কৃতজ্ঞতা চিত্তে স্বীকার করি, সংগ্রামে থাকাবস্থায় এই দুখিঃ প্রতিষ্ঠান আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে। উপরে উঠার সিঁড়ি দিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সৌদিআরব, পাকিস্তান, ভারত এবং ইউরোপের একাধিক দেশে সফর করার সুযোগ দিয়েছিলো, এসব ভুলবো কিভাবে।
সাংবাদিকতায় আমার জার্নি শুরু হয় ‘সংগ্রাম’ থেকে। দৈনিক পত্রিকাটিতে কাজ শুরু করি ১৯৭৭ সালে, সেপ্টেম্বর মাসের পয়লা তারিখে থেকে। শুরুতেই আমাকে কাজ করতে দেওয়া হলো : ডেস্কে, এটাই ছিলো সংগ্রামের রেওয়াজ। নতুন কাউকে অবশ্যই ‘সাব-এডিটর’ হিসেবে কাজ করতে হতো। এখান থেকে সংবাদ কাঠামো এবং ভাষার ব্যবহারের ওপর একরকম দখল নেওয়া ছিলো বাধ্যতামূলক। এটাই সম্পাদক আবুল আসাদ ভাইয়ের শৈলী। এ কারণেই সংগ্রাম যাদেরকে ‘উৎপাদন’ করেছে, তাদের ভীত শক্ত হয়ে গড়ে উঠেছে। সংগ্রাম থেকে অনেক সাংবাদিক তৈরি হয়েছে। বলতে গেলে, এই পত্রিকাটি ছিল সাংবাদিক তৈরির কারখানা। তাদের অনেকে সংগ্রাম থেকে বিদায় নিয়ে এখন বড়ো বড়ো দায়িত্বে আছেনও ছিলেন। দেশসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও কারো কারো পদচারণা ছিল। অবসরে যাওয়ার পর বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এখনো শীর্ষপদে আছেন। এটাই দৈনিক সংগ্রামের অবদান। অর্থাৎ সাংবাদিকতা ছেড়ে যারা গেছেন, তারাও পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলেন, এখনো আছেন। গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামাল দেওয়ার মতো যোগ্যতা সংগ্রাম থেকেই শিখেছেন। এ কারণে সংগ্রাম থেকে যারা বেরিয়ে গেছেন, তাদেরকে বলা হয় ‘দুঃখী মায়ের সুখী সন্তান’। সন্তানেরা ভালো থাকলেও মা ঠিকই অনটনের ভারে দুঃখী হয়ে আছে।
প্রথম যখন আমি দুঃখী মায়ের সন্তান হলাম, তখন সম্পাদক ছিলেন অধ্যাপক আখতার ফারুক। আমি যোগ দেওয়ার কিছুকাল পর সংগ্রাম থেকে ফারুক ভাই চলে যান। পরে সম্পাদক হিসেবে পাই জনাব আবুল আসাদ ভাইকে। তিনি দায়িত্বে আসার আগেও প্রকৃত অর্থে তিনি আমাদের সম্পাদক ছিলেন। ইতিহাস তার কাছে খোলা জানালার মতো। আসাদ ভাইয়ের দিকে তাকালেই ইতিহাস কথা বলে। আর ইতিহাসের ভিত্তিতেই তিনি বর্তমানকে ব্যাখ্যা করতেন, ভবিষ্যতের দিক-নির্দেশনা দিতেন। তিনি ছিলেন জ্ঞানের এক চলমান ভাণ্ডার।
আবুল আসাদ ভাই ছিলেন আমার মেন্টর। তার জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও নেটওয়ার্ক আমাকে সমৃদ্ধ করেছে। তার আলো আমার ওপর এসে পড়েছে। তার কাছ থেকেই সাংবাদিকতা শিখেছি আমি। ইতিহাসবোধ ছিলো আসাদ ভাইয়ের বড়ো শক্তি। তিনি কেবল ঘটনা নয়, ঘটনার ভেতরের এবং পিছনের ঘটনা জানতেন। যে পরিবর্তনগুলো তখন দৃশ্যমান হচ্ছিল, সেগুলো তিনি আগেভাগেই চিহ্নিত করতে পারতেন। বিশেষ করে স্নায়ুযুদ্ধে- পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থায় সংঘাতের চরিত্র কী হবে, এই প্রশ্নটি তাকে ভাবাতো। ঠিক এই জায়গায় পশ্চিমা এক চিন্তাবিদের তথ্য বিশ্লেষণ করতেন তিনি।
