এ বিশ্বচরাচরে মানুষের জানা-অজানা অসংখ্য সৃষ্টির অস্তিত্ব বিদ্যমান। সৃষ্টিলোকের এ মহাসমুদ্রে অনেক কিছু চোখে দেখা যায়। আবার অনেক কিছুই এমন রয়েছে, যাদের অস্তিত্ব চোখে দেখা যায় না। এগুলোর অস্তিত্ব বৈজ্ঞানিক যন্ত্রের সাহায্যে ধরা পড়ে। আবার কোনো কোনোটার অস্তিত্ব নিরীক্ষণের মাধ্যমে, আবার কোনটা উপলব্ধির ওপর নির্ভরশীল হয়ে মহান স্রষ্টার এক অপূর্ব সৃষ্টি কৌশলের সাক্ষ্য দেয়। গভীর সমুদ্র তলদেশের বালুকারাজি, ঝিনুক অথবা প্রস্তর খণ্ডের মাঝে কোনো কিছুর অস্তিত্ব থেকে শুরু করে, সৌরজগৎ তথা মহাশূন্যের বিভিন্ন বস্তুর অস্তিত্ব সম্পর্কে সসীম জ্ঞানের অধিকারী মানুষ আজ নব নব আবিষ্কার করে চলেছে। শুধু তাই নয়, এ ধরা পৃষ্ঠের মানুষ আজ চাঁদে পর্যন্ত পৌঁছেছে।

এ বিশ্বজগতের সমস্ত সৃষ্টিই মানুষের সেবায় নিয়োজিত। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জিনিস থেকে শুরু করে অতি বড় এবং প্রকাণ্ড সৃষ্ট বস্তুকে মানুষ তার কল্যাণে ব্যবহার করছে। মৃত প্রাণীর অস্থি-মাংস থেকে শুরু করে গাছপালা, বৃক্ষ-তরুলতা, নদনদী, সমস্ত পার্থিব প্রাণী ও প্রাণহীন বস্তু এবং চন্দ্র, সূর্য, আলো, বায়ু সবকিছুই মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত। বিজ্ঞান ও বুদ্ধির ক্রমবিকাশের সাথে সাথে বহু অজানা জিনিসকেও আজ মানুষ তার নিজের কল্যাণে ব্যবহার করার প্রয়াস পাচ্ছে। সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ তাই তো হলো মানুষ। মানুষ হলো আশরাফুল মাখলুকাত। আল্লাহ তায়ালা আল কুরআনে ঘোষণা করেছেন, ‘আমরা আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি, স্থলে ও সমুদ্রে তাদের চলাচলের জন্য বাহন দিয়েছি, তাদের উত্তম রিজিক (জীবিকা) দান করেছি এবং যাদের সৃষ্টি করেছি, তাদের অনেকের ওপর তাদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি।’ (বনী ইসরাঈল : ৭০)।

আল কুরআনের আরেক জায়গায় আল্লাহ বলেছেন, ‘হে মানুষ, তুমি কি লক্ষ কর না যে, দুনিয়ায় যা কিছু রয়েছে আল্লাহ তার সবকিছুই তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন।’ (আল হজ : ৬৫)।

এছাড়া আল কুরআনের আরো অনেক আয়াতে মানুষকে এ কথা আল্লাহ তায়ালা বলে দিয়েছেন, আসমান এবং জমিনে যত জিনিস আছে, তার সবই মানুষের খেদমত ও কল্যাণের জন্য তাদের অধীন করে দেয়া হয়েছে। এই গাছপালা, পাহাড়-পর্বত, নদী-নালা, সাগর, জীবজন্তু, রাতদিন, আলো-অন্ধকার, চন্দ্র-সূর্য, তারকারাজি, বাতাস, আগুন, পানি অর্থাৎ সবই তাদের কল্যাণে নিয়োজিত এবং তাদের কার্যোপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে এবং এসব কিছুর খেদমত পাওয়ার যোগ্য করেই মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ বলেছেন, ‘তিনিই আল্লাহ, যিনি পৃথিবীর সবকিছু তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন।’ (আল বাকারা : ২৯)।

