রাজ্যধিপতি থেকে প্রশাসক, রাষ্ট্রের উপদেষ্টা থেকে তত্ত্বাবধায়ক-সর্ব ক্ষেত্রে ছিলো মুমিন নারীদের বিচরণ। এই রূপকথার গল্পের মতো সময়টি ছিলো ইসলামের স্বর্ণালী যুগটি যা ৭ম শতাব্দী থেকে শুরু করে পরবর্তী প্রায় ১৩০০ বছরের খিলাফত তথা ইসলামী শাসনামল নামে পরিচিত। হাজার হাজার মুসলিম নারী আইনবিদ, বিজ্ঞানী, রাজনীতিবিদ, বিচারক, ভাষাবিদ, জ্ঞানসাধক ও সর্বোপরি আদর্শ মা ও স্ত্রী হিসাবে অনবদ্য ভূমিকা রেখেছিলো ইসলামের ইতিহাসে।

“আর আমি আপনাকে পূর্ববর্তী নবীগণের এমন সব ঘটনা শোনাচ্ছি, যা দ্বারা আমি আপনার অন্তরকে শক্তিশালী করি। আর এগুলোর মধ্য দিয়ে আপনার কাছে সত্য বাণী এসেছে এবং মুমিনদের জন্য উপদেশ ও স্মারক রয়েছে।” (১১:১২০)

একটি আদর্শ জীবন গড়তে ইতিহাসের মহান ব্যক্তিত্বদের জীবন অধ্যয়নের উপর গুরুত্বারোপ করে সুরা হুদের এই আয়াতটি। ইসলামি শাসনামলে অগণিত মহিমান্বিত নারীগণ রাজনৈতিক অঙ্গনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন বলে আমরা ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখতে পাই। তেমনই কয়েকজন মহীয়সী নারীর কথা তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

১। রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়ন

আয়েশা বিনতে আবু বকর (রা.)-

যে কোনো রাষ্ট্র পরিচালনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো আইন প্রণয়ন। আয়েশা রা. ছিলেন অন্যতম একজন শ্রেষ্ঠ আইন বিশারদ।

ঈমাম শা’বী তাঁর কাছে বিভিন্ন জটিল বিষয়ে আইনি সহায়তা চাইতেন এবং তাঁর ইসলাম ভিত্তিক আইনি দক্ষতা দেখে মুগ্ধ হতেন। ১

ঈমাম আবু ওমরের মতে, আয়েশা রা. তাঁর যুগে তিনটি শাস্ত্রে অদ্বিতীয় ছিলেন; তারমধ্যে অন্যতম হলো ফিকহ বা ইসলামিক আইন।২

ঈমাম ইবনে কাসীর বলেন আয়েশা রা. এমন সব আইনি সমাধান করে দিতেন যা ছিলো অতুলনীয় ও অনন্য।৩

ঈমাম যারকাশী বলেন,’ খলিফা উমার রা. এবং খলিফা আলী রা. তাদের রাজ্য পরিচালনার জন্য বিভিন্ন আইনি সমাধান নিতে আসতেন।৪

ঈমাম যাহাবী রাহি. এর মতে উম্মুল মু’মিনীন আয়েশা রা. ছিলেন উম্মতের শ্রেষ্ঠতম নারী আইন বিশেষজ্ঞ।৫

ঈবনে যুহরীর মতে মানুষের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টিকারী সকল ধরনের আইনের অস্পষ্টতা যিনি সর্বপ্রথম দূর করেন এবং আইনের সঠিক ব্যাখ্যা প্রদান করেন তিনি হলেন আয়েশা রা.।৬

ইসলামে স্বর্ণ যুগে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নানা রকম প্রশ্নের উত্তর ও আইনি উপদেশ গ্রহণ করতে আয়েশা রা. এর বাড়িতে আসতেন এবং তিনি তাঁর বাড়ির কক্ষ থেকে আড়ালে সেসব প্রশ্নের উত্তর দিতেন।৭

আয়েশা রা. তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আবু বকর, উমার ও উসমানের খেলাফতকালে স্বতন্ত্র ও স্বাধীনভাবে আইন প্রণেতা হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনায় অবদান রেখেছিলেন।৮

আমারাহ বিনতে আব্দুর রহমান

তিনি আয়েশা রা. এর হাত ধরেই পরবর্তীতে ফতোয়া প্রদানের যোগ্য নারী হয়ে ইসলামিক রাষ্ট্র গঠনে অবদান রেখেছিলেন।