স্যামুয়েল পি. হ্যান্টিংটন ১৯৯৩ সালে ফরেন অ্যাফেয়ার্স জার্নালে ‘ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশনস’ নামে একটি লেখা প্রকাশ করেন। এতে তিনি বলেন, আগামী পৃথিবীর দ্বন্দ্ব কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শ বা অর্থনৈতিক কারণে হবে না। দ্বন্দ্বের কারণ হবে সংস্কৃতি ও ধর্ম। তিন বছর পর একই নামে প্রকাশ করা একটি বইয়ে এই থিসিস পেপার ব্যাখ্যা করেন হান্টিংটন। ১৯৯৩ সালে টুইন টাওয়ার হামলা, ১৯৯৮ সালের তানজানিয়া ও কেনিয়ার মার্কিন দূতাবাসে বোমা হামলা হান্টিংটন তত্ত্বকে মূলধারায় নিয়ে আসতে সাহায্য করে। পরে ২০০১ সালের টুইন টাওয়ারে বিমান হামলার পর তিনি ব্যাপকভাবে আলোচিত হন। হান্টিংটনের এই তত্ত্ব কেবল অ্যাকাডেমিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ ছিলো না। ধীরে ধীরে এটি নীতিনির্ধারণ, মিডিয়ার বয়ান এবং পশ্চিমা জনমত গঠনের হাতিয়ার হতে দেখা যায়।
২০০১ সালের সেপ্টেম্বরের ১১ তারিখ, টুইন টাওয়ারে বিমান হামলার সময় আমরা নিউজরুমে ছিলাম। আমাদের তখন মনে হয়েছিল, হান্টিংটন চর্চার মধ্য দিয়েই টুইন-টাওয়ার ভাঙা হলো। নিউজরুমে অনেককে সেদিন গভীরে না গিয়ে উল্লাস করতে দেখেছিলাম। উৎকণ্ঠা নিয়ে সেদিন আমি দ্রুত ওই ঘটনার কথা বলতে আসাদ ভাইয়ের কাছে ছুটে গিয়েছিলাম। আবুল আসাদ ভাই সেদিন উল্লাস করেনি। বরং এর ভবিষ্যৎ দেখতে পেয়ে চিন্তিত হয়ে বলেছিলেন, পত্রিকার প্রথম পাতায় তার জন্য দুই কলাম জায়গা রেখে দিতে। সেখানে তিনি বিশেষ সম্পাদকীয় লিখেছিলেন। লিখেছিলেন- এই হামলায় শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড়ো মূল্য দিতে হবে মুসলিম বিশ্বকে।
জাতীয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ‘সংগ্রাম’ এর সংগ্রামী ও ঐতিহাসিক ভূমিকা ছিলো। কোনো কোনো সময় কেবল ইস্যুতে অবস্থান নেওয়াই নয়, ইস্যু তৈরিতেও এই পত্রিকাটি ভূমিকা রেখেছে। উদাহরণ হিসেবে শেখ হাসিনাকে আদলতের ‘রং হেডেড’ ঘোষণা করার ঘটনাটা বলা যায়। ওই ঘোষণার ক্ষেত্রে সংগ্রামের একটা অবদান ছিলো। সেই রায়ের পিছনে রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল ‘সংগ্রাম’। সেই লড়াইয়ের অংশীদার আমিও ছিলাম। শেখ হাসিনা তখন প্রধানমন্ত্রী, আমি তখন ‘সংগ্রাম’ এর চিফ রিপোর্টার,’। আর তখন সংগ্রামের সিনিয়র রিপোর্টার ছিলেন, জনাব আযম মীর। আমি তাঁর সাহচর্য পেয়ে গর্বিত বোধ করি তিনি এখন সংগ্রামের সম্পাদক। শেখ হাসিনার একটি প্রেস কনফারেন্স কভার করেছিলেন তুখোড় মিডিয়ার রিপোর্টার আযম মীর শহিদুল আহসান। তিনি এখন ‘সংগ্রাম’ এর সম্পাদক। ওই সময় প্রেস কনফারেন্সে আদালত নিয়ে কিছু বিতর্কিত কথা বলেছিলেন শেখ হাসিনা। কথাগুলোকে রেকর্ড করে নিয়ে এসেছিলেন আযম মীর। গুরুত্বপূর্ণ অ্যাসাইনমেন্টে বরাবর আযম মীর সে বক্তব্যগুলো রেকর্ড করে আনতেন। এটা ছিল তার এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। তারপর হুবহু লিখে আমার কাছে এনে জমা দিলেন আযম মীর। আমি দেখলাম, অনেক স্পর্শকাতর কথা বলেছেন শেখ হাসিনা। কথাগুলো ছাপা উচিত হবে কি হবে না দ্বিধায় পড়েছিলাম। এ কারণে আসাদ ভাইয়ের কাছে গেলাম। আসাদ ভাই মন দিয়ে শুনলেন। তিনি তারপর বললেন- ‘পাগলি এমন কথা বলছে!’ খেয়াল করুন, এখানে ‘পাগলি’ শব্দটা উচ্চারণ করেছেন তিনি। আসাদ ভাই শেখ হাসিনাকে সচরাচর ‘পাগলি’ বলতেন। পাগলি মানেই তো ‘যার মাথায় সমস্যা আছে’, অর্থাৎ ‘রং হেডেড’। আসাদ ভাই কোট আন কোর্টের ভিতর শেখ হাসিনার কথাগুলো লিখতে বললেন।
প্রতিবেদনটি সে ভাবে প্রকাশ হলো। পরদিন দেখা গেলো, অন্য কোনো সংবাদপত্রে এটা তেমন করে শেখ হাসিনার কথা আসেনি। তারা ধরি মাছ না ছুঁই পানি এমনই করে লিখেছিল। সংগ্রামের প্রতিবেদন নিয়ে তোলপাড় তৈরি হলো। পরেরদিন সন্ধ্যায় আমাকে ফোন করলেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ। প্রকাশিত প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার বক্তব্য হুবহু কোট আন কোট করায় তিনি আন্দাজ করেছিলেন। শেখ হাসিনার পুরো বক্তব্যর রেকর্ড আমাদের কাছে আছে। ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেছিলেন, আগামীকাল বিকালে আমার চেম্বারে আসতে। টেলিফোনে সব কথা বলা যাবেনা, সাক্ষাতে বলবো। পরদিন যথারীতি আমি তার দফতরে হাজির হলাম। তিনি বললেন, হাসিনার কথাগুলো সম্ভবত তোমরা রেকর্ড করেছো। জবাব দিলাম জি,তিনি বললেন সে রেজর্ডের একটা কপি তাকে দিতে পারবো কিনা। তখন আমরা তাকে রেকর্ড সরবরাহ করলাম। তবে শর্ত দিলাম, এই তথ্য কাউকে বলা যাবেনা।
তিনি জবাবে বললেন, অবশ্যই না। তাঁকে টেপ দেওয়ার বিষয়টি কারো কাছে বলিনাই, এমন কি সম্পাদক মহোদয়কেও নয়। তিনি জানালেন, এ টেপ থেকে রিপোর্ট করে আপিল বিভাগের পাঁচ বিচারকদের কাছে দেবেন। এর জের পুরো জাতি দেখেছে, একজন প্রধানমন্ত্রীকে ‘রং হেডেড’ বলে ঘোষণা দিয়েছে আদালত। যতদূর জেনেছিলাম, সেই রায় লিখেছিলেন, বিচারপতি মোস্তফা কামাল আব্বাসী। সম্ভবত ওই রাগ থেকেই দেশের বিচার-ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে প্রতিশোধ নিয়েছে শেখ হাসিনা।
সংগ্রামের আরেক ঘটনা বলবো, তখনো আমি সংগ্রামের চিফ রিপোর্টার। আসাদ ভাই নির্দেশ দিয়েছিলেন, একটি পত্রিকায় যেমন দেশের ও আন্তর্জাতিক অঙ্গন নিয়ে কথা বলতে হয়। তেমনি সামাজিক বিষয়েও তার দায়-দায়িত্ব থাকে। আমাদের অফিসের সন্নিকটে একটি ম্যনহোলের ঢাকনা খোলা পরে আছে, মূর্হুতেই সেখানে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। ‘সংগ্রাম’ অফিসের সামনের একটা ম্যানহোলের ঢাকনা খোলা নিয়ে একটা স্বচিত্র প্রতিবেদন করেছিলেন আযম মীর। ওই ছোট্ট স্বচিত্র রিপোর্টি ছাপা হয়েছিলো পিছনের পাতার প্রথম কলামে। সে সময় দেশ চালাচ্ছে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। অনেক ব্যাপারে তার সমালোচনা থাকলেও কিছু কিছু বিষয়ে তিনি খুব সিরিয়াস ছিলেন। বিশেষ করে জনদুর্ভোগের বিষয়গুলো খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখতেন। পত্র-পত্রিকায় ছাপা