পানি আল্লাহতায়ালার এক বিশেষ নিয়ামত। পৃথিবীর সব জীবের জীবনধারণের জন্য পানি একটি অত্যাবশ্যক পদার্থ। বিশ্বের সব প্রাণী তাই পানির ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে। পানি শুধু মানুষের পান করার জন্য নয়; বরং আরও বহুবিধ কাজের প্রধান উপকরণ। ভূপৃষ্ঠের ৭০.৯ শতাংশ অংশজুড়ে পানির অবস্থান। পৃথিবীতে প্রাপ্ত পানির ৯৬.৫ শতাংশ পাওয়া যায় মহাসাগরে। ১.৭ শতাংশ পাওয়া যায় ভূগর্ভে। ১.৭ শতাংশ পাওয়া যায় হিমশৈল ও তুষার হিসাবে। একটি ক্ষুদ্র অংশ পাওয়া যায় অন্যান্য বড় জলাশয়ে। আর ০.০০১ শতাংশ পাওয়া যায় বায়ুমণ্ডলে অবস্থিত মেঘ, জলীয়বাষ্প, বৃষ্টিপাত, তুষারপাত ইত্যাদিরূপে (যুগান্তর, ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯, অনলাইন সংস্করণ)। আন্তর্জাতিক পানি গবেষকদের মতে, পৃথিবীর পানির মাত্র ২.৫ শতাংশ হলো বিশুদ্ধ পানি এবং বাকি ৯৮.৮ শতাংশ হলো ভূগর্ভস্থ পানি ও বরফ। বিশুদ্ধ পানির ০.৩ শতাংশেরও কম অংশ পাওয়া যায় নদীতে, হ্রদে ও বায়ুমণ্ডলে।
পানি নিজেই প্রকৃতির সবচেয়ে রহস্যময় একটি পদার্থ। এর রয়েছে অস্বাভাবিক তাপ ধারণক্ষমতা, যা না-থাকলে পৃথিবীতে কোনো প্রাণীই টিকে থাকতে পারত না। এটি একটি মহামূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ। বিশ্বব্যাপী নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন পানির উৎস ঘিরে শহর, বন্দর, কলকারখানা ইত্যাদি গড়ে উঠেছে। বিশুদ্ধ পানির ব্যবসা বর্তমান পৃথিবীতে খুব লাভজনক। বিশ্ব স্টক মার্কেটে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পানির এ ব্যবসা তেল ও সোনাকে ছাড়িয়ে গেছে, যা কিনা বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির চেয়েও অনেক বেশি।
আগামী ২৫ বছরে বিশ্বের রাষ্ট্রগুলো তাদের সমুদ্রবন্দর, রেল ও সড়ক যোগাযোগের জন্য যে অর্থ খরচ করবে, তার থেকে অনেক বেশি অর্থ খরচ করতে হবে নাগরিকদের বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের জন্য। পৃথিবীতে বিশুদ্ধ পানির অভাব এত ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে যে, আগামীতে আর তেল-গ্যাস নয়; বরং যুদ্ধ হবে পানি নিয়ে। আজকাল উন্নত এবং অনুন্নত প্রায় অধিকাংশ দেশের শহরাঞ্চলে রান্নাঘরে বা বাথরুমে কল ছাড়লেই পানি পাওয়া যায়; কিন্তু আফ্রিকার গরিব দেশগুলোর জনসাধারণকে সামান্য পানির জন্য প্রতিদিন গড়ে আধা ঘণ্টা হাঁটতে হয়।
