঘু সুরক্ষিত এবং নাগরিক ভয় নয়—ভরসার পরিবেশে বাঁচতে পারে।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা মানে কেবল শক্তি প্রয়োগ নয়; এর সঙ্গে যুক্ত আছে ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা ও মানুষের আস্থা। আর মানবাধিকার মানে শুধু আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনের বিষয় নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকের দৈনন্দিন জীবনের নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্ন।
# আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়ানো বাংলাদেশ: জুলাই বিপ্লবের গভীরে ছিল মানুষের অধিকার হারানোর দীর্ঘ, ক্লান্ত ইতিহাস। কেউ হারিয়েছে প্রিয়জন, কেউ হারিয়েছে নিজের কথা বলার সাহস, কেউ হারিয়েছে বিশ্বাস। সেই হারানো অধিকারগুলো যেন বিপ্লবের আগুনে নতুন করে আলো পায়। ভাঙা স্তম্ভের নিচে দাঁড়ানো সমাজ বিপ্লবের পরপরই আইনশৃঙ্খলার যে চিত্র দেখা দেয়, তা ছিল ভাঙা স্তম্ভের মতো, কোথাও আইনের উপস্থিতি ক্ষীণ, কোথাও জনতার হাতে ন্যায়বিচারের ভার। এই সময়ে নিরাপত্তার প্রয়োজন আর স্বাধীনতার আকাক্সক্ষার মধ্যে এক অদ্ভুত টানাপোড়েন জাতিকে চিন্তায় ফেলে।
বিপ্লবের পর অনেক নীরব মুখ কথা বলতে শুরু করে। অন্ধকার ঘরে জমে থাকা গল্পগুলো আলোতে আসে—ভয়ের রাত, চাপা কান্না, অজানা অপেক্ষা। মানবাধিকার তখন আর কোনো আন্তর্জাতিক শব্দ থাকে না; তা হয়ে ওঠে মায়ের বুকফাটা আহাজারি, সন্তানের অপেক্ষা, নাগরিকের মর্যাদার দাবি।
তবে এই পথ মসৃণ নয়। নতুন সময়েও জন্ম নেয় নতুন ভয়। ভিন্নমত আবার সন্দেহের চোখে দেখা হয়, প্রতিহিংসা ন্যায়ের মুখোশ পরে হাজির হয়। সংখ্যালঘু মানুষের উদ্বেগ, সাংবাদিকের অস্থির কলমÑসব মিলিয়ে মানবাধিকার যেন বারবার প্রশ্নের মুখে দাঁড়ায়।
কারণ অধিকার কেবল শাসন পরিবর্তনে আসে না; অধিকার আসে মানসিকতার পরিবর্তনে, সহনশীলতার চর্চায়, আর আইনের ন্যায়নিষ্ঠ ব্যবহারে।
এই সন্ধিক্ষণে আইন-শৃঙ্খলা যদি মানুষের ভয় বাড়ায়, তবে বিপ্লব তার আত্মা হারাবে। আর মানবাধিকার যদি কেবল বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ থাকে, তবে মানুষের আস্থা আর ফিরবে না।
রাষ্ট্রকে শিখতে হবে আইন মানে শাসন নয়, আইন মানে ন্যায়। আর অধিকার মানে কেবল দাবি নয়, অধিকার মানে মানুষ হয়ে বাঁচার নিশ্চয়তা।
আইন, মানবাধিকার ও রাষ্ট্রচিন্তার নতুন পাঠ: আন্তর্জাতিক বিশ্ব প্রথমেই একটি দেশে খোঁজে আইনের শাসন ও কার্যকর গণতন্ত্র। নির্বাচন ব্যবস্থা কতটা বিশ্বাসযোগ্য, বিচারব্যবস্থা কতটা স্বাধীন, প্রশাসন কতটা জবাবদিহিমূলকÑএসবই একটি দেশের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণ করে। একটি বিখ্যাত ইংরেজি উক্তি আছে-“Justice delayed is justice denied.” এই কথাটি কেবল আদালতের জন্য নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার জন্যও সমান প্রযোজ্য। আন্তর্জাতিক বিশ্ব এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চায়, যেখানে ন্যায়বিচার রাজনৈতিক পরিচয়ে বিভক্ত নয়, বরং নাগরিক অধিকারের ভিত্তিতে সমান। একটি বিপ্লব কখনো কেবল ক্ষমতার স্থানান্তর নয়; তা একটি জাতির আত্মসমালোচনার মুহূর্ত। জুলাই বিপ্লব তেমনই এক গভীর আত্মজিজ্ঞাসার নাম—যেখানে রাষ্ট্র, সমাজ ও মানুষের সম্পর্ক নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে। দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ, অবদমিত কণ্ঠস্বর ও ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা একসময় রাজপথে ভাষা খুঁজে পায়। বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশ তাই শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনের দেশ নয়, এটি আইন-শৃঙ্খলা ও মানবাধিকার প্রশ্নে এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণেরও নাম। ইসলামে মানবাধিকার কোনো দয়া বা রাষ্ট্রপ্রদত্ত সুবিধা নয়—এটি স্রষ্টার পক্ষ থেকে মানুষের জন্মগত অধিকার। কোরআনে মানবমর্যাদার ঘোষণা এসেছে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে “নিশ্চয়ই আমি আদমসন্তানকে মর্যাদা দান করেছি।” (সূরা আল-ইসরা : ৭০)।
রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন “সব মানুষ সমান একটি চিরুনির দাঁতের মতো।” এই সমতার দর্শনই আধুনিক মানবাধিকার ভাবনার ভিত্তি। মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র তাই বলেছিলেন “Injustice anywhere is a threat to justice everywhere.