প্রতিবেদন ও লেখাগুলো ঠিকঠাকমতো সংগ্রহ করার কড়া নির্দেশ দেওয়া ছিলো তার অফিসকে। আযম মীরের তৈরি করা সেই ছোট্ট স্বচিত্র প্রতিবেদনটি এরশাদ সাহেবের নজরে পড়েছিলো। পরদিন হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসেন ওয়াসার দায়িত্বে থাকা চেয়ারম্যান কর্নেল শরিফ। ম্যানহোল ঠিক করার পর তিনি অনুরোধ করেন, আমরা যেন আরো একটা ফলো আপ প্রতিবেদন করে আপডেট খবর পাঠকদের জানিয়ে দিতে। তিনি যে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের নির্দেশে এসেছেন, সেটাও জানিয়ে যান কর্নেল শরিফ। ওই সময় জেনা : এরশাদের প্রেস সচিব ছিলেন শ্রদ্ধেয় তোয়াব ভাই। প্রেসিডেন্ট এরশাদ নিয়মিত পত্রিকার কাটিং পড়তেন। আর পত্রিকার কাটিং নিয়ে তৈরি থাকতে হতো তোয়াব খানকে। একদিন বঙ্গভবনে প্রেসিডেন্ট এরশাদের সংসদ সম্মেলনে আমাকে যেতে হয়েছিল বঙ্গভবনে। সম্মেলন শেষে দেখলাম বিভিন্ন পত্রিকার কাটিং নিয়ে একটি ফাইল হাতে তোয়াব ভাইকে দাঁড়িয়েছেন প্রেসিডেন্টের অপেক্ষায়। এক সময়ের বিখ্যাত সাংবাদিক জনাব তোয়াব খান। তিনি তখন প্রেসিডেন্টের প্রেস সেক্রেটারি। সালাম দিয়ে তোয়াব ভাইকে বিনয়ের সাথে প্রশ্ন করলাম কাটিং গুলো নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন কার অপেক্ষায়। তোয়াব ভাই বললেন-, তোমরা সারাদিন চা-বিডি খেয়ে যা লেখো, ওগুলো তো সামলাতে হয় আমাকে। তিনি কাটিংগুলো সাবমিট করার পর প্রেসিডেন্ট নিজে সেগুলো মার্ক করে দিতেন বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর জন্য। তখন আমার মনে পড়লো আযম মীর ভাইয়ের সেই ম্যানহোল নিয়ে লেখা রিপোর্টের কথা।
এই অভিজ্ঞতাই স্পষ্ট করে দেয়, একটি প্রভাবশালী পত্রিকা হিসেবে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ এর প্রতিবেদনগুলো ছিল কতটা বাস্তব অর্থেই গুরুত্বপূর্ণ। স্মরণ করা যেতে পারে, প্রেসিডেন্ট এরশাদ তার তথ্য মন্ত্রী কাজি জাফর কে নিয়ে। সংগ্রাম অফিসে এসেছিলেন, নিউজ রুমে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি বলেছিলেন সংগ্রাম আমার পত্রিকা। আবুল আসাদ ভাইয়ের রুমে বসে তিনি জানতে চেয়েছিলেন সংগ্রামের সমস্যা কি! আসাদ ভাই উত্তরে সংগ্রামের সরকারি বিজ্ঞাপনের ন্যায্য হিসাবটা পাচ্ছে না। তখন তিনি তথ্য মন্ত্রীকে নির্দেশ দিলেন, তুমি বিষয়টা দেখবা। তারপর সংগ্রাম সরকারি পাওয়া শুরু করে। এবং অনেক আগে রাষ্ট্র নায়ক প্রেসিডেন্ট জিয়ার খাল কাটা কর্মসূচি নিয়েও ছিলো সংগ্রামের ঐতিহাসিক ভূমিকা। আমি তখন প্রেসিডেন্ট বিট করতাম। জিয়ার খাল কাটা কর্মসূচি নিয়ে একটা অপপ্রচার চাওর ছিল। আওয়ামী বলতো, জিয়া খাল কেটে কুমির আনছেন। আসলে কী করছেন, সেটা দেখে আসার জন্য সারা দেশের সাংবাদিকদের একটি দল নিয়ে তিনি বিমান যোগে কক্সবাজার গেলেন। ওই দলে আমিও ছিলাম। কক্সবাজার জেলা সদর থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার ভেতরে যেতে হয়েছিল আমাদেরকে। সেখানে