আল্লাহ তায়ালার এসব বাণীর যথার্থতা নিরূপণ করতে অন্তর্চক্ষু খোলার প্রয়োজন হয় নাÑ মানুষ তার চর্মচক্ষুর ক্ষুদ্র দৃষ্টি নিজের স্বাভাবিক জীবনের ওপর নিবদ্ধ করলেই এ কথার প্রমাণ পায়।

‘ল্যাটিন ভাষায় একটি কথা আছে- তা হলো, ‘Ex nihilo nihil fi’ অর্থাৎ Nothing comes out of nothing, তার মানে Everything must have a cause‘ কারণ ছাড়া কোনো কিছুই হয় না।’ অর্থাৎ ‘প্রত্যেক জিনিসেরই একটি কারণ আছে।’

বিজ্ঞান, দর্শন অথবা কলা সবকিছুই এ অভিমত ব্যক্ত করে, কারণ ছাড়া কোনো কিছু সংঘটিত হয় না। তেমনিভাবে অন্যদিকে উদ্দেশ্য ছাড়া কোনো সৃষ্টির অস্তিত্ব অকল্পনীয়। এখন প্রশ্ন জাগেÑ এই যে মহাবিশ্বের সৃষ্টি, এই যে জানা-অজানা অসংখ্য মাখলুকাত, যারা সকলেই সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি ‘মানুষের’ সেবায় নিয়োজিত সেই ‘মানুষ’ সৃষ্টির কারণ বা উদ্দেশ্য কী?

এই মানুষ সৃষ্টির নিশ্চয়ই একটা উদ্দেশ্য আছে। আর এই উদ্দেশ্য শুধু তিনিই বলতে পারেন, যিনি তাদের সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্ট জীব মানুষ তার মস্তিষ্ক দিয়ে তার স্রষ্টা সম্পর্কে নানারূপ অবাস্তব কল্পনার জাল বুনতে পারে, নানাজন নানারূপে অর্থহীন কিছু সংলাপ পেশ করতে পার বটে অথবা সসীম মগজের খোঁড়া যুক্তিতে স্রষ্টার অস্তিত্বকেই অস্বীকার করে বসতে পারে, কিন্তু স্রষ্টার উদ্দেশ্যকে জানা সম্ভব হবে না। মানুষ যার সৃষ্টি কেবলমাত্র তার কাছেই এ প্রশ্নের সঠিক জওয়াব জানা যেতে পারে। আর তিনি হলেন বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তা, একমাত্র আল্লাহ তায়ালা।

মহান আল্লাহ তায়ালা মানুষ সৃষ্টি করেছেন এবং এই মহাবিশ্বকে বৈচিত্র্যময় করে গড়ে তুলেছেন। পৃথিবীর মাঝে জীবজন্তু, বৃক্ষ-তরুলতা, শূন্যলোকে গ্রহ, উপগ্রহ, তারকারাজি এক অপূর্ব সৌন্দর্যে সুষমামণ্ডিত এবং সুসামঞ্জস্যশীল করে তৈরি করে একমাত্র মানবকুল সৃষ্টির মাধ্যমেই তার সৃষ্টির যথার্থতা সার্থক করে তুলতে চেয়েছেন। মানবকুলকে সবকিছুর চেয়ে শ্রেষ্ঠ বা প্রধান করে সৃষ্টি করে বাকি সবকিছুই মানুষের অধীন এবং সেবায় নিয়োজিত করে মহান আল্লাহ তায়ালা তার উদ্দেশ্যকে পরিপূর্ণ করে তুলতে চেয়েছেন। মানবজাতির কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তিনি তার সৃষ্টির যথার্থতা নিরূপণ করতে চান।

তাই আমরা দেখি দুনিয়ার অন্য কোনো প্রাণীর জন্য মহান আল্লাহ তায়ালার কোনো নির্দেশনা নেই; নেই কোনো আসমানী কিতাব। কোনো জীবজন্তু বা পক্ষীকুলের জন্য তিনি কখনো কোনো পয়গাম্বর বা নবী-রাসূল পাঠাননি। কিন্তু মানুষের জন্য তিনি পাঠিয়েছেন নবী-রাসূল (সা.) দিয়েছেন গাইডলাইন এবং হেদায়াত।