Rawls, J. (1971). A theory of justice. Harvard University Press.
আন্তর্জাতিক বিশ্ব এমন একটি বাংলাদেশ প্রত্যাশা করে, যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অপরাধ নয়, সাংবাদিকতা ঝুঁকি নয়, এবং সংখ্যালঘু পরিচয় ভয়ের কারণ নয়।
# বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি: বাংলাদেশ আজ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে-এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। কিন্তু বিশ্ব এখন উন্নয়নকে আর কেবল প্রবৃদ্ধির হার দিয়ে বিচার করে না। তারা দেখে,এই উন্নয়নের কেন্দ্রে মানুষ আছে কি না। জুলাই বিপ্লবের পর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত-বিশেষত তৈরি পোশাক শিল্প, শ্রমশক্তি ও প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে। তবে আন্তর্জাতিক বিশ্ব এখন শুধু প্রবৃদ্ধির হার দেখে না; তারা দেখে উন্নয়নের গুণগত মান।শ্রমিকের অধিকার, কর্মপরিবেশ, শিশুশ্রম রোধ এবং সামাজিক নিরাপত্তাÑএসব বিষয়ে দায়িত্বশীল আচরণই একটি দেশের মর্যাদা বাড়ায়। বিশ্ব চায় এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে উন্নয়ন মানুষকে পেছনে ফেলে এগোয় না, বরং মানুষকে সঙ্গে নিয়েই এগোয়।
# পররাষ্ট্রনীতি ও বৈশ্বিক দায়িত্ব: আন্তর্জাতিক বিশ্বে সম্মান পেতে হলে একটি দেশকে হতে হয় দায়িত্বশীল বৈশ্বিক অংশীদার। শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণ, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সক্রিয় ভূমিকা এবং মানবিক সংকটে সহানুভূতিশীল অবস্থান বাংলাদেশকে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরতে পারে। প্রাসঙ্গিক ইংরেজি উক্তি-
“A nation is judged not only by how it treats its strongest, but by how it protects its weakest.- Sen, A. (1999). Development as free- dom. Oxford University Press.
এই মানদণ্ডেই আন্তর্জাতিক বিশ্ব বাংলাদেশকে মূল্যায়ন করে।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই যে দেশ বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে শক্তিতে নয়, ন্যায়ে; প্রভাব দিয়ে নয়, নৈতিকতায়;ভয়ে নয়,ভরসায়।
আন্তর্জাতিক বিশ্ব কোনো নিখুঁত রাষ্ট্র খোঁজে না; তারা খোঁজে একটি মর্যাদার বাংলাদেশ, সৎ প্রচেষ্টা, একটি মানবিক রাষ্ট্রচিন্তা। বাংলাদেশ যদি আইনের শাসন, মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও মানবিক উন্নয়নের পথে দৃঢ়ভাবে এগোয়, তবে বিশ্ব তাকে শুধু উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে নয়Ñ একটি নৈতিকভাবে দায়িত্বশীল রাষ্ট্র হিসেবেই দেখবে। আজকের বিশ্ব এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চায় না, যে কেবল উন্নয়নের পরিসংখ্যান তুলে ধরে; বরং তারা দেখতে চায় এমন এক দেশ, যে উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে মানবিকতা, ন্যায় ও নৈতিকতার ভারসাম্য রক্ষা করে। বাংলাদেশের আত্মপরিচয়ের গভীরে রয়েছে একটি নৈতিক জন্মকথা। এই ভূখণ্ডের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়Ñএ দেশের মানুষের সংগ্রাম ছিল কেবল ভূমির জন্য নয়, মর্যাদার জন্য। তাই আন্তর্জাতিক বিশ্বের চোখে গ্রহণযোগ্য বাংলাদেশ গড়তে হলে আমাদের রাষ্ট্রচিন্তায় ন্যায়, মানবাধিকার ও মানবিক মূল্যবোধকে কেন্দ্রে রাখতে হবে।