দেখলাম ১৬ কিলোমিটার লম্বা খাল কাটা হয়েছে, সে খালের নাম উথলী খাল। প্রেসিডেন্ট জিয়া আমাদের সে খাল দেখিয়ে বললেন, এখানে কয়টা কুমির এসেছে ঘুরে-ফিরে দেখুন। রাতে এক সাথে ডিনারের সময় আমাকে সেটা জানাবেন। আমরা অবাক হলাম খালের পরিবর্তন দেখে। খাল পুনঃ খননের ফলে, এলাকা সবুজ ধান গাছ হাওয়ায় দুলছে। খালে মাছের চাষ হচ্ছে,, খালের এপারে ওপারে তিনটি ফসল ফলছে। খালের দু’পাসে লাগানো হয়েছে ওষুধি ও ফলজ গাছ। স্থানীয়রা জানালেন এই মজা খালে আগে বসবাস করতো ব্যাঙ ও ধোরা শাপ। আজ আমি ভিন্ন পত্রিকায় কাজ করছি। কিন্তু আজও আমার ২৩ বছরের সংগ্রামী জীবন আমার হৃদয়ে উজ্জ্বল হয়ে আছে। আর আবুল আসাদ ভাই এখনো আমার মেন্টের। সংগ্রামে কাজ করা নিয়ে আজও আমাকে স্মৃতিকাতর কারে তোলে। অভাবের সেই সংসারে নানা টানা পড়ন ছিল। বিশেষ করে আর্থিক অবস্থায় নিয়ে। রিপোর্টিং বিভাগের দায়িত্ব থাকার কারণে। সহকর্মীদের অনেক আবদার রক্ষার জন্য বার বার হিসাব বিভাগে গিয়েছি। সেই সব আবদার রক্ষার জন্য। তখন হিসাবের প্রধান ছিলেন মরহুম সাত্তার ভাই, তার সহকারী যিনি এখন সে পত্রিকার জেনারেল ম্যানেজার আবুল হোসেন চৌধরী। সহৃয়দতার সাথে সে সব আবদার তাঁরা রক্ষা করতেন। তাদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। সংগ্রামে এখন অনেক নেই। সে দিন প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে সংগ্রাম এ দেখে এলাম বার্তা সম্পাদক, চিফ রিপোর্টার সহ সকল রিপোর্টির টেবিলে বসে আছে নবীন তুর্কীঘোর সোয়ারা। যাদের সাথে এক সাথে কাজ করেছি, তাদের মধ্যে দেখে এসেছি ভালোবাসার সায়াদাত ভাই সাথে অনুজ প্রতিম সাইফুলকে। খুব কষ্ট পেয়েছি, সাবেক চিফ রিপোর্টার এবং সাংবাদিকদের নেতা প্রিয় রুহুল আমিন গাজীকে না দেখে। ফ্যাসিস্টদের নির্যাতনে ও কারাগারে খুব কষ্ট পেয়েছিল। কারাগারই তাঁর মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করেছিল। প্রবীণ সম্পাদক জ্ঞান সমৃদ্ধ আসাদ ভাইকে জেল জুলুম, নির্যাতন করেছে আওয়ামী ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচার।
আমার সাংবাদিকতার জন্মভূমিতে আমার দেখা চৌকস রিপোর্টার প্রিয় আযম, এখন সম্পাদক দৈনিক সংগ্রাম। আশা করি ও দোয়া করি উজ্জ্বল ৫১ বছরের সংগ্রামকে তিনিও তাঁর সহকর্মীরা এই দৈনিককে উজ্জ্বলতর থেকে আরো উজ্জ্বল করে তুলবে। সুম্মা আমিন।
ফেরার সময় পত্রিকার চিফ রিপোর্টার আমাদের উত্তরসূরী মোহাম্মদ নাসির আমাকে গাড়িতে তুলে দিলো। গাড়িতে ওঠার আগে একবার সংগ্রাম ভবনের দিকে ফিরে তাকালাম। এই ভবনের সাথে কত আনন্দ-বেদনা জড়িয়ে আছে। চোখের কোনায় অশ্রু জমলো।
কৃতজ্ঞতা চিত্তে স্বীকার করি, সংগ্রামে থাকাবস্থায় এই দুখিঃ প্রতিষ্ঠান আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে। উপরে উঠার সিঁড়ি দিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সৌদিআরব, পাকিস্তান, ভারত এবং ইউরোপের একাধিক দেশে সফর করার সুযোগ দিয়েছিলো, এসব ভুলবো কিভাবে।