মানুষ ছাড়া বিশ্বের আর যত সৃষ্টি আছে, সবকিছুই আল্লাহ তায়ালার প্রদত্ত সুনির্দিষ্ট এবং সুনির্ধারিত নিয়ম মোতাবেকই চলছে। আম গাছে কখনো লিচু ফল ধরে না, পূর্বের সূর্য কখনো পশ্চিমে উদয় হয় না। আগুন দহন করে, পানি করে ঠাণ্ডা। আল্লাহ তায়ালা যেভাবে তাদের হুকুম করেছেন, তারা সেভাবেই চলছে সৃষ্টিলগ্ন থেকে। কিন্তু মানুষকে তিনি সেভাবে সৃষ্টি করে ছেড়ে দেননি। আল্লাহ তায়ালা মানুষকে বুদ্ধি দিয়ে, বিবেক দিয়ে এবং সীমিত স্বাধীনতা দিয়ে এ দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা মানুষের Animality সাথে সাথে দান করেছেন Rationality কারণ তিনি দেখতে চান যে, মানুষ হক এবং বাতিল পার্থক্য করতে পারে কিনা, মানুষ তার বুদ্ধি ও বিবেক দিয়ে আল্লাহকে চিনে আল্লাহর নির্দেশিত পথে চলে না কি শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে পশুর মতো ন্যায়-অন্যায় বিচার না করে অনৈতিকভাবে জীবনযাপন করে কিংবা ইতর প্রাণীর মতো পশুর চেয়েও নিকৃষ্টভাবে এ দুনিয়ার জীবন কাটায়?

আল্লাহ তায়ালা তাই মানুষকে সৃষ্টি করে অন্ধকারে ছেড়ে দেননি। এই দুনিয়ায় মানুষের সঠিক চলার পথ কী এবং কোনটি, তা জানা এবং বোঝার জন্য যুগে যুগে মানবজাতির জন্য তিনি পাঠিয়েছেন নবী-রাসূল (আ.) ও ঐশী গ্রন্থ। অনুরূপভাবে সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নিকট হযরত জিবরাইল (আ.)-এর মাধ্যমে সমগ্র মানবজাতির জন্য পাঠিয়েছেন মহাগ্রন্থ আল কুরআন।

সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) তার জীবনের প্রতিটি কাজ এবং কথা দিয়ে মহাগ্রন্থ আল কুরআন নির্দেশিত পথই বাস্তবভাবে দেখিয়ে দিয়ে গেছেনÑ যাতে মানুষ এই পথ চিনতে ভুল না করে।

আল কুরআনের সূরা বাকারার ৪র্থ রুকুর প্রথমেই আমরা দেখতে পাইÑ আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘আমি পৃথিবীতে খলিফা (প্রতিনিধি) প্রেরণ করছি।’ (সূরা বাকারা : ৩০)। মহান আল্লাহ মানুষ সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রথম কথাই বলেছেন, ‘প্রতিনিধি’ প্রেরণ করছি। এটা অত্যন্ত পরিষ্কার যে, প্রতিনিধি শব্দ ব্যবহারের মধ্যেই আল্লাহ তায়ালার মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্য পরিস্ফুট।

প্রতিনিধি কাকে বলা হয়? কোনো একজন ক্ষমতাবান ব্যক্তি কাউকে বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে অন্য কোনো জায়গায় তার পক্ষে কোনো কাজ সম্পাদন করার জন্য যখন পাঠায়, তখন সেই ব্যক্তি হয় উক্ত ব্যক্তির প্রতিনিধি। এই প্রতিনিধি তার দায়িত্ব পালনকালে কোনোক্রমেই যার প্রতিনিধি, তার অর্পিত বিধিনিষেধবহির্ভূত নিজের ইচ্ছানুযায়ী কোনো কাজ করতে পারবে না। কারণ তা করলে তিনি আইনত শাস্তির যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।