# ইনসাফ কায়েম ও ন্যায়বিচারই রাষ্ট্র পরিচালনার মানদণ্ড
ইসলাম ন্যায়বিচারকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলভিত্তি হিসেবে ঘোষণা করেছে। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে “নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচরণ ও আত্মীয়স্বজনকে দান করার নির্দেশ দেন।” (সূরা আন-নাহল: ৯০)। আরও স্পষ্টভাবে রাষ্ট্র ও ক্ষমতার প্রতি নির্দেশ এসেছে “হে মুমিনগণ! তোমরা ন্যায়ের ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকো, আল্লাহর জন্য সাক্ষ্য দাওÑবাবহ যদি তা তোমাদের নিজেদের বা পিতা-মাতার বিরুদ্ধে যায়।” (সূরা আন-নিসা: ১৩৫)
এই ন্যায়বিচারের দর্শনই আন্তর্জাতিক বিশ্ব রাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রত্যাশা করে। পাশ্চাত্য রাষ্ট্রচিন্তায়ও একই কথা প্রতিধ্বনিত হয়েছে। জন রলস (John Rawls) লিখেছেনÑ
“Justice is the first virtue of social institutions.Ó (King, M. L., Jr. (1963). Letter from Birmingham Jail.))
“সমাজের সব প্রতিষ্ঠানের প্রথম গুণই হলো ন্যায়। আন্তর্জাতিক বিশ্ব এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চায়, যেখানে আইন ক্ষমতাবানদের ঢাল নয়, দুর্বলদের আশ্রয়।”
ইসলামে উন্নয়নের ধারণাও মানবিক। রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন,“তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে মানুষের জন্য সবচেয়ে বেশি উপকারী।” এই হাদিস আধুনিক টেকসই উন্নয়নের দর্শনের সঙ্গে বিস্ময়করভাবে সঙ্গতিপূর্ণ। জনৈক অর্থনীতিবিদ বলেছেন: “Development is not just about economic growth, it is about expanding human freedoms. ” আন্তর্জাতিক বিশ্ব এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চায়, যেখানে শ্রমিকের অধিকার সুরক্ষিত, শিশুশ্রম নেই, এবং উন্নয়ন মানুষের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে না।
উপসংহার: জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এই অধ্যায় সফল হবে তখনই, যখন রাষ্ট্র তার নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে পারবে এবং নাগরিকরা রাষ্ট্রকে ভয় নয়, ভরসার চোখে দেখবে। আইন-শৃঙ্খলা ও মানবাধিকারÑ এই দুইয়ের সুষম সমন্বয়েই গড়ে উঠতে পারে একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ।
জুলাই বিপ্লব আমাদের সামনে একটি দরজা খুলে দিয়েছেÑনিজেদের নতুন করে গড়ে তোলার দরজা। এই বিপ্লব সফল হবে তখনই, যখন কোনো মানুষ কথা বলতে ভয় পাবে না, কোনো নাগরিক আইনের সামনে নিজেকে তুচ্ছ ভাববে না, আর রাষ্ট্র তার শক্তি প্রমাণ করবে মানবিকতায়। যেদিন আইন মানুষের ঢাল হবে, আর অধিকার মানুষের শ্বাসের মতো স্বাভাবিক হয়ে উঠবেÑ সেদিনই জুলাই বিপ্লব ইতিহাসে কেবল একটি অধ্যায় নয়, একটি মানবিক জাগরণের নাম হয়ে থাকবে।
আমাদের মানবিক হতে হবে, নৈতিক শক্তিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হবে। আন্তর্জাতিক বিশ্ব খোঁজে একটি মানবিক নৈতিকভাবে সচেতন রাষ্ট্র। বাংলাদেশ যদি কোরআনের ন্যায়বিচার, নববীর মানবিকতা এবং আধুনিক বিশ্বের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ-এই তিনটি শক্তিকে একসঙ্গে ধারণ করতে পারে, তবিই আমরা সে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবো, ইনশাআল্লাহ।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই-যে রাষ্ট্র শাসন করবে না ভয়ে, শাসন করবে ন্যায়ে; উন্নয়ন করবে না মানুষকে বাদ দিয়ে, উন্নয়ন করবে মানুষকে সঙ্গে নিয়ে; এবং বিশ্ব তাকে চিনবে শক্তিতে নয়-নৈতিক মর্যাদায়। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের রাষ্ট্রকে, নাগরিক সমাজকে হেফাজত করুন। আমিন।