বর্তমান বিশ্বের ৮০ কোটি মানুষের কাছে পানযোগ্য সুপেয় পানি নেই। সুপেয় পানি অঞ্চলের মানুষ মলমূত্র ত্যাগ করে ওই পানি দিয়েই ফ্ল্যাশ করে। আবার ওই একই পানি দিয়ে টয়লেট পরিষ্কার করে। এ স্বাভাবিক ব্যাপারটি বিশ্বের ২৫০ কোটি মানুষের কাছে স্বপ্নবিলাসের মতো। শৌচাগার তো দূরের কথা, মলত্যাগের পর শৌচ কাজের জন্য পানিই যেখানে অপ্রতুল, সেখানে ‘পিওর’ পানি দিয়ে ফ্ল্যাশের কথা চিন্তাও তারা করে না। পৃথিবীতে ২০০ কোটি এমন বনি আদম আছে, যারা মলমূত্রমিশ্রিত পানি পান করে। আর প্রতিবছর আট লাখ মানুষ দূষিত পানি পান করে মারা যায়। প্রতিদিন তিন হাজার শিশু বিভিন্ন পানিবাহিত রোগে ভোগে। এ অবস্থায় একজন জ্ঞানী মানুষকে এক গ্লাস জীবাণুমুক্ত পানি পান করতে মহাচিন্তায় ফেলে দেয়।
প্রাকৃতিকভাবেই বাংলাদেশে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভূ-পৃষ্ঠস্থ ও ভূগর্ভস্থ পানিসম্পদ। বাংলাদেশের মানুষ তাদের দৈনন্দিন পানির চাহিদা পূরণ করে কয়েকটি উৎস থেকে। শহরাঞ্চলের মানুষ সাধারণত ভূ-গর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভর করে। সিলেট, মৌলভীবাজার, চট্টগ্রাম, খুলনা, বাগেরহাটসহ বেশকিছু অঞ্চলের মানুষকে দেখা যায়, তারা বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে তা পান করে। আবার নিজস্ব অভিজ্ঞতায় কিছু মানুষকে দেখা যায়, তারা পুকুরের পানিই সব কাজে ব্যবহার করে। সিলেট ও পার্বত্য এলাকার অনেক মানুষ পাহাড়ি ঝরনার পানিও ব্যবহার করে। এ ছাড়া নদী এলাকার মানুষ নদীর পানি দিয়েই তাদের সব কার্য সম্পাদন করে।
বাংলাদেশের জন্য এ সুপেয় পানি অন্য অনেক দেশের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড যে কৃষি, তার মূল উৎস পানি। পানি ছাড়া কোনো ফসল হয় না বললে চলে। এ মিঠাপানি দিয়েই কৃষক চাষাবাদ করছেন। অপরিকল্পিত ব্যবহার এবং অপব্যবহার পানির গুণগতমান দ্রুত কমিয়ে দিচ্ছে। এতে ভূগর্ভস্থ ও ভূ-উপরিভাগের পানি দূষিত হয়ে পড়ছে। কৃষিকাজ এবং অন্যান্য কাজে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভর করার ফলে এর স্তর গড়ে ৭.৫ মিটারের নিচে নেমে গেছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে ঢাকা শহরের দুই কোটি মানুষের পানির প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে রাজধানীর অনেক অঞ্চলে পানির স্তর ৭০ মিটার নিচে নেমে গেছে। আন্তর্জাতিক পানি বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, আগামী ৪০ বছরে বাংলাদেশের ভূগর্ভস্থ পানির সঞ্চয় প্রায় ৩৮ শতাংশ হ্রাস পাবে। একদিকে বৃষ্টিপাত কমে যাবে, অপরদিকে বর্ষার সময়ও কমে আসবে। ফলে ভূমিকম্প, ভূমিধস ইত্যাদি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়বে বাংলাদেশ।
ভয়াবহ এ বিপর্যয় আর তীব্র পানির চাহিদা থেকে বাঁচতে হলে অবশ্যই এখন থেকে উন্নত পানি ব্যবস্থাপনার দিকে নজর দেওয়া উচিত। বাংলাদেশসহ আন্তর্জাতিক বিশ্বে সুপেয় পানির জন্য নানা ধরনের ব্যবস্থাপনা প্রয়োগ করা হচ্ছে। এসব ব্যবস্থাপনা কখনো কাজে লাগছে, আবার কখনো বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনছে। বাংলাদেশের পানি ব্যবস্থাপনায় যথেষ্ট দুর্বলতা বা ঘাটতি দেখা যায়। তাই এদেশের মানুষের জন্য একটি উন্নত ও বাস্তবমুখী পানি ব্যবস্থাপনা প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। পানি ব্যবস্থাপনায় ইসলামের সুস্পষ্ট ও যৌক্তিক কিছু বিধান আছে।