মহাক্ষমতাধর আল্লাহ তায়ালা মানুষকে খলিফা (প্রতিনিধি) করে পাঠিয়েছেন আল্লাহ তায়ালার নির্দেশনাবলী পালন করার মাধ্যমে তাঁর দীন প্রতিষ্ঠা করার জন্য। এর অর্থ এই যে, এ দুনিয়ায় যত সৃষ্টি আছে সবকিছু মানুষের অধীনস্থ থাকবে আর মানুষ আল্লাহর দেয়া সুনির্দিষ্ট নিয়মনীতি মোতাবেক নিজেরা চলবে এবং অপরকে চালাবে। প্রাকৃতিক জগতের পরিচালনা করবেন আল্লাহ তায়ালা নিজে।

আল্লাহ তায়ালা যা ফেরেশতাদের জানাননি, সে সম্পর্কে ফেরেশতাগণ মোটেই অবহিত নয়। তাই তাদের সন্দেহ হয়েছিল, মানুষ দুনিয়াতে অশান্তি ঘটাবে। কিন্তু মহান আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করলেন, ‘আমি যা জানি, তোমরা তা জান না।’ (সূরা বাকারা : ৩০)। অর্থাৎ রাব্বুল আলামিন জানতেন, মানুষ এই দুনিয়ায় তাঁর সঠিক প্রতিনিধিত্ব করতে সক্ষম হবে।

এরপর আল্লাহ তায়ালা এ পৃথিবীতে চলার জন্য মানুষের যত জ্ঞানের প্রয়োজন হতে পারে সমুদয় জ্ঞান হযরত আদম (আ.)-কে শিখিয়ে দিলেন। ফেরেশতাগণ যেসব জিনিসের নাম বলতে পারলেন না, হযরত আদম (আ.) অনায়াসে তা বলে দিলেন।

আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতাদের নির্দেশ দিলেন আদম (আ.)-কে সিজদা করার জন্য। ফেরেশতাগণ হযরত আদম (আ.)-কে সিজদা করলেন। ফেরেশতাদের সিজদার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা এটাও পরিষ্কার করে দিলেন, মানুষ দুনিয়ায় সৃষ্ট জীবের মধ্যে শ্রেষ্ঠ এবং সম্মানের অধিকারী!

সূরা আন’আমের ১৬৫নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘তিনি তোমাদের দুনিয়ায় প্রতিনিধি করেছেন এবং যা তিনি তোমাদের দিয়েছেন, সে সম্বন্ধে পরীক্ষার উদ্দেশ্যে তোমাদের কতককে অপরের ওপর মর্যাদায় উন্নীত করেছেন।’ এহেন মর্যাদা দিয়ে যে মানুষকে আল্লাহ তায়ালা তাঁর খলিফা বা প্রতিনিধি হিসেবে এ দুনিয়ায় পাঠালেন, সেই খলিফা বা প্রতিনিধি হিসেবে মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্য কী, তাই এখন দেখার বিষয়।

এ দুনিয়ায় মানুষের মর্যাদা হচ্ছে সে আল্লাহর খলিফা, অর্থাৎ আল্লাহর প্রতিনিধি। প্রতিনিধির কাজ এই যে, সে যার প্রতিনিধি তারই আনুগত্য ও অনুসরণ করে চলবে। সে নিজের মনিব ব্যতীত অন্য কারো যেমন আনুগত্য করতে পারে না, তেমনি মনিবের প্রজাদের নিজের প্রজা বা খাদেম বানাতে পারে না। প্রতিনিধি কখনো কোনো অবস্থাতেই নিজে মনিব সেজে বসতে পারে না। প্রতিনিধি তার মনিবের প্রদত্ত সকল সুযোগ-সুবিধা মনিবের হুকুম মতো পরিচালনা করতে পারে, কিন্তু নিজে কখনো মনিবের আমানতের খেয়ানত করতে পারে না।