ওমর (রা.) এবং উসমান (রা.) এর খিলাফত কালে আইন ও বিচার উপদেষ্টা ছিলেন উম্মে আমারাহ (রা.)। ৯

আয়িশা আল বানিয়্যা- তিনি ছিলেন দামেস্কের একজন বিশিষ্ট আইনজ্ঞ এবং ইসলামিক চিন্তাবিদ। ইসলামী আইন বিষয়ক তার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রচনা রয়েছে।

মুফতি উম্মে আল বানিন : ১৪২৭ খ্রিষ্টাব্দে মরক্কোর একজন প্রসিদ্ধ আইনবিদ।

২। রাজনৈতিক উপদেষ্টা

উম্মে সালামা (রা.)-

হুদাইবিয়ার সন্ধি চুক্তিতে যখন মুসলমানরা নবীজি সা. এর নির্দেশ না মেনে চুপ করে বসেছিলেন, ঠিক সেই সংকটময় মুহূর্তে উম্মুল মু’মিনীন উম্মে সালামা রা. এর পরামর্শে সমস্যার সমাধান হয়। মুসলমানদের একতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে তিনি তখন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

জুবাইদা- তীক্ষè বুদ্ধিমত্তার অধিকারী খলিফা হারুন-উর-রশিদ এর স্ত্রী জুবাইদা সবসময়ই তার স্বামীকে রাষ্ট্র পরিচালনা এবং ব্যবস্থাপনা বিষয়ে মূল্যবান পরামর্শ দিতেন।

খানসা রা.-

উমার রা. এর খিলাফতকালে সংগঠিত হয় পারস্য সম্রাটের বিরুদ্ধে মুসলমানদের এক দুঃসাহসী অভিযান। এ ভয়াবহ যুদ্ধে অসংখ্য সৈনিক নিহত হয়। খানসা রাঃ তার চারজন পুত্রকে নিয়ে সেই যুদ্ধে অনশগ্রহণ করেন এবং তাঁর চার সন্তানই শাহাদাত বরণ করেন। এই মা যুদ্ধ শুরুতে উদ্দীপনামূলক ভাষণ দেন, যার ফলে সৈনিকরা যুদ্ধক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। ১০

৩। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা

আল শিফা বিনতে আব্দুল্লাহ

উমার রাঃ এর খিলাফতকালে যখন মদীনার সমাজ ব্যবস্থা উন্নততর হয়ে উঠছিলো তখন মদীনার সকল মার্কেটের বাণিজ্যের পর্যবেক্ষক নিয়ন্ত্রক হিসেবে আল- শিফা বিনতে আব্দুল্লাহ কে সবচেয়ে উপযুক্ত মনে করেন এবং পুরো মদীনার বাজার নিয়ন্ত্রকের দায়িত্ব অর্পণ করেন। ঐতিহাসিকদের মতে বাণিজ্য উপদেষ্টা পরিষদে আল-শিফার নিয়োগ খুবই সফল ছিলো।

উল্লেখ্য যে, তিনি ছিলেন একাধারে সর্বপ্রথম নারী শিক্ষক, প্রসিদ্ধ চিকিৎসক, বিখ্যাত ক্যালিগ্রাফার এবং আইনজ্ঞ।

৪। রাষ্ট্রীয় কাজে পরামর্শদান

উম্মে দারদা সুগরা

উমাইয়া খলিফাগণ যেমন, খলিফা মারওয়ান ইবনে আব্দুল মালিক নিয়মিত উম্মে দারদার নিকট হাজির হতেন রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ গ্রহণের জন্য। ৫ম উমাইয়া খলিফা মালিক বিন মারওয়ান বৃদ্ধা উম্মে দারদার সাথে বায়তুল মুকাদ্দাসের পাথরের উপর বসে পরামর্শ করতেন।

৫। যুদ্ধের ময়দানে সাহসী যোদ্ধা

আয়েশা রাঃ মাত্র ৮ বছর বয়সে উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। উসমানীয় খিলাফতকালে আয়িশা (রা.) উটের উপরে থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করছিলেন বিধায় এই যুদ্ধ উটের যুদ্ধ নামে পরিচিত।

উম্মে সালামা (রা.) ওহুদ জিহাদে অংশগ্রহণ করেন।

সাফিয়া বিনতে আবদিল মুত্তালিব (রা.) (মহানবি সা. এর ফুফু) খায়বর জিহাদে অংশগ্রহণ করেন।