তাই এ ব্যবস্থাপনা প্রণয়নে ইসলামি বিধিবিধানের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। ইসলাম পানি ব্যবস্থাপনার নানাবিধ পদ্ধতির কথা উল্লেখ করেছে। এসব নীতি ও পদ্ধতি বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে উন্নত ও সুপরিকল্পিত বলে প্রমাণিত।
বাংলাদেশের শহরাঞ্চলের নদী ও খালগুলো কলকারখানার বর্জ্য নিক্ষেপের ফলে পানির স্বাভাবিক গতিধারা ব্যাহত হচ্ছে। ইসলাম এটাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। হাদিসে এসেছে-‘তোমাদের কেউ যেন বদ্ধ পানিতে প্রস্রাব না করে। কারণ, মানুষ ওই পানি দিয়েই গোসল করে’ (বুখারি, মুসলিম, তিরমিজি, ইবনু মাজাহ, নাসাঈ)। পানির অপচয় একটি নিন্দনীয় কাজ। অথচ বাংলাদেশে প্রতিদিন অন্তত ৫৭ কোটি লিটার পানি অপচয় হয়। ইসলাম পানি ব্যবহারে অত্যন্ত যত্নবান হওয়ার উপদেশ ও উৎসাহ প্রদান করে। কোনোভাবেই পানির অপচয় ইসলাম সমর্থন করে না। যদি নদী অথবা সাগরপাড়ে মানুষ অজু-গোসল করে, সেক্ষেত্রেও প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করা ইসলামে নিষিদ্ধ। মানবজীবনে পানি ব্যবহারের এমন বিধান সব ধর্ম, বর্ণ ও সব দেশের জন্য সমভাবে কল্যাণকর হবে, যদি পানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এর বাস্তব প্রয়োগ ঘটানো যায়।
বর্তমানে ‘বর্জ্য পানি’র ব্যবহার বিশ্বব্যাপী অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। সৌদি আরবের সর্বোচ্চ শরিয়া বোর্ড কর্তৃক ১৯৮০ সালে বর্জ্য পানি ব্যবহারের ফতোয়া জারির পর নবায়নকৃত পানি মক্কা ও মদিনার মুসল্লিদের টয়লেট ফ্ল্যাশিং ও অজুর কাজে ব্যবহার করা হয়। কুয়েত সরকার সে দেশের ১৭শ’ হেক্টর জমিতে রসুন, পেঁয়াজ, মরিচসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদনে ব্যবহার করে সুফল পায়। এ ছাড়া ১৯৯৮ সালে জর্ডান সরকার ৭০ মিলিয়ন কিউবিক বর্জ্য পানি দেশের বিভিন্ন উৎপাদনমুখী কাজে ব্যবহার করে, যা দেশের মোট পানি ব্যবহারের ১২ শতাংশ।
পরবর্তী সময়ে ফিলিস্তিনের বর্জ্য পানি দিয়ে চাষাবাদ করা জমি থেকে উৎপাদিত বেগুন, মরিচ, আপেল, আঙুর ও সবজি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনায় ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে তা নিরাপদ বলে ঘোষণা করা হয়। সুতরাং বাংলাদেশের পানি সংকট দূরীকরণ ও উন্নত পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এখন থেকেই বর্জ্য পানি ব্যবহারের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কারণ, এটি স্বাস্থ্যসম্মত ও পরীক্ষিত বলে প্রমাণিত হয়েছে।