এখন যদি কোনো প্রতিনিধি মনিবের হুকুম না মেনে নিজের ইচ্ছামতো কাজ করে অথবা অন্য কোনা শক্তির অধীনস্থ হয়, মনিবের আমানত খেয়ানত করে, মনিবের নির্দেশ অমান্য করে এবং তাঁর দেয়া বিধান লঙ্ঘন করে, মনিবের দেয়া ধন-সম্পদ মনিবের নির্দেশনামতো ব্যয় না করে, অর্থাৎ মনিবের হুকুমমতো প্রতিটি কাজ সম্পন্ন না করে, তাহলে তার দ্বারা সঠিক প্রতিনিধিত্ব হতে পারে না। সে ব্যক্তি কখনো মনিবের নিকট থেকে পুরস্কার আশা করতে পারে না। বরং মনিবের হুকুমের বিরোধী কাজ করলে পরিণামে তাকে ভীষণ শাস্তি ভোগ করতে হবে। এমনিভাবে এ দুনিয়ায় প্রতিটি কার্যকলাপের জন্য মানুষকে প্রতিনিধি হিসেবে তাঁর মনিব, অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালার সামনে জবাবদিহি করতে হবে। কারণ এ দুনিয়ায় সে ছিল আল্লাহর প্রতিনিধি। সে যদি তাঁর হুকুমমতোই সবকিছু করে থাকে নিঃসন্দেহে মনিব খুশি হবেন এবং তাকে পুরস্কৃত করবেন।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমার পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে হেদায়াত আসবে, যারা আমার দেয়া হেদায়াতের অনুসরণ করবে, তাদের জন্য কোনোরূপ শাস্তির ভয় এবং কোনো দুশ্চিন্তার কারণ নাই। আর যারা নাফরমানি করবে এবং আমার বাণী ও নির্দেশনাবলীকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে যাবে, তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের আগুন, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে।’ (সূরা বাকারা : ৩৮-৩৯)।

তাই প্রতিনিধির সর্বপ্রথম কর্তব্য হলো সে যার প্রতিনিধি, তার আজ্ঞানুবর্তিতা, আদর্শ এবং সর্বোচ্চ ক্ষমতাকে দ্বিধাহীনচিত্তে মেনে নেয়া। সে যদি এটা করতে রাজি না হয়, তাহলে অন্য কোনো ভালো এবং সৎকাজ করলেও তা অর্থহীন হয়ে যাবে। কারণ সে মূলতই প্রতিনিধিত্বের সঠিক দাবি পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে।

মানুষের সৃষ্টিতত্ত্ব আলোচনা করলে দেখা যায়, মানুষ নিকৃষ্টভাবে সৃষ্টি হয়েছে। এক ফোঁটা অপবিত্র পানি থেকেই তার সৃষ্টি। এদিক দিয়ে সে অতি তুচ্ছ। আল্লাহ তায়ালার ফুঁকে দেয়া রূহসংবলিত দেহ নিয়ে কোনো বান্দা যদি শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে অসৎ, অনৈতিক এবং খারাপ পথে চলে তাহলে তার মর্যাদা রক্ষিত হতে পারে না, বরং সে পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট স্তরে চলে যাবে। কারণ একমাত্র আল্লাহ তায়ালার প্রতিনিধিত্ব সঠিকভাবে করার ওপরই তার ইজ্জত হেফাজত করা সম্ভব।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, আল্লাহ তায়ালার প্রতিনিধি হবার কারণেই মানুষের মর্যাদা দুনিয়ার সকল সৃষ্টির চেয়ে শ্রেষ্ঠ এবং উন্নত। দুনিয়ায় প্রতিটি বস্তুই তার অধীন এবং তার ব্যবহারের জন্য নিয়োজিত। আল্লাহর নির্ধারিত পন্থায় তা থেকে সে খেদমত গ্রহণ করার অধিকারী। প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হলে এবং পরকালে আল্লাহর আজাব থেকে নাজাত পেতে হলে আল্লাহর দীন বা বিধানকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক পন্থায় বিনম্রভাবে দরদভরা মন নিয়ে দাওয়াতি কাজ করে যেতে হবে। কারণ এই দুনিয়ায় দীন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই আল্লাহ মানুষকে এত বেশি মর্যাদা দিয়ে সর্বশ্রেষ্ঠ করে সৃষ্টি করেছেন। তাদের এই মর্যাদা একমাত্র ‘দীন’কে কল্যাণকর শান্তিময় জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ওপরই নির্ভরশীল এবং এ উদ্দেশ্যেই আল্লাহ তায়ালা যুগে যুগে নবী-রাসূল (সা.) পাঠিয়েছেনÑ যেন আল্লাহ তায়ালার সেই মহান উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্য বাস্তবায়ন ও পালনের জন্য তাঁরা বান্দাদের পথ দেখিয়ে দেন।