আসমা, উম্মুল খায়ের, জুরকা বিনতে আদি, ইকরামা বিনতে আতরাশ ও উম্মে সিনান অসংখ্য জিহাদে প্রতিরক্ষামূলক কাজে সহযোগিতা করেন।

উমাইয়া বিনতে কায়েস কিফারিয়া খায়বর জিহাদে অংশগ্রহণ করেন।

উম্মে আমারা (রা.) ৬২৪ খ্রিষ্টাব্দে কাফিরদের বিরুদ্ধে বীরত্বের সাথে ওহুদ এবং আমামার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

৬। কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রধান

আমারা বিনতে আব্দুর রাহমান

৮০০ শতাব্দীর একজন বিশিষ্ট আইনবিদ। তিনি মদীনার কৃষি বিভাগের প্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।

৭। নারী অধিকারে সোচ্চার কণ্ঠ

নুসাইবা বিনতে কা’ব আল আনসারিয়াহ (রা.) ওরফে উম্মে আমারা (রা.), প্রথম মুসলিম নারীর অধিকার নিয়ে সোচ্চার হন। তিনিই সেই নারী যিনি রাসূল(সা)-কে প্রশ্ন করেছিলেন, কুরআনে নারীদেরকে কেন সম্বোধন করা হয় না? এরপরেই আল্লাহতাআলা নাজিল করেন সূরা আল আহযাবের ৩৬ নং আয়াত,

“নিশ্চয় মুসলমান পুরুষ ও মুসলমান নারী, ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারী, অনুগত পুরুষ ও অনুগত নারী, সত্যবাদী পুরুষ ও সত্যবাদী নারী, ধৈর্য্যশীল পুরুষ ও ধৈর্য্যশীল নারী, বিনীত পুরুষ ও বিনীত নারী, দানশীল পুরুষ ও দানশীল নারী, রোযা পালনকারী পুরুষ ও রোযা পালনকারী নারী, যৌনাঙ্গ হেফাযতকারী পুরুষ ও যৌনাঙ্গ হেফাযতকারী নারী, আল্লাহর অধিক যিকিরকারী পুরুষ ও অধিক যিকিরকারী নারী- তাদের জন্য আল্লাহ প্রস্তুত রেখেছেন ক্ষমা ও মহাপুরস্কার।”

৮। রাজ্যধিপতি সুলতান

শাজার আল-দুর

তিনি ছিলেন সুলতান আস-সালিহ আইয়ুবের স্ত্রী। সুলতানের মৃতুর পর মিশরকে স্থিতিশীল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনি আক্রমণকারী ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে মিশরের সফল নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং ১২৫০ সালে তিনি সুলতান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মিশরের ইতিহাস গঠনে তার ভূমিকা উপেক্ষা করা যায় না। তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং কৌশলগত প্রতিভা অনুকরণীয়।

ইসলামিক ইমারতের প্রতিষ্ঠা ও রক্ষণাবেক্ষণে নারী সমাজ একটি অপরিহার্য অংশ। ইসলামিক রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার প্রতিষ্ঠায় ও রক্ষণাবেক্ষণে নারী এক অতুলনীয় সৃষ্টি। কুরআন, হাদীস ও ইতিহাসের পাতায় পাতায় পাওয়া যায় নারী কখনোই প্রান্তিক ছিলেন না, বরং ইসলামি সভ্যতার প্রতিটি স্তরে তারা জ্ঞান, নেতৃত্ব, পরামর্শ ও দাওয়াহর মাধ্যমে অবদান রেখেছেন। পর্দার আবরণে, ঈমানের আলোয় ও শরীয়তের সীমানায় থেকেও একজন নারী ইসলামি পৃথিবী গঠনে এক মহৎ কারিগর।

১। সিয়ারু আ’লামীন নুবালা ২/১৯৭

২। মুসনাদে ইসহাক ২/৩০

৩। বিদায়া নিহায়া ২/৯২

৪। আলামুন নিসা৩/১০৫

৬। বুখারী ১৭০০

৭। সুনানে বায়হাকী ৯৯৭

৮। তিরমিজি ৩৮১৮

৯। আমারাহ বিনতে আবদুর রহমান- ইলমের অফুরন্ত দরিয়া

১০। Explaining al-khansa's delightful stanzes