‘তিনিই তাঁর রাসূল প্রেরণ করেছেন পথনির্দেশ ও সত্য দীনসহ সকল দীনের ওপর তাকে বিজয়ী করে তোলার জন্য।’ (সূরা আস সাফ : ৯)। এখানে এই আয়াতের আলোকে দেখা যায়, এ দীন প্রতিষ্ঠার মহান লক্ষ্যে সমাজে বিদ্যমান অন্যান্য বিধান বা ব্যবস্থা মানবসমাজকে বোঝানোর মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে পরিবর্তন করে আল্লাহর দীনক প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নবী-রাসূলদের ইতিহাস তাঁদের জীবনচরিত্র এ কথারই উজ্জ্বল নিদর্শন। আল্লাহ তায়ালার তরফ থেকে প্রত্যেক নবী ঐ একই কাজ করে গেছেন।

‘তিনি তোমাদের জন্য দীনের নিয়ম বিধান নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন, যার হুকুম তিনি নূহকে দিয়েছিলেন। আর যা (হে মুহাম্মদ) এখন তোমার প্রতি আমরা অহির সাহায্যে পাঠিয়েছি। আর যার হেদায়েত ইবরাহীম, মূসা ও ঈসাকে দিয়েছিলাম। এই তাকিদ সহকারে যে, প্রতিষ্ঠা কর এই দীনকে এবং এতে ছিন্ন ভিন্ন হয়ো না।’ (সূরা আশ শুরা : ১৩)।

আল্লাহ এ দুনিয়াতে যত নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন সকলের ওপর একই দায়িত্ব ছিল। সকলেরই উদ্দেশ্য ছিল দীন প্রতিষ্ঠা করা। এমনিভাবে সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুয়্যত প্রাপ্তির পর থেকে মক্কায় ১৩ বছর আল্লাহর পথে মানুষকে আহ্বান করা, নৈতিক ও আদর্শিকভাবে গড়ে তোলা এবং মদীনায় ১০ বছরÑ আল্লাহর দেয়া জীবনবিধান এর বাস্তব রূপায়ণ- এই ২৩ বছরের জিন্দেগী আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় মানবজাতির জন্য একমাত্র পথিকৃত।

শান্তিময় ও কল্যাণকর জীবনব্যবস্থা আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠার যে পথ, তা মহামানব রাসূলেরই (সা.) একমাত্র প্রদর্শিত পথ। এ পথ ছাড়া আল্লাহ তায়ালার দীন প্রতিষ্ঠার অন্য কোনো পথ নেই। আল্লাহ প্রদত্ত আদর্শ একমাত্র রাসূল (সা.) প্রদর্শিত পথেই বাস্তবায়ন সম্ভব। আল্লাহর রাসূল (সা.) এ পথই দেখিয়ে গেছেন, যে পথ ধরে আমাদের চলতে হবে।

সমাজব্যবস্থা, রাষ্ট্রব্যবস্থা, অর্থব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার অর্থাৎ জীবনের সার্বিক বিভাগ ও দিকের ওপর আল্লাহ প্রদত্ত জীবনব্যবস্থাকে শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক উপায়ে কার্যকর ও বাস্তবায়ন করার মধ্যেই মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালনের যথার্থতা নিহিত। আর এভাবে একটি কল্যাণকর, শান্তিপূর্ণ সমাজ ও পরিবেশ সৃষ্টির মাঝেই বিশ্বজাহানের মালিক, প্রভু ও প্রতিপালক আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক মানব সৃষ্টির মহান উদ্দেশ্য সুশোভিত ও প্রস্ফুটিত হয়ে ওঠে।